জন কিটসের কবিতার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সৌন্দর্যচেতনা, অতীতচারিতা ও প্রকৃতিপ্রীতি

কবি জন কিটসের কবিতার বৈশিষ্ট্য (ইংরেজি: Features of Keats’s poetry) হচ্ছে সৌন্দর্যচেতনা, অতীতচারিতা, প্রকৃতিপ্রীতি, চিত্ররূপময়তা, ইন্দ্রিয়পরতা, অতিপ্রাকৃতের ব্যবহার ও প্রকাশকলা। রোমান্টিকতাবাদী যুগের অন্যতম সর্বকনিষ্ঠ কবি হিসাবে যে কাজ তাঁর পক্ষে করা কঠিন ছিল, কিটস তাঁর কাব্য ও কবিতায় খুব সহজেই সেটা করে দেখিয়েছেন।

বার্টটোমের ‘অ্যানাটমি ওব মেলানকলি’ থেকে গল্প নিয়ে জন কিটস তাঁর ‘ল্যামিয়া’ কাব্যটি রচনা করেছেন। এই কাব্যে কবি মধ্যযুগীয় আলোছায়াময় রহস্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে ল্যামিয়া নামক এক নাগিনী কন্যার কাহিনি পরিবেশন করেছেন। কিটসের প্রেম বিষয়ক একটি বিখ্যাত কাব্য ‘ইসাবেলা অর দ্য পট অব বাসিল’। এখানে ইসাবেলার প্রেমিক লরেন্সের তারই ভাতৃদ্বয়ের হাতে মারা যাওয়ার পর ইসাবেলার জীবনে যে দুঃখ নেমে এসেছিল তার করুণ কাহিনি বর্ণিত হয়েছে।

কিটসের ‘লা বেলে ড্যাম সানস্ মাসি’ কাব্যটিতে এক নাইটের ব্যার্থ প্রেমকাহিনি দেখানো হয়েছে। অতিপ্রাকৃত শক্তি সম্পন্না এক কুহকিনি নারীর প্রেমের ছলনায় বহু পুরুষের মত এক পবিত্রচিত্ত খ্রিস্টান নাইটের নিঃস্ব হওয়ার কাহিনি এটি, যে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে এক নির্জন হ্রদের ধারে একাকি ক্ষুন্নচিত্তে ঘুরে বেড়ায়।

জন মিলটনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’-এর প্রেরণায় রচিত ‘হাইপেরিয়ান’ কিটসের অসমাপ্ত মহাকাব্য। তিনি এই মহাকাব্যটি রচনা করার পরিকল্পনা করলেও শেষ করতে পারেন নি। কাব্যের অসমাপ্তিতে কবিচিত্তের একটি অচরিতার্থতার গ্লানি ছিল, যা থেকে তিনি ‘দ্য ফল অব হাইপেরিয়ান: এ ড্রিম’ রচনা করে মুক্তি খুঁজতে চেয়েছিলেন।

উপরিউক্ত কাব্যগুলি ছাড়াও কিটস বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ১৮টি ওড জাতীয় কবিতা রচনা করেন। এগুলিতে তাঁর কবি প্রতিভার অনেক নিদর্শন ছড়িয়ে আছে। এই ওড জাতীয় কবিতাগুলির মধ্যে ‘ওড টু এ নাইটিঙ্গেল’, ‘ওড অন এ গ্রিসিয়ান আর্ন’, ‘ওড টু সাইকি’, ‘ওড টু মেলানকলি’ প্রভৃতি কাব্যমূল্যে উৎকৃষ্ট মানের রচনা। কীটস তাঁর স্বল্পায়ু জীবনে অনেকগুলি সনেটও রচনা করেন। এরমধ্যে প্রথম যুগের ৪২টি সনেটে পেত্রার্কিয় রীতি এবং পরের দিকের ১৬টি সনেটে শেক্সপীয়রীয় রীতি অনুসরণ করেছিলেন। তবে কিটস পেত্রার্কিয় রীতির চেয়ে শেকসপিয়রীয় রীতিতেই বেশি স্বচ্ছন্দ ছিলেন।

কিটসের কবিতার কিছু বৈশিষ্ট্য

অতীতচারিতা

কিটস ছিলেন ভাব রাজ্যের মানুষ, কবি হিসাবে তিনি অর্জন করতে চেয়েছিলেন ‘Negative Capability.’ এ জন্য তিনি ধর্মদর্শন ও রাজনীতি থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করতেন। তাই তাঁর কাব্যে বারবার অতীত দিনের কথা তা পুরানই হোক বা মধ্যযুগীয় ঘুরে ফিরে এসেছে। কীট–এর এই অতীতচারিতার মধ্যেই সৌন্দর্যের পিপাসা গড়ে উঠেছে।

সৌন্দর্যচেতনা

রোমান্টিক যুগের সমস্ত কবির মত কিটসও ছিলেন সৌন্দর্যের সাধক। তাঁর কাব্যকবিতায় বারবার সৌন্দর্যচেতনার কথা ধরা পড়েছে। তার ‘এন্ডিমিয়ন’ কাব্যটির প্রথম উদ্ধৃতিটি হলো “A thing of beauty is a joy forever.” ব্যক্তিগত জীবনে কীটস নানা দুঃখ-কষ্ট, রোগ শোক, আর্থিক অনটন, ভাতৃবিরহ, প্রেমের প্রত্যাখান, পিতৃ-মাতৃ বিয়োগের সম্মুখীন হলেও জীবনকে সুন্দরভাবে দেখেছেন। তাই অনায়াসেই বলেছেন “Beauty is truth, truth beauty.”

