আদিম সাম্যবাদ কী এবং মানব ইতিহাসের প্রাথমিক সামাজিক রূপরেখা

আদিম সাম্যবাদ বা আদিম গোষ্ঠীবদ্ধ সাম্যবাদ (ইংরেজি: Primitive clan communism) হলো মানব ইতিহাসের প্রাচীন কাল জুড়ে টিকে থাকা এক অনন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা। মূলত শিকারী-সংগ্রাহক মানুষের ‘উপহারের অর্থনীতি’ (Gift Economy) বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এই ব্যবস্থায় গোষ্ঠীর সমস্ত সদস্যের মাঝে সম্পদ ও সম্পত্তি সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হতো এবং প্রত্যেকে তাদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুসারে তা ভোগ করতে পারতেন。

সমাজবিজ্ঞানী ও দার্শনিক কার্ল মার্কস এবং ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের তত্ত্ব থেকে এই ধারণাটির উৎপত্তি। তাঁদের মতে, প্রাচীন শিকারী-সংগ্রাহক সমাজগুলো গড়ে উঠেছিল সমমাত্রিক সামাজিক সম্পর্ক এবং সম্পদের যৌথ মালিকানার ওপর ভিত্তি করে। মার্কসের আর্থ-সামাজিক কাঠামোর মডেলে দেখা যায়, আদিম সাম্যবাদী সমাজে বর্তমান যুগের মতো কোনো সামাজিক শ্রেণি-বিভাগ কিংবা পুঁজির পাহাড় গড়ার সুযোগ ছিল না।

প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও আদিম মানুষের জীবনযাত্রা

মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশের শুরুর দিনগুলোতে মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য প্রকৃতির সাথে এক কঠিন ও নিরন্তর সংগ্রাম চালাতে হতো। বহু হাজার বছর ধরে লাঠি আর সুচালো পাথরই ছিল মানুষের একমাত্র হাতিয়ার। প্রতি পদে পদে অসংখ্য প্রাকৃতিক বিপদ মানুষকে তাড়া করে বেড়াতো। প্রকৃতির ভয়ঙ্কর শক্তির সামনে মানুষ ছিল একেবারেই অসহায়, কারণ প্রাকৃতিক নিয়ম-কানুন সম্পর্কে তখন তাদের কোনো ধারণাই ছিল না।

এই চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার জন্য মানুষ ছোট ছোট গোত্র বা গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে বসবাস শুরু করে। তারা সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করতো এবং তাদের যৌথ শ্রমের ফসলও সবাই মিলে সমানভাবে ভাগ করে নিত। মানবজাতির এই প্রাথমিক স্তরে কোনো অর্থনৈতিক বা সামাজিক অসমতা থাকার সুযোগ ছিল না। কারণ শিকার, পশুপালন বা প্রাচীন পদ্ধতির চাষাবাদের মাধ্যমে কেবল কোনো রকমে টিকে থাকার মতো খাদ্য ও সামগ্রীই সংগ্রহ করা সম্ভব হতো।[১]

যৌথ মালিকানা ও শ্রমের আদিম রূপ

সমাজতাত্ত্বিক গবেষক এবং বিশেষ করে মার্কসবাদীদের মতে, মানুষের প্রথম সামাজিক সংগঠনটি ছিল সম্পূর্ণ যৌথ এবং সাম্যবাদী। জীবন রক্ষার জন্য উৎপাদনের হাতিয়ারগুলো তখন ছিল অত্যন্ত অনুন্নত। আধুনিক সমাজের মতো শ্রমের সুনির্দিষ্ট কোনো বিভাজন তখন গড়ে ওঠেনি, এমনকি নারী ও পুরুষের কাজের মধ্যেও তেমন বড় কোনো দেয়াল ছিল না।

