জন কিটসের কবিতায় সৌন্দর্য চেতনা হচ্ছে রোমান্টিকতার বহিঃপ্রকাশ

জন কিটসের কবিতায় সৌন্দর্য চেতনা (ইংরেজি: Concept of Beauty) হচ্ছে রোমান্টিকতার বহিঃপ্রকাশ এক সত্যের নামান্তর। ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক যুগের সর্বকনিষ্ঠ অন্যতম কবি জন কিটস সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন তার কবিতায়। স্বল্পায়ু জন কিটস (১৭৯৫-১৮২১) মাত্র ৫-৬ বছর কাব্যচর্চা করলেও তাঁর কাব্য কবিতায় তিনি এমন কিছু বিষয়ের অবতারনা করেছিলেন যে জন্য পৃথিবীর তাবৎ সাহিত্যপ্রেমী মানুষ আজও তাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।

রোমান্টিক যুগের সমস্ত কবিদের মত কিটসও ছিলেন সৌন্দর্যবাদী কবি। তিনি স্বল্পায়ু জীবনে অনেক দুঃখকষ্টের সম্মুখীন হলেও কখনোই তার কাছে আত্মসমর্পন করেননি। তাঁর কাছে ছিল সত্যই সুন্দর এবং সুন্দরই সত্য। তিনি কবিতাতে একথা ঘোষণাও করেছেন, “Beauty is truth, truth beauty.”

জন কিটসের কবিতায় সৌন্দর্য চেতনা

জন কিটস মাত্র ৫-৬ বছর সাহিত্য চর্চা করেছেন, কিন্তু এর মধ্যেই তিনি কিছু অসামান্য সৃষ্টি পৃথিবীবাসীর জন্য রেখে গেছেন। তাঁর রচনাগুলি হলো ‘এন্ডামিয়ন’, ‘ইভ অব সেন্ট অ্যাগনেস’, ‘ল্যামিয়া’, ‘ইসাবেলা অর দ্য পট অব বাসিল’, ‘লা বেলে ড্যাম সানস মারসি’, ‘হাইপেরিয়ান’, ১৮টি ওড জাতীয় কবিতা এবং ৬১টি সনেট। কিটসের এই রচনাগুলিতে বারবার যে বৈশিষ্ট্য ধরা পড়েছে তা হল তার সৌন্দর্যপিপাসু মন। তিনি তার রচনাগুলিতে সময় সু্যোগ পেলেই সৌন্দর্যের বর্ণনা দিতে শুরু করেছেন।

রোমান্টিক যুগের কবিমাত্রেই ছিলেন সৌন্দর্যের পূজারি। ওয়ার্ডসওয়ার্থ থেকে শুরু করে শেলি, বায়রন সকলেই সৌন্দর্য চেতনা বিষয়টিকে কবিতায় তুলে এনেছেন। রোমান্টিক যুগের কবি হওয়ায় কিটসের রচনায় বারবার সৌন্দর্যের বর্ণনা নানারূপে প্রকাশিত হয়েছে। তবে অন্যসব কবিদের চেয়ে কিটসের সৌন্দর্যচেতনা ও সৌন্দর্যসাধনা ভিন্ন ছিল। সৌন্দর্যবোধকে তিনি চেতনার পরম ও সৌন্দর্যের সাধনাকে সাধনার সার বলে জানতেন। তাঁর ‘এন্ডিমিয়ন’ কাব্যের প্রথম পঙতিই হলো “A thing of beauty is joy forever.” এ কেবল তাঁর কাব্যের বাণী নয়; এ হলো তার প্রত্যয়। ব্যক্তিগত চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, “I have love the principle of beauty in all things.”

