অনিল রায় বা অনিলচন্দ্র রায় (২৬ মে, ১৯০১ – ৬ জানুয়ারি, ১৯৫২) ছিলেন একাধারে বরেণ্য রাজনীতিবিদ, নির্ভীক স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং দূরদর্শী রাজনৈতিক চিন্তাবিদ। তাঁর চরিত্রে এক অনন্য সংমিশ্রণ ঘটেছিল—তিনি যেমন ছিলেন প্রখর বিপ্লবী ও নিঃস্বার্থ সমাজকর্মী, তেমনি ছিলেন গভীর জীবনবোধসম্পন্ন দার্শনিক। এর পাশাপাশি অসাধারণ সাহিত্যপ্রতিভার স্বাক্ষর রেখে তিনি বাংলা সাহিত্যেও এক ব্যতিক্রমী স্থান দখল করে আছেন।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
বিপ্লবী অনিলচন্দ্র রায় অবিভক্ত বাংলার মানিকগঞ্জ জেলার বায়রা গ্রামে তাঁর মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার যন্ত্রাইল ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে। তাঁর পিতা অরুণচন্দ্র রায় ছিলেন ঢাকা জেলার সরকারি শিক্ষা বিভাগের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং মা ছিলেন শরৎকুমারী দেবী।
অনিল রায় ও লীলা নাগের সমন্বিত ভাবনা
অনিলচন্দ্র ছিলেন এক বিরল ও অখণ্ড ব্যক্তিত্বের অধিকারী, যাঁর মধ্যে জ্ঞান, প্রেম ও কর্মের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল। তাঁর এই বহুমুখী সত্তা সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিচিত্রভাবে বিকশিত হয়েছে। তিনি ছিলেন এক বিশাল মহীরুহের মতো—যাঁর ব্যক্তিত্বের শাখা-প্রশাখা জীবনের নানা আঙিনায় বিস্তৃত ছিল।
এই বিচিত্রকর্মা মানুষটি তাঁর জীবনের গভীরে লুকিয়ে থাকা নানামুখী সৃজনী শক্তি ও প্রাণরসকে জনকল্যাণে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন নয়, বরং রাজনীতির মাধ্যমেই মানুষের আত্মিক মুক্তি নিশ্চিত করা। দেশমাতৃকার শৃঙ্খল মোচনের মধ্য দিয়ে তিনি আসলে নিজের জীবনের চরম সার্থকতা খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন।
অনিলচন্দ্র মনেপ্রাণে ঈশ্বরভক্ত ও আধ্যাত্মিকতায় বিশ্বাসী ছিলেন। মানুষের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা ছিল, যার ফলে দেশের পরাধীনতা ও মানুষের কষ্ট দেখে তিনি বিপ্লবী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর উচ্চমার্গের চিন্তাধারা দেশ ও মানুষের টানে মাটির কাছাকাছি নেমে এসেছিল—অর্থাৎ তিনি কেবল ধ্যানে মগ্ন না থেকে মানুষের সেবায় কঠোর পরিশ্রমে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন।
লীলা নাগ ছিলেন একজন একনিষ্ঠ কর্মী। তিনি কাজকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করতেন। তাঁর মূল চালিকাশক্তি ছিল মানবপ্রেম। যখন তাঁর এই সেবামূলক কাজের সাথে আধ্যাত্মিক চেতনার মিলন ঘটল, তখন তিনি জাগতিক কর্তব্য এবং আধ্যাত্মিক লক্ষ্য—এই দুয়ের মধ্যে এক চমৎকার সমন্বয় ঘটাতে পেরেছিলেন।
অনিলচন্দ্র রায় ও লীলা নাগ ছিলেন একে অন্যের ‘প্রাণ ইবাপরঃ’। একে অন্যের পরিপূরক। বিশ দশকে কর্মযজ্ঞের শুরুতে অনিল রায়ের হাতে গড়া সেদিনকার কোনো কোনো প্রথম সারির সহকর্মী এমনতর ইঙ্গিত করেছেন যে, লীলা নাগের বিপ্লবা সত্তা যেন স্বতন্ত্র। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে, লীলা রায়ের জীবন-সাধনাকে অনিলচন্দ্রের জাবন-সাধনা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা অন্ধের হস্তি-দর্শন-তুল্য। উভয়ের তাদাত্ম্য সহজ-সিদ্ধ।
বহু রসের ধারা
সংগীত ছিল তাঁর ‘দুঃখ-সুখের সাথী, সঙ্গী দিনরাতি’। জেল থেকে তাঁর এক ভাইকে তিনি লিখেছিলেন, ‘গান মনকে সহজ, সতেজ রাখার অব্যর্থ উপায়’। তাঁর এই সংগীতপ্রবণতা গান গেয়েই নিঃশেষ হয় নি, সংগীত রচনায়ও প্রবাহিত হয়েছিল।
বহু রসের ধারা এই একটি জীবনে মিলিত হয়েছিল। এদিক দিয়ে অনিলচন্দ্র ছিলেন বাংলার খাঁটি ছেলে নিখাদ বাঙালী। এক সিন্ধুনদ ছাড়া উত্তরা পথের সমস্ত জলাধারকে বাংলাদেশ আকর্ষণ করে গণ্ডুষে আহরণ করেছে। মনে হয়, এই নানা প্রবাহের সঙ্গে ভারতের সকল সাধনা, ভাবরস ও সংস্কৃতির ধারাও বাংলা তথ্য বাঙালিতে সমাহৃত। এমন সমন্বয়ের সাধনা ভারতের আর কোনো দেশে নাই। সংস্কৃত, হিন্দী, বাংলা, উর্দু—প্রভৃতি ভাষার মাধ্যমে এই সর্বভারতীয় ধর্ম-কর্ম-সাধনাকে আহরণ করে অনিলচন্দ্র রায় আপন জীবনে রূপায়িত করেছিলেন। এই কারণে বলেছি, অনিলচন্দ্র ছিলেন খাঁটি বাঙালী।
অনিলচন্দ্রের আদর্শনিষ্ঠ জীবন ও চারিত্রিক গঠন
