প্রতাপ উদ্দিন আহমেদ (ইংরেজি: Pratap Uddin Ahmed, ২৫ জুন ১৯৩০ – ১৪ মার্চ ১৯৯৮) ছিলেন সাম্যবাদী শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের নেতা, সাম্যবাদী বিপ্লবী, স্বৈরতন্ত্র ও সামরিক শাসন বিরোধী লড়াকু যোদ্ধা। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বাংলাদেশের গনতান্ত্রিক আন্দোলন ও শ্রমিক আন্দোলনে একজন অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি মানুষের সংগ্রামে বলিষ্ঠ ভূমিকা নেওয়ার কারনে বার বার কারাবরন করেন। খুনি গণহত্যাকারী এরশাদ ও খালেদা জিয়ার সন্ত্রাসবাদী শাসনামলে তিনি কারাগারে আটক থেকেছেন।
১৯৩০ সালের ২৫ জুন হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ থানায় মোস্তফাপুর গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। প্রতাপ উদ্দিন আড়াই বছর বয়সে শিশু থাকা অবস্থায় তাঁর মাকে হারান । পিতা এরশাদ উল্লা ছিলেন কলকাতায় একজন সীম্যান। নবীগঞ্জ জেকে উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতাপ উদ্দিন আহমেদ পড়াশুনা করেন। ১৯৪২ সালে কলকাতায় চলে যান। একেবারে অল্প বয়সে নিজের উপার্জনের পথ বেচে নিতে হয়। বৃটিশ ইন্ডিয়া সী ইউনিয়নের সাথে কলকাতায় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। সী ইউনিয়নের কালেক্টর পদে নিযুক্ত হন। চাকুরীর পাশাপাশি লেখাপড়া চালিয়ে যান। ১৯৪৭ সালে কলকাতার শিয়ালদহ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাশ করেন। ১৯৪৯ সালে আই এ পাশ করেন। স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হয়েও রাজনৈতিক করার কারনে লেখাপড়া বেশি দুরে এগিয়ে যেতে পারেননি।
ইন্ডিয়া সী- ইউনিয়নের নেতা মনসুর আলী জ্বীলানীসহ বড় বড় শ্রমিক নেতাদের সাথে তাঁর যোগাযোগ গড়ে ওঠে। ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টির নেতা কমরেড এম এ সামাদ, আব্দুল হালিম খান, জ্যোতি বসু সহ অনেক বড় নেতাদের সংস্পর্শে আসেন তিনি। তিনি কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শ মার্কসবাদ গ্রহন করেন। ১৯৫২ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। তিনি রাজনীতিতে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করেন। শ্রমিক শ্রেণির প্রতিনিধি হয়ে রাশিয়া, চীন, কোরিয়া, কিউবা সফর করেন। ভারতের শ্রমিক রাজনীতিতে তিনি খুব সফলতা লাভ করেন।
ভারতের অবৈধ প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাসী জওহরলাল নেহরু তার রাজনীতির প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় কমরেড প্রতাপ উদ্দিনের নাগরিকত্ব বাতিল ঘোষনা করেন। ১৯৬৫ সালে ভারত সরকার কমরেড প্রতাপ উদ্দিনকে পাকিস্তানী নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং জোর করে পুর্ব পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেন। ভারত সরকারের এই নেতিবাচক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি আন্দোলন শুরু করে।
প্রতাপ উদ্দিন ভারত থেকে পুর্ব পাকিস্তান আসার পর কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সাথে তিনি যোগাযোগ করেন। কমরেড মনি সিংহ, কমরেড তোয়াহা ও আব্দুল হকের সাথে যোগাযোগ করেন। তখন পূর্ব পাকিস্তানে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিভক্তির কারণে মস্কোপন্থী-পিকিংপন্থী বিরোধ চলছিল। তিনি পিকিংপন্থী অংশের সাথে যুক্ত হন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পার্টি বিভক্ত হলে তিনি কমরেড আব্দুল হকের পক্ষে থাকেন। ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠন করা হলে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাকে বাকশালে যোগদান করার জন্য আমন্ত্রন জানালে তিনি নাকচ করে দেন।
১৯৭৭ সালে শ্রমিকদেরকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ। ১৯৮৮ সালে গঠিত হয় জাতীয় গনতান্ত্রিক ফ্রন্ট। কমরেড প্রতাপ উদ্দিন আহমেদ এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন। আমৃত্যু পর্যন্ত এই পদে তিনি বহাল ছিলেন। বাংলাদেশের শ্রমিকদের প্রতিনিধি হয়ে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন ( ILO) সভায় দুইবার প্রতিনিধিত্ব করেন। বাংলাদেশের হোটেল রেষ্টুরেন্ট ও সুইটমিট প্রতিষ্টানে শ্রম আইন লংঘনের অভিযোগ তিনি আইএলও-তে তুলে ধরেন।
শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তির দর্শন – মার্কসবাদ। তিনি মার্কসবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ, জাতীয় গনতান্ত্রিক ফ্রন্ট, বাংলাদেশ নৌ পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন তিনি প্রতিষ্টা করেছেন। নৌ পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক, বাংলাদেশ লঞ্চ লেবার এসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও এশিয়া-আফ্রিকা ফ্রি ট্রেড ইউনিয়নের বাংলাদেশের প্রধান ছিলেন। তিনি সাপ্তাহিক সেবা পত্রিকার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
