শান্তিসুধা ঘোষ ছিলেন যুগান্তর দলের বিপ্লবী

শান্তিসুধা ঘোষ যুগান্তর দলের কর্মী। ভগ্নস্বাস্থ্যের হলেও মেধাবী ছিলেন। একাডেমিক পড়াশুনার পাশাপাশি বিপ্লবী কাজ করেছিলেন। মহিলা কর্মীদের মাঝে কাজ গড়ে তুলেছিলেন। জীবনের দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের বরিশালে থেকে রাজনৈতিক কাজ করেছিলেন। দেশভাগের কয়েক বছর পরে কলকাতায় চলে যান। রাজনীতির পাশাপাশি লেখালেখি করতেন। পরবর্তীতে সেই লেখা বই আকারে প্রকাশিত হয়।

জন্ম ও পরিবার:

বরিশাল শহরে ১৯০৭ সালের ২৭ জুন শান্তিসুধা ঘোষ জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস বরিশালের গাভা গ্রামে হলেও শান্তিসুধা বরিশাল শহরেই মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। তার পিতা ক্ষেতরনাথ ঘোষ ও মাতা অন্নদাসুন্দরী দেবী। স্বনামখ্যাত অধ্যক্ষ দেবপ্রসাদ ঘোষ তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। শান্তিসুধা ঘোষের বাবা ক্ষেত্রমোহন ঘোষ ছিলেন বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। মা অন্নদাসুন্দরী ছিলেন কবি, শিক্ষাব্রতী এবং স্বাধীনতার কাজে আত্মনিবেদিত এক মহিলা। শিক্ষাবিদ ও জনসংঘ নেতা দেবপ্রসাদ ঘোষ তার দাদা। শান্তিসুধার মননে ও জীবনে তার প্রভাব অসীম।

শান্তিসুধা ঘোষ-এর শিক্ষাজীবন

ছোটবেলা থেকে তিনি যেমনই মেধাবী ছাত্রী তেমনি ভগ্নস্বাস্থ্য ছিলেন। শান্তিসুধা প্রথমে ব্যাপটিস্ট মিশন ছোট মেমের স্কুল, তারপর ১৯১৫ সালে ব্রাহ্ম মহিলা স্নেহলতা দাসের সদর বালিকা বিদ্যালয় এবং সেখান থেকে ছাত্রবৃত্তি পেয়ে কলকাতায় ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষা সদনে পড়াশোনা করেন। পরে বরিশালে ফিরে গিয়ে উন্নত সদর বালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীতে ভর্তি হন শারীরিক অসুস্থতা কারণে। এরপর ১৯২৪ সালে ম্যাট্রিকে ১৯২৪ যষ্ঠ স্থান অধিকার করে ব্রজমোহন কলেজে ভর্তি হন আর দুই ছাত্রীর সঙ্গে — মনোরমা গুহ এবং হেমলতা রায়। এই তিন ছাত্রীকে নিয়েই বি.এম. কলেজে সহশিক্ষার প্রবর্তন হয়। আই.এ পরীক্ষাতেও তৃতীয় স্থান অধিকার করেন এই মেধাবী ছাত্রী।  ছাত্রজীবনে উচ্চতম বৃত্তির অধিকারী হয়ে তিনি ম্যাট্রিক ও আই. এ. পাস করেন। অঙ্কে অনার্স নিয়ে তিনি ১৯২৮ সালে বি.এ. পরীক্ষায় ‘ঈশান স্কলার’ হয়ে পুরুষ ও নারী সমাজকে চমৎকৃত করেন। সমস্ত ছাত্রছাত্রীর মধ্যে সর্বাধিক নম্বর তিনিই পেয়েছিলেন। তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে মিশ্র-গণিত নিয়ে এম. এ. পড়তে যান। ১৯৩০ সালে অসুস্থ শরীরেও পরীক্ষা দিয়ে তিনি প্রথম শ্রেণীর দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। বরিশাল বি.এম. কলেজে তিনি এবং আরো তিনজন ছাত্রী সহশিক্ষার প্রথম পথপ্রদর্শক ছিলেন। পরে ঐ কলেজেই শান্তিসুধা অধ্যাপকের পদ লাভ করেছিলেন।

