ভাববাদ হচ্ছে দর্শনশাস্ত্রের অন্তর্গত অধিবিদ্যা বিষয়ক প্রত্যয় বা ধারণা

ভাববাদ (ইংরেজি: Idealism) হচ্ছে, দার্শনিক আলোচনায়, অধিবিদ্যক দৃষ্টিভঙ্গির একটি গোষ্ঠী যা দাবি করে যে “বাস্তবতা” মানুষের প্রত্যক্ষণ এবং উপলব্ধি থেকে অবিচ্ছিন্ন ও অবিচ্ছেদ্য, অর্থাৎ এক অর্থে, বাস্তবতা হলো ভাবসমূহের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত একটি মানসিক নির্মাণ।[১]

দর্শনশাস্ত্রের অন্তর্গত অধিবিদ্যা বিষয়ক এই প্রত্যয় বা ধারণাটি দর্শনের দুটি প্রধান ধারার একটি। অপর একটি বিপরীত ধারা হচ্ছে বস্তুবাদ। শব্দটির পিছনে এই বিশ্বাস কাজ করে যে বাস্তব বিশ্বচরাচরের অন্তর্নিহিত প্রকৃত স্বরূপ হলো ভাব, চিন্তন, চেতনা বা পরম এক বস্তু-নিরপেক্ষ প্রাথমিক সত্তা। বস্তুনির্ভর জগৎ-প্রকৃতির স্থান দ্বিতীয়। গ্রিক ভাবমূর্তি (image) প্রত্যয় থেকে এই বিশ্বাসের উদ্ভব ঘটে।[২]

ভাববাদ সম্পর্কে আলোচনা

বিশ্ব রহস্যের ক্ষেত্রে মুল প্রশ্ন হচ্ছেঃ বস্তু প্রধান, না মন বা ভাব প্রধান? এই প্রশ্নে ভাববাদের সাধারণ জবাব হচ্ছে মন বা অ-বস্তুই হচ্ছে প্রধান, বস্তু প্রধান নয়। কারণ, সাধারণ মানুষ দেখতে পায় যে, বস্তুর পরিবর্তন, ক্ষয় এবং বিলুপ্তি আছে। এবং যার পরিবর্তন বা বিলুপ্তি ঘটে সে নিশ্চয়ই শক্তিশালী বা মূল বলে স্বীকৃত হতে পারে না। এই স্থূল মত অনুযায়ী মন বা ভাবের কোনো ক্ষয় বা পরিবর্তন নেই। কারণ মন বা ভাব অবস্তু। কাজেই ভাব হচ্ছে বস্তুর চেয়ে শক্তিশালী। ভাববাদের এই সাধারণ ব্যাখ্যার সঙ্গে সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে ধর্মীয় বিশ্বাসের ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য রয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাসে সব কিছুর যে স্রষ্টা এবং চালক সে বস্তু নয়। তিনি বস্তু হতে পারেন না, বস্তুর ঊর্ধ্বের কোনো শক্তি।[৩]

অতীন্দ্রিয় এবং অ-বস্তুমূলক কোনো কিছুকে মূল বলে ঘোষণা করার একটি সামাজিক তাৎপর্য আছে। বস্তুর সঙ্গে সাধারণ শ্রমজীবি মানুষের সম্পর্ক সাক্ষাত। বস্তু চোখে দেখা যায়, তাকে ধরা যায়, ছোঁয়া যায়। বস্তুকে জীবনের মূল শক্তি বলে স্বীকার করলে সাধারণ শ্রমজীবি মানুষের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ সম্পর্কের তাৎপর্য্যকে স্বীকার করতে হয় এবং সাধারণ মানুষ বস্তুকে পরিবর্তন করে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারে এ কথাও স্বীকার করতে হয়। কিন্তু এরূপ স্বীকৃতি শ্রেণীবিভক্ত সমাজের শাসক শ্রেণীর স্বার্থবহ হতে পারে না। এ কারণে ভাববাদ অর্থাৎ সমস্ত শক্তির মূল হিসাবে অতীন্দ্রিয় বা অবস্তুমূলক কোনো সত্তার তত্ত্ব শাসক শ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সার্বজনীন বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এসেছে।[৩]