অনিলচন্দ্র রায়ের জীবন ও চরিত্র সম্ভবত গড়ে উঠেছিল বঙ্কিমচন্দ্র বর্ণিত ‘কৃষ্ণচরিত্রের’ সেই মহত্তম আদর্শে। ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের মতে, মানুষের সকল মানবিক বৃত্তির মধ্যে এক সুশৃঙ্খল সামঞ্জস্য বিধান করাই হলো প্রকৃত ধর্ম। অনিলচন্দ্র তাঁর জীবনে এই গভীর ও ব্যাপক জীবনদর্শনকেই ধ্রুবতারা করেছিলেন।
শৈশব থেকেই তিনি কোমল মানবিক গুণাবলির পাশাপাশি কঠোর বীরত্ব ও পৌরুষের সাধনায় সমান আগ্রহী ছিলেন। তাঁর ব্যক্তিত্বে জ্ঞান, শিল্প এবং শক্তির এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছিল। তাই পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানচর্চা, সুরের মায়াজাল কিংবা খেলাধুলা ও কুস্তির মতো শারীরিক কসরত—সবক্ষেত্রেই তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ ও সমান অনুরাগ। তিনি বিশ্বাস করতেন, কেবল একতরফা সাধনায় নয়, বরং দেহ ও মনের সর্বাঙ্গীণ বিকাশের মাধ্যমেই প্রকৃত মনুষ্যত্ব অর্জন সম্ভব।
অনিল রায়ের জ্ঞানস্পৃহা ও ত্যাগের মহিমা
অনিলচন্দ্র কেবল আত্মোন্নতিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং নিজের অর্জিত জ্ঞান ও উৎকর্ষকে অপরের মাঝে বিলিয়ে দেওয়াকেই তিনি জীবনের সার্থকতা মনে করতেন। তিনি যা কিছু শিখতেন এবং যে দক্ষতাই অর্জন করতেন, তা তাঁর অনুসারী ও সহকর্মীদের মাঝে সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে পারলেই পরম তৃপ্তি পেতেন। তাঁর এই উদারতা ও বৈদগ্ধ্য কেবল নিজের জন্য ছিল না, ছিল সবার কল্যাণের জন্য।
শারীরিক সামর্থ্য বৃদ্ধি বা কুস্তি চর্চাই হোক, কিংবা উচ্চতর বিদ্যাশিক্ষা ও সংগীতের সাধনা—সবকিছুই তিনি সাধারণের আয়ত্তে নিয়ে আসার জন্য সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। কাউকে গানের পাঠ দেওয়া, নতুন কোনো ভাষা শেখানো কিংবা পাঠচক্রে গভীর কোনো জীবনদর্শন নিয়ে আলোচনা করার মধ্যে তিনি খুঁজে পেতেন নির্মল আনন্দ। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত সাধনা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা দশের উপকারে আসে।
অনিলচন্দ্রের জীবনদর্শনে আধ্যাত্মিকতা ও বিপ্লবের সমন্বয়
অনিলচন্দ্রের অন্তরে প্রায় একই সময়ে দুটি বিপরীতমুখী ভাবাদর্শের সংঘাত শুরু হয়। একদিকে স্বামী প্রেমানন্দ ও ব্রহ্মানন্দ মহারাজের মাধ্যমে আসা রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের আধ্যাত্মিক চেতনা, যা তাঁকে সংসারত্যাগী বৈরাগ্যের দিকে আহ্বান জানাচ্ছিল; অন্যদিকে রাজনৈতিক বিপ্লবের উত্তাল তরঙ্গ, যা তাঁকে পরাধীন দেশের মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রেরণা দিচ্ছিল। এই পরলৌকিক মুক্তি এবং ইহজাগতিক বিপ্লবের দ্বন্দ্ব তাঁর সত্তাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে।
কিন্তু আজন্ম মানবদরদী অনিলচন্দ্র মানুষের সীমাহীন দুঃখ-কষ্টকে অবজ্ঞা করে কেবল নিজের মুক্তির জন্য সমাজ ও সংসার ত্যাগ করতে পারেননি। দীর্ঘদিনের গভীর মনন ও বিচার-বুদ্ধির মাধ্যমে তিনি এই দুই বিপরীত আদর্শের মধ্যে এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটান। তিনি বুঝতে পারেন, মানুষের সেবাই হলো শ্রেষ্ঠ সাধনা।
পরবর্তী জীবনে তিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর কর্মধারা ও আদর্শের মধ্যেও এই একই আধ্যাত্মিকতা ও দেশপ্রেমের সমন্বয় খুঁজে পান। ফলস্বরূপ, তিনি ধীরে ধীরে সুভাষচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধায় পরিণত হন এবং ‘সুভাষবাদ’-এর অন্তর্নিহিত দর্শন প্রচার ও শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে নিজেকে উৎসর্গ করেন।
অনিলচন্দ্রের জীবনদর্শন: অদ্বৈতবাদ থেকে মানবতাবাদে উত্তরণ
দার্শনিক চিন্তায় অনিলচন্দ্র ছিলেন তাত্ত্বিক বিচারে ‘অদ্বৈতবাদী’—যিনি পরম সত্যকে এক ও অভিন্ন বলে জানতেন। কিন্তু ব্যবহারিক জীবনে তিনি ছিলেন ‘বহুবাদী’; অর্থাৎ জগতের বিচিত্র কর্মধারা ও সমাজের বহুমুখী কারণকে তিনি স্বীকার করতেন। তাঁর প্রখর বুদ্ধিবৃত্তি ও সংবেদনশীল হৃদয়ের মিলনে সমাজতত্ত্ব তাঁর কাছে কেবল একটি ধারণা ছিল না, বরং তা ছিল বিভিন্ন মানবিক সম্পর্কের এক নিবিড় বুনন (a nexus of relations)। এক নির্লিপ্ত আধ্যাত্মিক সত্তা হয়েও কেবল মানুষের প্রতি অমোঘ ভালোবাসার টানে তিনি এই ধুলো-মাটির পৃথিবীতে কর্মযোগী হিসেবে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন।