আরো পড়ুন:  কল্যাণী দাস ছিলেন যুগান্তর দলের বিপ্লবী নেত্রী ও লেখক

অনুপ্রাণিত হওয়া

শান্তিসুধা ঘোষ ছাত্রজীবনে রাজনীতির জটিল পথে নামেন নি। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের পর তার রাজনৈতিক চেতনার উদ্বোধন হয়। ধীরে ধীরে সেটি বিকাশ লাভ করে। সম্ভবত শ্রী অরবিন্দের জীবন ও বাণী তাঁকে প্রবুদ্ধ করে। এককথায় মনে হয়, অরবিন্দের সশস্ত্র বিপ্লব ও পূর্ণ আধ্যাত্মিকতার সমন্বয় তাকে আকৃষ্ট করে। এম.এ. পাস করার পর যখন বরিশাল ফিরে যান তখন তিনি রাজনৈতিক কাজে যোগদান করেন। তার ছোট ভাই রুণু ও বোন অপরাজিতা ঘোষের মারফত স্থানীয় তরুণ সংঘের কর্মীদের তিনি কিছু কিছু সাহায্য করতে থাকেন। সেই সময় বরিশালে যুগান্তর-দলের শঙ্করমঠ, তরুণসংঘ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান বিপ্লবাত্মক কাজে ব্রতী ছিল। তাদের নীতিনিষ্ঠ আচরণ তাকে আকৃষ্ট করে।

তরুণসংঘে যুক্ত

তরুণসংঘে যোগদানের ফলে শান্তিসুধা ঘোষ, রুণু ও অপরাজিতা একত্রে বিপ্লবীকর্মে সহযোগী হন। বন্দুক, রিভলবার প্রভৃতি নিষিদ্ধ জিনিস রাখার দায়িত্বে ছিলেন শাস্তিসুধা ও অপরাজিতা ঘোষ। তার তরুণ সংঘে’ যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভাই সত্যব্রতর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। তবে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড চালাতেন বাড়ির লোকের অগোচরেই। ১৯৩১ সালে শান্তিসুধা ঘোষ বরিশালের মেয়েদের নিয়ে ‘শক্তিবাহিনী’ নামে একটি সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। সংঘের কর্মী ছিলেন লীলা চ্যাটার্জী, অনিলা চ্যাটার্জী, মুকুল সেন, নির্মলা ঘোষ, অপরাজিতা ঘোষ প্রভৃতি। এখানে লাঠি-ছোরা খেলা, সাইকেল ও নৌ-চালনা শিক্ষা দেওয়া হত। নানাবিধ শরীরচর্চার ব্যবস্থাও ছিল। কাজেই পুলিসের কড়া নজর এসে পড়তে দেরি হল না। শাসানি, ধমকানি ও জুলুম চলে কর্মীদের উপর এবং প্রতিষ্ঠাত্রীর উপর। ছেলে কর্মীদের পুলিস গ্রেপ্তার করে আটক রাখতে থাকে।

পুলিসের কড়া দৃষ্টিকে একটু নরম করবার প্রচেষ্টায় তারা নির্দোষ একটি হরিজন বিদ্যামন্দির প্রতিষ্ঠিত করেন। তখন শক্তিসংঘের কার্যকলাপ যথাসম্ভব এই বিদ্যামন্দিরের ঘরে বসেই পরিচালিত হত। ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৩২ সালের মধ্যে অহিংসাপন্থী ও বিপ্লবপন্থী সক্রিয় পুরুষ কর্মিগণ স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করাতে বড় থেকে ছোট পর্যন্ত অধিকাংশই গ্রেপ্তার হয়ে যান। সুতরাং মহিলা কর্মীদের মধ্যে শান্তিসুধা ঘোষ প্রভৃতি যাঁরা তখন বাইরে ছিলেন তাদের উপরই অনেকখানি কাজের ভার এসে পড়ে। কর্মনির্দেশও তারাই দিতেন। নতুন অনেক কর্মী এগিয়ে এলেন। এইভাবে শাস্তিসুধা ঘোষের কিছুদিন বরিশালে কেটে গেল।

