ড. আলেয়া পারভীন: বিশিষ্ট নারীবাদী লেখক, প্রাবন্ধিক ও গবেষকের জীবনী

ড. আলেয়া পারভীন (জন্ম: ১৯ এপ্রিল ১৯৭৫) বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট লেখক, প্রাবন্ধিক, গবেষক এবং সাম্যবাদী ধারার প্রখর চিন্তাবিদ। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই গুণী ব্যক্তিত্ব একাধারে একজন দক্ষ সম্পাদক ও সুকণ্ঠী সংগীতশিল্পী। নারী-পুরুষের বৈষম্যহীন এক প্রগতিশীল সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে তিনি অসংখ্য সামাজিক সংগঠন, এনজিও এবং সাম্যবাদী আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভাবে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন।

তাঁর জ্ঞানতাত্ত্বিক গবেষণার এক অনন্য নিদর্শন ‘নারী ও রাজনীতি’ (২০০৭) গ্রন্থটি, যা প্রকাশের পর পাঠক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক মহলে ব্যাপক সমাদৃতি লাভ করে। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান’ (২০০৯) এবং ‘রাজনৈতিক তত্ত্বের পরিচিতি’ (২০১৩)। জ্ঞানচর্চার এই সৃজনশীল ধারায় তিনি আজও নিরলসভাবে তাঁর লেখনী চালিয়ে যাচ্ছেন।

জন্ম ও শৈশব

বরেণ্য নারীবাদী লেখক ড. আলেয়া পারভীন ১৯৭৫ সালের ১৯ এপ্রিল ঢাকা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানার পাড়াতুলি ইউনিয়নের বালুয়াকান্দি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবার। তাঁর পিতা মমতাজউদ্দিন আহম্মদ এবং মাতা ফজিলাতুন নেসা। এক ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তান।

ব্যক্তিগত জীবন

ব্যক্তিগত জীবনে ড. আলেয়া পারভীন প্রখ্যাত লেখক ও শিক্ষাবিদ মো. আবদুল ওদুদের সহধর্মিণী। তিনি দুই সন্তানের জননী; তাঁর বড় ছেলে রেশাদ আহমেদ মুগ্ধ এবং ছোট ছেলে রাইয়ান আহমেদ স্নিগ্ধ। তাঁর পারিবারিক আবহাওয়া ছিল অত্যন্ত শিক্ষিত ও মার্জিত। পিতা মমতাজউদ্দিন আহমেদ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

পারিবারিক পরিমণ্ডলে তাঁর ভাই-বোন সকলেই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত এবং নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর একমাত্র ভাই বোরহান উদ্দিন আহমেদ বর্তমানে কানাডার স্থায়ী নাগরিক এবং সেখানে কর্মরত আছেন। বড় বোন ‘ইউসেপ বাংলাদেশ’-এর একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক এবং একইসাথে একজন স্নাতকধারী হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক হিসেবে মানবসেবায় নিয়োজিত।

শিক্ষা জীবনে আলেয়া পারভীন

ড. আলেয়া পারভীনের শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি ১৯৮০ সালে টালি অফিস প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর তিনি ধানমন্ডি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে ১৯৯০ সালে এসএসসি এবং ঢাকা সিটি কলেজ থেকে ১৯৯২ সালে এইচএসসি সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৫ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৯৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই নারী ও রাজনীতি বিষয়টি তাঁর বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করে; সমাজে নারী-পুরুষের বিদ্যমান বৈষম্যমূলক সম্পর্ক তাঁকে গবেষণায় এবং পরবর্তীতে লেখালেখিতে অনুপ্রাণিত করে। উচ্চতর গবেষণার ধারায় তিনি ২০১৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে ‘মুসলিম পারিবারিক আইন ও নারীর অধিকার’ শীর্ষক থিসিসের ওপর ডক্টরেট (পিএইচডি) ডিগ্রি অর্জন করেন।

পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি সহ-শিক্ষা কার্যক্রমেও ছিলেন অনন্য। তিনি বাফা (BAFA) থেকে নজরুল সঙ্গীতের ওপর দুই সেমিস্টার পর্যন্ত তালিম নিয়েছেন। এছাড়া তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিএনসিসি (সেনা শাখা) ক্যাডেট হিসেবে ‘বেস্ট শুটার’ এবং বিসিএস ক্যাডারদের বুনিয়াদী প্রশিক্ষণ কোর্সে ‘অলরাউন্ডার’ হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন। পেশাগত জীবনে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগদানের পূর্বে তিনি সমাজসেবা কর্মকর্তা এবং উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (TEO) হিসেবেও সাফল্যের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।

কর্মজীবনে আলেয়া পারভীন

ড. আলেয়া পারভীন ২০০৩ সালে ২২তম বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারে প্রভাষক পদে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর পেশাগত জীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত সরকারি সঙ্গীত কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি টাঙ্গাইল, জামালপুর, নরসিংদী ও চাঁদপুরের বিভিন্ন সরকারি কলেজসহ ঢাকার মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) আইসিটি প্রজেক্টে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি নারী অধিকার রক্ষা, ক্ষমতায়ন এবং নারী-বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতে যেমন সোচ্চার, তেমনি শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নেও নিবেদিতপ্রাণ।

সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তিনি ২০১৫ সালে কেরানীগঞ্জের মধ্যেরচর মেইন রোডে ‘অ্যাওয়ারনেস ফর অল’ (Awareness for All) নামক একটি প্রতিষ্ঠান ও পাঠাগার গড়ে তোলেন। একই সময় থেকে তিনি ‘সচেতন বার্তা’ নামক একটি ব্যতিক্রমী ম্যাগাজিন সম্পাদনা করে আসছেন। ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর লেখনী বিভিন্ন পত্রিকা, স্মরণিকা ও বার্ষিকীতে নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে। বর্তমানেও তিনি বিভিন্ন ম্যাগাজিনে প্রাবন্ধিক ও সম্পাদনা সহকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

আরো পড়ুন

✨ অনুপ সাদি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে: 👉 অনুপ সাদি: জীবন ও কর্মের মূল্যায়ন 📖

Leave a Comment