শাহেরা খাতুন কঠিন বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিয়ে হয়ে উঠেছিলেন বাস্তববাদী

রেজাউল করিম, রাজনীতি বিশ্লেষক

ভারতীয় উপমহাদেশ সংক্রান্ত আলোচনার সাথে পৃথিবীর অন্যান্য অংশের সামাজিক অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতার সম্পর্ক আছে, এমনকি ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ এই ১৯০ বছর এই অঞ্চলের বৃটিশ বিরোধী লড়াই-সংগ্রামগুলো সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা ও অনুধাবন করলে দেখা যাবে ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতি ঐক্যবদ্ধভাবে একমুখী ছিল! ফ্রান্সের শিল্প বিপ্লব যন্ত্রের ব্যবহারকে ব্যাপক মাত্রায় বিকশিত করায় সারা বিশ্বেই এর কম বেশি প্রভাব পড়ে।

১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা এবং একই সাথে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্থান নামে দুটি দেশের যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ শাসক শ্রেণির মনোভাব এবং ১৯৪৭ পরবর্তী পূর্ববঙ্গের প্রতি পশ্চিম পাকিস্থানের শাসক শ্রেণির মনোভাব একই রকম থাকে। ফলে অনুন্নত পূর্ব বাংলাকে ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ হিসাবে অর্জন করা পূর্ববাংলার মুক্তিকামী জনগণের নিকট ঐতিহাসিক বাস্তবতায় অনিবার্য হয়ে ওঠে। অনুপ সাদি’র আম্মা শাহেরা খাতুন এই পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার টানাপোড়েন ও ভাঙনের দর্শক ছিলেন।

শাহেরা খাতুন জন্মেছিলেন পশ্চিমবঙ্গে, শৈশব কৈশোর সেখানেই অতিবাহিত করেন। দীর্ঘ কঠিন জীবনে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন অর্থনীতি রাজনীতি নানাবিধ ঘটনা, লড়াই-সংগ্রাম সংস্কৃতিসহ নানান বিষয়। বৈবাহিক সূত্রে জীবনের সিংহভাগ সময় অতিবাহিত করেন বর্তমান বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁয়ের প্রত্যন্ত পল্লীগ্রামে। কার্ল মার্কস বলেছিলেন, অনুন্নত সমাজের পরবর্তী অনিবার্য আকাঙ্ক্ষা ও পরিণতি হলো উন্নতি। মানুষ তার নিজের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই উৎপাদন সংগ্রামে যুক্ত থাকে এবং অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে।

শাহেরা খাতুন তাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী মার্কসবাদী ছিলেন না কিন্তু কঠিন বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিয়ে, হয়ে উঠেছিলেন বাস্তববাদী। ১৯৭১ পরবর্তী বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের স্বপ্ন ছিলো মধ্যবিত্ত পর্যায়ে উঠে আসা। তিনি অনেকাংশে সফল হয়েছিলেন। অনুন্নত সমাজের নানান প্রতিবন্ধকতাকে তিনি অতিক্রম করে ছেলেমেয়েদেরকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলেন। অনুন্নত পশ্চাৎপদ ব্যবস্থায় তিনি সংস্কৃতির সাথে যুক্ত থেকে নিজে লোকসংগীত গাইতেন।

আরো পড়ুন:  অনুপ সাদির সম্মেলনপঞ্জি হচ্ছে বিভিন্ন সম্মেলনে উপস্থিতি ও প্রবন্ধ উপস্থাপন

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের পাহাড় ও আদিবাসীদের সমাজ সংস্কৃতি জীবনযাপন দেখার জন্য আমি একদিন অনুপ সাদি ও তার মায়ের ভ্রমণসঙ্গী হয়েছিলাম। একদিনের অভিজ্ঞতায় পর্যবেক্ষণ করলাম, তিনি অত্যন্ত স্বল্পভাষী এবং মৃদুস্বরে কথা বলতেন। আমরা সকালে যাত্রা করে সারাদিন একসাথে হালুয়াঘাটের গোবরাকুড়া, খ্রিস্টানপাড়া, ব্যাপ্টিস্ট চার্চ, পাহাড় ও অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখেছি। কখনো অপ্রয়োজনে অহেতুক কথা বলতে দেখিনি। পশ্চাৎপদ কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভাববাদী গোঁড়া অভিভাবকদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা সন্তানের ইতিবাচক চিন্তা কর্ম ও অনুশীনের প্রতি সমর্থন করতে পারেন না, অনেক ক্ষেত্রে দুটো প্রজন্ম চিন্তার দিক থেকে বিপরীতমুখী হয়ে পড়ে। অনুপ সাদির মায়ের ক্ষেত্রে তেমনটি দেখা যায়নি।

শাহেরা খাতুন জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে সময়কে ধারণ করতেন। চাপিয়ে দেয়া ধর্ম, সিদ্ধান্ত নাস্তিকতা আস্তিকতা ঝাড়ফুক তাবিজ-কবচ এমনকি বস্তুবাদ মার্কসবাদসহ যে কোনো কিছুই তাঁর নিজস্ব চিন্তাকে ভেঙ্গে দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে পারেনি। তিনি সারাজীবন বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজস্ব শিক্ষার বুনিয়াদ থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে জীবন অতিবাহিত করেছেন। ঠিক যেমন, ভ ই লেনিনের ‘জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার’ অবশ্যই মার্কসবাদ-লেনিনবাদের তত্ত্বানুসারেই সম্ভব অন্যথায় ব্রিটিশ শাসক শ্রেণির উপনিবেশ সৃষ্টির তত্ত্ব ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ পলিসিতে বিশ্বের নিপীড়িত জাতিগুলো টুকরো টুকরো হতে বাধ্য। শাহেরা খাতুন এই টুকরো হবার সময়ের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি হলেও তিনি দায়িত্বশীল আন্তরিকতা নিয়ে বাক্য বিনিময় করতেন। আমাদের ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার তিনি নিজ হাতে তৈরি করে সঙ্গে নিয়েছিলেন।

Leave a Comment

error: Content is protected !!