তবে এই উত্তরণ সহজ ছিল না। একবার তাঁর অতি ঘনিষ্ঠ এক সহকর্মীর অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণে মানুষের প্রতি তাঁর গভীর আস্থা টলে গিয়েছিল। আদর্শিক এই সংকটে তিনি হিমালয়ের বদরিকাশ্রমের শান্ত ও পবিত্র পরিবেশে আশ্রয় নেন। সেখানে নিভৃত সাধনা ও আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে তিনি মানুষের প্রতি হারানো বিশ্বাস ফিরে পান। সংশয়মুক্ত হয়ে দ্বিগুণ উদ্যমে তিনি পুনরায় বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড ও সমাজ পরিবর্তনের কঠিন পথে অগ্রসর হন।
অনিলচন্দ্রের জ্ঞানসাধনা ও বৈপ্লবিক জীবনের সূচনা
বিপ্লব আর সমাজসেবার প্রবল জোয়ারের মধ্য দিয়েই অনিলচন্দ্রের কর্মজীবনের অভিষেক ঘটেছিল। তবে কিশোর বয়সেই বিভিন্ন আদর্শের দ্বন্দ্বে তাঁর মন হয়ে উঠেছিল অস্থির। এই অস্থিরতা তাঁকে ঠেলে দিয়েছিল গভীর আত্মজিজ্ঞাসার দিকে। সত্যের সন্ধানে তিনি একদিকে দর্শন, আর অন্যদিকে রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের বইয়ের পাতায় নিমগ্ন থাকতেন; পড়তে পড়তে কত রাত যে ভোর হয়ে যেত, তার হিসাব ছিল না। তাঁর সেই সময়ের ঘুমও ছিল অতি সতর্ক—একেবারে ‘শ্বাননিদ্রা’ বা কুকুরের ঘুমের মতো সজাগ। এভাবে গভীর অধ্যয়ন, তীক্ষ্ণ বিচারবোধ আর নিরন্তর চিন্তার মধ্য দিয়ে তিনি বয়সে তরুণ হওয়া সত্ত্বেও প্রজ্ঞায় ও মননশীলতায় প্রবীণদের উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিলেন।
রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা ধীরে ধীরে তাঁর হৃদয়ে শিকড় গেড়ে বসলেও, মনের গভীরে থাকা আদর্শিক দোলাচল তখনো পুরোপুরি শান্ত হয়নি। রাজনীতির গভীরে ডুব দিলেও হয়তো তাঁর চিত্ত তখনো পুরোপুরি স্থিরতা পায়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও, দেশ ও দশের টানে তাঁর দুর্ধর্ষ বৈপ্লবিক কর্মজীবন ততদিনে পুরোদমে শুরু হয়ে গিয়েছিল।
“… বিদ্যা-বুদ্ধি, সাহস-শৌর্য এবং সর্বোপরি নেতৃত্বশক্তি কৈশোরকাল থেকেই সমবয়সীদের অপেক্ষা বহুগুণে বেশি তাঁর মধ্যে ছিল বলেই দলে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই ‘ইনার সার্কেলে’ তাঁর স্থান হয়ে যায় এবং অল্প বয়সেই স্বীয় গুণে ও অদ্ভুত সংগঠন ক্ষমতার প্রভাবে তিনি দলস্থ নেতৃবৃন্দের অন্যতমরূপে পরিগণিত হন।”
সাংগঠনিক নেতৃত্ব ও সমাজসেবার নবজাগরণ
অনিলচন্দ্র তখন হয়ে উঠেছেন জনশক্তির প্রধান উৎস; তাঁর আদর্শ ও উদ্দীপনাময় মন্ত্রে সমগ্র দলে যেন এক নতুন প্রাণের জোয়ার এল। তাঁর সেই দূরদর্শী চিন্তা কেবল তত্ত্বে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা নানামুখী জনহিতকর ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাস্তব রূপ পেতে শুরু করল। জনসেবাকে মূলমন্ত্র করে তাঁরই উদ্যোগে একে একে গড়ে উঠল আর্তমানবতার সেবায় নিবেদিত ‘সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার লিগ’ (Social Welfare League) এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণের লক্ষ্যে বিভিন্ন নৈশ বিদ্যালয়। তাঁর বিচিত্রমুখী কর্মধারা সমাজকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার এক মহৎ আন্দোলনে রূপ নিল।
গণমুখী বিপ্লব ও সামাজিক সমন্বয়
অনিল রায় প্রতিষ্ঠিত নৈশ বিদ্যালয়গুলোতে পড়তে আসত মূলত নিম্নবিত্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান এবং অভাবী শ্রমিক-মজুরদের ছোট ছোট ছেলেরা। সেই সময়ে বিপ্লবীদের কর্মকাণ্ড সাধারণত মধ্যবিত্ত হিন্দু ছাত্রদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু অনিলচন্দ্র তখনই অনুভব করেছিলেন যে, সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো বিপ্লবই সফল হতে পারে না। তিনি বুঝেছিলেন, সার্থক স্বাধীনতার জন্য পিছিয়ে পড়া মুসলিম সম্প্রদায়কে সেবার মাধ্যমে মূলধারার আন্দোলনে যুক্ত করা একান্ত প্রয়োজন। এই লক্ষ্যেই তিনি কয়েকজন মুসলিম তরুণকে বিপ্লবী আদর্শে দীক্ষিত করেছিলেন।
জনসাধারণের সঙ্গে এই নিবিড় যোগসূত্র স্থাপনের তাড়না থেকেই ১৯৩৮ সালে জেল (ডিটেনশন) থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি এক সাহসী পদক্ষেপ নেন। নিজ জন্মগ্রাম, মুসলিম কৃষক-প্রধান বায়রা-তে সহধর্মিণী লীলা নাগ ও অন্যান্য সহকর্মীদের সহযোগিতায় তিনি একটি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল—স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বতঃস্ফূর্ত আর্থিক সাহায্য ও চাঁদার মাধ্যমেই এই বিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল। এটি ছিল তাঁর অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী চেতনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আর্তমানবতার তরে উৎসর্গীকৃত প্রাণ
