দুকড়িবালা দেবী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রথম সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত নারী বিপ্লবী

দুকড়িবালা দেবী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্নিকন্যা। রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয় নিজের বোনপোর মাধ্যমে। তিনি রাজনৈতিক বই, অস্ত্র ইত্যাদি লুকিয়ে রাখতেন। এছাড়াও বিপ্লবীদের আশ্রয়ও দিতেন। ১৯১৭ সালে বিপ্লবীদের পিস্তল লুকিয়ে রাখার জন্য কারাবরণ করেন। তিনি অস্ত্র আইনে দন্ডিতা প্রথম সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত নারী বিপ্লবী।[১]

দুকড়িবালা দেবী-র জন্ম ও পরিচয়:

১৮৮৭ সালে ((জন্ম: বাংলা ১২৯৪, ৬ শ্রাবণ, ২১ জুলাই) ) দুকড়িবালা দেবী জন্মগ্রহণ করেন বীরভূম জেলায় নলহাটি থানার ঝাউপাড়া গ্রামে। পিতা নীলমণি চট্টোপাধ্যায় এবং মা কমলকামিনী দেবী। স্বামী ছিলেন ঝাউপাড়া গ্রামেরই ফণীভূষণ চক্রবর্তী।

মাসিমা নামে তিনি বিপ্লবী মহলে পরিচিতি। তিনি ছিলেন বাংলার প্রথম পর্যায়ের মহিলা বিপ্লবীদের মধ্যে অন্যতম। ব্রিটিশ দ্বারা যেসব বিপ্লবী মহিলা সাজা পান তাদের মধ্যে তিনিই  প্রথম সশ্রম কারাদণ্ড প্রাপ্ত।

বিপ্লবীদের সাথে সাক্ষাৎ:

দুকড়িবালার বোনপোর নাম ছিলও নিবারণ ঘটক। তিনি ছিলেন মাইনিং ক্লাসের ছাত্র। মাসিমা দুকড়িবালা নিবারণ ঘটককে খুব স্নেহ করতেন। বোনপো প্রায়ই তার বাড়িতে বন্ধুবান্ধব নিয়ে আসতেন।

স্বদেশী বই, বে-আইনী বই লুকিয়ে পড়বার আড্ডা ছিল মাসিমার বাড়ি। দুকড়িবালা দেবীর কেমন সন্দেহ হতো। তিনি সকলের আড়ালে বইগুলি দেখেন এবং পরে বোনপোকে ধমক দেন।

একদিন তাঁর বাড়িতে মাস্টারমশাই নাম নিয়ে এলেন অধ্যাপক জ্যোতিষ ঘোষ। সিয়ারসোল রাজস্টেটে রণেনবাবু নাম নিয়ে এলেন ফেরারী বিপিন গাঙ্গুলী।

রাজবাড়ির কর্মচারীরূপে বিপিনবাবু লাঠি, ছোরা খেলা ও মুষ্টিযুদ্ধ শিক্ষার শিক্ষক হয়ে আত্মগোপন করে আছেন। এঁদের আত্মবিশ্বাস ও সাহস দেখে দুকড়িবালা দেবী মুগ্ধ হয়ে যান, বিস্মিত হয়ে যান। তাঁর মনে এঁদের প্রতি সহানুভূতি ও শ্রদ্ধা জেগে ওঠে। ধীরে ধীরে একটা পরিবর্তন দেখা দিল তার মনে।

বোনপো নিবারণের বিবাহ নিয়ে তুমুল তর্ক বাধল মাসি-বোনপোর মধ্যে। শর্ত ছিল তর্কে যে হারবে সে বিজয়ীর পথ ও মত গ্রহণ করবে। তর্কে হেরে গেলেন। বললেন, “এ বার আমায় দলে নিয়ে নাও।” বোনপো নিবারণ বলেন, “তুমি কি এপথে আসতে পারবে মাসিমা ? এমন বিপদের মুখে পা বাড়াতে নাই-বা এলে?” সিংহী গর্জে উঠে বললেন, “তুমি যদি দেশের জন্য প্রাণ দিতে পার, তোমার মাও পারে।”

আরো পড়ুন:  রাসবিহারী বসু ছিলেন আধুনিক বর্বর ব্রিটিশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এক ভারতীয় বিপ্লবী

রাজনৈতিক কাজে যুক্ততা:

