বিপ্লব কেন হয় বা বিপ্লব সংঘটিত হবার কারণ (ইংরেজি: Causes of Revolution) বুঝতে হলে বিপ্লবের সংজ্ঞা থেকে শুরু করা যেতে পারে। বিপ্লবের কারণ তার সংজ্ঞার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। চারটি বিপ্লবের সাদৃশ্য বিবেচনা করে ক্রেন ব্রিন্টন The Anatomy of Revolution (১৯৬৫) গ্রন্থে বিপ্লবের একটি তত্ত্ব গড়ে তোলেন। বিপ্লবগুলি হলো ইংল্যান্ডের বিপ্লব (১৬৪০), মার্কিন বিপ্লব (১৭৭৬), ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯) ও রুশ বিপ্লব (১৯১৭)। তার মূল প্রতিবেদন হলো—
- অর্থনৈতিক সংকট সরকারকে অপদার্থ কর।
- অপদার্থতা গুরুত্বপূর্ণ গোষ্ঠীর অগ্রগতির পথে বাধা হওয়ায় হতাশা সঞ্চার করে।
- অসন্তোষের সৃষ্টি হয়।
- বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গ ত্যাগ ও সংগঠিত হওয়ার মাধ্যমে অসন্তুষ্টরা রাজনৈতিক ভাবে সক্রিয় হয়।
- সরকার সফলভাবে সংশোধন আনার প্রচেষ্টা চালায়।
- শ্রেণি সংগ্রাম জোরালো হয়।
- পরিস্থিতির মোকাবিলা করার পদ্ধতি নিয়ে শাসক শ্রেণির মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হয়।
- সরকারের কার্যকলাপ ক্রমেই আরো বেশি অসংগত হয়ে ওঠে। সংকট বৃদ্ধি পায়।
এই পর্যায়, ব্রিণ্টনের মতে, বিপ্লব বাতাসে থাকে। লোকে তার কথা আলোচনা করে এবং তখন বিপ্লব ঘটে।
লুই গটসচক্ ‘Causes of Revolution’ গ্রন্থে বিপ্লব কেন ঘটে তার কারণ হিসাবে বলেন
‘(১) একটি পরিবর্তনের দাবি সেটার কারণ (ক) ব্যাপক প্ররোচনা ও (খ) ঐক্যবদ্ধ জনমত। ও (২) পরিবর্তন সম্পর্কে আশাবাদী, যেটির কারণ আবার (ক) একটি জনপ্রিয় কর্মসূচি ও (খ) বিশ্বস্ত নেতৃত্ব। তবে এই চারটি কারণও কিন্তু এক সাথে কার্যকর হলেও নিজে থেকে বিপ্লব আনতে পারে না। এগুলি দূরবর্তী কারণ..। পাঁচটি কারণের মধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো সংরক্ষণপন্থি শক্তির দুর্বলতা। এটি বিপ্লবের প্রয়োজনীয় প্রত্যক্ষ কারণ।’
টেড গুড Why Men Rebel (১৯৭০) বইতে বলেন যে, তুলনামূলকভাবে বঞ্চিত হওয়ার ব্যাপক ধারণা অসন্তোষ সঞ্চার করে। সেই অসন্তোষের রাজনীতিকরণ হয়, যা রাজনৈতিক হিংসার সৃষ্টি করে।
চার্লস টিলি From Mobilization to Revolution, (১৯৭৮) গ্রন্থে এবং থিড়া স্কচুপল States and Social Revolutions (১৯৭৯) গ্রন্থে যে কারণগুলিকে গুরুত্ব দেন সেগুলি হলো—রাষ্ট্র দুর্বল হওয়া, ব্যাপক বিরোধিতার সৃষ্টি হওয়া ও বিপ্লবী শক্তির সাফল্যের সম্ভাবনা। কোন ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে এই কারণগুলি উঠে আসে সেগুলির উপর জোর দেওয়া হয়।
১৯৬৬ তে Chalmer Johnson-এর গুরুত্বপূর্ণ কাজ Revolutionary Change প্রকাশিত হয়। ব্রিন্টনের The Anatomy of Revolution-এর এক বছর পর। তিনি বিপ্লবকে অ-সামাজিক বলে আখ্যা দেন। এই ধরনের ঘটনা সেখানেই ঘটে যেখানে মূল্যবোধের সহমত আর নেই। অর্থাৎ যে সমাজে ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। বিপ্লব ঘটে এবং সফল হয় কারণ রাজনৈতিক নেতৃত্ব তার কাজ করতে ব্যর্থ হয়।