অনিলচন্দ্রের চরিত্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর গভীর মানবতাবোধ ও সেবার প্রতি অবিচল নিষ্ঠা। একবার নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দের স্নান মেলায় সেবাকার্য চলাকালে এক ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে আসে। প্রবল ঝড়ে সেবকদের তাঁবু যখন লন্ডভন্ড হওয়ার উপক্রম, তখন অনিলচন্দ্র তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে আপ্রাণ চেষ্টায় তাঁবুর দড়ি টেনে ধরে তা রক্ষা করার চেষ্টা করছিলেন। ঝড় থামার পর সবাই নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরলেও দেখা গেল অনিলচন্দ্র সেখানে নেই। অনেক খোঁজাখুঁজির পর দেখা গেল—একদল তীর্থযাত্রীর হোগলাপাতার ঘর ঝড়ে উড়ে গেছে, আর অনিলচন্দ্র একাই সেই বিধ্বস্ত ঘর মেরামতে মগ্ন। নিজের ভেজা শরীরের তোয়াক্কা না করে তিনি আর্তের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন।
জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত আর যন্ত্রণার মাঝেও মানুষের প্রতি ভালোবাসাই ছিল তাঁর একমাত্র পরম তৃপ্তি। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে ছোট ভাইকে লেখা এক চিঠিতে তাঁর এই জীবনদর্শন স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে:
“ব্যর্থতা আছে, নিরানন্দ আছে, তবু মনে মনে বিশ্বাস আছে—মানুষকে ভালোবাসি। এইখানেই মন তৃপ্তিতে ভরিয়া যায়।”
অনিলচন্দ্রের স্নেহ ও মমতার অমিয় ধারা কেবল তাঁর পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা তাঁর সহকর্মীদের জীবনকেও সিক্ত করেছিল। তাঁর হৃদয়ের এই কোমলতার এক অনন্য পরিচয় পাওয়া যায় এক সহকর্মীর স্মৃতিচারণায়। গভীর রাতে যখন হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে ক্লান্ত সহকর্মীরা গভীর ঘুমে মগ্ন থাকতেন, তখন অনিল রায় নিজে জেগে থাকতেন পাহারাদারের মতো। পাছে মশার কামড়ে কোনো সহকর্মীর তন্দ্রা ভেঙে যায়, সেই আশঙ্কায় তিনি সারা রাত জেগে তাঁদের হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতেন। নেতার এই মাতৃসুলভ মমতা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা তাঁর অনুসারীদের কেবল ধন্যই করেনি, বরং তাঁদের আদর্শিক বন্ধনকে করেছিল আরও সুদৃঢ়।
শ্রীসঙ্ঘ ও অনিলচন্দ্রের বৈপ্লবিক মেধা-চর্চা
অনিল রায় প্রতিষ্ঠিত ‘সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার লিগ’ কালক্রমে বাংলা ‘শ্রীসঙ্ঘ’ নাম ধারণ করে। তাঁর নেতৃত্বে লোকসেবা ও বৈপ্লবিক প্রস্তুতি—এই দুই ধারা সমান্তরালে চলতে থাকে। কর্মী সংগ্রহের ক্ষেত্রে অনিলচন্দ্র এক সম্পূর্ণ নতুন ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রবর্তন করেন। সেই সময় প্রচলিত একটি ভ্রান্ত ধারণা ছিল যে, মেধাবী ছাত্ররা বিপ্লবের পথে অকেজো এবং তারা কেবল নিজেদের জীবন বা ‘ক্যারিয়ার’ গড়তেই ব্যস্ত থাকবে। অনিলচন্দ্র এই ধারণাকে আমূল পাল্টে দিলেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন, বুদ্ধিদীপ্ত ও মেধাবী তরুণেরাই বিপ্লবের প্রকৃত শক্তি হতে পারে। তাই তিনি বেছে বেছে স্কুল-কলেজের তুখোড় ছাত্রদের শ্রীসঙ্ঘে অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করেন। দলের কর্মীদের প্রতি তাঁর কঠোর নির্দেশ ছিল—প্রতিটি ক্লাসের মেধা তালিকায় প্রথম সারিতে থাকা অন্তত দশজন ছাত্রকে সংগঠনের আওতায় আনতে হবে। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে এবং কঠোর শৃঙ্খলাবোধের কারণে মেধাবীদের বিপ্লবে যুক্ত করার এই দুঃসাহসী পরিকল্পনা বাস্তব রূপ লাভ করেছিল।
লীলা নাগ ও দীপালি সঙ্ঘ: নারী জাগরণের এক অনন্য অধ্যায়
১৯২৩ সালে বিপ্লবী লীলা নাগের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে ‘দীপালি সঙ্ঘ’। তাঁরই ঐকান্তিক নিষ্ঠা ও দূরদর্শী ভাবনায় এই সঙ্ঘ প্রতি বছর আয়োজিত করত অভূতপূর্ব ও সুপরিকল্পিত সব প্রদর্শনী। বাংলার ইতিহাসে সম্পূর্ণভাবে মহিলাদের একক প্রচেষ্টায় এ ধরনের প্রদর্শনী ছিল সে সময় এক যুগান্তকারী ঘটনা।
