অনুপ সাদির ‘হৃদমাঝারে প্রাণভোমরা’: মেহনতি মানুষের জীবনের খণ্ডচিত্র

‘হৃদমাঝারে প্রাণভোমরা’—আমার (অনুপ সাদি) রচিত ও প্রস্তাবিত একটি বিশেষ জীবনগাথা বা সংকলন। এই বইটির পরতে পরতে মিশে আছে আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ প্রায় কুড়িজন অসাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম ও পথচলার গল্প। এই মানুষগুলো আমাদের চারপাশের অতি সাধারণ মুখ হলেও তাদের জীবনদর্শন অত্যন্ত গভীর। এই সংকলনে ঠাঁই পেয়েছেন মেহনতি শ্রমিক ও ঘামঝরা কৃষক থেকে শুরু করে আপসহীন বিপ্লবী, ত্যাগী রাজনীতিবিদ এবং নিবেদিতপ্রাণ পরিবেশবিদ। মূলত আমার সান্নিধ্যে আসা এবং আমার জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকা কিছু বিরল ব্যক্তিত্বের সমাহার এই গ্রন্থ।

এই মানুষগুলোর পরিচয় এক কথায় প্রকাশ করতে গেলে বলতে হয়—তারা আপাদমস্তক ‘মানুষের’ ছিলেন এবং আছেন। যান্ত্রিক সমাজের ইঁদুর দৌড়ে শামিল না হয়ে তারা সবসময় সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের সারথি হতে চেয়েছেন। প্রতিটি ব্যক্তিত্বের ওপর আমি অন্তত তিন-চারশ শব্দের সংক্ষিপ্ত অথচ তথ্যবহুল জীবনলেখ্য প্রস্তুত করেছি, যা তাদের কর্ম ও আদর্শকে প্রতিফলিত করে।

মজার বিষয় হলো, যাদের কথা আমি এখানে বলেছি, তাদের কেউ হয়তো তথাকথিত সমাজের উচ্চপদে আসীন নন, নেই কোনো জাঁকজমকপূর্ণ পদ-পদবি বা অর্থবিত্তের আস্ফালন। বরং তারা নিভৃতচারী; নিজের কাজ এবং যাপিত জীবনের মাঝেই খুঁজে পেয়েছেন অনাবিল আনন্দ। মানুষের কল্যাণে কাজ করা এবং ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল হওয়াই ছিল তাদের জীবনের প্রধান ব্রত। মূলত এই প্রচারবিমুখ ও নিঃস্বার্থ মানুষগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই ‘হৃদমাঝারে প্রাণভোমরা’র এই আয়োজন।

আমি সাধারণত আমার চারপাশের পরিচিত মানুষগুলোর ছোট ছোট গল্প বা তাদের নিয়ে আমার উপলব্ধির কথাগুলো ফেসবুকের পাতায় লিখে থাকি। সেই শব্দগুলো যখন একটু বড় রূপ নেয়, তখন সেগুলোকে সাজিয়ে গুছিয়ে ‘প্রাণকাকলি ব্লগ’ কিংবা ‘রোদ্দুরে’ ও ‘ফুলকিবাজ’ ওয়েবসাইটের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রকাশ করি। এভাবেই অবহেলায় আর অযত্নে প্রায় কুড়ি জন ব্যক্তিত্বকে নিয়ে আমার এই ক্ষুদ্র লেখাগুলো গড়ে উঠেছে।

এই লেখাগুলো কলেবরে যেমন ছোট, তেমনি এতে মিশে আছে ফেলে আসা দিনগুলোর ধূসর স্মৃতিচারণ। আমি মূলত চেয়েছিলাম সেই সময়টিকে এবং সেই মুহূর্তের অনুভূতিগুলোকে অক্ষরের ফ্রেমে বন্দি করতে। সত্যি বলতে, কোনোটিই খুব বেশি সময় নিয়ে বা প্রথাগত কোনো পরিকল্পনা মেনে লেখা হয়নি। সুপরিকল্পিত লেখনীতে যে কৃত্রিম সৌন্দর্য বা পরিশীলিত নান্দনিকতা ফুটে ওঠে, আমার এই অগোছালো শব্দগুলোতে হয়তো তার অভাব রয়ে গেছে।

তবে আমার কাছে এর চেয়েও বড় সত্য হলো—এই লেখাগুলো একেবারেই সাধারণ, ব্রাত্য মানুষের জীবন নিয়ে রচিত। তারা সমাজের চোখে হয়তো ‘বিখ্যাত’ কোনো ব্যক্তিত্ব নন, ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখাও নেই। কিন্তু তাদের যাপিত জীবনের পরতে পরতে যে জীবনবোধ আর সংগ্রামের গল্প লুকিয়ে আছে, তা আমার কাছে মহামূল্যবান। বড় কোনো পরিকল্পনা করে নয়, বরং হৃদয়ের তাগিদ থেকেই এই সাধারণ মানুষগুলোর অসাধারণ সাধারণত্ব আমি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

শ্রমিক ও কৃষকের রাজনীতি তথা সাম্যবাদী আদর্শের বিকাশের ফলেই একদল নিঃস্বার্থ মানুষের জীবন আমাদের নজরে আসার সুযোগ পেয়েছে। আমরা তাদের চিনি কঠোর পরিশ্রমী কর্মজীবী হিসেবে; যারা পরজীবিতাকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করেছেন এবং আমৃত্যু লড়েছেন গণমানুষের মুক্তির নেশায়। আমাদের সমাজে এমন অকুতোভয় ও কর্মনিষ্ঠ মানুষ হাজারে হাজারে বিদ্যমান। ‘হৃদমাঝারে প্রাণভোমরা’ সংকলনে মূলত তেমন কিছু মানুষের সংগ্রামী জীবনের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে।

স্পষ্ট করে বলতে চাই, এই লেখাগুলো কোনো মানুষের পূর্ণাঙ্গ জীবনবৃত্তান্ত বা প্রথাগত জীবনী নয়। এগুলো বরং চলচ্চিত্রের খণ্ডচিত্রের মতো অথবা একটি বিশাল গ্রন্থের মাত্র কয়েক পাতা। তাদের জীবন হতে পারত হাজার হাজার পৃষ্ঠার এক একটি অনন্য মহাকাব্য; সেই বিশাল জীবনের গুটিকয়েক টুকরো পাতা পড়ার মাঝেও যে এক অসামান্য আনন্দ ও শিক্ষা থাকতে পারে, সেই বিশ্বাস থেকেই এই কলম ধরা।

আমাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় বা ‘হৃদমাঝারে প্রাণভোমরা’ হিসেবে আমরা নির্দ্বিধায় এই নিভৃতচারী মানুষগুলোকে স্থান দিতে পারি। তারা আগামী প্রজন্মকে শত শত বছর বেঁচে থাকার সাহস যোগাবে এবং মানুষের জন্য কাজ করার প্রেরণা দিয়ে যাবে নিরন্তর।

আরো পড়ুন

Leave a Comment