মহাকাব্য জাতীয় বা বীরত্বব্যঞ্জক বিষয়ে বিশাল পটভূমিতে বিধৃত বর্ণনামূলক কাব্য

মহাকাব্য বা মহাকবিতা (ইংরেজি: Epic poetry) হচ্ছে জাতীয় ও বিশাল পটভূমিতে বিধৃত উদাত্ত রীতিতে লেখা সুদীর্ঘ বিবরণসম্বলিত কবিতা, যাতে কবি এবং তাদের শ্রোতাগণ নিজেদেরকে মানুষ বা জাতি হিসাবে উপলব্ধির জন্য লিখে থাকেন। মহাকাব্য সাধারণত সতেজ স্মৃতির বাইরে এমন একটি সময়কে নিয়ে লিখিত যেখানে দেবতা বা অন্যান্য অসাধারণ নারী-পুরুষের সাথে দেবতা বা অন্যান্য অতিমানবিক শক্তির বীরত্বব্যঞ্জক অসাধারণ সব কাজকর্ম থাকে, যেসব কাজের মাধ্যমে তাঁদের ও পরবর্তী বংশধরদের জন্য মর্ত্যজগতে তাঁদের জীবনধারার কাঠামো তৈরি হয়। ইংরেজিতে ‘এপিক’ বা Epic শব্দের বাংলা অর্থ হচ্ছে মহাকাব্য।[১]

মহাকাব্যের কয়েকটি প্রচলিত কাব্যরীতি হলো প্রারম্ভে কাব্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর আবাহন, বীরোচিত নায়ক, বীররসের উদ্দীপন, যুদ্ধের বর্ণনা ইত্যাদি। মহাকাব্য দু-ধরনের হতে পারে; মৌখিক মহাকাব্য বা primary epic, যেমন ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’, ‘ইলিয়াড, ‘ওডিসি ইত্যাদি এবং লিখিত বা সাহিত্যিক মহাকাব্য বা secondary or literary epic। সাহিত্যিক মহাকাব্যের উদাহরণ হচ্ছে ভারজিল-এর ‘ইনিড’, মিলটন-এর ‘প্যারাডাইস লস্ট’ ইত্যাদি।[১]

গ্রীক সাহিত্যতাত্ত্বিক অ্যারিস্টটল তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘পোয়েটিক্স’-এ ট্র্যাজেডির ওপর বিস্তৃত আলোচনা করতে গিয়ে মহাকাব্যের লক্ষণ ও স্বরূপ সম্পর্কেও মন্তব্য করেছেন। কাহিনীর বিস্তারধর্মিতা, ওজোগুণসম্পন্ন শব্দপ্রয়োগ ও হেকটামিটার ছন্দ মহাকাব্যের গঠনরীতির বিশেষত্ব ও স্বাতন্ত্র। অ্যারিস্টটল আর যে দুটি লক্ষণের কথা বলেছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

প্রথম লক্ষণ: বস্তুনিষ্ঠা বা Objectivity – কবির নির্লিপ্ততা, নিরাসক্তি। ঘটনা বা কাহিনীর অন্তরালে কবির নিরপেক্ষ অবস্থান বা আত্মগোপন করার ক্ষমতা। 

দ্বিতীয় লক্ষণ: অলৌকিক বিষয়বস্তুকে কাব্যসম্মতভাবে রূপদান করা। এ সম্পর্কে অ্যারিস্টটলের একটি মন্তব্য মূল্যবান – ‘অবিশ্বাস্য সম্ভবের চেয়ে বিশ্বাসযোগ্য অসম্ভব অনেক বেশি কাম্য’। 

মহাকাব্যের বিষয়বিন্যাস ও গঠনকৌশলে বৈচিত্র্য, ব্যাপকতা ও অভিনবত্ব সুস্পষ্ট। এর ঘটনা বা প্লট গ্রন্থনে আদি-মধ্য-অন্তের ঐক্য থাকতে হবে, নায়ক বীর্যবত্তা ও দক্ষতায় বহুগুণে গুণান্বিত। এর বস্তু-উপাদান জাতীয় জীবনের ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক তথ্য ও ঘটনা, এর অনুপ্রেরণা-উৎস অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঐশীশক্তি। মহাকাব্যে মানব-দানব, দেব-দেবী চরিত্রের সমাবেশ ঘটায় অলৌকিকতার প্রয়োগ ঘটে থাকে।

আরো পড়ুন:  মুকুন্দ দাস ছিলেন বাংলার চারণ কবি, লেখক, পালাগায়ক ও স্বাধীনতা সংগ্রামী

