কমরেড মুজিবর রহমান নকশালবাড়ি অভ্যুত্থানের অন‍্যতম চরিত্র ও অস্ত্র প্রশিক্ষক

কমরেড মুজিবর রহমান (১৯১৭- ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯) নকশালবাড়ি অভ্যুত্থানের অন‍্যতম চরিত্র এবং অস্ত্র প্রশিক্ষক ছিলেন। বালক বয়স থেকে লড়াকু এই নেতা ছিলেন পুলিশের দুঃস্বপ্ন। দীর্ঘ অসুস্থতার পর কমরেড মুজিবর রহমানের জীবনাবসান ঘটে ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল একশো-দুই বৎসর। বছর সাতেক আগেও তাঁকে নকশালবাড়ি এলাকার যেকোনো সভা-সমিতিতে উপস্থিত থাকতে দেখতেন কমরেডরা। অশক্ত অবস্থাতেও পার্টির বৈঠকগুলোতে ছিল তাঁর নিয়মিত উপস্থিতি।[১]

কমরেড মুজিবর রহমানের জন্ম অধুনা বাংলাদেশের ঢাকা জেলায় ১৯১৭ সালে। যৌবনে ১৯৪২ সালের আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি জেলে যান এবং তাঁর জন্মশহর ঢাকা জেলে বন্দী থাকেন। জেল থেকে বের হয়ে, ১৯৪৩ সালে জীবিকার অন্বেষণে শিলিগুড়ি গভর্নমেন্ট স-মিলে ফিটার হিসেবে যোগদান করেন। এখানে শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে থাকা কমরেড কেশব সরকার, অনিল সাহাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে, শ্রমিক ইউনিয়নের কাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন।[২]  

অর্থাৎ সেই সময় তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন। তখন শিলিগুড়ি পার্টি কমিটি জলপাইগুড়ি জেলা কমিটির অধীনে ছিল। ১৯৪৫ সালে আই.এন.এ বন্দীদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন এবং ১৯৪৬-এর ফেব্রুয়ারিতে রশীদ আলী দিবস উপলক্ষ্যে শিলিগুড়িতে শ্রমিক সংগঠিত করে মিছিলে নেতৃত্ব দেন কমরেড মুজিবর রহমান। এই সময় কমরেড সুশীল চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে পার্টির দার্জিলিং জেলা কমিটি গড়ে ওঠে। তাতে জলপাইগুড়ি জেলা থেকে ৬১৭ জনকে দার্জিলিং জেলা কমিটির সঙ্গে যুক্ত করার ব্যবস্থা হয়। কমরেড মুজিবর রহমান ছিলেন তাঁদেরই একজন।

১৯৪৮ সালে ভারতের জনগণ, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার শত্রু বর্বর সন্ত্রাসী জওহরলাল নেহরু কর্তৃক কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনী ঘোষিত হলে কমরেড মুজিবর রহমান মাটিগাড়া চা বাগানে সংগঠনের কাজ করতে শুরু করেন। এই সময়ই গভর্নমেন্ট স-মিল এবং এনকো প্লাইউড কারখানায় ধর্মঘট হয়। নেতা হিসাবে তিনি গ্রেফতার হন এবং তাঁর সাড়ে পাঁচ বছরের জেল-হাজত হয়। ‍১৯৫২ সালে জেল থেকে বেরিয়ে পার্টির নির্দেশে তিনি নির্বাচনের কাজে নকশালবাড়ি এলাকায় চলে যান। তারপর তাঁকে নকশালবাড়িতেই পার্টি সংগঠনের কাজে নিয়োগ করা হয়। ১৯৫৮ সালে বিনা অনুমতিতে চা-বাগানে প্রবেশের জন্য তিনি গ্রেফতার হন। জেল থেকে বার হলে চীন-ভারত যুদ্ধের কারণে ১৯৬২ সালে পুনর্বার কারাবরণ করতে হয় তাঁকে। এই ভাবেই চলতে থাকে জীবন। বারবার গ্রেপ্তার হওয়া, আবারও সংগ্রামে নেমে পড়া।