ইন্দ্রিয়পরতা

উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ, পার্সি বিশি শেলি প্রমুখেরা বিশ্বের সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করেছেন নিজেদের জ্ঞানমুকুরে। অন্যদিকে কিটস সৌন্দর্যকে দেখেছেন দু’চোখ ভরে, কেবল দু’চোখ ভরেই নয়, পঞ্চ ইন্দ্রিয় ও মনের দরজা খুলে। তাই তার কবিতার একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ইন্দ্রিয়পরতাময় (ইংরেজি: Sensuousness)। তিনি অনুভব করতেন সৌন্দর্যের ভিতরে সত্য নেই, সৌন্দর্যই সত্য। তাঁর কাছে সবই ছিল সুন্দর। কিটসের কবিতা কেবল পড়ার বিষয় নয়, বরং তা অনুভব করার বিষয়। তিনি শব্দ দিয়ে এমনভাবে চিত্রকল্প তৈরি করতেন যা পাঠককে দৃষ্টি, শ্রবণ, স্পর্শ, ঘ্রাণ এবং স্বাদের এক অনন্য অনুভূতি দেয়।

প্রকৃতিপ্রীতি

রোমান্টিক যুগের সব কবিরাই প্রকৃতিকে নানাভাবে বন্দনা করেছেন। কিটসও বারবার প্রকৃতির কোলে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন। তাঁর কাব্যচর্চার মধ্যে প্রকৃতির কথা বারবার এসেছে। ওয়ার্ডসওয়ার্থের মতো কিটস প্রকৃতিকে আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে না দেখে বরং এর বাহ্যিক রূপ এবং লাবণ্যকে ভালোবেসেছেন। ‘ওড টু আ নাইটিংগেল’ বা ‘টু অটাম’-এর মতো কবিতাগুলোতে প্রকৃতির জীবন্ত রূপ ফুটে উঠেছে।

নেতিবাচক সক্ষমতা

নেতিবাচক সক্ষমতা (ইংরেজি: Negative Capability) হচ্ছে কিটসের নিজস্ব একটি দার্শনিক ধারণা। অনিশ্চয়তা বা রহস্যের মধ্যে থেকেও কোনো যৌক্তিক কারণ না খুঁজে কেবল সৌন্দর্যের রস আস্বাদন করার ক্ষমতাকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।

চিত্ররূপময়তা

কিটস দু’চোখে যা দেখেছেন, হুবহু চিত্রের মত কবিতার মধ্য দিয়ে পাঠকের সামনে তা তুলে ধরেছেন। তঁর ‘ওড টু অটাম’ কবিতাটি পুরোপুরি চিত্ররূপময়।

অতিপ্রাকৃতের ব্যবহার

অতিপ্রাকৃতকে প্রথম কবিতার বিষয় করে তুলেছিলেন কোলরিজ। কিটস ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতার প্রভাবে যেমন একদা ‘ও সলিচ্যুড’ কবিতা রচনা করেছিলেন, তেমনি কোলরিজের কাব্যপাঠের পর অতিপ্রাকৃতের উপাদান নিয়ে ‘ল্যামিয়া’ কাব্যটি রচনা করেন।

প্রকাশকলা

প্রকাশকলার ব্যাপারেও কিটস অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। শব্দ, বাক্যবন্ধ, ইমেজ, উপমার প্রয়োগ, ছন্দ, চরণবিন্যাস ইত্যাদি ব্যাপারে কিটস তাঁর কাব্যে যথেষ্ট পারদর্শিতা দেখিয়েছেন।

কাব্যিক বিষণ্ণতা

কিটসের কবিতায় আনন্দের পাশাপাশি এক ধরণের সূক্ষ্ম বিষণ্ণতা কাজ করে। তিনি জানতেন সৌন্দর্য ক্ষণস্থায়ী, আর এই নশ্বরতার বোধই তার কবিতাকে গভীরতা দান করেছে।

পরিশেষে বলা যায় স্বল্পায়ু হওয়ায় কিটস মাত্র ৫-৬ বছর সাহিত্য চর্চা করে যে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন তা পৃথিবীর খুব কম সাহিত্যিকের দ্বারাই সম্ভব হয়েছে। পাশ্চাত্য সাহিত্য দীর্ঘদিন তাঁর রচনা দ্বারা প্রভাবিত ছিল। বাঙ্গালী সাহিত্যিকরাও তার প্রভাব থেকে বাদ যান নি৷ হেমচন্দ্র থেকে শুরু করে বিভিন্ন গীতিকবি এমনকি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও কিটসের কবিতা ও কবিতার বৈশিষ্ট্য দ্বারা প্রভাবিত হন। জীবনানন্দ দাশকে অনেকেই কীটসের সাথে তুলনা করেছেন। এজন্যই সাহিত্যের পাঠকদের কাছে জায়গা করে নিয়ে কিটস তাঁর কবিতা ও কবিতার বৈশিষ্ট্য দ্বারা আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন।

আরো পড়ুন

    তথ্যসূত্র

    ১. কুন্তল চট্টোপাধ্যায়, ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস, রত্নাবলী, কলকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ জানুয়ারি ১৯৫৯, পৃষ্ঠা ১৫৪-১৫৬।

    Leave a Comment

    error: Content is protected !!