শাহেরা খাতুনের চিন্তাধারা হচ্ছে উদারতা, স্বনির্ভরতা আর পরোপকারিতা

সেলিমুল হাসান
পথিক সেলিম

আমার নানী শাহেরা খাতুনের চিন্তাধারা বহু দিকে বিস্তৃত হয়েছে। তাঁকে দেখেছি একজন উদার পরোপকারী স্বনির্ভর মানুষ হিসেবে। তিনি প্রচণ্ড পরিশ্রমী একজন ব্যাক্তি ছিলেন। ভোর থেকে শুরু করে রাত্রে বিছানায় শোয়ার আগ পর্যন্ত ঘরের কাজ, বাইরের কাজ, বসতভিটা এবং কান্টায় গাছপালার সার্বিক যত্ন নেওয়া, হাস, মুরগি, গরু, ছাগলের যত্ন নেওয়া থেকে শুরু করে সকল কাজ কর্ম এক হাতে এক নাগাড়ে করে যেতেন।

ছোটবেলায় নানী এবং আম্মুর কাছে গল্প শুনেছি যে মুক্তিযুদ্ধের সময়, যুদ্ধের পূর্বে ও পরবর্তী সময়ে নাকি প্রচন্ড কষ্টে দিনকাল কেটেছে। যুদ্ধের সময় খেয়ে না খেয়ে বাসস্থান এবং সব কিছু ছেড়ে-ছুড়ে শুধু নিজ জীবন এবং সন্তানদের নিয়ে লক্ষহীন অনিশ্চিত যাত্রা করা, দিন কি রাত মাঠে ঘাটে পরবাসে অমানবিক জীবন যাপন করা, অতঃপর শূন্য হাতে নিজ বাসস্থানে ফিরে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিনরাত একাকার করে ঢেঁকিতে ধান, জব মেড়ে, যাঁতাতে জব, মাইড়ার আটা পিশে শূন্য থেকে আবার নতুন করে সব কিছু দাঁড় করেছেন নানী।

৮০ বছর বয়স পর্যন্ত আমি নানীকে নকসি কাথা সেলাই করতে দেখেছি। আসলে একটা মানুষ কতোটা দক্ষ ও পরিশ্রমি হলে চোখে সমস্যা থাকা সত্বেও ৮০ বছর বয়সে এসে এসেও সুইয়ে সুতা দিয়ে নকসি কাঁথা সিলাই করতে পারে তা নানীকে না দেখলে বুঝা যায় না। আমার জানা মতে দশ বছর বয়সে বিবাহ হওয়ার পর থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এভাবেই পরিশ্রম করেছেন আমার নানী।

সারাটা জীবন নিজের কাজ নিজে করেছেন তিনি। ৮৩ বছর বয়সে জীবনের শেষ দিনে এসেও নিজের কাজ নিজে করে এবং কি নিজের খাবার নিজে রান্নাবান্না করে খেয়েছেন। নানী প্রায় বলতেন যে মৃত্যুর আগে যেন বিছানায় পড়ে থাকতে না হয়, কারো ঘাড়ের বোঝা যাতে হতে না হয়, স্বাভাবিক অবস্থায় যেন মৃত্যু হয়। নানীর এই চাওয়া সত্য হয়েছিল। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কখনোই নানী পরনির্ভরশীল হননি বা অন্যের আশায় মিছেমিছি সুখের স্বপ্ন দেখেননি।

আরো পড়ুন:  আমার বড় ফুপু ছিলেন সাদা সাদা কোকড়ানো চুলের অসীম সাহসী মানুষ

তাছাড়া নানী চরম দয়ালু পরোপকারি ধার্মিক এবং ন্যায় নিষ্ঠাবান ছিলেন। নানী যতই কাজ কর্মে ব্যস্ত থাকুক না কেন, আমি দেখেছি নামাজের সময় ঠিকই নামাজ আদায় করতেন। প্রতি রমজান মাসে এলাকার দরিদ্র ও দরিদ্র আত্মীয় স্বজনদের তিনি রোজা খুলাতেন বা ইফতার করাতেন। সর্বদা সত্য কথা বলতেন। এলাকার দারিদ্র্য পীড়িত ব্যাক্তিদের বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা করতেন। সত্যি বলতে একটা পূর্ণাঙ্গ আদর্শ জীবন বলতে যা বুঝায় নানীর জীবনটা ঠিক তাই।

একটা মানুষের জীবনে যতো প্রকার ভালো গুণের প্রয়োজন তার সকল কিছুই যেন নানীর জীবনে ছিল। এ যেন নিষ্ঠার নিপুণ দক্ষতায় সজ্জিত এক নির্ভুল আদর্শ জীবন। আমার নানীর মতো মানুষের স্নেহ মায়া মমতা এবং আদর্শে বেড়ে উঠতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি, এবং নানীর সব থেকে স্নেহের নাতি হতে পেরে আমি নিজেকে নিয়ে গর্ববোধ করি।

সচরাচর মানুষকে সর্বদা যশ, খ্যাতিমান ব্যক্তি বা বিত্তবানদের পাশে থাকতে বা মিশতে বা মেশার চেষ্টা করতে দেখা যায়। কিন্তু নানী যেন ঠিক তার উল্টো ছিলেন। নানীকে সবসময় দেখেছি দরিদ্র, অসহায় ও দুস্থ ব্যাক্তিদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে ও সাহায্য করতে।