এই পর্যায়ে উৎপাদনের ক্ষেত্রে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল সম্পূর্ণ সামাজিক ও সমষ্টিগত। উৎপাদনের প্রধান উপায় বা যন্ত্র— যেমন সুচালো পাথর, বর্শা কিংবা বল্লম ছিল পুরো গোষ্ঠীর যৌথ সম্পত্তি। এসব হাতিয়ারের ব্যবহার এবং তার মাধ্যমে সংগৃহীত খাদ্য বা সম্পদ ভোগ করার অধিকারও ছিল সবার জন্য সমান।[২]

ইউরোপীয় বুর্জোয়াদের প্রভাব ও বিশ্বজুড়ে সাম্যবাদ

ইতিহাসের শুরুর দিকে পৃথিবীর সব অঞ্চলের মানুষই এই ধরনের আদিম গোত্রীয় সাম্যবাদী সমাজে বসবাস করতো। এমনকি আধুনিক যুগেও পৃথিবীর যেসব প্রত্যন্ত অঞ্চল উন্নত দেশগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত ছিল, সেখানে এই আদিম সাম্যবাদী ব্যবস্থার অস্তিত্ব দেখা গেছে। তবে ইউরোপীয় বুর্জোয়া শ্রেণি যখন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত জোরপূর্বক দখল করতে শুরু করে, তখন তাদের আগ্রাসনে এই প্রাচীন সমাজ-সংগঠনগুলোর অপূরণীয় ক্ষতি হয়।

অথচ আজ থেকে মাত্র এক বা দেড় হাজার বছর পূর্বে, এই ইউরোপীয়দের পূর্ব-পুরুষেরাও ঠিক এমন আদিম গোত্রভিত্তিক সমাজেই জীবনযাপন করতো। এ থেকে স্পষ্ট যে, সমাজে শ্রেণি-বিভাগের উত্থানের পূর্ব পর্যন্ত পৃথিবী জুড়ে আদিম গোত্র সাম্যবাদই প্রচলিত ছিল। ভৌগোলিক কারণে বিভিন্ন গোত্র ও জাতির মধ্যে এই ব্যবস্থার রূপ কিছুটা ভিন্ন হলেও, মূল বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে সব জাতির প্রাথমিক স্তর ছিল একই রকম।

বিবর্তনের ধীরগতি ও হাতিয়ারের উন্নয়ন

সমাজ বিকাশের এই প্রাথমিক স্তরটি কিন্তু খুব দ্রুত পরিবর্তিত হয়নি, বরং এর বিবর্তন ছিল অত্যন্ত ধীরগতির। শত শত, এমনকি হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের জীবনযাত্রার মান একই রকম ছিল। যদি কোনো পরিবর্তন আসতোও, তবে তার গতি ছিল ভীষণ শ্লথ। মানুষ তার বিকাশের প্রতিটি পদক্ষেপই ফেলেছে প্রচণ্ড বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম অতিবাহিত হয়ে গেছে, অথচ সামাজিক কাঠামোর কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি। মানুষ অত্যন্ত ধীর গতিতে, যুগের পর যুগ অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে তার কাজের পদ্ধতি ও হাতিয়ারগুলোকে কিছুটা উন্নত করতে শিখেছে।

আদিম সাম্যবাদী সমাজের সামাজিক সম্পর্ক ও শ্রম বণ্টন

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, আদিম সাম্যবাদী ব্যবস্থায় মানুষের সামাজিক সম্পর্ক কেমন ছিল? সে সময়ের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে একটি বিরাট জনগোষ্ঠীর খাদ্যের সংস্থান করা সম্ভব ছিল না, তাই আদিম সাম্যবাদী গোত্রগুলো সংখ্যায় ছিল বেশ ছোট। তবে এই ছোট সম্প্রদায়ের শ্রম ব্যবস্থা পরিচালিত হতো একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা মেনে।

