চারুশীলা দেবী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী

চারুশীলা দেবী ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিযুগের নারী বিপ্লবী। তিনি ক্ষুদিরামের সাথে রাজনৈতিক কাজ করেছিলেন। এছাড়াও তিনি লবণ আইন অমান্য, সত্যাগ্রহ আন্দোলন সহ বিপ্লবীদের জন্য কাজ করেছিলেন। এজন্য জেল খাটতে হয়েছিল কয়েকবার।[১]

জন্ম ও বৈবাহিক জীবন:

চারুশীলা দেবী ১৮৮৩ সালে মেদিনীপুরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।  তিনি মেদিনীপুর স্থানীয় ছিলেন। পিতার নাম রাখালচন্দ্র অধিকারী, মা কুমুদিনী দেবী। চারুশীলা দেবী ছিলেন ভূদেব মুখখাপাধ্যায়ের প্রথম ছাত্রী। শিশু বয়স থেকেই তিনি ছিলেন পাঠপ্রিয় এবং স্বাতন্ত্র্যপ্রিয়। বারোবছর বয়সে তার বিবাহ হয়েছিলে মেদিনীপুরের বীরেন্দ্রকুমার গোস্বামীর সঙ্গে।

ক্ষুদিরামের সাথে পরিচয়:

শৈশবে পিতৃ মাতৃহীন অগ্নিশিশু ক্ষুদিরাম থাকতেন মেদিনীপুর শহরের উপকণ্ঠে হবিবপুরে তার দিদির কাছে। তিনি প্রায়ই চারুশীলা দেবীর বাড়িতে আসতেন। তাকে ক্ষুদিরাম এতো ভালোবাসতেন যে, মাঝে মাঝে দিদির বাড়ি থেকে চলে এসে তার কাছে থাকতেন।

ক্ষুদিরাম ছিলেন চারুশীলা দেবী অপেক্ষা কয়েক বছরের ছোট। ক্ষুদিরাম জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর ১৯০৫ সালে ক্ষুদিরাম বিপ্লবীদলে যোগদান করেন। চারুশীলা দেবীকেও একদিন ক্ষুদিরাম রক্ততিলক পরিয়ে স্বদেশীর প্রতিজ্ঞা করিয়ে নেন।

এই প্রতিজ্ঞার পর ১৯০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একদিন মেদিনীপুরের পুরানোকেল্লার এক প্রদর্শনীর দরজার মুখে দাঁড়িয়ে ক্ষুদিরাম বন্দে মাতরম  নামে একটি পুস্তিকা বিলি করছিলেন। পুলিস ক্ষুদিরামের হাতে পুস্তিকা দেখে সেগুলি কেড়ে নিতেই ক্ষুদিরাম পুলিসকে মেরে বসলেন। ফলে তিনি গ্রেপ্তার হন।

 ক্ষুদিরামের কাজে সহযোগিতা:

মেদিনীপুরে বিপ্লবীদের প্রধান সমর্থক ও সাহায্যদানকারী রাজা নরেন্দ্রলাল খান অকাতরে টাকা দিয়ে এই মামলা পরিচালনা করান। অবশেষে ক্ষুদিরাম মুক্তি পেলেন। তারপর ১৯০৮ সালে মজঃফরপুরে ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যা করতে যাওয়ার আগে ক্ষুদিরাম চারুশীলা দেবীর বাড়িতে কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন। ক্ষুদিরামের মামলার সময় পুলিস চারুশীলা দেবীর খোঁজ করতে থাকে। তিনি তখন আত্মগোপন করে রইলেন। এরই কয়েকবছর পর তিনি বিধবা হন।

চারুশীলা দেবী-এর রাজনৈতিক কাজ:

১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় মহাত্মা গান্ধী,  দেশবন্ধু প্রভৃতি মেদিনীপুরে যান। ঐ সময় তাদের প্রেরণায় মেদিনীপুরে নারী জাগরণ দেখা দেয়। চারুশীলা দেবীও একটি মহিলা সমিতি গঠন করেন। ১৯২২ সালে তিনি কলিকাতায় ট্রেনিং পড়তে আসেন। তারপর মেদিনীপুরে ফিরে গিয়ে পুনরায় মহিলাদের মধ্যে গঠনমূলক কাজ করতে থাকেন।