আরো পড়ুন:  ইমানুয়েল কান্ট ছিলেন অষ্টাদশ শতকের জার্মান ভাববাদী দার্শনিক ও বিজ্ঞানী

ভাববাদ সম্পর্কিত দর্শনচিন্তার অন্যতম আদি প্রবক্তা ছিলেন প্লেটো। ভাববাদের দুটি ধারা আছে: আত্মগত ও বস্তুগত। আত্মগত ধারায় বলা হয় যে মানুষের চেতনা-নিরপেক্ষ কোনও স্বাধীন অস্তিত্ব বস্তুজগতের নেই; ব্যক্তি মানুষের চেতনা, অনুভূতি ও বীক্ষণের উপর যাবতীয় বাস্তবতা নির্ভরশীল। বিশপ বার্কলে ছিলেন এই ধারার সমর্থক। পক্ষান্তরে বস্তুগত ভাববাদী ধারা অনুযায়ী সর্ববিধ বাস্তব-বিশ্বের মানুষের ভাব-নিরপেক্ষ স্বাধীন অস্তিত্ব আছে, তবে তার প্রাথমিক ভিত্তি হলো এক পরম পরিচিন্তন, অর্থাৎ এক জাগতিক ভাব বা ঈশ্বর। স্বতঃই অধ্যাত্মবাদ বা ধর্ম এসে পড়ে। সেই নিরিখে সসীম কালাকাশের স্রষ্টা হলেন ঈশ্বর।[২]

আধুনিক কালে কান্ট ও হেগেল হলেন ভাববাদী চিন্তার অন্যতম প্রধান দিকপাল। বস্তুবাদী মার্কসীয় দৃষ্টিতে বস্তুর সত্তা হলো প্রাথমিক। বস্তুরই প্রতিফলন হলো মন। ভারতীয় রাষ্ট্রদার্শনিকদের মধ্যে গান্ধী ও শ্রীঅরবিন্দ ছিলেন আধ্যাত্মিক ভাববাদী। অন্যদিকে মানবেন্দ্রনাথ রায় বস্তু ও ভাবকে পৃথক না করে উভয়ের অদ্বয় ধারায় বিশ্বাসী ছিলেন।[২]

রাষ্ট্রচিন্তায় ভাববাদের তাৎপর্য হলো জনজীবনে ভাবগত ও নীতিসম্মত আচরণে অবিচল আস্থা। এমনকী বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে বিরােধ দেখা দিলেও অথবা অসম্ভব বলে মনে হলেও সেইসব ভাবগত নৈতিক আচরণ পরিহারে দৃঢ় অনীহা ফুটে ওঠে। বৃহত্তর আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে বাস্তববাদীদের সঙ্গে তুলনায় ভাববাদীরা বিভিন্ন দেশের পারস্পরিক সম্পর্কে নৈতিক মূল্যবত্তা, সুবিচার, সহনশীলতা ও মানবিকতার আদর্শ তুলে ধরেন; বাস্তববাদীরা কার্যকারিতা, রণকৌশল, কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার দিক থেকে বিচার করেন। অবশ্য সেজন্য সব ধরনের বস্তুবাদ ন্যায়নীতি থেকে বিচ্যুত বলে মনে করা যায় না।[২]

তথ্যসূত্র

১. অনুপ সাদি, ২৬ মে ২০১৯, “ভাববাদ হচ্ছে দর্শনশাস্ত্রের অন্তর্গত অধিবিদ্যা বিষয়ক প্রত্যয় বা ধারণা”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/encyclopedia/philosophical-glossary/on-idealism/
২. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ২১৭-২১৮।
৩. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ২০৮-২০৯।

Leave a Comment

error: Content is protected !!