আমার দাদী শাহেরা খাতুন কোনো কাজে অলসতা দেখাতেন না

শিউলি আকতার

আমার দাদী শাহেরা খাতুন ছিলেন আমার জন্য পিতা মাতা দাদী নানী। মায়ের আদর আর বাবার দায়িত্ব তিনি একাই পূরণ করেছেন। আমি ‘ক’ ‘অ’ বলতে শিখেছি দাদীর কাছে। হাঁটতে শিখেছি, স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, আরবি বর্ণমালা, অ্যালফাবেট শিখেছি দাদীর কাছে। তিনি পড়তে পারতেন না তবে এগুলো আমার চাচাদের পড়ার সময় মুখে শুনে শুনে শিখেছিলেন। তাই আমি যখন ছোট ছিলাম তখন রাতে শুয়ে শুয়ে দাদী আমাকে শিখাতেন।

আমার দাদীর গলা খুব মিষ্টি ছিল। প্রতিদিন রাতে গীত গেয়ে আমাকে ঘুম পাড়াতেন। দাদীর গীত না শুনলে আমার ঘুম আসত না। তিনি গাইতেন নিন আয় নিন আয় বাঁশের কাঁকড়া, ছুট্টিতলায় ঘুমায় শিয়াল কুকুর, গোহিলেতে ঘুমায় ধেনু বাছুর, ঘরেতে ঘুমায় শিউলি ঠাকুর। দাদী মজার মজার গল্প বলতে পারতেন। মাঝে মাঝে ঘুমানোর আগে গল্প শুনার জন্য বাইনা ধরতাম দাদীর কাছে। দাদী তার ছোট বেলার গল্পও বলতেন মাঝে মাঝে।

তিনি যখন ছোট ছিলেন তখন তার বাবা অনেক বড় বড় মাছ ধরতেন। তখনকার সময়ে খাল-বিল, নদী-নালায় প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। দাদী বলত যে তখন মাছ খেত এক প্লেট আর ভাত খেত এক চামচ; আমরা যেমন এক প্লেট ভাতের সাথে এক চামচ মাছ খাই। দাদী আরো বলত যে একটা মাছের ডিম নাকি এক কড়াই হতো। আমার দাদীর বাবা একবার একটা মাছ ধরেছিলেন সেটা এত বড় ছিল যে দাদী ও তার ভাই দুইজন মিলে টেনে বাড়ি আনতে পারেনি।

দাদী খুব ভালো সাঁতার কাটতে পারতেন। তার সাথে সাঁতার কাটতে গিয়ে সবাই হেরে যেত। এসব গল্প শুনতাম আর আমিও স্বপ্নে সাঁতার কাটতাম। তবে বাস্তবে আমি এখনো সাঁতার কাটতে পারিনা।

আমার দাদী অনেক সাহসি নারী ছিলেন। তিনি কোনো কিছুতে ভয় পেতেন না। আমার দাদা মারা যাওয়ার পর তিনি বাড়িতে একা থাকতেন। আমাদের বাড়ির পিছনে আম, কাঠাল, শিমুল সহ নানান ধরনের গাছ ছিল, আর তার নিচে ছিলো আনারসের বাগান, সেই বাগানে বড় বড় ও মোটা সাপ ছিল। আমার দাদী সাপগুলোকে কখনো মারতেন না বরং অনেক সময় দেখতাম সাপ সামনে পড়লে বলতেন—রাস্তায় কেন তুই যা জঙ্গলে যা। সাপটাও চলে যেত। তাছাড়া সাপগুলোকে কখনোই কাউকে কামড় দিতে দেখিনি। গ্রামের ছেলেরা সাপ মারতে চাইলে দাদী বাধা দিতেন। ঝড়ের দিনে পাখির বাসা ভেঙ্গে গেলে বাচ্চাগুলো কান্না করত, দাদী বাচ্চাগুলোকে যত্ন করে বাঁচানোর চেষ্টা করতেন। দাদী সকল প্রাণীকে ভালোবাসতেন।