লবণ আইন অমান্যের সময় কাজ:

১৯৩০ সালে লবণ আইন অমান্যের সময় তিনি আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েন।  নরঘাটে (তমলুক) যে সভায় চারুশীলা দেবী বক্তা ছিলেন সেখানে সোমঙ্করী দেবী, জিতেন্দ্রনাথ মিত্র, প্রভাত কুমার গাঙ্গুলী, ভগবতীচরণ সোম, লালমোহন মিত্র, অক্ষয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মকসুদ হোসেন প্রমুখ কংগ্রেসের নেতৃবর্গ উপস্থিত থেকে লবণ আইন অমান্য করার ক্ষেত্রে জনগণের উৎসাহ বর্ধন করেন। বঙ্গীয় আইন অমান্য পরিষদের পক্ষ থেকে তমলুকে এসেছিলেন ললিত মোহন সিংহ ও বিনোদ বিহারী দাশগুপ্ত। এঁরা জনপ্রিয়তার কারণে সকলের কাছে ‘দাদা’ নামে পরিচিত হন।

আরো পড়ুন:  ননীবালা দেবী ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লবী ও প্রথম মহিলা রাজবন্দি

এই মিটিং ভেঙে দেবার জন্য মেদিনীপুরের ম্যাজিস্ট্রেট পেডি সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী নিয়ে উপস্থিত হন। পেডি আদেশ দিলেন, ‘১৪৪ ধারা জারী আছে, মিটিং করা যাবে না’। জ্যোতির্ময়ী দেবী পুলিসের বাধা অগ্রাহ্য করে জনতাকে আহ্বান করে বললেন, ‘যারা বুকের রক্ত দিতে প্রস্তুত আছেন তারা এই সভায় এগিয়ে আসুন, যাঁরা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবেন তারা ফিরে যান’।

এই আহ্বান শুনে সাবিত্রী নামে তমলুকের এক সালঙ্কারা পরমাসুন্দরী ষোড়শী পতিতা নারী এসে বললেন, ‘আমরা বুকের রক্ত দেব, কিন্তু পৃষ্ঠপ্রদর্শন করব না’। তার পশ্চাতে প্রায় আটশত গ্রাম্য মেয়ে ও বউ কোলে-পিঠে সন্তান নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন যে, তাঁরাও এই সভা রক্ষা করবার জন্য জীবন বিসর্জন করবেন। তারা পুরুষদের ঘিরে দাঁড়িয়ে রইলেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যে সভা সাঙ্গ করে তারা সকলে মিলে লবণ-তৈরির ক্ষেত্রের দিকে অগ্রসর হন। সশস্ত্র পুলিস-বাহিনী এই সময় জনতার উপর লাঠিচার্জ করে।

একটি দশবছরের বালকের চোখে ম্যাজিস্ট্রেট পেডি নিজেই আঘাত হেনে রক্তাক্ত করে ফেলেন। তৎক্ষণাৎ ঐ পতিতা নারী সাবিত্রী ছুটে এসে নিজের পরনের খদ্দরের শাড়ি ছিড়ে তার চোখ বেঁধে কোলে নিয়ে বসলেন। এ দৃশ্য সেদিন মেদিনীপুরের জনসাধারণকে বিস্মিত ও বিচলিত করে তুলেছিল। পেডি সেদিন প্রায় একঘণ্টা লাঠিচার্জের হুকুম জারী রেখেছিলেন। এসব দেখে এই সময় তিনি অলিগঞ্জ বালিকা বিদ্যালয়ে অন্যতম শিক্ষিকার পদ পরিত্যাগ করে আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েন।

