নকশালবাড়ি আন্দোলন কেবল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ইতিহাস নয়, বরং এটি একটি সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়া এক রাজনৈতিক বাস্তবতা। ষাটের দশকের অন্তিমলগ্নে এসে এটি আর নিছক ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ থাকেনি; বরং একটি স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে উপমহাদেশে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সূচনা করে। এই আন্দোলন একদিকে যেমন প্রচলিত ধারার কমিউনিস্ট রাজনীতির গণ্ডি ভেঙেছে, অন্যদিকে সংসদীয় গণতন্ত্রের কাঠামোর বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের ডাক দিয়েছে।
ভারতের স্বাধীনতা-উত্তর রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘নকশাল আন্দোলন’ একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। ইতিহাসের পাতায় এই সংগ্রামের উৎস হিসেবে চিহ্নিত দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ি মহকুমার নকশালবাড়ি গ্রামটি। ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত যে, ১৯৬৭ সালের মার্চ মাসে ভারতের তরাই অঞ্চলে এই বৈপ্লবিক আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। কিন্তু, অচিরেই তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায়। এই আন্দোলন কেবল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং দেশকাল ছাপিয়ে জন্ম দিয়েছে এক নতুন রাজনৈতিক দর্শন বা ‘ইজম্’—যা আজও চর্চিত।
চারু মজুমদার ও রাজনৈতিক লাইন
নকশালবাড়ির জনজীবনের মূল ভিত্তি ছিল কৃষি। তৎকালীন বর্গাপ্রথা ছিল কৃষকদের জন্য এক অভিশাপ। ১৯৬১ সালের আদমশুমারি (সেন্সাস) রিপোর্ট অনুযায়ী, নকশালবাড়ি থানার অন্তর্গত প্রায় ৪৯.৭ শতাংশ জমি বর্গাপ্রথায় চাষাবাদ করা হতো। অন্যদিকে, মাত্র ৩৭.১ শতাংশ জমি ছিল সম্পন্ন গৃহস্থদের অধীনে। এই বর্গাচাষিদের জীবন কাটত চরম অনিশ্চয়তায়; যে কোনো মুহূর্তে জমি থেকে উচ্ছেদের আতঙ্ক ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। এই বঞ্চনা ও শঙ্কার বিরুদ্ধেই ভূমিহীন কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন একঝাঁক বিপ্লবী নেতা। কানু সান্যাল, চারু মজুমদার, জংগল সাঁওতাল, আজিজুল হক, অসীম চ্যাটার্জী এবং সুশীতল রায়চৌধুরীর মতো ব্যক্তিত্বদের বলিষ্ঠ নেতৃত্বেই নকশাল আন্দোলন এক অপ্রতিরোধ্য গতি লাভ করে।
উপমহাদেশে কৃষি বিপ্লবের রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের রণকৌশলটি সুনির্দিষ্ট করেছিলেন চারু মজুমদার। তিনি গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে সশস্ত্র কৃষিবিপ্লবের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পথকে একটি সুসংহত ‘রাজনৈতিক লাইন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর সময়কাল থেকেই উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে ‘নকশাল আন্দোলন’ ও ‘চারু মজুমদার’ নাম দুটি সমার্থক হয়ে ওঠে। আজও কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে ‘নকশাল ধারা’ একটি স্বতন্ত্র ও নির্দিষ্ট বিপ্লবী রাজনৈতিক আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করে আসছে।
আন্দোলনের আদর্শিক ও প্রায়োগিক ভিত্তি
যুগ যুগ ধরে শোষিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও উৎপাদনশীল কৃষক সমাজ সুদীর্ঘকালের বঞ্চনার বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আমূল বদলে দেওয়ার লক্ষ্যে তারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের এক সশস্ত্র অভিযানের সূচনা করেন, যার চূড়ান্ত অভীষ্ট ছিল সাম্যবাদের আদর্শে একটি সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। নকশালবাড়ির প্রকৃত সারমর্ম নিহিত ছিল কৃষকদের বৈপ্লবিক শক্তির ওপর। এই আন্দোলনের অন্তঃসার ছিল আমূল ‘কৃষিবিপ্লব’ (Agrarian Revolution), যার তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও মাওসেতুং-এর চিন্তাধারার (Maoism) সমন্বয়ে।
নকশালবাড়ি আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল প্রচলিত আধা-সামন্তবাদী ও আধা-ঔপনিবেশিক সমাজ কাঠামো ভেঙে একটি নয়া-গণতান্ত্রিক ভারত গড়ে তোলা। এটি কেবল সাধারণ কৃষক আন্দোলনের মতো জমি বা ফসলের অধিকার আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং শ্রমজীবী মানুষের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের এক বৈপ্লবিক সংগ্রামে রূপ নিয়েছিল। সংশোধনবাদের প্রভাবে ম্লান হয়ে যাওয়া মার্কসবাদের প্রকৃত বিপ্লবী আদর্শকে ভারতের মাটিতে নতুন করে পুনরুজ্জীবিত করেছিল এই আন্দোলন।
