বড় ফুপু শাহেরা খাতুন ছিলেন পুরো পরিবারের তথ্য ভাণ্ডার

মাহবুবুল আলম আপেল

বড় ফুপু শাহেরা খাতুন আমার বাবা-চাচাদের মধ্যে সবার চেয়ে বড়। আমাদের রণহাট্টা গ্রামের বাড়ি থেকে ফুপুদের বাড়ি দেড় কিলোমিটার দূরে। অনেক রকম ফলের গাছ ছিল ফুপুর বাসায়। ছোট বেলায় সাইকেল নিয়ে অনেক গিয়েছি আম-কাঁঠাল খাওয়ার জন্য। নানা রকম গাছের ছায়ায় বসলেই প্রাণটা জুড়িয়ে যেত। বড় ফুপুর বাসায় গেলেই কোনো না কোনো খাবারের আয়োজন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন তিনি। না খাইয়ে কখনোই ছাড়তেন না।

বড় ফুপুর কথা মনে হলে পিঠা খাওয়ার কথা মনে পড়ে যায়। আমেদের বাড়িতে বড় ফুপু যখনই এসেছেন সাথে কোনো না কোনো পিঠা নিয়ে এসেছেন। আমার বড় মেয়ে এই দাদীর নাম দিয়েছিল পিঠা দাদী। প্রায় দিনই সন্ধ্যায় বড় ফুপু আমাদের বাড়িতে আসতেন। তিনি আসা মানেই আমরা নিশ্চিত থাকতাম ফুপু আমাদের জন্য পিঠা এনেছেন।

আমার বাবা ছিলেন ফুপুর চেয়ে বয়সে পাঁচ-ছয় বছরের ছোট। তার প্রতি ফুপুর ছিল অগাধ ভালোবাসা। আমার মনে হতো বাবাকে তিনি তার অন্য ভাইদের চেয়ে একটু বেশি ভালোবাসতেন। অবশ্য আমার অন্য চাচাদের চেয়ে আমাদের বাড়ি ছিল কাছে। এতটা কাছে যে তিনি অনায়াসে এই পথটুকু হেঁটে আসতেন।

আমার দাদা নূর হোসেন মারা যাবার পর আমরা দাদার ভিটা মহেন্দ্রগাঁও থেকে কিছুটা দূরে রণহাট্টা গ্রামে চলে আসি। এখান থেকে বড় ফুপুর দামোলের বাড়িটা ছিল খুব কাছে। তাই আমাদের বড় ফুপুর বাড়িতে যাওয়া হতো খুব বেশি।

বড় ফুপু শাহেরা খাতুন ছিলেন পুরো পরিবারের তথ্য ভাণ্ডার। তার কাছে শুনেছি আমার দাদাদের আদি বাসস্থান ছিল বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলায়। সেখানেই ফুপু এবং আমার বাবা-চাচাদের বড় হয়ে উঠার গল্প। ভাইবোনদের মধ্যে সবার বড় হওয়ায় সবাই তাকে মান্য করত এবং সমীহ করে চলত। আমাদের বাড়িতে আসলে দেখতাম বাবা এবং বড় ফুপু গল্প করতে করতে তাদের অতীত জীবনে হারিয়ে যেতেন। বাবার মুখে শুনেছি ভারতের মালদা জেলায় তাদের দাদা এবং পূর্ব পুরুষদের বাসস্থান। তাদের গ্রামের নাম ছিল মাঠিয়ারি। আরও কত গল্পের উপকরণ থাকত দু ভাই-বোনের। আমরা থাকতাম শ্রোতা হয়ে।

আরো পড়ুন:  শাহেরা খাতুনের সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি হচ্ছে ৮৩ বছরের কর্মকাণ্ড

আমরা বড় ফুপুর বাসায় গেলে ঘরে বসার চেয়ে বাইরে গাছে ছায়ায় বসতে বেশি পছন্দ করতাম। বাসাটা জুড়ে ছিল একটা প্রশান্তিময়তা। সারা বাসা জুড়ে ছিল বিভিন্ন রকমের ফুল ও ফলের গাছ। বাসাটা সারাক্ষণ ছায়ায় ঢেকে থাকত। বড় ফুপুর বাসায় গেলে কখনো না খেয়ে আসতে দিতেন না। আমাদের চার ভাই বোনকেই তিনি অত্যন্ত স্নেহ করতেন। বড় ফুপু আজ নেই কিন্তু তিনি আজীবন আমাদের স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে থাকবেন। পরম করুণামায়ের নিকট দোয়া করি তিনি যেন আমাদের বড় ফুপুকে বেহেশতের সর্বোৎকৃষ্ট স্থানে অধিষ্ঠিত করেন।

Leave a Comment

error: Content is protected !!