বনলতা দাশগুপ্ত ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের তরুণ বিপ্লবী

বনলতা দাশগুপ্ত অভিভক্ত বাংলার ঢাকার বিক্রমপুরে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকে হাঁপানির রোগী ছিলেন। ব্যায়ামের মাধ্যমে সুস্থ ছিলেন। এরপরে অল্প বয়সেই বিপ্লবী কাজে যুক্ত হন। ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে কাজ গড়ে তুলেছিলেন। জেলে জীবনের নানা অনিয়ম ও নির্যাতনের ফলে অসুস্থ হয়ে যান। অবশেষে অসুস্থতা থেকে আর আরোগ্য লাভ করতে পারেন নি।

শৈশব জীবন ও পরিবার

বনলতা দাশগুপ্ত (নীনা) ১৯১৫ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের মধ্যে বিদগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পিতৃভূমি তার সেখানেই। তার পিতা হেমচন্দ্র দাশগুপ্ত ও মাতা নির্মলাসুন্দরী দাশগুপ্ত। পিতা সরকারি চাকুরিতে নিযুক্ত থাকা সত্ত্বেও স্বাধীনতা-আন্দোলনের প্রতি তিনি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, এমন-কি বেনামীতে কংগ্রেসকে অনেক সময় অর্থ সাহায্যও করতেন।

বাড়ীর ভাই-ভগ্নীদের সকলকেই লেখাপড়া করতে দেখে, ছোটবেলা থেকে বনলতা লেখাপড়ায় মনোযোগী হন। ভবিষ্যৎ জীবনে তিনি ভালো ছাত্রী হয়েছিলেন। নিষ্ঠা ও নিয়মানুবর্তিতা তাঁর একটি বৈশিষ্ট্য ছিল।

ছোটবেলায় তিনি হাঁপানি রোগে আক্রান্ত। হন। বহু চিকিৎসায়ও তা আরোগ্য হয় নি। তার ১১-১২ বছর বয়সের সময় নাইডু নামে শরীরচর্চাবিদ তাকে হাঁপানির প্রতিষেধক হিসাবে ব্যয়ামের একটি বিশেষ প্রণালী শিখিয়ে দেন। পরিবারের অন্যান্য ছেলেমেয়েরাও নাইডুর কাছে শিক্ষালাভ করেছিলেন। অল্পদিনের মধ্যেই সকলে ব্যয়াম করা বন্ধ করেন। কিন্তু বনলতা সে-অভ্যাসটি পরম নিষ্ঠার সঙ্গে বজায় রাখেন। পরবর্তী জীবনে তার আর হাঁপানি রোগ ছিল না এবং ব্যয়ামের দ্বারা তিনি একটি সুগঠিত স্বাস্থ্যপূর্ণ দেহ গড়ে তুলেছিলেন। নুতন কিছু করবার ও শিখবার দিকে তার প্রবল আকর্ষণ ছিল। একটু বড় হবার পর তিনি সাইকেল ও মোটর চালাতে শিখেছিলেন। এমনকি উড়োজাহাজ-চালনা শিক্ষাও আরম্ভ করেছিলেন।

বনলতা দাশগুপ্ত-এর শিক্ষাজীবন

বনলতা ডায়োসেসান স্কুল ও কলেজের ছাত্রী ছিলেন। স্কুলে থাকতে তিনি সপ্তাহে একদিন জর্জেট পরবার নিয়ম মানতেন না এবং সকল ছাত্রীকেই বিলিতি বস্ত্র ব্যবহার করতে নিষেধ করতেন। তিনি যখন কলেজে পড়তেন তখন ১৯৩৩ সালে বেঙ্গল ফ্লাইং ক্লাব থেকে একটি স্মার্ট বাঙালী মেয়ে চেয়েছিল। বনলতাকে উপযুক্ত মেয়ে মনে করে কল্যাণী দাস তাকে এইখানে এরোপ্লেন-চালনা শিক্ষার বন্দোবস্ত করে দেন।

আরো পড়ুন:  মুজফফর আহমদ ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সুবিধাবাদী নেতা

রাজনীতির সাথে যুক্ততা

তাদের পরিবারের সঙ্গে মেডিকেল কলেজের কয়েকটি ছাত্রের পরিচয় ঘটে। তারা একটি ছোট বিপ্লবীদলের সদস্য ছিলেন। জীবন-বিস্তারের ও জীবন বিকাশের সর্বাপেক্ষা প্রধান অন্তরায় ছিল দেশের পরাধীনতা। সেইজন্য যখন বিপ্লবের ডাক এসে ঐ গৃহের ছেলেমেয়েদের কাছে পৌঁছাল, তারা সাড়া দিয়ে উঠলেন। তাদের মনে হল ঐ ডাকের জন্যই যেন তারা অপেক্ষা করে ছিলেন। বিপ্লব দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে অগ্রগতির পথ উন্মুক্ত করবে, এই কথা তারা সহজ দৃঢ়তায় বিশ্বাস করে নিলেন। বিপদকে সঙ্গীরূপে গ্রহণ করে জীবনযাপনে একটা তীব্র আনন্দ আছে। বিপদের পথে মানুষকে ডেকে নেওয়াও কম আনন্দের নয়। জীবনদানের প্রতিজ্ঞা নিয়েই প্রবলভাবে বাঁচবার পথ বাড়ির ছেলেমেয়েরা বেছে নিলেন। এই জীবনের আদর্শ ও কর্ম তার দিদি চারু দাশগুপ্তের নিকট থেকে বনলতাও গ্রহণ করেন।