শিল্প-সংস্কৃতিতে এক বৈপ্লবিক রূপান্তর
নকশালবাড়ি আন্দোলন কেবল রাজনৈতিক বিদ্রোহ ছিল না, এটি শিল্প ও সংস্কৃতির চিরাচরিত ধারণাগুলোকে আমূল বদলে দিয়েছিল। মাও সেতুঙের নেতৃত্বে চীনে হওয়া সাংস্কৃতিক বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এই আন্দোলন ‘মূর্তি-ভাঙা’র মাধ্যমে তথাকথিত দেশপ্রেমিক পুঁজিপতিদের আসল মুখোশ খুলে দেয়। সরোজ দত্তের মতো বিপ্লবীরা তৎকালীন প্রচলিত ও সংশোধনবাদী সাংস্কৃতিক ধারার বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াই চালিয়েছিলেন। এটি বুদ্ধদেব বসুর বর্ণিত দারিদ্র্য কিংবা সমর সেনের ক্ষয়িষ্ণু সংস্কৃতির গণ্ডি পেরিয়ে এক নতুন বৈপ্লবিক চেতনার পথ প্রশস্ত করে, যা ভারতের শিল্প-সাহিত্যে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।
চারু মজুমদারের ঐতিহাসিক বার্তা আজও সত্য যে, নকশালবাড়ি কখনো শেষ হয়ে যায় না। ১৯৬৭ সাল থেকে নানা বিপর্যয় ও চড়াই-উতরাই পেরিয়েও ভারতের বিপ্লবী আন্দোলনগুলো বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে এক ঐক্যবদ্ধ ও দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধের লক্ষ্যে। এই আন্দোলনের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল কেবল সমাজের অবক্ষয় বা দুঃখ-দুর্দশা তুলে ধরা নয়, বরং সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে তার একটি সুস্পষ্ট বিকল্প ও সমাধানের পথ দেখানো। গান, নাটক, কবিতা কিংবা উপন্যাসে স্বাধীনতার পর এমন শক্তিশালী সাংস্কৃতিক জোয়ার আর দেখা যায়নি, যা আজও একটি নয়া-গণতান্ত্রিক ভারত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখায়।
আঞ্চলিক বিস্তার ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান
সময়ের পরিক্রমায় এই বিদ্রোহ যখন কলকাতার রাজপথে আছড়ে পড়ল, তখন প্রেসিডেন্সি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা দলে দলে এই আন্দোলনে শামিল হলেন। ১৯৬৮ সাল নাগাদ নকশালবাড়ি আন্দোলনের এই আদর্শিক উত্তরাধিকার ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে প্রতিবেশী নেপাল এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) বিস্তৃত হয়। তবে বাংলাদেশে এই আন্দোলনের সূচনাপর্বের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্নতর। প্রাথমিক পর্যায়ে এ দেশে কোনো কমিউনিস্ট পার্টি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নকশালবাড়ির আদর্শ গ্রহণ করেনি; বরং বিভিন্ন বামপন্থী দলের তৃণমূল পর্যায়ের একনিষ্ঠ কর্মীরা দলীয় সিদ্ধান্তের ঊর্ধ্বে গিয়ে এই রাজনৈতিক লাইনটি অনুসরণের সিদ্ধান্ত নেন।
তাত্ত্বিক উৎস ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
তৎকালীন কর্মীদের তাত্ত্বিক নির্দেশনার প্রধান উৎস ছিল ভারতের নকশালপন্থীদের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত ‘দেশব্রতী’ পত্রিকা। পাশাপাশি, নকশালবাড়ির কৃষকদের সশস্ত্র সংগ্রামের লব্ধ অভিজ্ঞতা তাদের সামনে প্রায়োগিক আদর্শ হিসেবে কাজ করেছিল। এই তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক মেলবন্ধনেই এ দেশে নকশাল ধারার রাজনীতির উন্মেষ ঘটে। আন্দোলনের প্রারম্ভিক পর্যায়ের পরবর্তীকালে, বিশেষ করে ১৯৭১ সালের উত্তাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, ইস্ট পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এম-এল) এবং পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে নকশালবাড়ির আদর্শিক ও রাজনৈতিক লাইনটি গ্রহণ করে। এই রাজনৈতিক ধারাটিই এ দেশে ‘কৃষিবিপ্লব’ বা ‘জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব’ (People’s Democratic Revolution) হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
🔗 নকশালবাড়ি সংগ্রহশালা:
- 📖 আরও পড়ুন: নকশালবাড়ি আন্দোলনের সশস্ত্র সংগ্রামের সাংস্কৃতিক প্রভাব নকশালবাড়ি আন্দোলনের সাহিত্য 🎵
- 📖 আরও পড়ুন: আন্দোলনের আরেক অকুতোভয় লড়াকু সৈনিক কমরেড ভারতজ্যোতি রায়চৌধুরী ✊
- 🚩 আরও পড়ুন: নকশালবাড়ি অভ্যুত্থানের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস ও বিপ্লবীদের বীরত্বগাথা: নকশালবাড়ি অভ্যুত্থান।
তথ্যসূত্র
১. নেসার আহমেদ, নকশাল দ্রোহে নারী, ঐতিহ্য, ঢাকা, প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারি ২০১০, পৃষ্ঠা ৮-৯।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।