পরের দিন জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলী ও চারুশীলা দেবীরা কঁথি, কালীনগর ইত্যাদি স্থানে গিয়ে পুনরায় সভার আযোজন করেন এবং জনসাধারণকে আইন অমান্য আন্দোলনে যোগদান করতে আহ্বান করেন। যা বে-আইনী লবণ তৈরি করার অপরাধে কর্মী ঝড়েশ্বর মাঝির কারাদণ্ড হয়।

তার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে চারুশীলা দেবী, জ্যোতির্ময়ী দেবী জানতে পারলেন যে, তাদের প্রায় আটশত মণ ধান পুলিস মাঠের মধ্যে ফেলে পুড়িয়ে দিয়েছে। কিছু ধান পুকুরে ফেলেছে। স্বয়ংসম্পূর্ণ এই আদর্শ কৃষক পরিবারের সমস্ত কৃষিজাত সম্পদ ও কৃষির বাগান পুলিস নষ্ট করে দিয়েছে। চরকা, তৈজসপত্র, গৃহদেবতা সবই তারা ধ্বংস করে গেছে।  

আরো পড়ুন:  ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরী ছিলেন যুগান্তর দলের বিপ্লবী

তারা আরো দেখলেন যে, ঝাড়েশ্বর মাঝির মা দুই টুকরো বস্ত্র খণ্ডে কোনো রকমে লজ্জা নিবারণ করে আছেন। ছেলে দুটি কৌপীন পরেছেন। চারুশীলা দেবী ও জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলীকে বৃদ্ধা বীর নারী বললেন

‘আমার আটশত মণ ধান নষ্ট করেছে ; আবার ষোলোশত মণ ধান হবে। আমার কিছু ক্ষতি হয় নি। আবার আমি সভা করব। একটা ছেলেকে গ্রেপ্তার করেছে, এখনো দুটো ছেলে মা বলে ডাকে। লবণ আইন অমান্য আমি তো করব’।

এই অনমনীয় নারীর উক্তিতে সেদিন মেদিনীপুরের পল্লীগ্রামের নারীদের সাহসের ছবি ফুটে ওঠে চারুশীলা দেবী, জ্যোতির্ময়ী দেবীর চোখে। তারা বে-আইনী সভা আহ্বান করতে করতে অগ্রসর হন।

সত্যাগ্রহীদের জন্য অর্থ সংগ্রহ:

চন্দ্রাকরে গিয়ে চারুশীলা দেবী এরূপ একটি সভায় বক্তৃতা করবার সময় লাঠিচার্জ হয়। নরঘাটের মতোই এবারেও মেদিনীপুরের দুঃসাহসী নারীরা নেত্রীদের আহ্বানে লাঠিচার্জকে অগ্রাহ্য করে সভা অনুষ্ঠিত করেন। চারুশীলা দেবীর নামে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা বের হয়। তিনি পলাতক অবস্থায় খড়পুরে এসে শ্রমিক ইউনিয়নের এক সভা আহ্বান করেন, সত্যাগ্রহীদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে। সেখানে হাজার হাজার লোকের জনতাকে উত্তেজিত দেখে পুলিস তাকে গ্রেপ্তার করতে সাহস পায় নি।

ঐ সংগৃহীত টাকা নিয়ে তিনি কাঁশি রওনা হন। যে বাসে তিনি ওঠেন সেই বাসে এবং সঙ্গের আরো কয়েকটা বাসে ছিল শুধু পুলিস। চারুশীলা দেবী সংগৃহীত পাঁচশত টাকা ও গহনা নিয়ে ড্রাইভারের পাশে বসে ছিলেন অসীম দুঃসাহসে। রাত প্রায় দুইটায় কাঁথি পৌছে তিনি সেই অর্থ ও গহনা নেতা অন্নদা চৌধুরীর হাতে তুলে দিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।

চারুশীলা দেবী-এর কারাবরণ:

৭ আগস্ট একটা বে-আইনী শোভাযাত্রা পরিচালনা করার সময় মেদিনীপুর শহরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর প্রতি ছয় মাস কারাদণ্ডের আদেশ হয়। মেদিনীপুর জেলের ভিতরে গিয়ে বিধবাদের নিজ হাতে রান্নার অধিকারের জন্য তিনি অনশন করেন। কর্তৃপক্ষ অবশেষে তার দাবি মেনে নিতে বাধ্য হন।