গোষ্ঠীর প্রত্যেক সদস্যেরই আলাদা আলাদা কাজ নির্দিষ্ট করা থাকতো। যেমন— পুরুষেরা শিকারে যেতো এবং যুদ্ধ করতো। অন্যদিকে নারীরা ঘর-বাড়ির দেখাশোনা করতো, রান্নাবান্না, কাপড় বোনা ও সেলাইয়ের পাশাপাশি প্রাথমিক স্তরের চাষাবাদও সামলাতো। পুরুষেরা বনের শিকার ও মাছ ধরার হাতিয়ারের মালিক ছিল, আর নারীরা ছিল গৃহস্থালী জিনিসপত্রের মালিক। ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের বর্ণনা অনুযায়ী,

“সংখ্যার দিক দিয়ে লোকসংখ্যা ছিল খুবই কম। গোষ্ঠীর (ইংরেজি: Tribe) নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে কেবল তারা একতাবদ্ধ থাকতো। এলাকার পাশেই এক বিরাট বৃত্তাকারে বেষ্টিত রয়েছে শিকারের ভূমি। অন্যান্য গোষ্ঠী থেকে সীমানা-নির্দেশক রেখা গঠন করছে এক নিরপেক্ষ বনাঞ্চল। শ্রম-বিভাগ পুরোপুরি আদিম প্রকৃতির। কাজকর্ম নারী-পুরুষের মধ্যে সরলভাবে বিভক্ত। পুরুষ জাতি যুদ্ধ করতো, শিকারে যেতো, খাদ্যের জন্যে কাঁচামাল ও এসব কাজকর্মের হাতিয়ার-পাতি যোগান দিত। নারী সম্প্রদায় ঘর-বাড়ীর দেখাশোনা করত, আর খাদ্য বস্তু তৈরি করতো; তারা রান্নাবান্না করতো, কাপড় বুনতো ও সেলাই করতো। নারী-পুরুষরা তাদের নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রের প্রভু ছিল; পুরুষরা বনের, আর নারীরা ঘরের। নারী-পুরুষ প্রত্যেকে যেসব হাতিয়ার তৈরি করতো সে সবের মালিক ছিল তারা নিজেরাই; পুরুষরা ছিল যুদ্ধাস্ত্র, পশু শিকার ও মাছ ধরার হাতিয়ার-পাতির মালিক, গৃহস্থালী দ্রব্য সামগ্রী ও বাসন-পত্রের মালিক ছিল নারী।[৩] গৃহস্থালী জীবন ছিল সাম্যবাদী, বেশ কয়েকটি, আর প্রায়শঃ বহু পরিবার নিয়ে তা গঠিত হতো। যৌথভাবে যাই উৎপাদিত ও ব্যবহৃত হতো তাই বিবেচিত হতো সাধারণ সম্পত্তি হিসেবে: বাড়ীঘর, বাগান, লম্বা নৌকা।”[৪]

আদিম সাম্যবাদী সমাজের মূল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য

উৎপাদনের উপায়ের যৌথ সম্প্রদায়গত মালিকানা ও শোষণের অনুপস্থিতি, স্বাভাবিক লিঙ্গ ও বয়সের বিভক্তির ভিত্তিতে যৌথ শ্রম, দ্রব্য সামগ্রীর সম বন্টন, উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের নিম্ন মাত্রা এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এইরকম যে সমাজ আদিকালে বিরাজমান ছিলো সেই সমাজকেই আদিম সাম্যবাদী সমাজ বলা হয়। সেই যুগে আধুনিক সমাজের মতো কোনো ব্যক্তিগত মালিকানার অস্তিত্ব ছিল না। মানুষ দলবদ্ধভাবে বসবাস করতো এবং সবাই মিলে খাবার জোগাড় করে একসঙ্গে খেতো। যেদিন খাবার জুটতো সবাই ভাগ করে আনন্দ করত, আর না জুটলে সবাই না খেয়ে থাকত। ঝড়-বৃষ্টি বা হিংস্র পশুর আক্রমণের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো তারা যৌথভাবেই মোকাবেলা করতো। বনের পশু বা বনাঞ্চলের কোনো একক মালিক ছিল না, সেখানে সবার সমান অধিকার ছিল।[৫]