দীপালি প্রদর্শনীর এই মহৎ কর্মযজ্ঞে সর্বদা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিত ‘শ্রীসঙ্ঘ’। উল্লেখ্য, যে মহীয়সী নারী এককালে ছিলেন অনিল রায়ের সতীর্থা, দেশমাতৃকার মুক্তির লড়াইয়ে তিনিই হয়ে ওঠেন তাঁর যোগ্য সহকর্মিণী। কালক্রমে আদর্শের এই গভীর মেলবন্ধন তাঁদের পৌঁছে দেয় পরিণয়ের সোপানে; ১৯৩৯ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
দীপালি সঙ্ঘ ও শ্রীসঙ্ঘ: বিপ্লব ও জাগরণের এক অনন্য গাথা
১৯২৩ সালে বিপ্লবী লীলা নাগের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘দীপালি সঙ্ঘ’। তাঁরই অনন্য সাধারণ ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই সঙ্ঘ প্রতি বছর আয়োজন করত নিখুঁত সব প্রদর্শনী। বাংলার ইতিহাসে সম্পূর্ণভাবে মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত এই উদ্যোগটি ছিল সে সময়ের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। দীপালি প্রদর্শনীর এই মহতী কর্মকাণ্ডে সর্বদা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিত বিপ্লবী দল ‘শ্রীসঙ্ঘ’। উল্লেখ্য, যে মহীয়সী নারী এককালে অনিল রায়ের সতীর্থা ছিলেন, তিনিই কালক্রমে বিপ্লব-সাধনার সুযোগ্য সহকর্মী হয়ে ওঠেন এবং ১৯৩৯ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
অন্যদিকে, ১৯২১ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে অনিলচন্দ্র ও তাঁর সহকর্মীদের ঐকান্তিক কর্মনিষ্ঠায় শ্রীসঙ্ঘের সাংগঠনিক শক্তি ঢাকা শহরের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিভিন্ন জেলা ও গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। বাঁকুড়া, বর্ধমান, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালি ও সিলেটে গড়ে ওঠে সঙ্ঘের শক্তিশালী বিপ্লবী কেন্দ্র। এমনকি, ১৯৩০ সালে মোহনদাস গান্ধীর পরিচালিত লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনেও এই সঙ্ঘের সঙ্গে যুক্ত কোনো কোনো স্থানীয় প্রতিষ্ঠান সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে বাংলার মুক্তিসংগ্রামকে আরও বেগবান করেছিল।
দাঙ্গা প্রতিরোধে অকুতোভয় অনিল রায়
১৯২৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগুনে যখন ঢাকা শহর তপ্ত হয়ে উঠেছিল, তখন অনিলচন্দ্রের অসীম সাহসিকতা এক কিংবদন্তি হয়ে দেখা দেয়। রাজপথ যখন উন্মত্ত আততায়ী আর দাঙ্গাকারীদের দখলে, ঠিক তখন মাত্র জনতিনেক সহকর্মীকে নিয়ে কোনো প্রকার মরণাস্ত্র ছাড়াই খালি হাতে দাঙ্গাকারীদের রুখে দিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি।
অনিলচন্দ্র ও তাঁর সঙ্গীদের সেই প্রতিরোধ ছিল এতটাই প্রবল, আন্তরিক এবং তেজোদীপ্ত যে, সশস্ত্র দাঙ্গাকারীরা তাঁদের বীরত্বের সামনে পিছু হটতে বাধ্য হয়। প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় তাঁর এই অভাবনীয় বলিষ্ঠতা ঢাকার ইতিহাসে আজও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
জাতীয় রাজনীতিতে পদার্পণ: ফরিদপুর থেকে লাহোর
বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি অনিল রায় জাতীয় রাজনীতির মূল ধারায়ও ছিলেন সমান সক্রিয়। ১৯২৫ সালে একদল একনিষ্ঠ সহকর্মীকে নিয়ে তিনি ফরিদপুর কংগ্রেস অধিবেশনে যোগদান করেন। তাঁর এই রাজনৈতিক তৎপরতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়, যার প্রতিফলন ঘটে ১৯২৮ সালের কলকাতা কংগ্রেসে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতিতে।
সর্বোপরি, ১৯২৯ সালের ঐতিহাসিক লাহোর অধিবেশনেও তিনি সগৌরবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। একের পর এক এই গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে যোগদান অনিলচন্দ্রের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং দেশমাতৃকার মুক্তির লড়াইয়ে তাঁর অবিচল অঙ্গীকারেরই বহিঃপ্রকাশ।
অগ্নিগর্ভ সময় ও কারাবরণ: খণ্ড-বিপ্লবের উত্তাল তরঙ্গ
শিক্ষা ও সুসংবদ্ধ সাংগঠনিক কাজে অনিলচন্দ্র যখন আত্মনিয়োগ করেছিলেন, ঠিক তখনই চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ভারতের বিপ্লবী ইতিহাসে এক নতুন ও অগ্নিঝরা অধ্যায়ের সূচনা করে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম তখন নৈরাজ্যবাদ বা বিচ্ছিন্ন কর্মকাণ্ডের গণ্ডি পেরিয়ে সশস্ত্র ‘খণ্ড-বিপ্লবে’র স্তরে উন্নীত হয়েছে। এই বৈপ্লবিক রূপান্তর ব্রিটিশ প্রশাসনের ভিত নাড়িয়ে দেয়।