আরো পড়ুন:  লোকশিল্পী ও ভূমিকন্যা শাহেরা খাতুন

দাদীকে কোনো দিন দেখিনি পাখিতে ফল খেলে মন খারাপ করতে। বরং ফল পাড়ার সময় বলতেন, কিছু আম বা কাঁঠাল গাছেই থাক, ওগুলো পাখিতে খাবে। পাখিদেরও ফল খাওয়ার অধিকার আছে। দাদী প্রতিদিন সকালে একটা বড় লাঠি বাগানে যেতেন কাঁঠাল পেকেছে কিনা তা যাচাই করতে। আমাদের একটা কাঁঠাল গাছ ছিল, বড় আর অনেক পুরনো। ঐ গাছ থেকে কাঁঠাল পাড়ার সময় দাদী বলেছিলেন যে, দাদা যখন গাছে উঠে কাঁঠাল পাড়তেন তখন দাদী সেই কাঁঠালগুলো হাত দিয়ে ধরতেন। একটা কাঁঠালও নিচে পড়ত না। আমি শুনতাম আর অবাক হতাম যে এত উপর থেকে পড়া কাঁঠাল তিনি হাত দিয়ে কীভাবে ধরতেন।

বুবুর একটা বড় গুণ ছিল যে, কোনো গাছের চারা পেলে সেটা এমন ভাবে যত্ন করতেন যেন দশ বছর পরে কী রকমের গাছ হবে তিনি সেটা স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছেন। দাদী গাছ লাগাতে অনেক ভালোবাসতেন। বসতভিটা এবং কান্টায় অঙ্কুরিত প্রতিটা গাছের চারায় প্রতিদিন সকাল বিকাল পানি দিয়ে বাচিয়ে রাখতেন। দাদী মারা যাওয়ার দুই মাস আগের ঘটনা। একটা নিম গাছের চারা আমাদের বাড়ির পিছনে হয়েছে। সেটা দেখে রোজার সময় রোজ ফজর নামাজের পর মগে করে পানি নিয়ে পানি দিতেন, আর বলতেন যে এই নিম গাছটা বড় হলে শিউলিকে খাট বানিয়ে দিব।

আসলে আমার দাদী শাহেরা খাতুন কোনো কাজে অলসতা করতেন না। সব সময় কোনো না কোনো কাজে নিজেকে ব্যাস্ত রাখতেন। আমার দাদী নিজের ছেলে মেয়ের পাশাপাশি আমাকে, শেফালিকে, সেলিমকে, শিশিরকে লালন পালন করেন। দাদী সবার চেয়ে আমাকে ভালোবাসতেন। আমার জন্য দাদী অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আমি যখন এস.এস.সি পাস করেছিলাম তখন আমার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করার জন্য আমাকে লেখাপড়া করার জন্য ময়মনসিংহ পাঠিয়ে দেন। তখন দাদী বাড়িতে একা থাকতেন দাদীর অনেক কষ্ট হলেও কখনো আমাকে পিছু টানেননি।

আরো পড়ুন:  উত্তরবাংলার লোকশিল্পী ও পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী শাহেরা খাতুন মারা গেছেন

আমি যখন বাড়ি যেতাম তখন দাদী আমাকে জড়িয়ে ধরে বাচ্চাদের মত কাঁদতেন। ঠিক যেভাবে আমি ছোট বেলায় দাদীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতাম। দাদী সবসময় আমার কথা ভাবতেন, আমাকে নিয়ে খুব চিন্তা করতেন। একদিন ফোনে কথা বলতে না পারলে অভিমান করে বলতেন ভুলে গেছিস আমাকে। কতোদিন ফোন দিস না অথচ দুইদিন আগেই কথা হয়েছে।

করোনা ভাইরাসের সময় দাদী ফোন দিয়ে বলেছিলেন কি ভাবে চলছিস টাকা পয়সা কিছু আছে? আমি তোকে তিন হাজার টাকা দিচ্ছি। সাবধানে থাকিস। আমি বলেছিলাম আমার কাছে টাকা আছে, টাকা লাগবে না। দাদি আমার কথা শুনেননি জোর করেই টাকা পাঠিয়েছিলেন। পৃথিবীতে এমন দরদী আর কেউ নেই যে আমাকে নিয়ে এতো চিন্তা করবে। কেবল আমাকেই নয়, দাদী আমাদের এলাকার গরীব দুঃখি মানুষদের বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা করতেন।

দাদীকে এতো তাড়াতাড়ি হারিয়ে ফেলব সে কথা কখনও ভাবিনি। কষ্টে বুকটা ভেঙ্গে আসে। আপনজন হারানোর ব্যথা যে এতোটা কষ্টের দাদীকে হারানোর আগে তা বুঝিনি। আমার দাদী যেন পরপারে ভালো থাকেন। এই কামনা করি।

Leave a Comment

error: Content is protected !!