আদিম সাম্যবাদী ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল যৌথতা। সেই যুগে আধুনিক সমাজের মতো কোনো ব্যক্তিগত মালিকানার অস্তিত্ব ছিল না। মানুষ দলবদ্ধভাবে বসবাস করতো এবং সবাই মিলে খাবার জোগাড় করে একসঙ্গে খেতো। যেদিন খাবার জুটতো সবাই ভাগ করে আনন্দ করত, আর না জুটলে সবাই মিলেই না খেয়ে থাকতো। ঝড়-বৃষ্টি বা হিংস্র পশুর আক্রমণের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো তারা যৌথভাবেই মোকাবেলা করতো। বনের পশু বা বনাঞ্চলের কোনো একক মালিক ছিল না, সেখানে সবার সমান অধিকার ছিল।

সংক্ষেপে আদিম সাম্যবাদী সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল:

  • যৌথ মালিকানা: উৎপাদনের সমস্ত উপকরণ সমাজের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
  • শ্রেণিহীন সমাজ: কোনো সামাজিক শ্রেণি ছিল না, ফলে শ্রেণি-শোষণের কোনো সুযোগ ছিল না।
  • সাম্য ও সমতা: নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো কৃত্রিম ভেদাভেদ ছিল না।
  • মাতৃতান্ত্রিক পরিচয়: সুনির্দিষ্ট বিয়ে প্রথা গড়ে না ওঠায় সন্তান মায়ের পরিচয়ে পরিচিত হতো।
  • সমবণ্টন: লিঙ্গ ও বয়সের ভিত্তিতে যৌথ শ্রম এবং সংগৃহীত দ্রব্যের সমান বণ্টন হতো।

অবশ্য এই সামগ্রিক যৌথ ব্যবস্থার মধ্যেও মানুষের পোশাক বা শরীর ঢাকার আবরণ ব্যক্তিগত ছিল। এমনকি ব্যক্তিগত ব্যবহারের ছোটখাটো শিকারের হাতিয়ারও থাকত না, এমন নয়। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি এমন ছিল যে, গোত্র বা গোষ্ঠীর ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ছাড়া একা কোনো মানুষের পক্ষে খাদ্য সংগ্রহ করা কিংবা বৈরী প্রকৃতি ও বন্যপশুর হাত থেকে জীবন রক্ষা করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।[৬]

বিনাশ্রমে আয়ের অনুপস্থিতি ও জমির যৌথ মালিকানা

আদিম সাম্যবাদী কাঠামোতে বিনা পরিশ্রমে অন্যের আয়ের ওপর বেঁচে থাকার কোনো সুযোগ ছিল না। অর্থাৎ, সমাজের এক অংশ কর্তৃক অপর অংশকে শোষণ করার কোনো ধারণাই তখন ছিল না। সেই প্রাচীন স্তরে শ্রমের হাতিয়ারগুলো ছিল অত্যন্ত সরল। পাথর, বর্শা বা তীর-ধনুক যে কেউ খুব একটা পরিশ্রম ছাড়াই নিজের জন্য তৈরি করে নিতে পারতো। ফলে এসব হাতিয়ারের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানার প্রশ্নই উঠতো না।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, তখন জমির ওপর কোনো ব্যক্তিগত মালিকানা ছিল না। জমি ছিল গোটা সম্প্রদায়ের বা গোত্রের ‘এজমালি’ বা যৌথ সম্পত্তি। মজার ব্যাপার হলো, সমাজে শ্রেণি-বিভাগ গড়ে ওঠার বহু যুগ পরেও কৃষক সম্প্রদায়ের মধ্যে জমির এই এজমালি মালিকানার প্রথাটি সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও স্থিতিশীল ছিল। পরবর্তীকালের শোষক শ্রেণি ও রাষ্ট্রগুলো কৃষকদের কাছ থেকে সহজে কর আদায়ের সুবিধার্থে এই কৃষক কমিউন বা যৌথ ব্যবস্থাকে কৃত্রিমভাবে টিকিয়ে রেখেছিল। আবার অনেক ক্ষেত্রে, পুঁজিবাদের অবাধ বিকাশের পথ পরিষ্কার করার জন্য শাসক শ্রেণি গ্রামীণ অঞ্চলের এই যৌথ মালিকানা ভিত্তিক জীবনকে জোরপূর্বক ধ্বংসও করে দেয়।