একদিন বোনপো নিবারণ সাতটা মসার (Mauser) পিস্তল এনে লুকিয়ে রাখতে দিলেন মাসিমা দুকড়িবালা দেবীকে। এগুলি ছিল রডা কোম্পানি থেকে চুরি করে আনা মাল। এই চুরির কাহিনী অভিনব।

১৯১৪ সালের ২৬ অগাস্ট রডা কোম্পানির জেটি সরকার শ্রীশ্রী মিত্র বড়সাহেবের হুকুম মতো মাল খালাস করতে জাহাজ ঘাটে যান। তিনি ২০২টি অস্ত্রপূর্ণ বাক্স খালাস করে সাতটি গরুর গাড়ি বোঝাই করে নিয়ে আসতে থাকেন।

ছ’খানা গাড়ি তিনি রডা কোম্পানির গুদামে পৌঁছে দেন। একটি গাড়ির গাড়োয়ান ছদ্মবেশী বিপ্লবী হরিদাস দত্ত গাড়িটাকে নিয়ে উধাও হন। সেই গাড়িতে ৯টি বাক্সে ছিল কার্ট্রিজ এবং একটিতে ৫০টি মসার পিস্তল। মালগুলি পরে বিপ্লবীদের বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রেরিত হয়।

১৯১৭ সালের জানুয়ারি মাসে ১ তারিখে পুলিস দুকড়িবালা দেবীর বাড়ি ঘিরে ফেলে। তল্লাশীতে পাওয়া যায় সাতটা মসার পিস্তল। শত জেরাতেও মাসিমার মুখ থেকে বের করতে পারল না যে, কে দিয়েছে তাকে পিস্তলগুলি। গ্রামের মেয়ে গ্রামের বৌ দুকড়িবালা দেবী কোলের শিশু বাড়িতে রেখে চলে গেলেন পুলিসের সঙ্গে।

দুকড়িবালা দেবী-এর জেল জীবন:

স্পেশাল ট্রাইবুনালের বিচারের রায়ে দুকড়িবালা দেবীর সাজা হয় দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। নিবারণ ঘটকও রেহাই পান নি। তার জন্য কারাবাসের আদেশ হয় পাঁচ বছর। ৯/৩/১৯১৭ দুকড়িবালা দেবীই পরাধীন ভারতে অস্ত্র আইনে দন্ডিতা প্রথম মহিলা।

দুকড়িবালা দেবীর কারাবাসের করুণ কাহিনী ননীবালা দেবীর জীবনীতে আগেই লেখা হয়েছে। বন্দীজীবনের অসহ্য পরিবেশের মধ্যে থেকেও, প্রতিদিন আধ মণ ডাল ভাঙতে থাকা সত্ত্বেও তিনি তার বাবাকে চিঠি লিখলেন, ‘তিনি ভালোই আছেন, তাঁর জন্য যেন তারা চিন্তা না করেন, শুধু বাচ্চাদের যেন তারা দেখেন, শিশুরা যেন না কাঁদে’। এমনই ছিলেন তখনকার দিনের অগ্রগামী নারী-সৈনিকরা। মুক্তি পেয়েছিলেন তিনি ১৯১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে।[২]

মৃত্যু:

২৮ এপ্রিল ১৯৭০ (১৪ বৈশাখ ১৩৭৭ বাংলা) সালে তার মৃত্যু হয়।[৩]

আরো পড়ুন:  আলতাব আলী ছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতিক ও শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের নেতা

তথ্যসূত্র:

১. দোলন প্রভা, ১৮ জুন, ২০১৮ , “দুকড়িবালা দেবী উপনিবেশবাদ বিরোধী বাংলার বিপ্লবী”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএলঃ https://www.roddure.com/biography/dukoribala-debi/

২. কমলা দাশগুপ্ত (জানুয়ারি ২০১৫)। স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী, অগ্নিযুগ গ্রন্থমালা ৯। কলকাতা: র‍্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন। পৃষ্ঠা  ৬১-৬২। আইএসবিএন 978-81-85459-82-0।

৩. প্রথম খন্ড, সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত (২০০২)। সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান। কলকাতা: সাহিত্য সংসদ। পৃষ্ঠা ২০৯। আইএসবিএন 81-85626-65-0।  

Leave a Comment

error: Content is protected !!