ফলস্বরূপ, দেশজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড় আর দমন-পীড়ন। চট্টগ্রাম বিদ্রোহের রেশ কাটতে না কাটতেই অনিলচন্দ্রকে কারারুদ্ধ করা হয়। আড়ালে থেকে শ্রীসঙ্ঘের শক্তিসঞ্চয়ের যে নিরলস প্রচেষ্টা তিনি চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত ঔপনিবেশিক পুলিশের সন্ধানী চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি। গোয়েন্দাদের সতর্ক দৃষ্টিতে ধরা পড়ে যায় তাঁর দূরদর্শী পরিকল্পনা, আর দেশপ্রেমের অপরাধে তাঁকে বরণ করতে হয় কারাজীবন।
বিপ্লবের সেই উত্তাল ধারার প্রতি সংহতি জানিয়ে এবং বৈদেশিক শাসনের মূলোৎপাটনে সারা দেশে কংগ্রেসের আইন অমান্য আন্দোলন এক নতুন মাত্রায় রূপ নেয়। ঠিক তখনই মুক্তিপাগল বিপ্লবীদের সশস্ত্র তৎপরতা সারা দেশে বিদ্যুতের ঝলকানির মতো খেলে যায়, যা ইংল্যান্ডের রাজশক্তিকে তটস্থ করে তুলেছিল। এই বৈপ্লবিক আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনিল রায়ের নেতৃত্বাধীন শ্রীসঙ্ঘ পূর্ণ শক্তিতে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং মুক্তি সংগ্রামের সেই অগ্নিগর্ভ পথে নিজেদের একনিষ্ঠভাবে উৎসর্গ করে।
মার্কসবাদ সম্পর্কে দ্বিধা
১৯৩০ সালের দিকে বৈপ্লবিক রাজনীতির অন্দরে সূচিত হয় এক গভীর আদর্শিক দ্বন্দ্ব। বন্দিশিবিরের চার দেয়ালের মাঝে বিভিন্ন বিপ্লবী দলের কর্মীদের মনে তৎকালীন প্রথাগত সশস্ত্র বিপ্লবের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় দানা বাঁধতে শুরু করে। মোহনদাস গান্ধীর নেতৃত্বে সূচিত ব্যাপক গণআন্দোলনের জোয়ার দেখে অনেক বিপ্লবীর মনেই এই বোধ জন্মায় যে, পুরোনো ধাঁচের বিচ্ছিন্ন নৈরাজ্যবাদী বৈপ্লবিক তৎপরতা হয়তো তার প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে।
ঐতিহাসিক সেই মানসিক অস্থিরতা ও শূন্যতার সন্ধিক্ষণে ‘সাম্যবাদ’ এক নতুন ও প্রবল আকর্ষণে বিপ্লবীদের চেতনার দ্বারে করাঘাত করে। বিচার-বিশ্লেষণের গভীরে না গিয়েই অনেক বিপ্লবী কর্মী এই নব্য স্রোতের মোহে গা ভাসিয়ে দেন। কিন্তু অনিল রায় ছিলেন তাঁর আদর্শিক অবস্থানে হিমালয়ের মতো অটল। সাম্যবাদের মূল ভিত্তি—অর্থাৎ ‘বস্তুবাদ’-এর সঙ্গে তাঁর আধ্যাত্মিক ও চারিত্রিক দর্শনের বিরোধ ছিল চিরন্তন। মার্কসবাদী জীবনদর্শন কিংবা ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যাকে তিনি কোনোকালেই অন্তরে স্থান দেননি; বরং দেশপ্রেমের এক ভিন্নতর ও গভীরতর মহিমায় বিশ্বাসী অনিলচন্দ্রের কাছে এই মতবাদ ছিল একান্তই অগ্রাহ্য।
প্রচলিত জরাজীর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং সমাজতন্ত্রের অপরিহার্যতা অনিলচন্দ্রের প্রগতিশীল চিন্তাধারায় গভীর স্বীকৃতি পেয়েছিল। তবে তাঁর এই সমাজতন্ত্র ছিল এক অনন্য সমন্বয়—যেখানে পরিবর্তিত আর্থিক কাঠামোর সাথে ভারতীয় ঐতিহ্য ও স্বাধীন সত্তার এক সর্বাঙ্গীণ মিলন ঘটানোর প্রয়াস ছিল। মূলত এই সমন্বয় সাধনের প্রচেষ্টাতেই তাঁর আদর্শিক দ্বন্দ্বর সূত্রপাত।
নিজস্ব তীক্ষ্ণ বিচারবুদ্ধি ও গভীর ইতিহাসবোধ থেকে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, কোনো মতবাদই দেশ ও কালের সীমানা ছাড়িয়ে চিরন্তন হতে পারে না। তাই দেশ-কাল-পাত্রভেদে জীবনদর্শনের বিবর্তন অনিবার্য। এই যৌক্তিক কারণেই তিনি মার্কসবাদকে সমাজ বা জীবন দর্শনের চূড়ান্ত ও শেষ কথা হিসেবে মেনে নিতে পারেননি।
কেবলং শাস্ত্রমাশ্রিত্য ন কর্তব্য বিনিময়ঃ।
যুক্তিহীনে বিচারে তু ধর্মহানিঃ প্রজায়তে।
কেবল শাস্ত্রের অন্ধ অনুকরণে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সমীচীন নয়। কারণ, যুক্তিহীন ও বিচারহীন ধর্মাচরণ প্রকৃত সত্যকে আড়াল করে, যার ফলে ধর্মের প্রকৃত মাহাত্ম্যই ক্ষুণ্ণ হয়।
মহাভারতের সেই শাশ্বত নির্দেশকে সত্য নির্ধারণ ও আদর্শিক দ্বন্দ্ব নিরসনের অমোঘ পথ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন অনিলচন্দ্র। মার্কসবাদের বিকল্প সন্ধান এবং ডায়ালেকটিকস বা দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের জটিল জাল ছিন্ন করে সমাজ বিবর্তনের মৌলিক সূত্রটি আবিষ্কারই ছিল তাঁর লক্ষ্য। এই গভীর অধ্যয়ন, নিরলস মনন আর মননশীল বিচার-বিশ্লেষণেই তিনি তাঁর দীর্ঘ কারাবাসের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করেন।
সুভাষ চন্দ্র বসুর সঙ্গে জীবনদর্শনের ঐক্য