কৃষিকাজ ও গো-চারণ ভূমির বণ্টন ব্যবস্থা

মানবসমাজে কৃষিকাজ প্রধান পেশা হয়ে ওঠার পরও জমির ওপর যৌথ বা এজমালি মালিকানা বজায় ছিল। সে সময় স্বতন্ত্র কৃষক পরিবারগুলোকে চাষাবাদের জন্য যে জমি দেওয়া হতো, তা নির্দিষ্ট সময় পর পর পুনর্বণ্টন করা হতো। জমিটি গ্রামের যৌথ সম্পত্তি হিসেবে থাকত এবং লটারির মাধ্যমে বিভিন্ন পরিবারের মধ্যে তা বণ্টন করা হতো, যাতে সবাই সমান সুযোগ পায়।

গবাদি পশু চরানোর ভূমি বা গো-চারণ ভূমির ওপর এই যৌথ মালিকানা আরও দীর্ঘ সময় ধরে টিকে ছিল। এমনকি আধুনিক যুগে পুঁজিবাদের শাসন প্রতিষ্ঠার পরও অনেক গ্রামের সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য যৌথ গো-চারণ ভূমি টিকে থাকতে দেখা যায়।

ব্যক্তিমালিকানার মিথ্যা গল্প ও বুর্জোয়া অপপ্রচার

শ্রেণি বৈষম্য ও শোষণের উত্থানের পূর্ব পর্যন্ত পৃথিবীর সব গোত্রেই এই আদিম সাম্যবাদ টিকে ছিল। ভৌগোলিক ও পরিবেশগত কারণে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কিছু বাহ্যিক ভিন্নতা থাকলেও, সমাজ ব্যবস্থার মৌলিক ও প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর ক্ষেত্রে সব জাতির প্রাথমিক স্তর ছিল একই রকম।

বর্তমান যুগের সাম্যবাদ ও ব্যক্তিমালিকানার বিলুপ্তির ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে, কিছু বুর্জোয়া বিজ্ঞানী বিষয়টিকে এমনভাবে প্রচার করার চেষ্টা করেন যেন ব্যক্তিমালিকানা ছাড়া মানুষের অস্তিত্বই কল্পনা করা অসম্ভব। কিন্তু মানব সমাজের প্রকৃত ইতিহাস পুঁজিবাদী তাত্ত্বিকদের এই মিথ্যা দাবিকে সম্পূর্ণরূপে খণ্ডন করে। ইতিহাস প্রমাণ করে যে, সমাজে শ্রেণি-বিভাগের মতোই ব্যক্তিসম্পত্তির ধারণাও মানব ইতিহাসের খুব বেশি দিনের নয়, এটি সমাজ বিকাশের বেশ পরবর্তী স্তরে উদ্ভূত হয়েছে। ব্যক্তি-সম্পত্তির কোনো ধারণা ছাড়াই মানুষ পৃথিবীতে হাজার হাজার বছর ধরে অত্যন্ত সফলভাবে শান্তিতে বসবাস করে এসেছে।