জনসন মনে করেন বিপ্লব ঘটার প্রয়োজন নেই, এবং সফল হওয়ারও দরকার নেই। ভি আই লেনিন বলেন, ‘যখন তীব্র শ্রেণিসংগ্রামের দ্বারা চালিত লক্ষ লক্ষ মানুষ শ্রেণি সচেতনতা, ইচ্ছাশক্তি, আবেগ ও স্বপ্ন বলে সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে তা প্রয়োগ করে তখন বিপ্লব ঘটে।’ [Left Wing Communism: An Infantile Disorder.] তার কাছে বিপ্লবের মূল নীতি হলো—
‘বিপ্লবের পক্ষে এটাই যথেষ্ট নয় যে শোধিত আবদমিত জনগণ মনে করে আগের মত অবস্থায় থাকা সম্ভব নয় এবং পরিবর্তন দাবি করে। বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন সেই পরিস্থিতি যেখালে শোষণকারীরা আর আগের মতন করে আর বাঁচতে বা শাসন করতে পারবে না। একমাত্র যখন নিম্নবর্গরা আগের পথটা চায় না আর উচ্চশ্রেণিরা আগের প্রক্রিয়ায় চালাতে পারে না—শুধু তখনই বিপ্লব সফল হতে পারে।’
আন্দোলনের প্রক্রিয়ায় সমাজের কিছু সমস্যা সমাধান করতে পারার দাবি খেকেই বিপ্লবী এলিট-এর বৈধতা সৃষ্টি হয়।
আরো পড়ুন
- মার্কসবাদ প্রসঙ্গে
- কর্তৃত্ব প্রসঙ্গে
- এশীয় উৎপাদন পদ্ধতি হচ্ছে কার্ল মার্কস কর্তৃক তৈরিকৃত একটি তত্ত্ব
- উৎপাদনের উপকরণ বলতে সম্পদকে বোঝায় যা সমাজকে উৎপাদনে নিযুক্ত করে
- উৎপাদিকা শক্তি হচ্ছে উৎপাদনের উপকরণ এবং মানুষের শ্রমশক্তি
- উৎপাদন সম্পর্ক পণ্যের উৎপাদন, বণ্টন ও বিনিময়ের প্রক্রিয়ায় যুক্ত মানুষের সম্পর্ক
- উৎপাদন পদ্ধতি হচ্ছে মার্কসবাদী ঐতিহাসিক বস্তুবাদ তত্ত্বের অন্যতম উপাদান
- মার্কসবাদের একটা বৃহত্তর আখ্যান দরকার যা পুঁজিবাদকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে — অরুণ গুপ্ত
- সাম্যবাদ মানুষের সর্বাঙ্গীণ বিকাশের সর্বোচ্চ সামাজিক স্তর
- সমাজ হচ্ছে মানুষের পারস্পরিক ক্রিয়াকলাপের উৎপাদন
- বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের দর্শন হচ্ছে মার্কসবাদ
- রাষ্ট্র হচ্ছে শ্রেণি শোষণ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার
- পুঁজিবাদ হচ্ছে মানবেতিহাসে পণ্য সম্পর্কের সামাজিক স্তর
- পুঁজি হচ্ছে উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উপাদানসমূহের একটি
- কার্ল মার্কসের বিচ্ছিন্নতার তত্ত্ব মানব প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করে
- মার্কসবাদী বিশ্বদৃষ্টিতে ধর্মের স্বরূপ বিশ্লেষণ
- মার্কসবাদী দৃষ্টিতে ইতিহাস হচ্ছে সমাজের অবস্থা ও সম্পর্কের বিশ্লেষণী পদ্ধতি
- মার্কসীয় তত্ত্বের মূলনীতি হচ্ছে মার্কসের রচনায় অনুসৃত কতিপয় মৌলিক নীতি
- ঐতিহাসিক বস্তুবাদ হচ্ছে সমাজ জীবনে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের মূলনীতিগুলোর প্রয়োগ
- উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব হচ্ছে মার্কসবাদের অর্থনৈতিক উপাদান
- বিপ্লবের মার্কসবাদী তত্ত্ব হচ্ছে আজ পর্যন্ত উঠে আসা সব থেকে স্পষ্ট বৈপ্লবিক চিন্তা
- বিপ্লব হচ্ছে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সংগঠনের মৌলিক ও আকস্মিক পরিবর্তন
- উদ্বৃত্ত মূল্য কাকে বলে?
