লুৎফুন নাহার হেলেন (ইংরেজি: Lutfunnahar Helen) ২৮ ডিসেম্বর, ১৯৪৭ — ৫ অক্টোবর, ১৯৭১) ছিলেন ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী, মার্কসবাদী বিপ্লবী, স্বনামধন্য শিক্ষক এবং পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)-এর একজন সক্রিয় সদস্য।
লুৎফুন নাহার হেলেন ১৯৪৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর মাগুরা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৮ সালে বি.এ পাশ করার পর তিনি মাগুরা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তার বড় ভাই মাহফুজুল হক নিরো ছিলেন মাওবাদী কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে যুক্ত মাগুরার একজন খ্যাতনামা ছাত্র নেতা ও রাজনৈতিক কর্মী। ছাত্র জীবন শেষ করার পর তিনি মাগুরা কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। এই ভাইয়ের প্রভাবেই হেলেন কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন।
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে শুরু হয় তার দুর্বিষহ জীবন। এক সন্তানের জননী হেলেন তার শিশু পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে গোপনে পার্টি কর্মীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। মাগুরা শহরে বসবাস করলেও হেলেনদের গ্রামের বাড়ী মহম্মদপুর থানার হরেকৃষ্ণপুর গ্রাম। এই গ্রামকে কেন্দ্র করে তখনকার মাওবাদী সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) বা সংক্ষেপে ইপিসিপি(এম-এল)-এর গড়ে ওঠা গেরিলা অঞ্চলের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে পার্টির দায়িত্ব পালন করতেন হেলেন। সংসার, চাকুরি, সন্তান পালন ও পার্টির কাজ; সব সামলে নেবার অসাধারণ যোগ্যতা তার ছিল।
যশোরে ইপিসিপি(এম-এল)-এর ঘাটি ছিল শালিখা থানার পুলুম গ্রামে। পার্টির নির্দেশে সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে মহম্মদপুরের প্রধান শক্তি পুলুমে চলে গেলে হেলেন এই এলাকাতেই থেকে যান। এখান থেকে কুখ্যাত রাজাকার বাহিনী নারী মাওবাদী হেলেনকে গ্রেফতার করে নিয়ে হত্যা করে। সে ছিল এক নির্মম হৃদয় বিদারক মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড।
অক্টোবর মাসের প্রথম দিকে মহম্মদপুর এলাকার পার্টি নেতৃত্বাধীন বাহিনী একটি গ্রামে অবস্থানকালে, ঘাতক দালালদের গুপ্তচরের সহায়তায় হেলেন ২ বছর ৫ মাস বয়স্ক শিশু পুত্র দিলীরসহ রাজাকারদের হাতে ধরা পড়েন। রাজাকাররা তাকে সরাসরি মাগুরা শহরে নিয়ে আসে এবং পাক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নিকট সোপর্দ করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। হেলেনের গ্রেফতারের খবর জানতে পেরে তার বৃদ্ধ পিতা ও আত্মীয় স্বজন দুগ্ধপোষ্য শিশুর মাতা হেলেনের মুক্তির জন্য শত অনুরোধ করা সত্ত্বেও মাগুরার জামাতি ঘাতক দালালেরা মুক্তির ব্যাপারে সব থেকে বেশি বাধার সৃষ্টি করে। পরিবারের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
অবশেষে ১৯৭১ সালের ৫ অক্টোবর, যেদিন ছিল মুসলমানদের পবিত্র শবে বরাত; সে রাতে পাকিস্তানী বর্বর স্বৈরতন্ত্রী কীটেরা হেলেনের শিশু পুত্র দিলীরের করুণ কান্নাকে উপেক্ষা করে তাকে মায়ের কোল থেকে বিচ্ছিন্ন করে অমানবিক নির্মম শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে হেলেনকে।
এখানেই শেষ নয়। এই মহান বীর নারী মাওবাদীর লাশ পাক বাহিনীর জিপের পিছনে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাস্তার উপর দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে যায় মাগুরা শহরের অদূরে নবগঙ্গা নদীর ডাইভারশন চ্যানেলে।[১]
আরো পড়ুন
- অনিল রায় ছিলেন একাধারে বরেণ্য রাজনীতিবিদ ও নির্ভীক স্বাধীনতা সংগ্রামী
- খোকা রায় ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনন্য বিপ্লবী
- কমরেড ভারতজ্যোতি রায়চৌধুরী ছিলেন একজন মহান নকশালবাদী বিপ্লবী
- কমরেড আব্দুর রউফ মুকুল ছিলেন বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির নেতা
