মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি উপাদান অথবা মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি অঙ্গ (ইংরেজি: The Three Sources and Three Component Parts of Marxism) হচ্ছে রুশ বিপ্লবী ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের লেখা কালজয়ী প্রবন্ধ। ১৯১৩ সালে প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধটি কার্ল মার্কসের ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে লিখিত এবং এই প্রবন্ধে লেনিন অত্যন্ত সহজভাবে মার্কসবাদের দার্শনিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তি ব্যাখ্যা করেছেন।
লেনিন দেখিয়েছেন যে, মার্কসবাদ কোনো আকাশকুসুম কল্পনা নয়, বরং মানবজাতির অর্জিত শ্রেষ্ঠ তিনটি জ্ঞানভাণ্ডারের যৌক্তিক উত্তরসূরি:
১. ধ্রুপদী জার্মান দর্শন: এই উৎস থেকে বিকশিত হয়েছে মার্কসবাদের দার্শনিক ভিত্তি—দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। এটি বিশ্বজগৎ ও সমাজ পরিবর্তনের নিয়ম ব্যাখ্যা করে।
২. ইংরেজ রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র: এই উৎসের ওপর ভিত্তি করে মার্কস তাঁর অর্থনৈতিক তত্ত্ব বা উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব প্রদান করেন। এটি পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শোষণের প্রক্রিয়াটি বৈজ্ঞানিকভাবে তুলে ধরে।
৩. ফরাসি কল্পলৌকিক সমাজতন্ত্র: কল্পলৌকিক সমাজতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এই উৎস থেকে জন্ম নিয়েছে মার্কসবাদের রাজনৈতিক উপাদান—শ্রেণিসংগ্রাম ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ধারণা।
তবে মনে রাখা প্রয়োজন যে, মার্কসবাদ কেবল এই তিনটি উপাদানেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি গতিশীল জীবনদর্শন, যা ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সমাজবিজ্ঞানের আরও নানাবিধ জটিল বিষয় ও মতবাদকে ধারণ করে একটি পূর্ণাঙ্গ বৈপ্লবিক তত্ত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
‘মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি উপাদান’ প্রবন্ধে লেনিন সেইসব সমালোচকদের কঠোর বিরোধিতা করেছেন, যারা মার্কসবাদকে একটি বিচ্ছিন্ন বা ‘বিষাক্ত গোষ্ঠী’র সংকীর্ণ মতবাদ হিসেবে চিত্রিত করতে চেয়েছিলেন। এই ধরনের অপবাদ প্রত্যাখ্যান করে লেনিন অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রমাণ করেন যে, মার্কসবাদ কোনো আকস্মিক বা কৃত্রিম উদ্ভাবন নয়। বরং এটি মানবজাতির অর্জিত সমস্ত শ্রেষ্ঠ জ্ঞান ও ইতিহাসের এক স্বাভাবিক ও যৌক্তিক পরিণতি।
লেনিন স্পষ্ট করে বলেন যে, মার্কসবাদ বিশ্ব সভ্যতার মূল ধারা থেকে বিচ্যুত কোনো মতবাদ নয়। বরং মানবজাতির ইতিহাসের অগ্রগতির পথে দর্শন, অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যে মহান প্রশ্নগুলো উঠেছিল, মার্কসবাদ কেবল সেই প্রশ্নগুলোরই বিজ্ঞানসম্মত উত্তর প্রদান করেছে। ১৯১৩ সালের সেই প্রবন্ধে লেনিন লিখেছিলেন:
‘গোষ্ঠীবাদ’ বলতে যদি বোঝায় একটি আত্মবদ্ধ, শিলীভূত মতবাদ, যার উদয় হয়েছে বিশ্বসভ্যতার বিকাশের রাজপথ থেকে বহু দূরে, তবে দর্শন এবং সামাজিক বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে অতি পরিষ্কার করে দেখা যায় যে, মার্কসবাদের মধ্যে তেমন কোনো কিছুই নেই।