- শ্রেণীসংগ্রাম হচ্ছে মার্কসবাদের একটি রাজনৈতিক উপাদান
- শ্রেণিসংগ্রাম হচ্ছে শ্রেণি বিভক্ত সমাজে পরস্পরবিরোধী দুটি শ্রেণির দ্বন্দ্ব
- দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ হচ্ছে মার্কসবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি
- মার্কসবাদের তিনটি উপাদান প্রসঙ্গে একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা
- দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ দ্বন্দ্ববাদ ও বস্তুবাদ থেকে সংশ্লেষণের মাধ্যমে উদ্ভূত মতবাদ
- মার্কসবাদের তিনটি উৎস জার্মান দর্শন, ফরাসি সমাজতন্ত্র এবং ব্রিটিশ অর্থনীতি
- মার্ক্সবাদ প্রলেতারিয়েতের শ্রেণিযুদ্ধের হাতিয়ার ও তাদের মুক্তির মতবাদ
- মার্কসবাদী তত্ত্বের বিকাশে লেনিনের সৃজনশীল অবদান
- মার্কসবাদে লেনিনের অবদান সৃজিত হয়েছে ছয়টি প্রধান ক্ষেত্রে
- সাম্যবাদী প্রচারণা হচ্ছে রাজনৈতিক সচেতনতা ও প্রভাব বৃদ্ধির প্রক্রিয়া
- পার্টি শৃঙ্খলা সম্পর্কে লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টির নীতি ও সে সম্পর্কিত ধারণা
- গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতাবাদ কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নীতিনির্ধারণ প্রণালী
- গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদ লেনিনবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর কাঠামোগত নীতি
- অর্থনীতিবাদ বিরোধী সংগ্রাম হচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টির একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য
- অর্থনীতিবাদ শ্রমিক আন্দোলনে রাজনীতি বাদ দিয়ে আর্থিক দাবি আদায়ের প্রবণতা
- বস্তুবাদ হচ্ছে দর্শনের ধারণা, যাতে বোঝায় জাগতিক যাবতীয় অস্তিত্বের আধার বস্তু
- মার্কসবাদী শ্রেণি তত্ত্ব হচ্ছে মার্কস ও এঙ্গেলস প্রণীত সামাজিক শ্রেণি সংক্রান্ত বীক্ষা
- সর্বহারা একনায়কত্ব থেকেই নির্মিত হয়েছে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের পথ
- সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণের সম্পর্ক জড়িত রাজনৈতিক অর্থনীতি অধ্যয়নের সংগে
জ্যাক গোল্ডস্টোন Revolution and Rebellion in the Early Modern World, (১৯৯১) গ্রন্থে বিপ্লব কেন এবং বিপ্লবের উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যার সমন্বয়ে বিপ্লব হয় সেগুলিকে চিহ্নিত করেন। প্রথমত, রাষ্ট্রের সম্পদের সংকট। দ্বিতীয়ত, এলিটদের মধ্যে বিভাজন। রাষ্ট্রের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ায় এলিটরা আলাদা আলাদা গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে প্রতিটি গোষ্ঠীই নিজে সরকার নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা চালায়। তৃতীয়ত, ব্যাপক আকারে জনগণের সংগঠিত হওয়ার সম্ভাবনা। যখন এই তিনটি পরিস্থিতি এক সাথে উপস্থিত তখন গোল্ডস্টোনর মতে, বিপ্লবী সংকট সৃষ্টি হয়।
তথ্যসূত্র
১. দেবী চ্যাটার্জী, রাষ্ট্রচিন্তার বিষয়সমূহ, নেতাজী সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় পুনর্মুদ্রণ ডিসেম্বর ২০১৯, পৃষ্ঠা ১৩৪-১৩৫।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।