১৯৩৮ সালে কারামুক্তির পর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক আদর্শ ও জীবনদর্শনের মাঝে অনিল রায় তাঁর দীর্ঘ লালিত চিন্তাধারার এক অপূর্ব মেলবন্ধন খুঁজে পান। অচিরেই নেতাজির সাথে অনিলচন্দ্র ও লীলা রায়ের ব্যক্তিগত নৈকট্য এক গভীর আস্থায় রূপ নেয়, যা তাঁদের দুজনকে নেতাজির রাজনৈতিক সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য সহযোদ্ধায় পরিণত করে। এর মাধ্যমেই অনিলচন্দ্র ও লীলা রায়ের ব্যক্তিগত জীবনে এবং তাঁদের সংগঠনের ইতিহাসে এক নতুন ও সমৃদ্ধতর অধ্যায়ের সূচনা হয়।
সেই থেকে আমৃত্যু তাঁরা নেতাজির জীবনবাদকে ভিত্তি করে মার্কসবাদের বিকল্প হিসেবে এক সমন্বিত আদর্শ প্রতিষ্ঠায় নিজেদের মনন ও কর্মকে উৎসর্গ করেন। তাঁদের সেই দর্শনের মূল সুর ছিল—কেবল জড় জীবন বা জাগতিক ভোগবিলাসই শেষ কথা নয়; বরং পার্থিব জীবনের অন্তরালে আধ্যাত্মিকতাকে এবং জড়শক্তির মাঝে চিৎ-শক্তিকে জাগ্রত করাই হলো মানবজীবনের সার্থকতা। এই দুইয়ের সুষম সমন্বয়ই ভারতের শাশ্বত বৈশিষ্ট্য, যা জাগতিক সমৃদ্ধিকে অস্বীকার না করেও তাকে আত্মিক মহিমায় পূর্ণতা দেয়। অনিলচন্দ্র ও লীলা রায়ের যাপিত জীবনের প্রতিটি ক্ষণে এই সমন্বিত সামঞ্জস্যের সুরই যেন এক সুমধুর সামগান হয়ে ধ্বনিত হয়েছে।
এক চিরঞ্জীব বিপ্লবীর মহাপ্রয়াণ: অনিল রায়ের অবিনশ্বর উত্তরাধিকার
১৯৪২ সালের জানুয়ারিতে তৃতীয়বার কারাবরণের পূর্বমুহূর্ত থেকে শুরু করে ১৯৪৬ সালে কারামুক্তির পর শেষ নিশ্বাস ত্যাগ পর্যন্ত—এই সংক্ষিপ্ত অথচ প্রদীপ্ত কালখণ্ডে অনিল রায় নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। ফরোয়ার্ড ব্লকের সাংগঠনিক কাজে ভারতব্যাপী তাঁর অতুলনীয় কর্মতৎপরতা এবং ঢাকা, কলকাতা ও নোয়াখালির দাঙ্গায় আর্তের সেবা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় তাঁর অকুতোভয় ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। দেশবিভাগের প্রবল বিরোধিতা এবং ভারতের সংস্কৃতি ও সংগ্রামী ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর অবিচল অনুরাগ তাঁকে দান করেছিল এক দুর্লভ ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ব্যক্তিত্ব।
রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকট উত্তরণে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী, ওজস্বী ভাষণ এবং সুভাষবাদী আদর্শ প্রচারে তাঁর দুর্জয় নিষ্ঠা আজও সমভাবে প্রাসঙ্গিক। কেবল রাজনীতির ময়দানেই নয়—সংগীত, কাব্য ও প্রবন্ধ রচনায় তাঁর যে প্রোজ্জ্বল মেধা প্রতিফলিত হয়েছে, তা এক বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে। এই বিচিত্রকর্মা পুরুষের অকাল প্রয়াণ ভারতের সমন্বয়-সমৃদ্ধ দীর্ঘ সাধনায় যেন এক অকস্মাৎ ছেদ টেনে দিয়েছে। তাঁর এই মহাপ্রয়াণ কেবল একটি রাজনৈতিক দলের শূন্যতা নয়, বরং সমগ্র ভারতের জন্য এক অপূরণীয় ও সুদূরপ্রসারী জাতীয় ক্ষতি।
মেধা ও সৃজনশীলতার অনন্য স্বাক্ষর: অনিল রায়ের সারস্বত সাধনা
অনিল চন্দ্র রায়ের পাণ্ডিত্য কেবল রাজনৈতিক ময়দানেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তাঁর বৌদ্ধিক গভীরতার প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর রচিত কালজয়ী গ্রন্থাবলিতে। ‘নেতাজীর জীবনবাদ’, ‘ধর্ম ও বিজ্ঞান’ এবং ‘সমাজতন্ত্রীর দৃষ্টিতে মার্কসবাদ’ প্রভৃতি গ্রন্থে তিনি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপটে জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রের এক অপূর্ব সমন্বয় সাধন করেছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, ভারতের নিজস্ব সমাজতান্ত্রিক ভাবনা হতে হবে তার মাটি ও সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত।
সৃজনশীল শিল্পের জগতেও তাঁর বিচরণ ছিল সমান স্বাচ্ছন্দ্যের। তিনি ‘নেতাজির ডাক’ নামক একটি অনন্য নৃত্যনাট্য রচনা ও পরিচালনা করেন, যা তাঁর শিল্পীসত্তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর সমগ্র রচনাবলীর সংকলন ‘নবগীতিকা’-তে তাঁর চিন্তাধারা ও সাহিত্যিক প্রতিভার অক্ষয় স্বাক্ষর মুদ্রিত রয়েছে।[১]
মৃত্যু
দুর্ভাগ্যবশত এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ ১৯৫২ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যান্সারের মারণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন। তাঁর এই প্রস্থান ভারতীয় রাজনীতি ও মননশীলতার জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করেছে।