ব্যক্তিগত জীবনে কিটস অনেক রকমের দুঃখ কষ্ট পেয়েছিলেন। রোগ, শোক, আর্থিক অনটন, ভাতৃবিরহ, প্রেমের প্রত্যাখ্যান, অল্প বয়সে পিতার এবং কিছুকাল পরে মাতার মৃত্যু প্রভৃতি সমস্তই তার ২৬ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে ঘটেছিল। তাঁর লেটারস-এ ছড়িয়ে রয়েছে সেই সাক্ষ্য, যে ব্যক্তিগত জীবনে অসীম যন্ত্রণায় কীভাবে তাঁর ভূবন কেঁপে উঠেছিল। তাঁর কাব্যে যে এ দুঃখের ছায়া পড়েনি, তা নয়। ‘ওড টু এ নাইটেঙ্গল’, ‘ওড অন মেলানকলি’, ‘ফল অব হাইপেরিয়ান’ প্রভৃতি রচনায় এই দুঃখের সাক্ষ্য আছে। ‘ওড টু এ নাইটেঙ্গল’- এর “The weariness, the fever, and the fret. Here, where men sit and hear each other groan.”-এ তিনি মৃত্যুকে প্রিয় নাম ধরে ডেকেছেন এবং ‘ফল অব হাইপেরিয়ান’-এ “The giant agony of the world.”- এর কথা বলেছেন। এ থেকে মনে হয় কিটসেরর সৌন্দর্যচেতনা তার অনাহুত কল্পনা, চিত্তের রোমান্টিক বিলাস কিংবা পলায়নবাদী মনোভাব (Escapism)। জীবন ও জগতের সুখ-দুঃখে আন্দোলিত করাল-কুটিল ভয়ংকর রূপকে তিনি নিজের জীবনে, বাইরে সর্বত্র নিবিড়ভাবে দেখেও সুন্দরকে বিশ্বের সার, জীবানুভবের পরমার্থ বলে অনুভব করেছেন। এই অনুভবের জন্য যে অসীম শক্তির প্রয়োজন, কিটসের চেতনায় সেই শক্তি ছিল। সেই শক্তিবলেই তিনি বলার অধিকার পেয়েছিলেন “Beauty is truth, truth beauty.”

আরো পড়ুন:  মহাকাব্য জাতীয় বা বীরত্বব্যঞ্জক বিষয়ে বিশাল পটভূমিতে বিধৃত বর্ণনামূলক কাব্য

প্রেমে, প্রকৃতিতে, পাখির গানে, ঋতুচক্রে, স্থাপত্যে, জীবনানুভবে, বিশ্বসৃষ্টিতে সর্বত্র তিনি উপলব্ধি করেছেন সৌন্দর্য চেতনা ও তার বহুবিধ ধরন। অখন্ড চিত্তে মনের ইন্দ্রিয়ের পঞ্চপ্রদীপ জ্বালিয়ে তিনি আজীবন করে গেছেন সেই অখন্ড সৌন্দর্যসত্তার তপস্যা। তাঁর কবিতাই ছড়িয়ে আছে এই সৌন্দর্য তপস্যারই ফল। কিটসের কবিতাগুলি আলোচনা করলেই তার সৌন্দর্যচেতনার প্রকৃতস্বরূপ আমাদের কাছে ধরা পড়ে।

কিটসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্য ‘এন্ডিমিয়ন’। গ্রীক মিথোলজি থেকে কাহিনি নিয়ে কাব্যটি রচনা করলেও এ কাব্যে কিটস বারবার সৌন্দর্যের জয়গান গেয়েছেন। কাব্যে দেখা যায় এন্ডিমিয়ন হলেন একজন মেষপালক। সে লাটমস পর্বতে বাস করত। সৌন্দর্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সিনথিয়া তার প্রেমে পড়ে এবং উভয়ের মিলন হয়। কাব্যটির রূপক অর্থ নির্ণয় করলে দেখা যায় যে, এন্ডিমিয়ন হলো মানুষের প্রতীক, চাঁদ হলো শ্বাশত সৌন্দর্যের প্রতীক। চাঁদের প্রতি মানুষের টান, স্তব বর্ণনা মানুষের চিরকালীন সৌন্দর্যাভিসার। সিনথিয়ার সাথে এন্ডিমিয়নের মিলন সৌন্দর্যের মধ্যে মানুষের সমাধিস্ত হওয়ার ব্যঞ্জনাবাহী। সিনথিয়ার প্রেম যেন সৌন্দর্যের অকল্পনীয় হাতছানি। কাব্যটির সূচনা পর্বেই কিটস লিখেছেন, “A thing of beauty is joy forever,/its lovelyness increases, it will never pass in nothingness…” এইভাবে সমস্ত কাব্যে কিটস সৌন্দর্যের সাধনা করে গেছেন।