মহাকাব্য দুই প্রকার 

১. জাত মহাকাব্য (Epic of Growth): এতে একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের যূথবদ্ধ জীবনপ্রণালী, মানব-মানবীর আচার-আচরণ-বিশ্বাস, প্রেম-সংগ্রাম বিন্যস্ত হয়। নির্দিষ্ট সময়খণ্ডের পরিবর্তে একটি সমাজের অতীত বর্তমানের দীর্ঘ সময়সীমা জাত মহাকাব্যে অনুসৃত হয়। ব্যক্তিবিশেষ রচনা করলেও জাত মহাকাব্যে সামাজিক ঘটনা-পরিক্রমা ও জীবনের সমাগ্রিক রূপায়ণ ঘটে। বাল্মীকি রচিত রামায়ণ ও কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসকৃত ‘মহাভারতের’ ঘটনা, বিষয়বস্তু ও চরিত্রের বৈচিত্র্য ভারতবর্ষের অদিকালের গোটা সমাজ ব্যবস্থাকেই উন্মোচন করেছে। 

হোমার রচিত ইলিয়ড ও ওডেসি প্রাচীন গ্রীসের যৌথ সমাজব্যবস্থার মহাকাব্যিক রূপ। ইলিয়ড-এ ট্রয় যুদ্ধের শেষ পর্যায়ের কাহিনী অবলম্বিত হলেও দশ বছর ব্যাপ্ত যুদ্ধের সমগ্র ছবিই কবির গ্রন্থণ-নৈপুণ্যে এতে বিধৃত হয়েছে। ওডেসিতে ট্রয় যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইথাকা রাজ্যের জনজীবন, নায়ক ওডেসিয়ুসের অবিশ্বাস্য ভ্রমণ ও সংগ্রাম এবং পেনিলোপির বিড়ম্বিত-ভাগ্য জীবন। হোমার ঘটনাভারাক্রান্ত্র মহাকাব্যে চরিত্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। 

২. সাহিত্যিক মহাকাব্য (Literary epic): এ জাতীয় মহাকাব্য পৌরাণিক ঘটনা কিংবা কোনো জাত মহাকাব্যের ঘটনাসূত্র অবলম্বনে কবির যুগমানস, সমাজমানস ও দৃষ্টিভঙ্গির সমবায়ে এক আধুনিক সৃষ্টি। এই শ্রেণির মহাকাব্যের মধ্যে ভার্জিলের ‘ঈনিদ’ (Eneid) তাসোর ‘জেরজালেম ডেলিভার্ড’ (Jerusalum Delivered), দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’ (Divine Commiedia), জন মিল্টনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’ (Paradise Last) এবং মাইকেল মধুসূদন দত্তের “মেঘনাদবধ কাব্য’ উলেখযোগ্য। পুরাতনের আশ্রয়ে নতুন যুগের জীবনসত্য প্রতিটি সাহিত্যিক মহাকাব্যেরই বিষয়বস্তু।[২]

প্রাচীন ভারতে মহাকাব্য

প্রাচীন ভারতের সুবিখ্যাত দুটি মহাকাব্য-রামায়ণ এবং মহাভারত। শ্লোক হিসেবে এ কাহিনী লিখিত হয়েছিল। এ দুটি মহাকাব্যের শ্লোকসংখ্যা দুই লক্ষের উপর ছিল। যেমন গ্রীসের হোমারের ইলিয়াড, তেমনি রামায়ন, মহাভারত উভয় কাহিনী প্রেম বিষয়ক। রামায়ণের প্রধান চরিত্র ছিল রাজা রাম এবং তার স্ত্রী সীতা। ভারতের দক্ষিণে শ্রীলঙ্কা নামে যে দ্বীপ ছিল সে দ্বীপের রাজা নাকি সীতার রূপে মুগ্ধ হয়ে সীতার বনবাসকালে তাকে অপহরণ করেছিল।

আরো পড়ুন:  ডি এইচ লরেন্স ইংরেজ কবি, উপন্যাসিক, নাট্যকার, সমালোচক ও প্রাবন্ধিক

এ নিয়ে রামের সঙ্গে তার যুদ্ধ বাধে। এ যুদ্ধে যে কেবল মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল তা নয়। বানরও এ কাহিনীর অন্যতম চরিত্র রাম ও সীতার পক্ষে দীর্ঘ সময় লড়াই করে সীতাকে লঙ্কা হতে উদ্ধার করেছিল। বাংলা সাহিত্যের অমর কবি মধুসূদন দত্ত মেঘনাদ, রাম রাবণের যুদ্ধের উপর দীর্ঘ এবং তাৎপর্য্যপূর্ণ শ্লোক রচনা করেন। মাইকেল মধুসূদনের রচনা ছন্দকে অমিত্রাক্ষর ছন্দ বলা হয়।[৩]

তথ্যসূত্র:

১. অনুপ সাদি, ২৮ জুন, ২০১৯, “মহাকাব্য প্রসঙ্গে”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/encyclopedia/literary-glossary/on-epic/
২. সুরভি বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহিত্যের শব্দার্থকোষ, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ৯৩।
৩. বেগম আকতার কামাল, ভীষ্মদেব চৌধুরী, রফিকউল্লাহ খান ও অন্যান্য, বাংলা ভাষা: সাহিত্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর, পুনর্মুদ্রণ ২০১১, পৃষ্ঠা ১২-১৩।
৪. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ২৭৩-২৭৪।

রচনাকাল: ২৮ জুন, ২০১৯, নেত্রকোনা, বাংলাদেশ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!