উৎপাদিকা শক্তি (ইংরেজি: Productive forces, productive powers, বা forces of production) হচ্ছে উৎপাদনের উপকরণ এবং মানুষের শ্রমশক্তির সমন্বয়। মানুষ তার জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার মাধ্যমে উৎপাদনের উপকরণকে কাজে লাগায়। উৎপাদিকা শক্তি সামাজিক উৎপাদনের প্রধান, সর্বাপেক্ষা গতিশীল উপাদান।[১] এটি মার্কসবাদ এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদ তত্ত্বের অন্যতম প্রধান ধারণা। উৎপাদিকা শক্তি প্রকৃতির বস্তু ও শক্তির প্রতি মানুষের সম্পর্ক প্রকাশ করে। উৎপাদনের উপকরণের উৎকর্ষসাধন, প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ, প্রকৃতি ও সমাজের বিকাশের নিয়মাবলী আয়ত্তকরণ — উৎপাদিকা শক্তির নিরবচ্ছিন্ন বিকাশের নির্ধারক উপাদান।
অর্থাৎ উৎপাদিকা শক্তি হচ্ছে দ্রব্যের উৎপাদনযন্ত্র এবং মানুষ, যারা এসব মাধ্যমকে ব্যবহার করে; এক কথায় উৎপাদনের উপকরণ ও শ্রম শক্তির একত্রীকরণ হচ্ছে উৎপাদিকা শক্তি। উৎপাদিকা শক্তি এবং উৎপাদন সম্পর্ক একযােগে উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তােলে।[২]
বিভিন্ন উপাদান নিয়ে যে উৎপাদনী শক্তি তার মধ্যে যন্ত্রব্যবহারকারী শ্রমিকের ভূমিকাই প্রধান। শ্রমিক একদিকে যেমন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে সম্পদ উৎপাদন করে তেমনি শ্রমের মাধ্যমে যন্ত্রের ক্রমাধিক উন্নতি তারাই সাধন করে, অর্থাৎ যন্ত্রের সঙ্গে শ্রমিকের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক এবং অভিজ্ঞতা যন্ত্রের উন্নতির মূল কারণ হিসেবে কাজ করে। শ্রমশক্তির উৎপাদনী ক্ষমতার ক্রমবৃদ্ধির মূলেও শ্রমিক। মানুষের সমাজের বিশেষ পর্যায়ের উৎপাদনী শক্তির অবস্থা প্রকৃতির উপর সেই সমাজের শক্তির পরিমাণের পরিচায়ক।[৩] ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস কমিউনিজমের নীতিমালার ১৬ নং প্রশ্নের উত্তরে লিখেছেন,
সবার চাহিদা অনুসারে যোগান দেবার জন্যে: পর্যাপ্ত সেই পরিমাণ উৎপাদই শুধু নয়, অধিকন্তু সামাজিক পুঁজি বাড়াবার এবং উৎপাদন-শক্তিসমূহের আরও সম্প্রসারের জন্যে আবশ্যক উদ্ধৃত্তি উৎপাদ যতক্ষণ না হয়, ততক্ষণ সবসময়ে থাকেই একটা প্রাধান্যশালী শ্রেণী, যেটা সমাজের উৎপাদনশক্তিসমূহের পরিচালক, আর একটা গরিব উৎপীড়িত শ্রেণি। উৎপাদন বিকাশের পর্বের উপর নির্ভর করে শ্রেণী-দুটোর গড়নের ধরন।
উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের চরিত্র ও মাত্রার সঙ্গে উৎপাদন-সম্পর্কের সামঞ্জস্যের নিয়ম
উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের চরিত্র ও মাত্রার সঙ্গে উৎপাদন সম্পর্কের সামঞ্জস্যের নিয়ম হচ্ছে একটি অর্থনৈতিক নিয়ম যা উৎপাদিকা শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের অন্তর্নিহিত নির্ভরশীলতা প্রকাশ করে। উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তন আনে। এই নিয়মের ক্রিয়ার ভিত্তিতে একটি সামাজিক ব্যবস্থা থেকে আরেকটিতে উৎক্রমণ ঘটে। নিচে নিয়মটি ব্যাখ্যা করা হলো:
উৎপাদিকা শক্তি প্রতি মুহুর্তেই পরিবর্তিত ও উন্নত হতে থাকে। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে সাধারণত দেখা যায় যে, শ্রমের যন্ত্রের উন্নতি ঘটে প্রথমে। অপেক্ষাকৃত অনুন্নত যন্ত্রের স্থলে উন্নততর যন্ত্র আবিষ্কৃত হয়। উন্নততর যন্ত্রের পরিপূর্ণ ব্যবহারের জন্য ভিন্নতর শ্রম বা উৎপাদন সম্পর্কের আবশ্যক হয়। অবশ্য একটিমাত্র উন্নত যন্ত্রের আবিষ্কারেই যে ভিন্নতর উৎপাদন সম্পর্কের আবশ্যক হয় এমন কথা বলা হচ্ছে না। ব্যাপকভাবে যন্ত্রের যখন উন্নতি ঘটে তখন দেখা যায় যে, পূর্বকার উৎপাদন সম্পর্ক যেমন উন্নততর যন্ত্র ব্যবহারে উপযুক্ত নয়, তেমনি পুরাতন সম্পর্কের ভিত্তিতে উৎপাদনও আর বৃদ্ধি করা সম্ভব হচ্ছে না।[৩]