লেনিন তাঁর প্রবন্ধে অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে যুক্তি দিয়েছেন যে, মার্কসবাদ কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক উদ্ভাবন নয়। বরং এটি ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত মানবচিন্তার শ্রেষ্ঠ অর্জনগুলোর এক নিবিড় সংশ্লেষণ। তিনি দেখিয়েছেন যে, মার্কসবাদ কেবল পুরোনো তত্ত্বের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং তা ছিল প্রচলিত জ্ঞানের এক সমালোচনামূলক পুনর্ব্যাখ্যা।
সৃজনশীল ব্যাখ্যার ফলে মার্কসবাদ একটি সুসম্পূর্ণ ও সুসমঞ্জস মতবাদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা কোনো প্রকার কুসংস্কার বা সংকীর্ণতার প্রশ্রয় দেয় না। এই তত্ত্বের মাধ্যমেই মানুষ একটি সামগ্রিক বিশ্বদৃষ্টি লাভ করে, যা তাকে সমাজ, প্রকৃতি এবং ইতিহাসের গতিরোধক শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে এক অপরাজেয় বৈজ্ঞানিক হাতিয়ার তুলে দেয়। লেনিনের মতে, মার্কসবাদ মানুষের চিন্তাজগতে এমন এক পূর্ণাঙ্গ দর্শন উপহার দিয়েছে যা কেবল বিশ্বকে ব্যাখ্যাই করে না, বরং তাকে পরিবর্তনের পথও দেখায়।
মার্কস ও এঙ্গেলসের দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে তাঁদের সরাসরি পূর্বসূরি হেগেল এবং ফয়ারবাখ সবচেয়ে গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন। হেগেলের ভাববাদী দর্শন থেকে দ্বান্দ্বিকতার ধারণা নিয়ে সেটিকে আমূল পরিবর্তিত ও রূপান্তরিত করে মার্কসবাদ বস্তুবাদী দ্বান্দ্বিকতার ভিত্তি স্থাপন করে। আবার হেগেলের ভাববাদের সীমাবদ্ধতা ভাঙতে গিয়ে তাঁরা ফয়ারবাখের বস্তুবাদসহ সমগ্র বস্তুবাদী ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করেছিলেন। মূলত হেগেল ও ফয়ারবাখের দর্শন ব্যবস্থার এক বৈপ্লবিক ও সৃজনশীল রূপান্তরের মাধ্যমেই দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ জন্ম নিয়েছে, যা সামাজিক ও প্রাকৃতিক বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করার এক সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে।
মার্কস দার্শনিক বস্তুবাদকে পূর্ণাঙ্গভাবে গভীর ও বিকশিত করেছিলেন এবং প্রকৃতির জ্ঞানকে মানব সমাজের জ্ঞানকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রসারিত করেছিলেন। বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনায় তাঁর ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ছিল এক বিরাট অর্জন।
অসামান্য ইংরেজ অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ (১৭২৩-১৭৯০) এবং ডেভিড রিকার্ডো (১৭৭২-১৮২৩) বুর্জোয়া সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। তাঁরাই প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে ‘শ্রমের মূল্যতত্ত্ব’ প্রমাণ করেন, যা মার্কস ও এঙ্গেলসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তাঁদের এই অর্থনৈতিক ধারণাগুলোই মূলত মার্কস ও এঙ্গেলসকে ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সামাজিক দর্শন বিকশিত করতে এবং পুঁজিবাদের অভ্যন্তরীণ শোষণের প্রক্রিয়াটি উন্মোচন করতে সাহায্য করেছিল।