নানী অবসর সময়ে আর্থিক শারীরিক, মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়া পাড়াপ্রতিবেশিদের সাথে গল্প-গুজবের মাধ্যমে অথবা প্রয়োজনে আনুষঙ্গিক সাহায্য সহযোগিতার মাধ্যমে অসহায় মানুষের বিপদের সময় তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এলাকার বয়স্ক ব্যক্তিরা বয়সের ভারে এবং শারীরিক অসুস্থতার কারণে বিছানায় পড়ে থাকলে দিন কি রাত এক করে নানিকে তাদের পাশে গিয়ে থাকতে দেখেছি। বিভিন্ন রকমের খাবার তৈরি করে নিয়ে গিয়ে খাওয়াতে দেখেছি।

শাহেরা খাতুনের চিন্তাধারা হচ্ছে উদারতা আর সহৃদয়তা দিয়ে পূর্ণ। আসলে নানী যে কতোটা উদার মনের মানুষ ছিল তার বাস্তব প্রমাণ আমি ২০১৭ কি ১৮ সালে পাই। সে সময় এক ঈদে আমি নানীকে জিঙ্গাসা করি যে নানী তুমিতো আন্ধাসা (যদিও আন্ধাসা একসময় নানীর খুব প্রিয় খাবার ছিল কিন্তু শেষ বয়সের দিকে নানী আর আন্ধাসা তেমন খেতেন না) এবং দুধের তৈরি খাবার খাওনা তাহলে ঈদে একাই এতা এসব খাবার তৈরি কর কেন? উত্তরে নানী আমাকে বলে যে, “বাপ থাকতেও বাপ হারা জাহানারার ছোট ছোট দুটা মেয়ে আছে, ফারজানার মা আন্ধাসা বানাতে পারে না, ওরা আছে, দোকানদার মুক্তিয়ার আছে, ফকির মিসকিনসহ আরো কত লোক-জন আছে”।

আরো পড়ুন:  দোলন প্রভা বাংলাদেশের কবি, লেখক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও পর্যটক

আসলে একটা মানুষ কতোটা উদার মনের হলে নিজ ছেলে, মেয়ে, নাতি-নাতনি, পোতা-পুতিন বা আত্মীয় স্বজন না থাকলেও এলাকাবাসির বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কথা ভেবে নিজে যে খাবার খায় না সেই খাবারও কতো বিশাল পরিমাণে তৈরি করতে পারে তা আমার নানীকে না দেখলে বুঝার উপায় থাকেনা।

শাহেরা খাতুনের চিন্তাধারা এমনভাবে গঠিত হয়েছে যাতে শিক্ষা একটি প্রধান স্থান দখল করে আছে। তিনি সারা জীবন সব সন্তানকে শিক্ষিত করার চেষ্টা করেছেন। ১৯৯২ সালের ২১ ডিসেম্বর আমার নানা মো. সাবের আলী পরলোকগমন করেন। সে সময় আর্থিক ভাবে কতোটা অসচ্ছল হলে মৃত্যুর আগ মুহূর্তে অসুস্থ অবস্থায় পড়ে থাকাকালিন সময়ে আমার নানা ঝাল (এক প্রকার চাউলের আটা, গুড় ও মসলার তৈরি খাবার) খাওয়ার ইচ্ছা হয়েছে জানালেও আর্থিক ভাবে অসচ্ছতার কারণে খাওয়াতে পারেনি। এমন অবস্থায় একক প্রচেষ্টায় আমার নানী আমার দুই মামাকে মাস্টার্স এবং আমার আম্মুকে এসএসসি পর্যন্ত পড়ালেখা করান।

এছাড়াও পরবর্তী সময়ে আমার নানী আমাকে ও আমার মামাত দুই বোন শিউলি আপু ও শেফালি আপুকে পড়ালেখা করান। শিউলি আপু এই বছর মাস্টার্স পরিক্ষার্থী, আমি অনার্স প্রথম বর্ষ চলমান, এবং শেফালি আপুকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করান। আমাদের এই ছয় ছয়টি মানুষের লেখাপড়ার পেছনে মূল অবদানই আমার নানীর।

নানী এছাড়াও দীর্ঘ ৮৩ বছরের জীবনে বিভিন্ন জনের শিক্ষা ক্ষেত্রে বিভিন্ন ভাবে অবদান রেখেছেন। নানী মৃত্যুর ছয় মাস আগে ‘শিশুডাঙ্গি’তে নিজের নামে এক একর জমিতে একটি উচ্চমাধ্যমিক কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রবল ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ ছোট মামার বাসায় ট্রেনে যাওয়ার পথে পুরোটা পথ নানী আমার সাথে এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। এবং ছোট মামা ও বড় মামার সাথে এ নিয়ে আলোচনা করতে বলেন।

পরবর্তীতে আমাকে সাথে নিয়ে ছোট মামা ও বড় মামার সাথে এ বিষয় নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়, কিন্তু পারিবারিক কিছু সমস্যার কারণে নানীর এই মহত উদ্যেগটি আর সফল হয়ে ঊঠতে পারেনি। এ কারনে নানী অনেকটাই ভেঙ্গে পড়েন এবং আমার সাথে কথা বলার সময় প্রায় এ নিয়ে আপসোস প্রকাশ করতেন। প্রকৃত পক্ষে শিক্ষা ক্ষেত্রে নানী যে প্রবল উদার মনের মানুষ ছিলেন তার শতাধিক ধারণা আমি দিতে পারি। শিক্ষা ক্ষেত্রে নানীর অবদান লিখতে থাকলে তা হয়তো একটা বৃহৎ উপন্যাসে পরিণত হবে তাই বাকি সব আর আজ নাই বা বলি।

Leave a Comment

error: Content is protected !!