- কমলা দাশগুপ্ত ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলের বিপ্লবী নেতৃত্ব
- উজ্জ্বলা মজুমদার সশস্ত্র বিপ্লবী নারী ও সমাজসেবী
- ইলা সেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী
- উল্লাসকর দত্ত ছিলেন অগ্নিযুগের ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী
- মণি সিংহ ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও বামপন্থী রাজনীতিক
- ভূপেশ গুপ্ত ছিলেন বাংলা ও ভারতের সুবিধাবাদী সংশোধনবাদী নেতা
- ক্ষুদিরাম বসু বিশ শতকের বাঙলার অগ্নিযুগের মহান সশস্ত্র বিপ্লবী
- হেমচন্দ্র দাস কানুনগো ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রদূত
- রেবতী মোহন বর্মণ ছিলেন বিশ শতকের সাম্যবাদী ধারার লেখক ও বিপ্লবী
- যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপধ্যায় বা নিরালম্ব স্বামী ছিলেন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী
- সতীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন বিশ শতকের ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী
- কমরেড মুজিবর রহমান নকশালবাড়ি অভ্যুত্থানের অন্যতম চরিত্র ও অস্ত্র প্রশিক্ষক
- আলতাব আলী ছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতিক ও শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের নেতা
- বাল গঙ্গাধর তিলক একজন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী, শিক্ষক এবং স্বাধীনতা কর্মী
- বিপিনচন্দ্র পাল একজন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী, লেখক, ও সমাজ সংস্কারক
- রাসবিহারী বসু ছিলেন আধুনিক বর্বর ব্রিটিশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এক ভারতীয় বিপ্লবী
- লুৎফুন নাহার হেলেন ছিলেন ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী
- আবু তাহের ছিলেন সাম্রাজ্যবাদের যুগের বামপন্থী সমাজগণতন্ত্রী বিপ্লবী
- সুনীতি চৌধুরী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী
- শান্তি ঘোষ ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী, সমাজসেবক
- লীলা নাগ ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী, লেখিকা
- বীণা দাস ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপ্লবী ও লেখিকা
- ননীবালা দেবী ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লবী ও প্রথম মহিলা রাজবন্দি
- দুকড়িবালা দেবী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রথম সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত নারী বিপ্লবী
- ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরী ছিলেন যুগান্তর দলের বিপ্লবী
- প্রতাপ উদ্দিন আহমেদ ছিলেন সাম্যবাদী শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের নেতা
- কল্যাণী দাস ছিলেন যুগান্তর দলের বিপ্লবী নেত্রী ও লেখক
- জ্যোতিষ বসু ছিলেন সাম্যবাদী বিপ্লবী, ভাষা সৈনিক, গণতান্ত্রিক যোদ্ধা
- ইন্দুসুধা ঘোষ ছিলেন যুগান্তর দলের নারী বিপ্লবী
- ইন্দুমতী সিংহ চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের একজন বিপ্লবী নেত্রী
- নগেন সরকার ছিলেন বাংলাদেশের মার্কসবাদী-লেনিনবাদী বিপ্লবী রাজনীতিবিদ
- নবারুণ ভট্টাচার্য বাঙালি কবি, সাহিত্যিক, লেখক, গল্পকার এবং বিপ্লবী চিন্তাবিদ
- মুজফফর আহমদ ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সুবিধাবাদী নেতা
- মওলানা ভাসানী ছিলেন মজলুম জনগণের সাম্রাজ্যবাদবিরোধি নেতা
- অরবিন্দ ঘোষ ছিলেন অগ্নিযুগের মহানায়ক ও সিদ্ধযোগী একজন কবি ও গুরু
- মানবেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা, বিপ্লবী ও তাত্ত্বিক
তথ্যসূত্র
১. লেখক নামহীন, মাওবাদী অগ্রযোদ্ধা, বাংলাদেশের মাওবাদী আন্দোলনে শহিদ ও প্রয়াত প্রতিনিধিস্থানীয় কমরেডদের জীবন ও সংগ্রামের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, প্রকাশক আতিফ অনীক, প্রথম সংস্করণ, নভেম্বর ২০২১, পৃষ্ঠা ৩৬।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।