রাষ্ট্রহীন সমাজ ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি

আদিম সাম্যবাদী সমাজ ব্যবস্থায় কোনো ‘রাষ্ট্র’ বা আইনি দমনপীড়নের যন্ত্র ছিল না। ব্যক্তি সম্পত্তির উদ্ভব এবং সমাজে শ্রেণি-বিভাগের সৃষ্টির পথ ধরেই পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এ বিষয়ে ভ্লাদিমির লেনিন তাঁর এক বক্তৃতায় বলেছিলেন:

“আদিম সমাজে মানুষ যখন ছোট ছোট পারিবারিক গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে বসবাস করতো এবং তখনও ছিল ক্রমবিকাশের নিম্নতম স্তরে, এমন এক অবস্থায় যা বর্বরতার সমতুল্য – এমন এক কাল যার সাথে আধুনিক সভ্য মানব সমাজের রয়েছে হাজার হাজার বছরের ব্যবধান – তখন রাষ্ট্রের অস্তিত্বের কোনো চিহ্নই ছিল না। … … 

“কিন্তু এমন একটা সময় ছিল যখন কোনো রাষ্ট্র ছিল না, যখন সাধারণ বন্ধন, সমাজ নিজে, তার শৃংখলা ও কর্মবিন্যাস বজায় থাকতো রীতি-নীতি ও ঐতিহ্য-প্রথার শক্তি দ্বারা; কিংবা সেই কর্তৃত্ব ও মর্যাদা দ্বারা যা গোষ্ঠীর প্রধানরা কিংবা মেয়েরা ভোগ করতো – সেসব যুগে মেয়েরা যে প্রায়শঃই পুরুষের সমান মর্যাদা লাভ করতো তাই নয়, বরং অনেক সময় তারা এমনকি অধিকতর মর্যাদাও ভোগ করতো – এবং যখন ছিল না শাসন-কার্যে বিশেষজ্ঞ কোনো বিশেষ ধরণের লোক। ইতিহাস দেখিয়ে দেয় যে, যখন ও যেখানেই সমাজে শ্রেণি বিভাগ দেখা দিয়েছে, অর্থাৎ মানুষের মধ্যে এমন একটা বিভক্তি দেখা দিয়েছে, যেখানে তাদের কেউ কেউ অন্যের শ্রম আত্মসাৎ করার মতো অবস্থান স্থায়ীভাবে লাভ করেছে, যেখানে কিছু লোক অন্যদের শোষণ করছে, সেখানেই মানুষের উপর দমন-পীড়নের এক বিশেষ যন্ত্র হিসেবে রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটেছে।”[৭]

ইতিহাস স্পষ্ট দেখায় যে, যখনই এবং যেখানেই সমাজে শ্রেণি-বিভাগের সৃষ্টি হয়েছে— অর্থাৎ কিছু লোক স্থায়ীভাবে অন্যের শ্রম আত্মসাৎ করে শোষকের আসনে বসেছে— ঠিক তখনই সাধারণ মানুষকে দমন ও নিপীড়ন করার একটি বিশেষ যন্ত্র হিসেবে ‘রাষ্ট্রের’ জন্ম হয়েছে।

শ্রেণি বৈষম্য কোনো চিরন্তন ব্যবস্থা নয়

উপরের আলোচনা থেকে আমরা এটি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি যে, সমাজে শোষক ও শোষিত শ্রেণির এই বিভাজন কোনো চিরন্তন বা অপরিহার্য বিষয় নয়। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এমন কোনো নিয়ম নেই যে সমাজ চলতে হলে শ্রেণি বৈষম্য থাকতেই হবে। এর বিপরীত চিত্রটিই বরং সত্য। মানুষ শ্রেণি, শোষণ কিংবা ব্যক্তিমালিকানা সম্পর্কে কোনো কিছু না জেনেই ইতিহাসের এক অতি দীর্ঘ সময় পার করে দিয়েছে এবং সেই সমাজগুলো অত্যন্ত সফলভাবে টিকে ছিল।

