সংলাপ হচ্ছে সাহিত্যিক রচনায় দুটি চরিত্রের মধ্যকার কথোপকথন

সংলাপ বা কথোপকথন (ইংরেজি: Dialogue) হচ্ছে দুই বা ততোধিক ব্যক্তির মধ্যে লিখিত বা কথিত বাক্যালাপ বিনিময় এবং এটা সাহিত্যিক ও নাট্যরূপে আলাপের আদান-প্রদান চিত্রিত করে। দার্শনিক বা বক্তৃতার কৌশল হিসাবে এটি পাশ্চাত্যে মূলত প্লেটো দ্বারা বিকাশমান সক্রেটিক সংলাপের সাথে জড়িত, তবে প্রাচীন সাহিত্যগুলি তথা ভারতীয় সাহিত্যসহ অন্যান্য ঐতিহ্যের মধ্যেও সংলাপ পাওয়া যায়।[১]

সাধারণ কথোপকথন থেকে সংলাপের বৈশিষ্ট্য এই যে, সংলাপ পূর্বপরিকল্পিত এবং এর মাধ্যমে রচনাকারী কোনো একটা প্রতিপাদ্যকে ধারাবাহিকভাবে প্রমাণের স্তরে নিয়ে যান। কোনো সমস্যা বা প্রশ্নের উভয় দিক উপস্থাপনের জন্য সাহিত্যিকগণ সংলাপকে সব যুগেই একটি উত্তম কৌশল বলে বিবেচনা করেছেন। লেখক প্রশ্নের পরস্পরবিরোধী দুটি দিক দুই চরিত্রের মাধ্যমে এমনভাবে উপস্থিত করেন যাতে যুক্তির খণ্ডনে যুক্তি অগ্রসর হতে হতে এমন সিদ্ধান্ত সমুপস্থিত হয় যেখানে আর বিরোধের অবকাশ থাকে না। যে চরিত্র প্রতিপাদ্যের প্রতিপক্ষের ভূমিকা পালন করেছে সে চরিত্রও সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতাকে স্বীকার করে।

সংলাপের ব্যুৎপত্তি

সংলাপ শব্দের অর্থ আলাপ বা কথোপকথন। এটাকে ‘নাটকের চরিত্রাবলির পরস্পর কথোপকথন’ হিসেবে সাহিত্যে উল্লেখ করা হয়। নাটকের সর্বপ্রধান অংশ এই সংলাপ। ঘটনা ও চরিত্র সৃষ্টি এই সংলাপের মধ্য দিয়ে মূর্ত হয়ে ওঠে। সংলাপের দুটি দিক—একটি তার নাটকীয় দিক আর একটি চিরন্তন সাহিত্যিক দিক। বর্ণনামূলক কবিতায়, গদ্য উপন্যাসে বা গাথাকাব্যে সংলাপ একটি জরুরি উপাদান। প্রাচীন গ্রিক ও লাতিন সাহিত্যে শিক্ষামূলক ও ব্যঙ্গাত্মক উদ্দেশ্যে সংলাপ ব্যবহার করার প্রচলন ছিল।[২]

সংলাপমূলক রচনার উদ্ভব গ্রিক সাহিত্যে বলে অনেকে মনে করেন। সক্রেটিসকে প্রধান চরিত্র করে প্লেটো তাঁর সমস্ত দার্শনিক তত্ত্বকে সংলাপের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। তাঁর রচনা কেবলমাত্র দার্শনিক এই বিতর্কের জন্যই নয়; তার নাটকীয়তা এবং রচনার মাধুর্যও অতুলনীয়। প্লেটোর সংলাপমূলক রচনাশৈলী কোনো উদ্ভাবন নয়। প্লেটোর পূর্বে গ্রিক দার্শনিকদের মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে তত্ত্ব পেশ করার রীতি প্রচলিত ছিল।