উইলিয়াম শেকসপিয়রের ‘রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’কে আদর্শ করে কিটস তাঁর ‘ইভ অব সেন্ট অ্যাগনেস’ কাব্যটি রচনা করলেও এই কাব্যে নায়ক নায়িকার মধুরান্তিক মিলন দেখিয়েছেন। আর তিনি সুযোগ পেলেই মধ্যযুগীয় পরিমন্ডলে সৌন্দর্যের বর্ণনা করেছেন। ‘ল্যামিয়া’ কাব্যটিতে কিটস দর্শন ও সত্যের ভিতর থেকে সুন্দর তত্ত্বকে আবিস্কার করেছেন। এখানে কিটস দর্শনের প্রতি বিরূপ। তাই এই কাব্যে সত্যকে দর্শনের সত্য থেকে আলাদা করা হয়েছে। এ কারণেই তো তিনি বলেছিলেন- “সুন্দরই সত্য, সত্যই সুন্দর”।

কিটসের সবধরণের রচনায় তার সৌন্দর্য চেতনা ধরা পড়লেও তা সব থেকে বেশি পরিস্ফুটিত হয়েছে তাঁর ওড বিষয়ক কবিতাগুলিতে। ‘ওড টু এ নাইটিঙ্গল’, ‘ওড অন আ গ্রিসিয়ান আর্ন’, ‘ওড টু অটাম’, ‘ওড টু সাইকি’, ‘ওড টু মেলানকলি’ প্রভৃতি কবিতার মধ্যে কোনগুলিতে বিষাদের চিহ্ন থাকলেও অনেক সময় তাকে ছাপিয়ে বড়ো হয়ে উঠেছে সৌন্দর্যের ভাবনা বর্ণনা। ‘ওড টু এ নাইটিঙ্গল’ কবিতাটি কিটস তাঁর ভাই টমের মৃত্যুর কিছুদিন পর রচনা করেছিলেন। হ্যাম্পাস্টেডের বন্ধু ব্রাউনের বাড়ির বাগানে ঘনায়মান অন্ধকারে দুঃখে নিমগ্ন কিটস শুনতে পায় সুরলহরি। এই সুর কবির গহনে জাগিয়ে দিয়েছে তার অবিনশ্বরকে। তিনি অনুভব করেছেন অতীতের কত সব পথিক এই নাইটিঙ্গলের গান শুনেছেন, আবার ভবিষ্যতেও অনেকে শুনবেন। তাই কবির কাছে নাইটিঙ্গলের গান কবির আনন্দ চিত্তের গান৷ এই গান সত্য ও সুন্দর।

আরো পড়ুন:  টু ড্যাফোডিলস বা ড্যাফোডিলের প্রতি কবিতার আলোচনা ও বিশ্লেষণ

‘ওড অন এ গ্রিসিয়ান আর্ন’ কবিতায় কারুকার্য খচিত একটিও গ্রিসীয় ভস্মাধার (Urn)-এর উদ্দেশ্যে লেখা। গ্রিসের ভস্মাধারে যে ছবি চিত্রিত হয়েছে তা কতশত বছর অতিক্রান্ত হয়ে আজও আনন্দ দেয়। কবির বিশ্বাস এ কারণে তা সত্য ও সুন্দর। কবির বিশ্বাস মানুষের জীবন নশ্বর ও সুন্দর অবিনশ্বর। তিনি ‘ওড টু অটাম’ কবিতায় শরৎসুন্দরীর নিখুত রূপ বর্ণনা করেছেন। আর ‘ওড অন মেলানকলি’তে আনন্দের সাথে বিষাদও মিশিয়েছেন।