আদিম সাম্যবাদের ভাঙন ও ব্যক্তিগত মালিকানার উদয়

তাহলে কীভাবে এই সুন্দর সাম্যবাদী সমাজ ভেঙে গেল? এর মূল কারণ ছিল উৎপাদিকা শক্তি ও সামাজিক শ্রম-বিভাগের বিকাশ। সময়ের সাথে সাথে মানুষ যখন উন্নত হাতিয়ার তৈরি করতে শিখল, তখন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বা ‘উদ্বৃত্ত দ্রব্য’ উৎপাদন করা সম্ভব হয়ে উঠল। আর এই উদ্বৃত্ত পণ্যের হাত ধরেই সম্পত্তি মালিকানায় অসমতা তৈরি হলো এবং পরবর্তীকালে ব্যক্তিমালিকানার জন্ম হলো।

ব্যক্তিমালিকানা আসার সাথে সাথেই প্রাচীন গোষ্ঠী ব্যবস্থায় ভাঙন ধরতে শুরু করল। সমাজে জন্ম নিল একে অপরের বিরোধী বা বৈরি শ্রেণি এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তৈরি হলো রাষ্ট্রযন্ত্র। মহান নেতা মাও সেতুং আদিম সাম্যবাদী ব্যবস্থা বদলে দাসব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার এই ঘটনাকে— অর্থাৎ একটি শোষণহীন ব্যবস্থাকে বিদায় দিয়ে একটি শোষণমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সেই ঐতিহাসিক বিপ্লবকে— “ইতিহাসে নজিরবিহীন” বলে উল্লেখ করেছেন।[৮]

শ্রমের বিভাজন এবং দাস সমাজের উত্থান

সভ্যতার এই পর্যায়ে সামাজিক পরিশ্রমে বড় ধরনের রূপান্তর বা শ্রম-বিভাগ শুরু হয়। পশুপালন এবং কৃষিকাজ— এই দুটি আলাদা জীবিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই সুনির্দিষ্ট বিভাজনের ফলে সমাজের সামগ্রিক উৎপাদন ক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে।

ধীরে ধীরে যা ঘটল:

  • দ্রব্য বিনিময়: বিভিন্ন গোত্রের উৎপাদিত পণ্যের পরিমাণের তারতম্যের কারণে একে অপরের সাথে পণ্য বা দ্রব্যবিনিময় শুরু হয়।
  • অসাম্য তৈরি: কালক্রমে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির পরিমাণের পার্থক্য দেখা দেয়, যা সমাজে অসাম্যের জন্ম দেয়।
  • দাসের উৎপত্তি: গোত্রে গোত্রে লড়াই বা যুদ্ধের ফলে পরাজিত গোত্রের মানুষদের বন্দী করে ‘দাস’ হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়। বিজয়ী গোত্রের শক্তিমান ব্যক্তিরা এই দাসদের উৎপাদনের এক অভাবনীয় হাতিয়ার হিসেবে খাটাতে শুরু করে।

এই নতুন পরিস্থিতিতে সামগ্রিক সামাজিক কাঠামোতে সাম্যবাদ বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। দাস এবং উৎপাদনের উন্নত যন্ত্রপাতির ব্যক্তিগত মালিকানা সমাজে উৎপাদন বৃদ্ধির যে বিপুল সম্ভাবনা তৈরি করেছিল, পূর্বের প্রাচীন যৌথ প্রথা বা সাম্যবাদ তখন তার জন্য এক বড় শৃঙ্খল বা বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