১৯৩১ সালের শেষে তাকে একমাসের জন্য জেলে রাজবন্দী হিসাবে আটক রাখা হয়। মুক্তি পেয়ে তিনি ১৯৩২ সালের আইন অমান্য আন্দোলনে যোগদান করেন এবং দেড়বছরের কারাদণ্ড লাভ করেন। এবারে বাইরে আসার পর তিনি পাবনা যান। সেখানে এক সভায় রাজদ্রোহমূলক বক্তৃতা দেওয়াতে ১৯৩৩ সালে তার পুনরায় একমাসের কারাদণ্ড হয়। কারাভোগের পর ফিরে এলেন তিনি মেদিনীপুরে।

আরো পড়ুন:  বীণা দাস ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপ্লবী ও লেখিকা

বাড়ি বাজেয়াপ্ত:

চারুশীলা দেবীর পুত্র ভবানী প্রদাস গোস্বামী বিপ্লবী দলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। ১৯৩০ সালে তিনি ও তার অন্যান্য বিপ্লবী সহযোদ্ধারা প্রকাশ্য আন্দোলনে যোগদান করেন। এখানে পুলিশের একটি গোপন নথির কিছু অংশ তুলে ধরা হলও ‘The Bengal terrorists took an active part in the civil disobedience movementin 1930 and many of them were imprisoned for picketing’. তাই ১৯৩০ সালে মেদিনীপুরে বিপ্লবীদের কার্যকলাপের ফলে চারুশীলা দেবীর বাড়ি তিন মাসের জন্য বাজেয়াপ্ত করা হয়। বাজেয়াপ্ত থাকাকালে তার বাড়ীর জিনিসপত্র, গহনা ও কাপড়চোপড় ইত্যাদি প্রায় সত্তর হাজার টাকা মূল্যের জিনিস চুরি যায়।

১৯৩৩ সালেই মেদিনীপুরের ম্যাজিস্ট্রেট বার্জকে বিপ্লবীরা হত্যা করেন। তখন চারুশীলা দেবীকে মেদিনীপুর জেলা থেকে বহিষ্কারের আদেশ দেওয়া হয় আট বছরের জন্য। তিনি পুরী চলে যান। ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট কর্তৃক পিউনিটিভ পুলিসের ট্যাক্স আদায় করবার জন্য তার বাড়ি ও জমি নিলাম হয়ে যায়।

পরে গভর্নমেন্টের পক্ষ থেকে ওই আট বছরের বহিষ্কারের আদেশ প্রত্যাহার করা হয় এবং তিনি ১৯৩৮ সালে কলিকাতায় চলে আসেন।

গৃহহারা, বাস্তুহারা ও কপর্দকশূন্য অবস্থায় তিনি কলিকাতায় রাস্তায় সাতদিন ঘুরে বেড়ান। তখন কলিকাতা কর্পোরেশনের এডুকেশন অফিসার শৈলেন ঘোষ তাকে কর্পোরেশনের শিক্ষয়িত্রীর কাজ গ্রহণ করতে অনুরোধ করেন। বৃদ্ধবয়স পর্যন্ত তিনি এই শিক্ষয়িত্রীর কাজে নিযুক্ত ছিলেন। তাঁর অনমনীয় দৃঢ়তা কোথাও তাঁকে মাথা নত করতে শেখায় নি।[২]

তথ্যসূত্র:

১. দোলন প্রভা,২ জুন, ২০২০ , “চারুশীলা দেবী ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবী নেত্রী”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএলঃ https://www.roddure.com/biography/carushila-debi/

২. কমলা দাশগুপ্ত (জানুয়ারি ২০১৫)। স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী, অগ্নিযুগ গ্রন্থমালা ৯। কলকাতা: র‍্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন। পৃষ্ঠা ৮১-৮৪। আইএসবিএন 978-81-85459-82-0

Leave a Comment

You cannot copy content of this page