শাহেরা খাতুন বাংলা অঞ্চলের স্বভাব ভূমিকন্যা যিনি প্রকৃতির জীবনে মিশে ছিলেন

শাহেরা খাতুন ছিলেন বাংলা অঞ্চলের এমন এক ভূমিকন্যা যিনি প্রকৃতির জীবনের সঙ্গে মিশে ছিলেন একাকার হয়ে। তিনি প্রকৃতির মাঝে থেকে কৃষি কাজ করতে, ফসল ফলাতে ভালোবাসতেন। গ্রামীণ জীবনে নাড়ীর সাথে ভূমির যোগ থাকে, তাঁর ক্ষেত্রে এই যোগ যেন একটু বেশিই ছিল। বাড়ির পাশে ছোট ছোট স্থানে শাক সবজির বাগান করাতে যেমন আগ্রহ ছিল তেমনি ফলের বাগানেও মনোযোগ ছিল। জমির শক্তিতে বা জমির মূল্যকে গুরুত্ব দিলেও জ্ঞানের চেয়ে কোনো কিছুকেই মূল্যবান মনে করেননি। গ্রামে চুরি ডাকাতি হবার ঘটনাকে সাধারণ বিষয় হিসেবে দেখেছেন, তাই এমন সম্পদের মালিক হতে বলতেন, যা কেউ চুরি করতে পারবে না।

তার জন্মের সাল জিগ্যেস করলেই বলতেন পয়তাল্লিশ সনের বন্যার কথা। সেই বন্যার পরে তিনি জন্মেছিলেন। মালদায় ১৯৩৮ সনে বা ১৩৪৫ বঙ্গাব্দে প্রচণ্ড বন্যা হয়। সেই বন্যায়, মালদা সদর থানা, কালিয়াচকের অর্ধেক এবং রতুয়ার কিছু অংশ বন্যা কবলিত হয়ে পড়ে।[১] তাঁদের গ্রামেও সেবার খুব বন্যা হয়। মাঠিয়ারি, বাবলাবোনা বা পাতাড়িডুবা গ্রামগুলো মহানন্দা নদী অববাহিকার অন্তর্গত। এই অঞ্চলে বন্যার প্রকোপ যেমন ছিল, তেমনি ছিল মাছ। আর ছিল শত শত প্রজাতির পাখি, সরীসৃপ ও অন্যান্য প্রাণী।

তার মুখে শোনা গল্পগুলোতে যেমন ছিল প্রচণ্ড গতি, তেমনি তাঁর সাঁতারের গতিও ছিল তীব্র। ৭০ বছর বয়সেও তিনি বলতেন আমার সাথে সাঁতার কেটে কেউ পারবে না। তাঁর কথায় মনে হতো পানিতে বাস করা এক উভচর জলদেবী যেন এইমাত্র উঠে আসলেন, আবার পানিতে নামবেন বলে। আরো অনেক কিছুর মতো পানিতে তাঁর ভয়ডর ছিল না। যদিও শৈশবে পিতামাতা তাঁকে কুমিরের ভয় দেখিয়েছেন।

তিনি নিজ গ্রামে শৈশবে মিঠাপানির কুমির দেখেছেন, মিঠাপানির কুমির শিশুদেরকে নিয়ে যেত, তাও দেখেছেন। নিশ্চিতরূপেই দেখেছেন ঘড়িয়াল, সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে তিনি বাইশাল নামের আরো এক ধরনের কুমির দেখেছেন, সেটার বর্ণনা দিয়েছেন এই বলে যে, বাইশালের মুখ হচ্ছে বাঁকানো। যদিও প্রাণি বিশেষজ্ঞ আলী রেজা খান পর্যন্ত বাইশালের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন, আমি মনে করি বাইশাল সত্যই ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

আরো পড়ুন:  রোকেয়া বেগম ছিলেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক নারীমুক্তি আন্দোলনের নেত্রী

শুধু কুমির বা ঘড়িয়ালে নয়, সমস্ত প্রাণি এবং উদ্ভিদ জগতের প্রতিই তাঁর ভালোবাসা ছিল তীব্র। তাঁকে কখনোই অপ্রয়োজনে শখের বসে কোনো বন্য প্রাণী হত্যা করতে দেখা যায়নি। পাখিদের ভেতরে পছন্দ করতেন শাহ বুলবুলি, তাঁর দীর্ঘ সাদা লেজের কারণে, পূর্ণ এবং অপূর্ণ বয়স্ক পাখিটির রং বদলে ফেলার গুণটিও তাঁকে মোহিত করে থাকবে। এছাড়াও এশীয় শামখোল দেখতে পেলে খুশি হতেন। গগনবেড় হারিয়ে যাবার কারণে সারা জীবন দুঃখ করেছেন।