আরো পড়ুন:  যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপধ্যায় বা নিরালম্ব স্বামী ছিলেন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী

শান্তিসুধা ঘোষ-এর সাংগঠনিক কাজ

১৯৩২ সালের জুলাই মাসে ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউশন কলেজের অধ্যাপনার কাজ নিয়ে শান্তিসুধা ঘোষ কলিকাতা চলে আসেন। এখানে এসে কল্যাণী দাসের সঙ্গে তিনি কাজে যুক্ত হন। তখন দেশের সর্বত্র ব্যাপক গ্রেপ্তারের পর যে মুষ্টিমেয় মহিলা কর্মী পৃথক পৃথক ভাবে কাজ করতে চেষ্টা করেছিলেন তাদের সকলকে একত্রিত ও সংঘবদ্ধ করতে প্রয়াস পান কল্যাণী দাস ও শান্তিসুধা ঘোষ। একদিকে এই সংযোগের প্রচেষ্টা, অন্যদিকে ছাত্রীসংঘের মারফত মহিলা-সংগঠনের কাজ তারা উৎসাহের সঙ্গে পরিচালিত করেন। কল্যাণী দাসের সাহচর্যে শান্তিসুধা ঘোষ গোপনে দীনেশ মজুমদার প্রভৃতি বিপ্লবীদের সঙ্গে যুক্ত হন।

কারাবরণ

গ্রীন্ডলে ব্যাঙ্কের টাকা অপসারণ সম্পর্কে সন্দেহক্রমে পুলিস অনেক কর্মীকে গ্রেপ্তার করে। ১৯৩৩ সালের ১১ নভেম্বর ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে শান্তিসুধা ঘোষকেও এই সম্পর্কে সন্দেহক্রমে গ্রেপ্তার করে। তাকে মাসখানেক রাখে প্রেসিডেন্সি জেলে। কিন্তু ভগ্নস্বাস্থ্যের জন্য তাকে জামীনে খালাস দিতে হয়। ১৯৩৪ সালের ২ মে তাকে মামলা থেকে মুক্তি দিয়ে বরিশালে ও পুরীতে স্বগৃহে অন্তরীণ করে রাখে। ১৯৩৭ সালে তিনি মুক্তি পান। ১৯৩৮ সালের মার্চ মাসে তিনি বরিশাল বি.এম. কলেজের অধ্যাপনার কাজে নিযুক্ত হন। এই কলেজ সহশিক্ষা প্রবর্তন এবং পুরুষ, মহিলা অধ্যাপক নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলার অন্যতম পথপ্রদর্শক। ১৯৩৮ সালেই তার পরিচয় হয় বিপ্লবী সতীন্দ্রনাথ সেনের সাথে, যা তার রাজনৈতিক জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