১৯৯৮ সালের ১৪ মার্চ তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরন করেন। ঢাকা মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। স্বামীর মৃত্যুর আগেই তাঁর স্ত্রী মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
আরো পড়ুন
- অনিল রায় ছিলেন একাধারে বরেণ্য রাজনীতিবিদ ও নির্ভীক স্বাধীনতা সংগ্রামী
- খোকা রায় ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনন্য বিপ্লবী
- কমরেড ভারতজ্যোতি রায়চৌধুরী: এক অকুতোভয় নকশালবাদী বিপ্লবীর জীবনগাথা
- কমরেড আব্দুর রউফ মুকুল ছিলেন বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির নেতা
- কমলা দাশগুপ্ত ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলের বিপ্লবী নেতৃত্ব
- উজ্জ্বলা মজুমদার সশস্ত্র বিপ্লবী নারী ও সমাজসেবী
- ইলা সেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী
- উল্লাসকর দত্ত ছিলেন অগ্নিযুগের ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী
- মণি সিংহ ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও বামপন্থী রাজনীতিক
- ভূপেশ গুপ্ত ছিলেন বাংলা ও ভারতের সুবিধাবাদী সংশোধনবাদী নেতা
- ক্ষুদিরাম বসু বিশ শতকের বাঙলার অগ্নিযুগের মহান সশস্ত্র বিপ্লবী
- হেমচন্দ্র দাস কানুনগো ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রদূত
- রেবতী মোহন বর্মণ ছিলেন বিশ শতকের সাম্যবাদী ধারার লেখক ও বিপ্লবী
- যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপধ্যায় বা নিরালম্ব স্বামী ছিলেন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী
- সতীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন বিশ শতকের ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী
- কমরেড মুজিবর রহমান: নকশালবাড়ি আন্দোলনের এক কিংবদন্তি বিপ্লবীর জীবনগাথা
- আলতাব আলী ছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতিক ও শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের নেতা
- বাল গঙ্গাধর তিলক একজন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী, শিক্ষক এবং স্বাধীনতা কর্মী
- বিপিনচন্দ্র পাল একজন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী, লেখক, ও সমাজ সংস্কারক
- রাসবিহারী বসু ছিলেন আধুনিক বর্বর ব্রিটিশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এক ভারতীয় বিপ্লবী
- শহীদ লুৎফুন নাহার হেলেন: এক অকুতোভয় মাওবাদী বিপ্লবীর জীবন ও মহান আত্মত্যাগ
- বিপ্লবী চেতনার অগ্নিপুরুষ: কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তম
- সুনীতি চৌধুরী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী
- শান্তি ঘোষ ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী, সমাজসেবক
- লীলা নাগ ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী, লেখিকা
- বীণা দাস ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপ্লবী ও লেখিকা
- ননীবালা দেবী ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লবী ও প্রথম মহিলা রাজবন্দি
- দুকড়িবালা দেবী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রথম সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত নারী বিপ্লবী
- ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরী ছিলেন যুগান্তর দলের বিপ্লবী
- প্রতাপ উদ্দিন আহমেদ ছিলেন সাম্যবাদী শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের নেতা
- কল্যাণী দাস ছিলেন যুগান্তর দলের বিপ্লবী নেত্রী ও লেখক
- জ্যোতিষ বসু ছিলেন সাম্যবাদী বিপ্লবী, ভাষা সৈনিক, গণতান্ত্রিক যোদ্ধা
- ইন্দুসুধা ঘোষ ছিলেন যুগান্তর দলের নারী বিপ্লবী
- ইন্দুমতী সিংহ চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের একজন বিপ্লবী নেত্রী
- আজীবন বিপ্লবী নগেন সরকার: ৩২ বছরের কারাজীবন ও সাম্যবাদী সংগ্রামের ইতিহাস
- নবারুণ ভট্টাচার্য বাঙালি কবি, সাহিত্যিক, লেখক, গল্পকার এবং বিপ্লবী চিন্তাবিদ
- মুজফফর আহমদ ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সুবিধাবাদী নেতা
- মওলানা ভাসানী ছিলেন মজলুম জনগণের সাম্রাজ্যবাদবিরোধি নেতা
- অরবিন্দ ঘোষ ছিলেন অগ্নিযুগের মহানায়ক ও সিদ্ধযোগী একজন কবি ও গুরু
- মানবেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা, বিপ্লবী ও তাত্ত্বিক
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।
The ending of this article isn’t true. He wasn’t childless. After his first wife died after 25 years of marriage, he married again and had two children; a daughter and a son. His daughter is a barrister and resides in Dhaka. His son is an Aeronautical engineer who lives in the UK.