১৯৩০ সালের শেষের দিকে দলের নেতৃস্থানীয় কয়েকজনের গ্রেপ্তার হয়ে যাবার পর নানা কারণে দলটি ভেঙে যায়। গভীর চিন্তা ও আত্মসমালোচনার পর দলের কয়েকজন কর্মী সমাজতন্ত্রবাদের আদর্শ গ্রহণ করেন। মেয়েদের মধ্যে এই আদর্শ প্রচার করবার পুরোভাগে যাঁরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে বনলতা ছিলেন অন্যতম।

গ্রেফতারের ঘটনা

১৯৩৩ সালে একটি ঘটনা ঘটে যায় যাতে বনলতা দাশগুপ্ত গ্রেপ্তার হন। এই সময় কয়েকটি পিস্তল রাখার দায়িত্ব তিনি গ্রহণ করেন। সেগুলি তিনি ডায়োসেসান কলেজে তার এক সহপাঠী ও বন্ধু জ্যোতিকণা দত্তর কাছে রেখে দেন। তারা যখন তৃতীয় বার্ষিক শ্রেণীর ছাত্রী। জ্যোতিকণা বিপ্লবীদলের সদস্য ছিলেন না কিন্তু বৈপ্লবিক কাজে তার সহানুভূতি ছিল বলেই পিস্তলগুলি রাখতে তিনি সম্মত হয়েছিলেন। জ্যোতিকণা দত্ত ডায়োসেসান কলেজের বোর্ডিং-এ থাকতেন। হঠাৎ বোর্ডিং-এ টাকা চুরি যাবার ব্যাপারে সমস্ত মেয়েদের বাক্স ও বিছানা তল্লাসী করা হয়। তখন পিস্তলগুলি ঐ কলেজের কর্তৃপক্ষ দেখতে পায়। তারা পুলিসে খবর দেন।

পুলিস এসে জ্যোতিকণাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। বনলতাকেও পুলিস পরদিন গ্রেপ্তার করে। পুলিস বনলতা দাশগুপ্তের বাড়ি তল্লাসীর সময় তার নামীয় মোটরলাইসেন্স এবং এরোপ্লেন-চালনা-শিক্ষা সংক্রান্ত কাগজপত্র হস্তগত করে। গ্রেপ্তারের পর বহু চেষ্টা করেও তার কাছ থেকে পুলিস কোনো কথা আদায় করতে পারে নাই।

আরো পড়ুন:  শান্তি ঘোষ ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী, সমাজসেবক

বে-আইনী পিস্তল রাখার অভিযোগে জ্যোতিকণার প্রতি আদালত কর্তৃক চার বৎসর সশ্রম কারাদন্ডের আদেশ হয়। বনলতার বিরুদ্ধে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ না থাকাতে তাকে মামলায় জড়াতে পারে নাই। কিন্তু বিনা বিচারে বন্দী করে ডেটিনিউ রূপে হিজলী ও প্রেসিডেন্সি জেলে আটকে রেখে দেয় তাকে তিন বছরেরও অধিক সময়।

বনলতা দাশগুপ্ত-এর জেলজীবন

কারাজীবনের অধ্যায়টি বনলতার জীবনে একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। বাধা-নিষেধ, নির্যাতন ও নিপীড়নের ঊর্ধ্বে তার দুর্দম তারুণ্য সেদিন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। রাজনৈতিক বন্দিনীদের সঙ্গে বহুমূল্য নিবিড় বন্ধুত্ব তার কারাজীবনেই ঘটে।

শেষ পর্যন্ত কারাগারে বনলতা অসুস্থ হয়ে পড়েন টক্সিক গয়টার রোগে। এরফলে ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠল। পুলিস তাকে ছেড়ে দিতে চাইল এই শর্তে যে, তিনি আর রাজনৈতিক কাজ করবেন না এমনি একটি মুচলেকা যদি লিখে দেন। বনলতা সম্মত হলেন না। রাজবন্দীর মৃত্যুর দায়িত্ব নেওয়া গভর্নমেন্টের পক্ষে অসুবিধাজনক। তাই বনলতাকে তার দিদির বাড়িতে কলিকাতায় অন্তরীণ করা হয় ১৯৩৬ সালে। তখন তাঁর শেষ অবস্থা।

মৃত্যুবরণ

অস্ত্রোপচার সম্বন্ধে যখন সংশয়ের অন্ত নাই, অথচ না করলেও ভালো হবার সম্ভাবনা খুবই কম— তখন বনলতা অস্ত্রোপচারের সপক্ষে রায় দিলেন। তিনি চেয়েছেন বাঁচতে হলে ভালোভাবেই বাঁচবেন। মরণেই বা কী ভয় আছে।

মেডিকেল কলেজের প্রিন্স-অব-ওয়েলস্ ওয়ার্ডে তিনি ভর্তি হন। ডাক্তার অ্যান্ডারসন তার গলায় অস্ত্রোপচার করেন। অস্ত্রোপচারের ছত্রিশ ঘণ্টার মধ্যেই ১৯৩৬ সালের পয়লা জুলাই তার জীবনপ্রদীপ নির্বাপিত হয়। তখন তার বয়স একুশ বছর মাত্র। মুক্তি-সংগ্রামের একটি নির্ভীক সৈনিক সেদিন জীবনের ক্ষেত্র থেকে বিদায় নিলেন।

তথ্যসূত্র:

১. কমলা দাশগুপ্ত (জানুয়ারি ২০১৫)। স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী, অগ্নিযুগ গ্রন্থমালা ৯। কলকাতা: র‍্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন। পৃষ্ঠা ১৬০-১৬২। আইএসবিএন 978-81-85459-82-0

Leave a Comment

error: Content is protected !!