ছুটিতে গ্রামে বেড়াতে গেলে বন্য পশু পাখির খবরাখবর দিতে চেষ্টা করতেন। কে কোথায় পাখি মারল, কোন বন্য প্রাণীটিকে কষ্ট দিল, এসব আমাকে বলে বিষণ্ণ মন ভাল করার চেষ্টা করতেন। নীল গাই বা কালো তিতিরের গল্প তাঁর মুখ থেকেই প্রথম শুনেছি। বর্ষাকালে বুনো কোনো মুরগি আমাদের গ্রামেও চলে আসে, এমন গল্প তিনি ২০১০ সালের দিকেও আমাকে শুনিয়েছেন।

শাহেরা খাতুন বাংলা দেশের নদীগুলো থেকে মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাবার জন্য খুব দুঃখবোধ প্রকাশ করেছেন। তিনি শোল এবং বোয়াল মাছ রান্না করতে পারতেন সুস্বাদু করে, কিন্তু ২০০০ সালের পরে বাড়ির পাশের গন্দর নদীতে দেশি মাছ পাওয়া যেত না, তাই তার মনে একটা বেদনাবোধ থেকেই গিয়েছিল। দেশি মাছ হারিয়ে গেলেও তিনি বাড়ি থেকে দেশি ফল মূলের গাছ হারাতে দেননি। আদি লাল চালের ভাত বা পান্তা পছন্দ করতেন।

প্রকৃতিকে, ফসলের আদি জাতকে, বিভিন্ন ধরনের বীজকে রক্ষা করতে চেষ্টা করেছেন নিজের মতো করে, কিন্তু আর কোনো নারীকে এসব বিষয়ে আগ্রহী করার তার চেষ্টা খুব একটা চোখে পড়েনি। বীজ বুনতে, ফসলের ক্ষেতে সেচ বা নিড়ানি দিতে হয়ত অন্যকে শিখিয়েছেন, কিন্তু আদি জাতগুলোকে অনেকে মিলে সংরক্ষণের চেষ্টা করেননি। শেষ বয়সে খুব অসুস্থ হয়ে পড়লে কায়িক পরিশ্রম করতে পারতেন না, এটাও একটা প্রতিবন্ধকতা ছিল।

আরো পড়ুন:  উত্তরবাংলার লোকশিল্পী ও পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী শাহেরা খাতুন মারা গেছেন

বাড়িতে গাভীর বিদেশী বাচ্চা পালন করতে দেখেছি নব্বই দশকের শুরুর বছরগুলোতে। পশুপাখি পালন নিয়ে শখ পূরণ করতে দেখেছি। চীনা মুরগি, কবুতর বা কুকুর পালন করতে দেখেছি। কিন্তু কখনোই বিড়াল বা বন্য পাখি পালন করেননি। লুকলুকি, শরীফা বা ডালিম গাছ যেন হারিয়ে না যায়, সেজন্য গাছগুলোকে নিজ বাগানে রক্ষা করেছেন। 

ফসলের ফলন বৃদ্ধিকে যেমন স্বাগত জানিয়েছেন, তেমনি নতুন ফসলের রোগবালাই সমস্যা বুঝে ফেলেছিলেন। ফলে দেশি ফসলের উপরে মনোযোগী ছিলেন। কৃষিক্ষেত্রে উন্নতিকে সদর্থক হিসেবে নিলেও দেশি জাতের বীজের বিলুপ্তির ব্যাপারে উদ্বিগ্ন ছিলেন।

জীবনের পাঠ থেকে প্রধান শিক্ষাগুলো গ্রহণ করেছিলেন। হাতে কলমে পরীক্ষা করার চেষ্টা করেছেন এবং ভুল পদক্ষেপকে পরিহার করতে চেষ্টা করেছেন। বারবার বলতেন, অসুখ যেমন আছে তেমনি অসুখের ওষুধ আছে। এই ওষুধ শব্দটি দিয়ে তিনি ফার্মেসির দোকানে গিয়ে ওষুধ কিনে সেই ওষুধ খেয়ে আরোগ্য লাভের সরলীকরণকে তিনি বোঝাতেন না। ওষুধ বলতে ওষুধের চেয়ে পথ্যকে অধিক গুরুত্ব দিতেন, আবার পথ্যের চেয়ে খাবার খেয়ে অসুখ সারিয়ে তোলায় বেশি গুরুত্ব দিতেন। তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিতেন বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার খেতে।