আরো পড়ুন
- অনিল রায় ছিলেন একাধারে বরেণ্য রাজনীতিবিদ ও নির্ভীক স্বাধীনতা সংগ্রামী
- খোকা রায় ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনন্য বিপ্লবী
- কমরেড ভারতজ্যোতি রায়চৌধুরী ছিলেন একজন মহান নকশালবাদী বিপ্লবী
- কমরেড আব্দুর রউফ মুকুল ছিলেন বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির নেতা
- কমলা দাশগুপ্ত ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলের বিপ্লবী নেতৃত্ব
- উজ্জ্বলা মজুমদার সশস্ত্র বিপ্লবী নারী ও সমাজসেবী
- ইলা সেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী
- উল্লাসকর দত্ত ছিলেন অগ্নিযুগের ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী
- মণি সিংহ ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও বামপন্থী রাজনীতিক
- ভূপেশ গুপ্ত ছিলেন বাংলা ও ভারতের সুবিধাবাদী সংশোধনবাদী নেতা
- ক্ষুদিরাম বসু বিশ শতকের বাঙলার অগ্নিযুগের মহান সশস্ত্র বিপ্লবী
- হেমচন্দ্র দাস কানুনগো ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রদূত
- রেবতী মোহন বর্মণ ছিলেন বিশ শতকের সাম্যবাদী ধারার লেখক ও বিপ্লবী
- যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপধ্যায় বা নিরালম্ব স্বামী ছিলেন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী
- সতীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন বিশ শতকের ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী
- কমরেড মুজিবর রহমান নকশালবাড়ি অভ্যুত্থানের অন্যতম চরিত্র ও অস্ত্র প্রশিক্ষক
- আলতাব আলী ছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতিক ও শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের নেতা
- বাল গঙ্গাধর তিলক একজন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী, শিক্ষক এবং স্বাধীনতা কর্মী
- বিপিনচন্দ্র পাল একজন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী, লেখক, ও সমাজ সংস্কারক
- রাসবিহারী বসু ছিলেন আধুনিক বর্বর ব্রিটিশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এক ভারতীয় বিপ্লবী
- লুৎফুন নাহার হেলেন ছিলেন ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী
- আবু তাহের ছিলেন সাম্রাজ্যবাদের যুগের বামপন্থী সমাজগণতন্ত্রী বিপ্লবী
- সুনীতি চৌধুরী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী
- শান্তি ঘোষ ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী, সমাজসেবক
- লীলা নাগ ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী, লেখিকা
- বীণা দাস ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপ্লবী ও লেখিকা
- ননীবালা দেবী ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লবী ও প্রথম মহিলা রাজবন্দি
- দুকড়িবালা দেবী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রথম সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত নারী বিপ্লবী
- ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরী ছিলেন যুগান্তর দলের বিপ্লবী
- প্রতাপ উদ্দিন আহমেদ ছিলেন সাম্যবাদী শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের নেতা
- কল্যাণী দাস ছিলেন যুগান্তর দলের বিপ্লবী নেত্রী ও লেখক
- জ্যোতিষ বসু ছিলেন সাম্যবাদী বিপ্লবী, ভাষা সৈনিক, গণতান্ত্রিক যোদ্ধা
- ইন্দুসুধা ঘোষ ছিলেন যুগান্তর দলের নারী বিপ্লবী
- ইন্দুমতী সিংহ চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের একজন বিপ্লবী নেত্রী
- নগেন সরকার ছিলেন বাংলাদেশের মার্কসবাদী-লেনিনবাদী বিপ্লবী রাজনীতিবিদ
- নবারুণ ভট্টাচার্য বাঙালি কবি, সাহিত্যিক, লেখক, গল্পকার এবং বিপ্লবী চিন্তাবিদ
- মুজফফর আহমদ ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সুবিধাবাদী নেতা
- মওলানা ভাসানী ছিলেন মজলুম জনগণের সাম্রাজ্যবাদবিরোধি নেতা
- অরবিন্দ ঘোষ ছিলেন অগ্নিযুগের মহানায়ক ও সিদ্ধযোগী একজন কবি ও গুরু
- মানবেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা, বিপ্লবী ও তাত্ত্বিক
তথ্যসূত্র
১. ক্ষিতীশচন্দ্র রায়, অনিল রায় রচিত হেগেলীয় দর্শন গ্রন্থে সংক্ষিপ্ত জীবনী, জয়শ্রী প্রকাশন, কলকাতা, শ্রাবণ ১৩৬৫, পৃষ্ঠা ছ-ড।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।