প্রভাব
সোভিয়েত ইউনিয়নে ভ্লাদিমির লেনিনের “মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি উপাদান” প্রবন্ধটি মার্কসবাদের সারমর্ম ও তাত্ত্বিক উৎসের এক অনন্য সংক্ষিপ্ত দলিল হিসেবে বিবেচিত হতো। এটি কেবল উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্যই নয়, বরং মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যসূচির একটি আবশ্যিক অংশ ছিল।
এই প্রবন্ধের একটি বিখ্যাত উদ্ধৃতি—“কার্ল মার্কসের মতবাদ সর্বশক্তিমান, কারণ তা সত্য” (রুশ: Учение Маркса всесильно, потому что оно верно)—সোভিয়েত যুগে এক অবিস্মরণীয় নীতিবাক্যে পরিণত হয়েছিল। প্রচার মাধ্যম থেকে শুরু করে শিক্ষামূলক সাহিত্য ও পোস্টার, সর্বত্রই এই উক্তিটি মার্কসীয় দর্শনের অভ্রান্ততা ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তির প্রতীক হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো।
আরো পড়ুন
- রাষ্ট্র ও বিপ্লব: অধ্যায় ৩ (৪) — জাতীয় ঐক্যের সংগঠন
- মার্কসবাদ এবং শোধনবাদ
- মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি উপাদান
- মার্কসবাদ প্রসঙ্গে
- কর্তৃত্ববাদ হচ্ছে রাজনৈতিক ব্যবস্থা যার বৈশিষ্ট্য হলো রাজনৈতিক বহুত্ববাদ প্রত্যাখ্যান
- কর্তৃত্ব প্রসঙ্গে
- দ্বন্দ্ববাদের উদাহরণ
- মার্কসবাদ ও অভ্যুত্থান
- বিশ্বজুড়ে মার্কসবাদ, মুক্তি কোন পথে
- বাংলাদেশে মার্কসবাদ চর্চা
- শ্রেণি উদ্ভব হবার কারণ ও বিলুপ্তি প্রসঙ্গে মার্কসবাদ
- বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের দর্শন হচ্ছে মার্কসবাদ
- রাষ্ট্র হচ্ছে শ্রেণি শোষণ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার
- বিপ্লব কেন হয় বা বিপ্লব সংঘটিত হবার কারণ প্রসঙ্গে
- ধ্রুপদী জার্মান দর্শনের সমালোচনা হচ্ছে মার্কস ও এঙ্গেলসের দার্শনিক আলোচনা
- বস্তুবাদ ও ভাববাদ হচ্ছে দুটি পরস্পরবিরোধী বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি
- মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি উপাদান প্রসঙ্গে একটি আলোচনা
- মার্কসবাদী দর্শন-এর একটি সাধারণ রূপরেখা
- মার্ক্সবাদ প্রলেতারিয়েতের শ্রেণিযুদ্ধের হাতিয়ার ও তাদের মুক্তির মতবাদ
- ভ্যানগার্ডবাদ বা ভ্যানগার্ড পার্টি গঠন সম্পর্কে লেনিনবাদী দৃষ্টিভঙ্গি
- মার্কসবাদে লেনিনের অবদান সৃজিত হয়েছে ছয়টি প্রধান ক্ষেত্রে
- পুঁজিপতিরা কীভাবে তাদের মুনাফা গোপন করে
- বলশেভিকবাদ রাষ্ট্রচিন্তা এবং রাষ্ট্রশাসন প্রণালীর বিপ্লবী মার্কসবাদী ধারা
- শ্রেণিহীন সমাজ হচ্ছে এমন সমাজ যেখানে কেউ সামাজিক শ্রেণিতে থাকে না
- হেগেলীয় দ্বান্দ্বিকতা বা দ্বন্দ্ববাদ: পরম ভাববাদ ও জগতের প্রপঞ্চ অনুধাবনের দার্শনিক পদ্ধতি
- উৎপাদিকা-শক্তি ও উৎপাদন-সম্পর্ক প্রসঙ্গে মার্কসীয় অর্থশাস্ত্রের বিশ্লেষণ
তথ্যসূত্র
১. ভি আই লেনিন, মার্চ, ১৯১৩, মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি উপাদান, মার্কস-এঙ্গেলস-মার্কসবাদ, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো; ১৯৭৫।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।