আন্দোলনে যুক্ত

সেসময় সেখানকার জনসাধারণের অনুরোধে তিনি বরিশাল মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনার নির্বাচিত হন। ১৯৪২ সালের আগস্ট-আন্দোলনের সময় তিনি এই পদ ত্যাগ করেন। ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনের সময় ২৭ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিছুদিন পরে অসুস্থতার দরুন তাকে স্বগৃহে অন্তরীণ করা হয়। বছরখানেক পরে তিনি মুক্তি পান। মুক্তির পর চিকিৎসার্থে কলিকাতা আসেন। কলিকাতায় তখন মন্বন্তরের বিভীষিকা চলছে। সেই বীভৎস দৃশ্য তার মনকে পীড়িত করে তোলে। তিনি “নিখিল ভারত মহিলা সম্মেলন’-এর ভারপ্রাপ্ত সদস্য হয়ে বরিশাল ফিরে গিয়ে প্রথমে একটি সেবাকেন্দ্র গঠন করেন। সেখান থেকে চাল, দুধ ও বস্ত্র বিতরণ করা হত। পরে ঐ সেবাকেন্দ্র মহিলা শিল্পভবন’ নামে দুঃস্থ মহিলাদের একটি শিল্পকেন্দ্রে পরিণত করা হয়। তার পরিচালিকা ছিলেন ইন্দুপ্রভা মজুমদার। সরকারের নিষেধাজ্ঞা জারী থাকায় শান্তিসুধা ঘোষ তখনো বি. এম. কলেজে অধ্যাপনার কাজে যোগ দিতে পারেন নাই। ১৯৪৫ সালে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর তিনি পুনরায় ঐ কলেজে প্রবেশ করেন। বাবার মৃত্যুর পরে ১৯৫০ সালে আসানসোল গার্লস কলেজের অধ্যক্ষের পদে নিযুক্ত হন। ১৯৫১ সালে অধ্যক্ষ হিসেবেই চলে আসেন হুগলি মহিলা কলেজে এবং ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সেখানেই কাজ করেন।

আরো পড়ুন:  বাল গঙ্গাধর তিলক একজন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী, শিক্ষক এবং স্বাধীনতা কর্মী

সাহিত্যকর্ম

১৯৪৭ সালে বাংলা দ্বিখণ্ডিত হয়। দেশ স্বাধীন হবার পর থেকে যান বরিশালে থেকে ‘মন্দিরা’ পত্রিকায় লেখালেখি করতেন এবং পাঠাতেন ‘শ্রী পাকিস্তানী’ ছদ্মনামে। এরপরে শান্তিসুধা ঘোষের পিতামাতার মারা যান। পর তিনি সেখানে প্রায় সম্পূর্ণ একলা পড়ে যান।  ১৯৫০ সালে নিরুপায় শান্তিসুধা মাতৃভূমি ও কর্মভূমি বরিশালকে দূরে রেখে বাধ্য হয়ে চলে আসেন পশ্চিমবঙ্গে। সাহিত্যে তার অনুরাগ সুপরিচিত। তরুণ সংঘ থেকেই লিখতেন লীলা নাগের দীপালি সংঘের মুখপত্র ‘জয়শ্রী’ পত্রিকায়। তার বিপ্লবাত্মক প্রথম গল্প ‘ভাইফোঁটা’ এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তার রচনা প্রকাশিত হয় ‘জয়শ্রী’, ‘মন্দিরা’ ও অন্যান্য পত্রিকাতে। ‘গোলকধাঁধা’, ‘১৯৩০ সাল’, নারী’ প্রভৃতি পুস্তক তিনি প্রকাশিত করেছেন নানা সময়ে।

শান্তিসুধা ঘোষ কর্মজীবনের শেষে হুগলি মহিলা কলেজের প্রিন্সিপ্যাল ছিলেন। তার রুগ্ন শীর্ণ দেহের উপরে মস্তবড় একটা মাথার নীচে বড় বড় চোখদুটোই কথা বলে। মুখের ভাষা দিয়ে কথা বোঝাবার তার বেশি দরকার হয় না। মুখের চাইতে চোখ যে কত বেশি ভাষা প্রকাশ করতে পারে তার একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত শাস্তিসুধা ঘোষ। তিনি ৭ মে ১৯৯২ সালে মারা যান।

তথ্যসূত্র:

১. কমলা দাশগুপ্ত (জানুয়ারি ২০১৫)। স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী, অগ্নিযুগ গ্রন্থমালা ৯। কলকাতা: র‍্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন। পৃষ্ঠা ১৭১-১৭৪। আইএসবিএন 978-81-85459-82-0

Leave a Comment

error: Content is protected !!