পরবর্তীতে হস্তশিল্প থেকে কৃষিকাজ আলাদা হয়ে যাওয়ায় শ্রমের বিভাজন আরও বিস্তৃত হয় এবং উৎপাদন ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়। এই অমোঘ প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পরিণামেই আদিম সাম্যবাদী সমাজ সম্পূর্ণ ভেঙে যায় এবং শ্রেণি-বিভক্ত সমাজের জন্ম হয়। ইতিহাসে আবির্ভূত হয় দাস ও প্রভুতে বিভক্ত এক নতুন নিষ্ঠুর সমাজ ব্যবস্থা। তবে ইতিহাসের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, কোনো কোনো জাতির মধ্যে এই আদিম গোষ্ঠীভিত্তিক জীবনধারা বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত টিকে থাকতে দেখা গেছে।[৯]

আরো পড়ুন

📚 তথ্যসূত্র ও টিকা (References & Notes)

১. এ. লিয়নতিয়েভ; মার্কসীয় রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র, সিরাজুল আনোয়ার অনূদিত, গণপ্রকাশন, ঢাকা; দ্বিতীয় সংস্করণ: ফেব্রুয়ারি ২০০৫, পৃষ্ঠা: ১৮।
২. রায়হান আকবর; রাজনীতির ভাষা পরিচয়, আন্দোলন প্রকাশনা, ঢাকা; জুন ২০২০, পৃষ্ঠা: ২৭-২৮।
৩. বিশেষত আমেরিকার উত্তর-পশ্চিম তীরভূমি। ব্যানক্রফট-এর রচনা দ্রষ্টব্য। কুইন শারলেট দ্বীপপুঞ্জের ‘হাইদাদের’ (Haidas) মধ্যে কোনো কোনো গৃহস্থালিতে একই ঘরে প্রায় ৭০০ জনের মতো সদস্য একত্রে বসবাস করতো। ‘নোটকাদের’ (Notkas) মধ্যে গোটা গোষ্ঠীই এক ঘরে থাকতো। – ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস।
৪. ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস; দি অরিজিন অফ দি ফ্যামিলি, প্রাইভেট প্রোপার্টি অ্যান্ড দি স্টেট (পরিবারের উৎস), চার্লস এইচ. কের অ্যান্ড কোম্পানি, শিকাগো; ১৯০২, পৃষ্ঠা: ১৯২-১৯৩।
৫. সোফিয়া খোলদ; সমাজবিদ্যার সংক্ষিপ্ত শব্দকোষ, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো; ১৯৯০, পৃষ্ঠা: ১৬-১৭।
৬. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ, প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই ২০০৬, পৃষ্ঠা: ১১৬-১১৭।
৭. ভ্লাদিমির ইলইচ লেনিন; “রাষ্ট্র” (Lecture on the State), সংকলিত রচনাবলী, ২৯শ খণ্ড, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো; ১৯৬৫, পৃষ্ঠা: ৪৭৪-৪৭৫।
৮. মাও সেতুং; সভাপতি মাও সেতুঙের উদ্ধৃতি ও শেষ জীবনের উদ্ধৃতি, ঐশী পাবলিকেশন্স; ২০১৫।
৯. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ, প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই ২০০৬, পৃষ্ঠা: ১১৬-১১৭।

🕒 অনলাইন প্রকাশনা ও হালনাগাদের ইতিহাস (Publication History)

  • মূল প্রকাশ: এই দার্শনিক প্রবন্ধটি সর্বপ্রথম ৬ মে ২০১৮ তারিখে রোদ্দুরে.কম-এর সম্মানিত পাঠকদের উদ্দেশ্যে রচিত ও প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে আরেকটি প্রবন্ধ ফুলকিবাজ.কম-এর পাঠকদের জন্য রচিত হয়।
  • সর্বশেষ আপডেট: প্রবন্ধের মূল ভাব ও তাত্ত্বিক গভীরতা অক্ষুণ্ণ রেখে, প্রবন্ধ দুটি নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাইপূর্বক পরিমার্জিত, পরিবর্ধিত ও আধুনিক এসইও ফ্রেন্ডলি আকারে আজ ১৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে পুনর্মূল্যায়ন করে আপডেট করা হলো।

Leave a Comment