আরো পড়ুন:  ট্রাজেডি হচ্ছে প্রধান চরিত্রের চরম বিপর্যয়ে পতিত হবার নাটক

সক্রেটিস কোনো গ্রন্থ রচনা করেন নি। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে তিনি অপর চরিত্রের সঙ্গে জীবন ও জগতের সমস্যা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করতেন। এবং তাঁর বৈশিষ্ট্যের জন্য তা সক্রেটিসের সংলাপ নামে খ্যাতি লাভ করেছিল। জ্ঞান বিজ্ঞানের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তাত্ত্বিক বিষয় পেশ করার জন্য সংলাপের স্থানে নিবন্ধই প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু কথোপকথন একেবারে পরিত্যক্ত হয় না। বিভিন্ন দেশের খ্যাতনামা সাহিত্যিক অন্যান্য শৈলীর সঙ্গে সংলাপের শৈলীও ব্যবহার করেছেন। ইংরেজি সাহিত্যে দর্শনের ক্ষেত্রে জর্জ বার্কলের ‘হাইলাস ও ফিলোনাস’ –এর সংলাপ এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।[৩]

সাহিত্যে সংলাপ

নাটক সংলাপ-নির্ভর; নাট্যকার নেপথ্যে থাকেন বলেই কাহিনী বা চরিত্রের ভার সবকিছুই সংলাপকে বহন করতে হয়। কিন্তু ঔপন্যাসিক উপন্যাসের কাহিনী এবং চরিত্রের সঙ্গেই চলেন, চরিত্র যেখানে নীরব সেখানে তিনি বর্ণনা, বিবৃতি বা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে সমগ্র পরিস্থিতিকে পাঠকের সামনে উদঘাটিত করতে পারেন। সেদিক দিয়ে উপন্যাসে সংলাপের গুরুত্ব নাটকে তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম।

আধুনিক উপন্যাসে সংলাপের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান ফখল করেছে। উপন্যাসের সর্বগ্রাসী আবেদলের ফলে উপন্যাসের গদ্যভাষার মধ্যে একইসঙ্গে কাব্যরস ও নাট্যরস যুগপৎ কুক্ষিগত। উপন্যাসে ব্যবহৃত সংলাপের মাধ্যমে একদিকে আমরা উপন্যাসে বর্ণিত পাত্রপাত্রীর অন্তরঙ্গ সান্নিধ্যলাভ করি, অন্য দিকে কাহিনীটি নাটকের মতো প্রত্যক্ষবৎ হয়ে ওঠে। সংলাপের মাধ্যমে কাহিনী অগ্রসর হলেও, সংলাপ প্রধানত অন্তর্জীবনের সঙ্গে পাঠকের পরিচিতি ঘটায়। পাত্রপাত্রীর আবেগ-অনুভূতি ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া প্রতিফলিত হয় সংলাপের মাধ্যমে। এদিক দিয়ে সংলাপ রচনায় নাট্যকার অপেক্ষা ঔপন্যাসিকের দায়িত্ব অপেক্ষাকৃত জটিল। পাত্রপাত্রীর ব্যক্তিবৈশিষ্ট্য অনেকখানি যেমন সংলাপে ধরে রাখতে হয়, তেমনই লেখকের নিজের ভাষারীতিকেও অব্যাহত রাখতে হয়। ঔপন্যাসিক নিজের স্টাইল কখনই বিসর্জন দিতে পারেন না, আবার কয়েকটি পৃথক ব্যক্তিত্বকে সংলাপের মাধ্যমে তার মধ্য দিয়েই পরিস্ফুট করে তোলেন।

উপন্যাসের সংলাপ রচনার পদ্ধতি দ্বিবিধ। প্রথমত, ঘটনা ও চরিত্রের সন্ধে সংলাপ যথাযথভাবে অন্বিত হবে। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যেভাবেই হোক না কেন কাহিনীকে বিকশিত করে তুলবে এবং চরিত্রের সঙ্গে ঘটনার যোগসূত্র স্থাপন করবে। যে-সংলাপ কাহিনী বা চরিত্রের বিকাশের সহায়ক নয় বা এ-দুটির মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করতে অক্ষম—সে জাতীয় সংলাপ উপন্যাসের ভারস্বরূপ, উপন্যাসের ঐক্যচেতনার বিরোধী। দ্বিতীয়ত, চরিত্রের ব্যক্তিত্বের এবং পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংলাপ হবে স্বাভাবিক, সুসংগত এবং নাটকীয়। চরিত্রের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে অন্বিত হলে সংলাপ হবে স্বাভাবিক, ঘটনা পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে সংলাপ হবে সংগত এবং পাঠকের কাছে জীবন্ত, আকর্ষণীয়, বৈচিত্র্যপূর্ণ হলে সংলাপ হবে নাটকীয়। আদর্শ সংলাপের এগুলি সাধারণ ধর্ম। ব্যাপারটি আপাত সরল বলে মনে হলেও, সংলাপ রচনায় এই ধর্মগুলির সামঞ্জস্যবিধান ঔপন্যাসিকের কাছে দুরূহ সাধনা-সাপেক্ষ।

