ছায়া গুহ ছিলেন ফরওয়ার্ড ব্লকের বিপ্লবী নেত্রী

ছায়া গুহ পারিবারিকভাবে দেশপ্রেমের শিক্ষা পান। শৈশব, কৈশোর বার্মা বা মায়ানমার দেশে কাটলেও দেশের সংকটাপন্ন সময়ে তিনি ছুটে আসেন দেশসেবায় নিজেকে উৎসর্গ করতে। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় কারাবরণ করেন। বেড়িয়ে এসে আবার কাজ শুরু করেছেন।

ছায়া গুহ-এর শৈশবকাল

ছায়া গুহ জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯২১ সালের ২ ডিসেম্বর ঢাকা জেলার আউটসাহী গ্রামে। তার পিতার নাম সুনেত্রচরণ গুহ এবং মাতা শৈলবালা দেবী। শিশুকাল থেকে মানুষ হয়েছিলেন তিনি বর্মাদেশে। তাঁর পিতা সেখানেই বসবাস করতেন। স্বামী বিবেকানন্দের জীবনী পড়ে ছায়া গুহের মনে মানুষের প্রতি দরদ ও সেবার আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে। ১৯৩২ সালের ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের কাহিনী বর্মায় বসে শুনতে শুনতে তার মনে দেশসেবার আকাঙ্ক্ষা জাগত হয়। তিনি বাংলাদেশে পালিয়ে গিয়ে কাজ করবার স্বপ্ন দেখতেন।

শিক্ষাজীবন

বার্মাদেশ বা মায়ানমারের রাজভক্ত স্কুলে পড়াশুনা করেন। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার পরে ১৯৪০ সালে কলকাতায় চলে আসেন। ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার কারণে জেলে যেতে হয়। জেলে থাকাবস্থায় আই এ পাশ করেন।  

ছায়া গুহ-এর ফরওয়ার্ড ব্লকে যুক্ত

দেশপ্রেমে উদ্ভুত হয়ে সুভাষচন্দ্র বসুকে একখানা চিঠিও লিখে ফেলছিলেন। ছোট ছায়া গুপ্তের সুপ্ত-আকাঙ্ক্ষা-ভরা চিঠি নেতাজীর হাতে পৌঁছেছিল কিনা তা জানা যায় নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাদের রাজভক্ত স্কুল ‘ওয়ার ফান্ড’ খোলে। ছাত্রী ছায়া গুহ প্রধান শিক্ষয়িত্রীর র্ভৎসনা অগ্রাহ্য করে, দল বেঁধে ঐ ফান্ডে টাকা না দিতে রুখে দাঁড়ালেন।

বর্মাদেশে তখন ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় বর্মীভাষা অবশ্যশিক্ষণীয় বিষয় হওয়াতে, ছায়া গুপ্ত রেঙ্গুনে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েন। তারপরে ১৯৪০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কলিকাতায় চলে আসেন। যে দেশের মাটি তাকে লালন পালন করেছে, তার উপর মায়া ছিল তার অনেকখানি, হয়তো জন্মভূমির পরেই তার স্থান। কিন্তু সেখানে ফিরে যাওয়া আর তার সম্ভব হয় নি।

আরো পড়ুন:  লীলা নাগ ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী, লেখিকা

কলিকাতায় এসে পরিচিত হন তিনি ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ দলের নেত্রী লীলা রায়ের সঙ্গে। যোগ দেন তিনি ঐ দলে। কাজের জন্য অন্তরের স্পৃহা এবারে সুযোগ পেয়ে নিজেকে সঁপে দিলেন।

১৯৪১ সালের শেষে বর্মাদেশে যুদ্ধের ঢেউ উঠল। জাপানের বোমাবর্ষণ শুরু হলো। বর্মায় প্রবাসী ভারতীয়গণ দিশাহারা হয়ে ছুটে আসতে লাগলেন ভারতের দিকে। কলিকাতায় জাহাজঘাটে ও হাওড়া স্টেশনে ছায়া গুহ সর্বস্বান্ত ও পথক্লান্ত ভারতীয়দের সেবা করতে ছুটে যেতেন।

ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগদান ও গ্রেপ্তার

অবশেষে ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের আহ্বান এলয়। পিছিয়ে রইলেন না ছায়া গুহ। তিনি নিষিদ্ধ সভা-সমিতিতে যোগদান করতে লাগলেন। ১৯৪২ সালের ১৫ আগস্ট নিরাপত্তা-বন্দীরূপে কারারুদ্ধ হলেন তিনি প্রেসিডেন্সি জেলে। জেলখানার বন্দীদের তিনি মাতিয়ে রাখতেন তার প্রাণস্পর্শ করা গানে। মুক্তি পান তিনি ১৯৪৫ সালে। জেলের মধ্যে তিনি আই.এ. পাস করেন। বেরিয়ে এসে তিনি দেখেন বর্মা থেকে তার বাবা মা সর্বস্ব হারিয়ে ফিরে এসেছেন। তাঁদের প্রতি কর্তব্যবোধে কাজ নেন তিনি একটা স্কুলে।

নোয়াখালী দাঙ্গায় ও উদ্বাস্তুদের জন্য কাজ

১৯৪৬ সালে নোয়াখালি-দাঙ্গার পর তিনি কলিকাতায় কর্তব্য অসম্পূর্ণ রেখে চলে যান নোয়াখালিতে রিলিফের কাজ করতে। ১৯৪৭ সালে খণ্ডিত ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়। ছায়া গুহ এর মাঝেই কখনো উদ্বাস্তুদের মধ্যে রিলিফের কাজ করতেন। এছাড়াও সরকারি যেসব আশ্রমে অভাগা ভিক্ষুকদের আশ্রয় দেওয়া হয় সেখানে তাদের সেবা ও রক্ষণাবেক্ষণের ভার নিয়ে কাজ করতেন। কখনো শিশু অপরাধীদের মঙ্গলামঙ্গলের ভার গ্রহণ করেন তিনি সরকারের ‘জুভেনাইল কোর্ট’-এ। এখানে দোষী বড়ো নয়, দোষকে ও তার কারণকে প্রাধান্য দিয়ে প্রকৃত তথ্য অনুসন্ধান করে, সাব্যস্ত দোষীকে সংশোধন করবার চেষ্টা করা হয়। এইভাবে মানুষের সেবাকেই তিনি আপন জীবনের ব্রত হিসাবে বেছে নিয়েছেন।

তথ্যসূত্র:

১. কমলা দাশগুপ্ত (জানুয়ারি ২০১৫)। স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী, অগ্নিযুগ গ্রন্থমালা ৯। কলকাতা: র‍্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন। পৃষ্ঠা ২২৫-২২৬। আইএসবিএন 978-81-85459-82-0

Leave a Comment

error: Content is protected !!