কিটসের সনেটগুলি থেকেও তার সৌন্দর্যচেতনার নানা দিক ধরা পড়ে। সৌন্দর্যমুগ্ধ এবং প্রেমপিয়াসী সংক্ষিপ্ত জীবনের নানা আশা-আশংকা, ক্ষোভ-দুঃখ-অভিমান, অনুরাগ ও সৌন্দর্যাবেশের নানা সিম্ফনি বেজে উঠেছে এই সনেটগুলিতে। প্রেমিক নিঃসঙ্গ কিটস তরুণী ফ্যানিকে ভালোবেসে কিভাবে জীবনকে পেতে চেয়েছিলেন তা তাঁর ‘ব্রাইট স্টার, উড আই স্টান্ড ফাস্ট’ সনেটটিতে অত্যন্ত অনুভূতিপ্রবণ কল্পনা আর অনুকরণীয় ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন।

উপসংহার

নশ্বর মরজগতের অপূর্ণতা ও অবিনশ্বর সৌন্দর্যলোকের চিরায়ত পরিপর্ণতা—এ দুয়ের দ্বন্দ্ব কিটসের সমগ্র কাব্য সাহিত্যের কেন্দ্রীয় বিষয়। শেলীর কাব্যে দূরবর্তী আনন্দলোকে পৌঁছতে না পারার যে হাহাকার শোনা যায় কিটসের কাব্যে সে ধরনের আত্ম-বিলাপের চিহ্ন নেই, বরং কল্পনার আকাশমিনার থেকে কিটস ফিরে এসেছেন রূঢ় বাস্তব, উপলব্ধি করেছেন সরল রৈখিক মানবজীবনে ক্ষয় ও মৃত্যুর অনিবার্যতা। শেলীর রাজনৈতিক তথা সামাজিক আবেগের দাহ কিংবা ওয়ার্ডসওয়ার্থের প্রশান্ত আনন্দানুভব কিটসের কবিতায় পাওয়া যায় না। প্রকৃতি ও মানুষের সর্ববিধ রূপ ও বর্ণের মাঝে সৌন্দর্যের অন্বেষণে ব্রতী কিটসের কবিতার সারাৎসার সুতীব্র সংবেদনশীলতা যার মধ্য দিয়ে সৌন্দর্য সন্ধান ও ইন্দ্রিয়ময়তাকে কিটস, শিল্পসুষমার এক ঈর্ষণীয় উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন চিত্রকল্পের রুপময়তা, প্রকরণের দক্ষতা ও ছন্দ তথা ধ্বনির অনুপম মাধুর্যে।[১]

এভাবে কিটস তাঁর রচনায় বারবার সৌন্দর্য চেতনার বর্ণনা দিয়েছেন। সৌন্দর্যের প্রতি অপার ভালোবাসায় কিটস সৌন্দর্যাভিসারি কবি ছিলেন। এখনও মানুষ অনুভূতিপ্রবণ কবি হিসাবে কিটসকেই বোঝেন। সেই সময়কার এবং তার পরবর্তীকালে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাহিত্য কিটসের সৌন্দর্য চেতনা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। আমাদের বাংলা সাহিত্যের সৌন্দর্যমুগ্ধ কবি রবীন্দ্রনাথ নিজে স্বীকার করে নিয়েছেন যে, পাশ্চাত্য সাহিত্যের যে কবির সাথে তার আত্মীয়তা গড়ে উঠেছিল তিনি হলেন জন কিটস।

আরো পড়ুন:  রোমান্টিক কবিতা হচ্ছে রোমান্টিকতাবাদী সাহিত্য আন্দোলন থেকে উদ্ভূত কবিতা

তথ্যসূত্র

১. কুন্তল চট্টোপাধ্যায়, ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস, রত্নাবলী, কলকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ জানুয়ারি ১৯৫৯, পৃষ্ঠা ১৫৬।

Leave a Comment

You cannot copy content of this page