ফলে পণ্য উৎপাদনের বিকাশ ও উন্নয়নের একটি নির্দিষ্ট স্তরে উৎপাদন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় উপাদান উৎপাদিকা শক্তির সঙ্গে সাবেকি উৎপাদন সম্পর্কের সংঘর্ষ বাধে। কারণ ওই উৎপাদন সম্পর্ক উন্নয়নের পরিপূরকতার পরিবর্তে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। উৎপাদিকা শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে বৈসাদৃশ্য কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রয়ােজন হয় সমাজ বিপ্লবের, যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় নতুন এক উৎপাদন ব্যবস্থা।[৪] অর্থাৎ উৎপাদন শক্তি এবং উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে এরূপ দ্বন্দ্বের নিরসন হয় বিপ্লবের মাধ্যমে নতুনতর উৎপাদন সম্পর্ক এবং সমাজ প্রতিষ্ঠায়।
চীনা প্রেক্ষাপট
১৯৮৪ সালে, দেং জিয়াওপিং ঘোষণা করেছিলেন “সমাজতান্ত্রিক পর্যায়ের মৌলিক কাজ হচ্ছে উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ”। দেং-এর মতে, “কেবলমাত্র উৎপাদিকা শক্তির ক্রমাগত বিকাশের মাধ্যমেই একটি দেশ জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির সাথে ধীরে ধীরে শক্তিশালী এবং সমৃদ্ধ হতে পারে।” ১৯৮৮ সালে দেং জিয়াওপিং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে প্রাথমিক উৎপাদিকা শক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। এই ধারণাটি দেং জিয়াওপিং তত্ত্বে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।[৫]
আরো পড়ুন
- কর্তৃত্ব প্রসঙ্গে
- এশীয় উৎপাদন পদ্ধতি হচ্ছে কার্ল মার্কস কর্তৃক তৈরিকৃত একটি তত্ত্ব
- উৎপাদনের উপকরণ বলতে সম্পদকে বোঝায় যা সমাজকে উৎপাদনে নিযুক্ত করে
- উৎপাদিকা শক্তি হচ্ছে উৎপাদনের উপকরণ এবং মানুষের শ্রমশক্তি
- উৎপাদন সম্পর্ক পণ্যের উৎপাদন, বণ্টন ও বিনিময়ের প্রক্রিয়ায় যুক্ত মানুষের সম্পর্ক
- উৎপাদন পদ্ধতি হচ্ছে মার্কসবাদী ঐতিহাসিক বস্তুবাদ তত্ত্বের অন্যতম উপাদান
- পুঁজি হচ্ছে উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উপাদানসমূহের একটি
- উৎপাদনের পুঁজিবাদী পদ্ধতি হচ্ছে পুঁজিবাদী সমাজে উৎপাদন ও বণ্টনের পদ্ধতি
- সরল পণ্য উৎপাদন হচ্ছে ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস কর্তৃক বানানো একটি শব্দ
- শ্রমের সামাজিক বিভাগ হচ্ছে বিশেষীকৃত পণ্য উৎপাদনের কাঠামোগত ভিত্তি
- উৎপাদিকা-শক্তি ও উৎপাদন-সম্পর্ক প্রসঙ্গে মার্কসীয় অর্থশাস্ত্রের বিশ্লেষণ
তথ্যসূত্র
১. সোফিয়া খোলদ, সমাজবিদ্যার সংক্ষিপ্ত শব্দকোষ, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৯০, পৃষ্ঠা ২৩।
২. অনুপ সাদি, ২২ ডিসেম্বর ২০১৮; রোদ্দুরে.কম, “উৎপাদিকা শক্তি হচ্ছে উৎপাদনের যন্ত্র, যন্ত্র ব্যবহারের দক্ষতাসম্পন্ন মানুষ এবং শ্রমের আগ্রহ”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/encyclopedia/marxist-glossary/productive-forces/
৩. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ৩২০-৩২১।
৪. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ৫০।
৫. Yang Lu (2016). China-India Relations in the Contemporary World Dynamics of National Identity and Interest. Taylor & Francis. p. 53.
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।