বনলতা সেন (চক্রবর্তী) পারিবারিকভাবে স্বদেশ প্রেমের শিক্ষা পান। পরিবারের অন্য সদস্যরা বিট্রিশ বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছিলো। ‘অনুশীলন সমিতি’র সাথে তিনি যুক্ত ছিলেন। ১৯৪২ সালে প্রেসিডেন্সি জেলে বন্ধী থাকার সময় নানা রাজনৈতিক বই পড়েন। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পড়ে আবার রাজনৈতিক কাজে যুক্ত হন।
বনলতা সেন-এর জন্ম ও পরিবার
বনলতা সেন (চক্রবর্তী) ১৯১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে জন্মগ্রহণ করেন ফরিদপুর জেলার কার্তিকপুর গ্রামে। পিতৃভূমিও ঐ স্থানেই। তার পিতা কালীপ্রসন্ন সেন ও মাতা সরোজিনী দেবী। ছোটবেলা থেকেই তাদের পরিবারে একটা স্বদেশী পরিবেশ তিনি দেখে আসছিলেন। ১৯৪২ সালে গ্রেপ্তার হয়ে ৩ বছর আটক ছিলেন। কারাবাস কালেই তিনি এম.এ. পরীক্ষা দিয়ে পাস করেন। জেল থেকে মুক্তির পর অনুশীলন দলের বিপ্লবী সরোজকুমার চক্রবর্তীর সঙ্গে তার বিবাহ হয়।
রাজনীতিতে প্রভাবিত হওয়া
মায়ের কাছ থেকে স্বদেশী যুগের বিপ্লবীদের কাহিনী এবং ১৯২১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের কাহিনী তিনি তন্ময় হয়ে শুনতেন। বাড়ির অনেকেই ১৯২১ সালে স্কুল কলেজ ছেড়ে অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯২৫ সালের দেশবন্ধুর মৃত্যুর পর এবং ১৯২৯ সালে যতীন দাসের মৃত্যুর পর দেশব্যাপী যে শোক ও আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছিল তাতে তিনি দেশের কাজ করবার জন্য প্রেরণা লাভ করেন।
ইউটিউবে দেখুন আমার লেনিন তথ্যচিত্র
বনলতা সেন-এর আন্দোলনে যুক্ততা ও বিপ্লবী দলে যোগদান
১৯৩০ সালে সমগ্র দেশ জুড়ে চলেছিল গান্ধীজীর ‘লবণ আইন অমান্য আন্দোলন’। বিপ্লবী আন্দোলনের গতিও সেই সময় প্রবল। চারিদিকের এই আবহাওয়া তাকে রাজনীতিক্ষেত্রের দিকে আকর্ষণ করে। তিনি বিপ্লবী অনুশীলন-দলে যোগদান করেন। অনুশীলন দলের বিপ্লবী নেতা জ্ঞান মজুমদারের স্ত্রী বিশিষ্টা কর্মী সুরমা মজুমদারের সঙ্গে কাজ করবার সৌভাগ্য তার হয়েছিল। তার সহকর্মী ছিলেন উমা সরকার, সুনীলা সেন প্রমুখ।
কার্তিকপুর গ্রামে একটি ক্লাব ও লাইব্রেরি স্থাপনে তার একটা প্রধান অংশ ছিল। একটি মহিলা-সমিতিও প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি টিটাগড় ষড়যন্ত্র, আন্তঃপ্রাদেশিক ষড়যন্ত্র প্রভৃতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মহিলা কর্মীসংঘ’, ‘কংগ্রেস মহিলা সংঘ’ প্রভৃতিতে যোগদান করে মহিলাদের মধ্যে তিনি কাজ করেন।
১৯৩৭ সাল থেকে তিনি ‘বন্দীমুক্তি আন্দোলন’, ‘ছাত্র ফেডারেশন’ প্রভৃতি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। অল বেঙ্গল গার্লস স্টুডেন্টস কমিটি’-র তিনি সম্পাদিকা ছিলেন। ১৯৩৯ সালে সুভাষচন্দ্র বসু যখন পৃথক কংগ্রেস পরিচালিত করেন— বনলতা সেন তাতে যোগ দেন।
১৯৪২ সালের আন্দোলনে একটি বে-আইনী শোভাযাত্রার পুরোভাগে থেকে তিনি শোভাযাত্রাসহ অগ্রসর হন। পুলিস লাঠিচার্জ করতে থাকে। পুলিসের লাঠির আঘাতে তিনি লাঞ্ছিত হন এবং গ্রেপ্তারবরণ করেন। প্রায় তিনবৎসর নিরাপত্তাবন্দীরূপে প্রেসিডেন্সি জেলে তিনি আটক থাকেন। ১৯৪৫ সালে তিনি মুক্তিলাভ করেন। ১৯৪৬ সালে কলিকাতায় দাঙ্গার সময় তিনি দাঙ্গাবিধ্বস্তদের মধ্যে রিলিফের কাজ করেন। নানা স্থানের শ্রমিক-আন্দোলনের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
জেল জীবনের চিত্র
