উৎপাদনের উপকরণ বলতে সম্পদকে বোঝায় যা সমাজকে উৎপাদনে নিযুক্ত করে

উৎপাদনের উপকরণ (ইংরেজি: Means of production) বলতে রাজনৈতিক দর্শনে সাধারণভাবে প্রয়োজনীয় সম্পত্তি এবং সম্পদকে বোঝায় যা একটি সমাজকে উৎপাদনে নিযুক্ত করতে সক্ষম করে। যদিও এই শব্দটিতে অন্তর্ভুক্ত সঠিক সম্পদগুলি ভিন্ন হতে পারে, তবুও উৎপাদনের ধ্রুপদী কারণগুলি (ভূমি, শ্রম এবং মূলধন) এবং স্থিতিশীল স্তরের উৎপাদনশীলতা চালাতে পুনরুৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সাধারণ অবকাঠামো এবং মূলধনী বা মূলধনের দ্রব্যগুলি অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে ব্যাপকভাবে একমত। এটি “উৎপাদন ও বিতরণের উপকরণ” এর সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে যার মধ্যে অতিরিক্তভাবে পণ্যের স্থানান্তর বিতরণ ও সরবরাহ অন্তর্ভুক্ত থাকে, সাধারণত পরিবেশকদের মাধ্যমে; অথবা “উৎপাদন, বিতরণ এবং বিনিময়ের উপকরণ” এর সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে যার মধ্যে সাধারণত ভোক্তাদের কাছে বিতরণকৃত পণ্যের বিনিময় অন্তর্ভুক্ত থাকে।[১]

“উৎপাদনের উপকরণ” ধারণাটি রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সমাজবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন গবেষণা ক্ষেত্রের গবেষকরা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেন। সমাজে যেসব দ্রব্যের উৎপাদনশীল ব্যবহার আছে গবেষকরা সেসব দ্রব্যের মালিকানা এবং দ্রব্যগুলি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক অংশগুলির মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন।

মানুষের প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী তৈরির জন্য মানুষের শ্রম এবং মাল-মসলা ও যন্ত্রপাতির সমাহারকে উৎপাদনের উপকরণ বা উপায় বলা যায়। অর্থাৎ ‘উৎপাদনের উপকরণ’ বলতে তাই মানুষের শ্রমশক্তি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের বিভিন্ন ধরনকে বুঝায়। মানুষের শ্রম যার উপর প্রয়োগ করা হয় তাকে বলা যায় শ্রমের মাধ্যম বা শ্রমের উপকরণ। এই অর্থে শ্রমের উপকরণ বলতে যে সমস্ত বস্তু এবং যন্ত্রপাতির দ্বারা মানুষ তার প্রয়োজনীয় কোনো কিছু উৎপাদন করে সে সমস্ত বস্তু এবং যন্ত্রপাতিকে বুঝায়।

প্রাচীনকালে মানুষ প্রধানত লাঠি এবং ঘর্ষিত পাথরের অস্ত্র ব্যবহার করে তার জীবনের প্রয়োজনীয় খাদ্য এবং অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহ এবং তৈরি করত। তাই প্রাচীনকালের মানুষের কাছে তার শ্রমের উপকরণ বা মাধ্যম ছিল লাঠি এবং পাথরের অস্ত্র। আধুনিক মানুষের কাছে তার শ্রম প্রয়োগের হাতিয়ার হচ্ছে বিবিধ রকম যন্ত্রপাতি। শ্রমের মাধ্যমের মধ্যে জমি, শ্রমের স্থান বা ঘর, রাস্তা ঘাট, খাল, নদী, পরিবহনের গাড়ি, জাহাজ প্রভৃতিকেও অন্তুর্ভুক্ত করতে হয়। অর্থাৎ উৎপাদনের জন্য শ্রমের কার্যকর প্রয়োগের যাবতীয় উপকরণই শ্রমের উপায় বা মাধ্যম।

প্রাচীনকাল হতে শুরু করে মানুষের শ্রমের প্রয়োগে উৎপাদনের উপকরণ ক্রমান্বয়ে উন্নত এবং পরিবর্তিত হয়েছে। মানুষের শ্রমই যে কেবল উৎপাদনের উপকরণ পরিবর্তন করেছে তাই নয়। উৎপাদনের উপকরণও আবার শ্রমের ক্ষেত্রে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্দিষ্ট করেছে। এক জোড়া গরু এবং একখানি লাঙ্গল যখন উৎপাদন বা শ্রমের উপকরণ ছিল তখন শ্রমের ক্ষেত্রে মানুষের সম্পর্ক ছিল প্রধানত ব্যক্তিগত এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন।

শিল্প উৎপাদন

উৎপাদনের সামাজিক উপকরণ হচ্ছে মূলধনী দ্রব্য এবং সম্পত্তি যা পরিচালনার জন্য ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার বিপরীতে সংগঠিত সম্মিলিত শ্রম প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয়। বিভিন্ন ধরণের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার শ্রেণীবিভাগ এবং সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে উৎপাদনের সামাজিক উপকরণের মালিকানা এবং সংগঠন একটি মূল বিষয়।

আধুনিককালে জটিল এবং বৃহৎ যন্ত্রপাতি যেখানে উৎপাদনের প্রধান উপকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে শ্রমের ক্ষেত্রে মানুষের সম্পর্ক অপরিহার্যরূপে যৌথ এবং সম্মিলিত সম্পর্কের রূপ গ্রহণ করেছে।[২]

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র:

১. অনুপ সাদি, ১ জুলাই ২০১৯; রোদ্দুরে.কম, “উৎপাদনের উপকরণ কাকে বলে?”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/encyclopedia/marxist-glossary/on-means-of-production/
২. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ২৮৩-২৮৪।

Leave a Comment

error: Content is protected !!