আরো পড়ুন:  বিমলপ্রতিভা দেবী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কর্মী

নকশালবাড়ির কৃষক অভ্যুত্থানের প্রতিটা সংগ্রামী মিছিলের অগ্রভাগে কমরেড মুজিবর রহমান। ১৯৬৭ সালে ভাগচাষি বিগুল কিষানের উপর অত্যাচারী জোতদার বুদ্ধিমান তির্কীর লেঠেল বাহিনীর নির্মম হামলার বিরুদ্ধে কমরেড মুজিবরের নেতৃত্বে কৃষকেরা বুদ্ধিমানের সহোদর কংগ্রেসের ডাকসাইটে নেতা ঈশ্বর তির্কীর বন্দুককে উপেক্ষা করে তির্কীদের বাড়িতে ঘেরাও আন্দোলন চালিয়ে যান। আবার, ২৪ মে ঝড়ুজোতে পুলিশের কুখ্যাত এস আই সোনাম ওয়াঙ্গিল কৃষক প্রতিরোধে মারা গেলে, পরবর্তী পুলিশি তান্ডবের বিরুদ্ধে  সাহসের সঙ্গে তিনি মণিরামে প্রতিরোধ মিছিলে অংশগ্রহণ করেন।[৩]

নকশালবাড়ির কৃষক অভ্যুত্থানের প্রতিটা সংগ্রামী মিছিলে পুলিশের নজরে পড়েন মুজিবর রহমান। এবার গ্রেপ্তার হন ১৯৬৮ সালে, সাড়ে পাঁচ বছরের জন্য। জেল থেকে বেরিয়ে এসে দেখেন পার্টি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে, সংগঠন দুর্বল। পার্টির সাথে সংযোগের চেষ্টার পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহের সংগ্রামে নামতে হয় তাঁকে। ১৯৭৬ সালে কমরেড খোকন মজুমদারের মাধ্যমে গোপনে আবার পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ হয়। তারপর থেকে মৃত্যুর কয়েক বছর আগে পর্যন্ত তিনি সক্রিয় ছিলেন।

জীবনের শেষ চার বছর তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। শেষ দিকে স্মৃতিও তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে শুরু করে। তবে যতদিন তিনি চেতনাসম্পন্ন ছিলেন, সেই ৯৮ বছর বয়স পর্যন্ত, তিনি দুটো স্বপ্ন দেখতেন। স্বপ্ন দেখতেন বিপ্লবী সংগ্রাম দিকে দিকে আবার ছড়িয়ে পড়ছে, পার্টি বড় হয়ে উঠছে, লাভ করছে নতুন শক্তি। কমরেড মুজিবর রহমানের স্স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন হচ্ছে যুগ যুগের নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ইতিহাস। কমরেড মুজিবুর রহমানের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো সফল করার দায়িত্ব নিয়ে বিপ্লবী কমরেডরা রয়েছেন লড়াইয়ের সারিতে।

তথ্যসূত্র:

১. অনুপ সাদি, ১০ জানুয়ারি ২০২০, “কমরেড মুজিবর রহমান নকশালবাড়ি অভ্যুত্থানের অন‍্যতম চরিত্র এবং অস্ত্র প্রশিক্ষক” রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল:https://www.roddure.com/biography/mujibor-rahman/
২. শোক সংবাদ, ২ জানুয়ারি ২০২০, সিপিআইএমএল লিবারেশন, ইউআরএল: https://www.ba.cpiml.net/index.php/Deshabrati/2020/01/The-late-Naxalbari-comrade-Mujibur-Rahman
৩. কার্তিক পাল প্রকাশিত, সিপিএই (এম এল) লিবারেশনের মুখপত্র, সাপ্তাহিক দেশব্রতী, খণ্ড ২৭ সংখ্যা ১, ২ জানুয়ারি ২০২০, পৃষ্ঠা ৮

Leave a Comment

error: Content is protected !!