তার বন্দী-জীবনের একটি ছবি দেওয়া এখানে হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না। জেলখানা হচ্ছে গতিহীন স্থির জলের ডোবা। এখানে অনেকদিন থাকতে থাকতে সব কিছুই যেন একঘরে হয়ে পচে উঠতে চায়। রাজবন্দীরা ঐ বদ্ধ জলকে প্রাণস্পর্শ সঞ্জীবিত করবার প্রয়াসে যতগুলি পন্থা অবলম্বন করতেন, তার মধ্যে পড়াশুনা ও আলোচনা একটা প্রধান স্থান অধিকার করত। কার্ল মার্কস, এঙ্গেলস প্রভৃতির কঠিন কঠিন নানা বই পড়বার একটা আড্ডা ছিল প্রেসিডেন্সি জেলের ফিমেল-ওয়ার্ডে। আড্ডার পাঠকবৃন্দ ঐ কঠিন পুস্তকগুলিকে গভীর মনোনিবেশ সহকারে উপলব্ধি করতে চেষ্টা করতেন। তর্ক এবং যুক্তি তখন জাল বিস্তার করে সব কয়টি পাঠককে জড়িয়ে ফেলত। জাল না-ছেড়া পর্যন্ত কারো মুক্তি ছিল না। ঐ তর্কজাল তাদের দিনের চিন্তা, রাতের ঘুম সবই বেড়ে ধরত। ‘অ্যান্টি ডুরিং’ প্রভৃতি পুস্তকের প্রতিটি পঙক্তির অন্তর্নিহিত অর্থ এবং তার যুক্তি ও তর্ক বনলতা সেন মাঝে মাঝে এমনভাবে মেলে ধরতেন যে, অন্যরা সেই জালে অজানতে জড়িয়ে যেতেন। জাল ছিড়ে সাময়িক মুক্তি অবশ্য একসময় আসত মূল সন্ধানের একটা প্রবল চেষ্টার পর। তবু অনন্ত রহস্য অনন্তই রয়ে যেতো। বনলতার যুক্তিবাদী মন তার কারাজীবনের সতীর্থদের এমনি করে আনন্দ পরিবেশন করত। ১৯৮৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যু হয়।
আরো পড়ুন
- কমরেড ভারতজ্যোতি রায়চৌধুরী ছিলেন একজন মহান নকশালবাদী বিপ্লবী
- কমরেড আব্দুর রউফ মুকুল ছিলেন বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির নেতা
- শান্তিসুধা ঘোষ ছিলেন যুগান্তর দলের বিপ্লবী
- শোভারানী দত্ত ছিলেন বিপ্লবীদের আশ্রয়দাতা
- সাবিত্রী দেবী ছিলেন যুগান্তর দলের বিপ্লবী
- মায়া ঘোষ ছিলেন বিপ্লবী দলের নেত্রী
- বিমলপ্রতিভা দেবী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কর্মী
- বনলতা সেন (চক্রবর্তী) ছিলেন অনুশীলন সমিতির নেত্রী
- বনলতা দাশগুপ্ত ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের তরুণ বিপ্লবী
- নির্মলা রায় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে একজন বিপ্লবী
- সুষমা রায় ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী কর্মী
- ছায়া গুহ ছিলেন ফরওয়ার্ড ব্লকের বিপ্লবী নেত্রী
- কমলা দাশগুপ্ত ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলের বিপ্লবী নেতৃত্ব
- কমলা চট্টোপাধ্যায় ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবী
- ঊষা মুখার্জী ছিলেন অনুশীলন দলের বিপ্লবী
- পারুল মুখার্জী ছিলেন অনুশীলন দলের বিপ্লবী
- উমা সেন ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী নারী বিপ্লবী
- উজ্জ্বলা মজুমদার সশস্ত্র বিপ্লবী নারী ও সমাজসেবী
- ইলা সেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী
- উল্লাসকর দত্ত ছিলেন অগ্নিযুগের ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী
- মণি সিংহ ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও বামপন্থী রাজনীতিক
- ভূপেশ গুপ্ত ছিলেন বাংলা ও ভারতের সুবিধাবাদী সংশোধনবাদী নেতা
- ক্ষুদিরাম বসু বিশ শতকের বাঙলার অগ্নিযুগের মহান সশস্ত্র বিপ্লবী
- হেমচন্দ্র দাস কানুনগো ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রদূত
- রেবতী মোহন বর্মণ ছিলেন বিশ শতকের সাম্যবাদী ধারার লেখক ও বিপ্লবী
- যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপধ্যায় বা নিরালম্ব স্বামী ছিলেন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী
- সতীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন বিশ শতকের ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী
- কমরেড মুজিবর রহমান নকশালবাড়ি অভ্যুত্থানের অন্যতম চরিত্র ও অস্ত্র প্রশিক্ষক
- আলতাব আলী ছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতিক ও শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের নেতা
- বাল গঙ্গাধর তিলক একজন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী, শিক্ষক এবং স্বাধীনতা কর্মী
- বিপিনচন্দ্র পাল একজন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী, লেখক, ও সমাজ সংস্কারক
- রাসবিহারী বসু ছিলেন আধুনিক বর্বর ব্রিটিশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এক ভারতীয় বিপ্লবী
- লুৎফুন নাহার হেলেন ছিলেন ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী
- আবু তাহের ছিলেন সাম্রাজ্যবাদের যুগের বামপন্থী সমাজগণতন্ত্রী বিপ্লবী
- সুনীতি চৌধুরী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী
- শান্তি ঘোষ ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী, সমাজসেবক
- লীলা নাগ ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী, লেখিকা
- বীণা দাস ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপ্লবী ও লেখিকা
- ননীবালা দেবী ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লবী ও প্রথম মহিলা রাজবন্দি
- দুকড়িবালা দেবী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রথম সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত নারী বিপ্লবী
- চারুশীলা দেবী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী
- ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরী ছিলেন যুগান্তর দলের বিপ্লবী
- প্রতাপ উদ্দিন আহমেদ ছিলেন সাম্যবাদী শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের নেতা
- কল্যাণী দাস ছিলেন যুগান্তর দলের বিপ্লবী নেত্রী ও লেখক
- জ্যোতিষ বসু ছিলেন সাম্যবাদী বিপ্লবী, ভাষা সৈনিক, গণতান্ত্রিক যোদ্ধা
- ইন্দুসুধা ঘোষ ছিলেন যুগান্তর দলের নারী বিপ্লবী
- ইন্দুমতী সিংহ চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের একজন বিপ্লবী নেত্রী
- নগেন সরকার ছিলেন বাংলাদেশের মার্কসবাদী-লেনিনবাদী বিপ্লবী রাজনীতিবিদ
- নবারুণ ভট্টাচার্য বাঙালি কবি, সাহিত্যিক, লেখক, গল্পকার এবং বিপ্লবী চিন্তাবিদ
- মুজফফর আহমদ ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সুবিধাবাদী নেতা
- মওলানা ভাসানী ছিলেন মজলুম জনগণের সাম্রাজ্যবাদবিরোধি নেতা
- অরবিন্দ ঘোষ ছিলেন অগ্নিযুগের মহানায়ক ও সিদ্ধযোগী একজন কবি ও গুরু
- মানবেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা, বিপ্লবী ও তাত্ত্বিক
- সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রধান বিপ্লবী কবি
তথ্যসূত্র:
১. কমলা দাশগুপ্ত (জানুয়ারি ২০১৫)। স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী, অগ্নিযুগ গ্রন্থমালা ৯। কলকাতা: র্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন। পৃষ্ঠা ২২২-২২৩। আইএসবিএন 978-81-85459-82-0
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি ফুলকিবাজ এবং রোদ্দুরে ডটকমের সম্পাদক।