ঔষধি গাছ সম্বন্ধে সাধারণ জ্ঞান রাখতেন। গাছ গাছড়া, শাক সবজি ফল মূলের উপকারিতা সম্বন্ধে জানতেন। খাদ্য বলতে মজাদার মুখরোচক খাবারের উপরে গুরুত্ব দেননি। একসময় প্রচণ্ড পান খাওয়ার অভ্যাস ছিল, উচ্চ রক্তচাপের পর পান আর জর্দা খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন; তাঁর কাছে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা অনেক বড় ছিল সামান্য পানের নেশার থেকে। 

গ্রামের জীবন আর শহরের জীবনের মধ্যে থাকা অনেক পার্থক্যকে তিনি সহজেই বুঝেছিলেন। তিনি দেখেছেন গ্রামে তাজা জীবন আছে, সতেজ বাতাস আছে। আমি দেখেছি তিনি দেশি ছোট পাকা টমেটোটা তুলে সেখানেই মুখে চালান করে দিলেন। পেয়ারা গাছের পেয়ারা গাছ থেকে পেড়েই খেয়ে নিচ্ছেন। কৃত্রিম পলিথিনে মোড়ানো বিষখাবারের প্রতি তাঁর কোনো আগ্রহ দেখিনি। খাদ্য নিজ হাতে তৈরি করতে চাইতেন, বিস্কুট নামক কারখানায় বানানো ফালতু খাবারের চেয়ে নিজ হাতে বানানো ভাজা রুটিটা অনেক স্বাদ নিয়ে খেয়েছেন।

আরো পড়ুন:  আমার বড় খালা যেমন সবার বড়, তেমনি সবার কাছে বড়র মতোই শ্রদ্ধা পেতেন

প্রতিদিন গ্রামবাসীরা একজন আরেকজনের সাথে কথা বলে, সময়কে ভাগাভাগি করে কাজে লাগায়। গ্রামে সবকিছুই প্রাকৃতিক। তবে শহরের জীবন অন্যরকম। নাগরিক জীবনের চটকদার উন্নয়ন দেখে তিনি সার্টিফিকেটধারীদের মতো বিভ্রান্ত হননি। কংক্রিট দিয়ে বানানো এপার্টমেন্ট নামক কুঠুরি, যেখানে কোনো প্রাণ নেই, সেরকম ঘর তার কাছে কবর মনে হয়েছে, তাই তিনি এক দুই মাসের ভেতরেই শহরে হাঁপিয়ে উঠতেন।

শাহেরা খাতুন বাংলা অঞ্চলের গ্রামের জীবনকে বেছে নিয়েছিলেন, নিজ গ্রামের সাথে সংযুক্ত থেকেছিলেন। গ্রামের নারীরা প্রকৃতির সাথে বেশি সংযুক্ত থাকে, তিনি সেই সংযোগকে কখনো কেটে ফেলেননি। তিনি শহরের জীবনকে অপছন্দ করেছেন শহরের কৃত্রিমতার কারণে। প্রাণোচ্ছল প্রকৃতির জীবনকে গ্রহণ করেছিলেন নাগরিক রোবোটিক জীবনের পরিবর্তে। প্রকৃতির জীবনে যে আনন্দ ছিল সেই আনন্দকে তাঁর সমগ্র জীবন সঙ্গীতের মাধ্যমে চর্চা করেছেন আমার এই গীতেশ্বরী মাতা।

তথ্যসূত্র

১. মহেশ্বর ভট্টাচার্য, “স্বাধীনতা সংগ্রামে মালদা”, চন্দন কান্তি চৌধুরী সম্পাদিত, উত্তরবঙ্গের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জীবনালেখ্য, ক্ষুদিরাম স্মৃতিরক্ষা কমিটি, কোচবিহার, পশ্চিমবঙ্গ, পৃষ্ঠা ২৩৪।

Leave a Comment

error: Content is protected !!