আরো পড়ুন:  তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন জনপ্রিয় বাঙালি কথাসাহিত্যিক

সাধারণ লোক দৈনন্দিন জীবনে যে ভাষায় কথা বলে, বা মার্জিত রুচির লোক বিশেষ পরিস্থিতিতে যে ভাষায় কথা বলে, উপন্যাসের সংলাপে তা আক্ষরিকভাবে প্রয়োগ করলে অনেক সময় কৃত্রিম বলে মনে হতে পারে। আবার বাস্তবজীবনের সঙ্গে সংগতি রাখতে গেলে সংলাপের ভাষা হয়তো স্বাভাবিক হয়, কিন্তু তার নাটকীয় গুণ অন্তর্হিত হয়ে যায়। অন্যদিকে সংলাপে নাটকীয়ত্ব আনতে গেলে তা জীবনানুগ নাও হতে পারে। সংলাপের এই দোলাচলবৃত্তি এড়িয়ে চলার জন্য লেখক বাস্তব জীবনে ব্যবহৃত কথ্যভাষা থেকে সংলাপগুলো আহরণ করবেন, কিন্তু তার মধ্যে নাটকীয়ত্ব আরোপ করার জন্য গ্রহণ বর্জনরীতি অনুসরণ করবেন। এবং এই গ্রহণবর্জন-রীতি নির্ভর করে উপন্যাসের বিষয়বস্তু, ঘটনা ও চরিত্রের বিন্যাসপদ্ধতির সঙ্গে সংলাপের সংগতিরক্ষার উপর।

বাস্তব জীবনের অধিকাংশ সংলাপই আকর্ষণীয় নয়, মানবমনের গভীর ও গোপন জটিল গ্রন্থিগুলি উন্মোচনে তা প্রায়শই অক্ষম, অন্যের মনে সঞ্চারণ-ক্ষমতা তার সীমাবদ্ধ; অধিকন্তু তাতে থাকতে পারে অতিশয়োক্তি বা পুনরুক্তি দোষ- যা পাঠকের বিরক্তি উৎপাদন করতে পারে; সেক্ষেত্রে সে জাতীয় সংলাপ রচনা লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে বাধ্য। তাই লেখককে সচেতনভাবে নির্বাচন, বিন্যাস ও বিশিষ্টতা মণ্ডিত করে সংলাপের পরিবেশন করতে হয়। সংলাপকে সাহিত্য রচনায় কতটুকু বর্জন করতে হবে, ঔপন্যাসিকের পক্ষে এই জ্ঞানই আদর্শ সংলাপ রচনার প্রাথমিক ভিত্তি।[৪]

তথ্যসূত্র:

১. অনুপ সাদি, ১৪ মে, ২০১৯, “সংলাপ হচ্ছে সাহিত্যিক রচনায় দুটি চরিত্রের মধ্যকার কথোপকথন”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/encyclopedia/literary-glossary/what-is-dialogue/
২. সুরভি বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহিত্যের শব্দার্থকোষ, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমী, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ১০৬
৩. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ১৩৫-১৩৬।
৩. শ্যামাপ্রসাদ সরদার, অলোক রায় সম্পাদিত, সাহিত্যকোষ: কথাসাহিত্য, সাহিত্যলোক, কলকাতা, প্রথম সংস্করণ ১৩৬৭, পৃষ্ঠা ২৫১-২৫৩

Leave a Comment

error: Content is protected !!