নগেন সরকার ছিলেন বাংলাদেশের মার্কসবাদী-লেনিনবাদী বিপ্লবী রাজনীতিবিদ

কমরেড নগেন সরকার (ইংরেজি: Nagen Sarkar, ১৮৯৭ – ১৩ অক্টোবর, ১৯৮১) ছিলেন বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহের সাম্যবাদী ধারার মার্কসবাদী-লেনিনবাদী বিপ্লবী রাজনীতিবিদ। তিনি বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ১৯৭৭-৮১ সময়কালে দায়িত্ব পালন করেন।

নগেন সরকার বর্তমান বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল উপজেলার তালজাঙ্গা গ্রামে তালুকদার পরিবারে ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। কমরেড নগেন সরকারের পিতা গোপীনাথ সরকার ছিলেন তালজাঁঙ্গার জমিদার রাজেন্দ্র চন্দ্র রায়ের নায়েব বা সরকার।

নগেন স্কুলজীবন থেকেই স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র বিপ্লবীদের দল ‘অনুশীলন’ গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এ সময় তিনি নবম ও দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন বলে তার আত্মীয়দের কাছ থেকে জানা যায়। ১৯২৩ সালে বোমা বহনের দায়ে গ্রেফতার হয়ে এক বছর পর ছাড়া পান। মীরাট ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেফতার হয়ে ১৯৩০ সালে তিনি জেলে যান। এর কিছুদিন আগে ইয়াং কমরেডস লীগ নামে কলকাতায় একটি সংগঠন আত্মপ্রকাশ করলে কমরেড নগেন সরকার ছিলেন তার নেতৃস্থানীয় সংগঠক। তিনি কিশোরগঞ্জে ইয়াং কমরেডস লীগ গঠন করেন।

ইয়াং কমরেডস লীগের সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শের প্রতি যেমন আকর্ষণ ছিল, তেমনিভাবে লীগের সংগঠকরা জোতদারি-মহাজনী শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে কৃষকদের সংগঠিত করে মহাজনী শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে উদ্যোগী ভূমিকা নিতেন। তারই অংশ হিসেবে তিনি কিশোরগঞ্জ থেকে ১০ মাইল দূরে পাকুন্দিয়া উপজেলায় মহাজনী শোষণের বিরুদ্ধে কৃষক অভ্যুত্থান সংগঠিত করার উদ্যোগী ভূমিকা নেন।

১৯৩০ সালে পাকুন্দিয়ায় কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের মহাজনী শোষণের বিরুদ্ধে প্রথম কৃষক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। মহাজনী শোষণের বিরুদ্ধে এই সংগ্রাম বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা স্বতঃস্ফূর্তরূপে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের বাড়ি কৃষকরা ঘিরে ফেললে তিনি বন্দুকের গুলিতে হাতেম আলীসহ আটজন কৃষককে হত্যা করেন। গুলির মুখে কৃষকরা পিছু হটলে কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের বাড়িতে গৃহভৃত্য হিসেবে কর্মরত মুসলিম পরিবারের এক সন্তান দৌড়ে এসে কৃষকদের খবর দেন যে, তার বন্দুকের গুলি ফুরিয়ে গেছে। তখন কৃষকরা আবারও সংঘবদ্ধ হয়ে কৃষ্ণচন্দ্রের বাড়িতে আক্রমণ করে তাকে হত্যা করেন। তার সিন্দুক ভেঙে কৃষকদের বন্ধকি জমির যে দলিল দেওয়া ছিল, তা পুড়িয়ে দেন।

আরো পড়ুন:  জওহরলাল নেহরু ভারতের জনগণ, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার শত্রু সন্ত্রাসবাদী

কিশোরগঞ্জের অন্যান্য গ্রামাঞ্চলেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু অন্য কোথাও মহাজনকে হত্যার ঘটনা ঘটেনি। এই ঘটনার পর জাঙ্গালিয়া, হোসেনপুর, মঠখোলা, গোবিন্দপুরে ব্রিটিশের গুর্খা পুলিশের বর্বরোচিত আক্রমণ শুরু হয়। ঢাকা থেকে বিরাট সশস্ত্র এই গুর্খা পুলিশ বাহিনী কিশোরগঞ্জে পাঠানো হয়। বিদ্রোহী বলে সন্দেহ হলেই তাদের ওপর গুলি চালানোর হুকুম দেওয়া হয়েছিল এই বাহিনীকে। কিশোরগঞ্জের খ্রিস্টান পাদ্রি ফ্রাঙ্কলিন একটি সশস্ত্র বাহিনী তৈরি করে গুর্খা বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়। ফ্রাঙ্কলিন নিজের হাতে গুলি করে বিদ্রোহী কৃষকদের হত্যা করে। বর্বর গুর্খা পুলিশ বাহিনী গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিদ্রোহী সন্দেহে কয়েকশ’ কৃষককে হত্যা করেছে। গুর্খাদের নির্মম অত্যাচারে কৃষকরা গ্রাম ছেড়ে পাটক্ষেতে আশ্রয় নেন। আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে বহু কৃষক বাড়ি না ফিরে পাটক্ষেতেই ১০-১৫ দিন গা ঢাকা দিয়ে থাকেন। এই অমানুষিক অত্যাচারের ফলে কয়েক দিনের মধ্যেই বিদ্রোহের অবসান ঘটে। এ কৃষক অভ্যুত্থানের এই ঘটনা কমরেড নগেন সরকারের জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে পড়ে।

এই ঘটনার পর কমরেড নগেন সরকার গ্রেফতার হয়ে যান এবং ১৯৩৯ সালের দিকে তিনি ছাড়া পান। ১৯৩৯ সালে, কিশোরগঞ্জের বর্তমানে ঈশাঁখা রোডে ফায়ার ব্রিগেড অফিসে ছিল কমিউনিস্ট পার্টির কার্যালয়। এ কার্যালয়ে কমরেড নগেন সরকারের নেতৃত্বে ১০/১২ জন সহকর্মী নিয়ে একটি “কমিউন” চালু করেন। কমিউনে যারা সার্বক্ষণিকের দায়িত্বে ছিলেন তারা হলেন, কমরেড ওয়ালী নেওয়াজ খান, কটিয়াদীর সুবোধ গোস্বামী, ক্ষিতিশ চক্রবর্তী এবং কটিয়াদীর বজ্রগোস্বামী, সরারচরের ক্ষিতিশ রায়।

কিশোরগঞ্জের সেই কমিউনে এছাড়াও ছিলেন করিমগঞ্জের মরহুম জমিয়ত আলী, তাড়াইলের ধামিহা ইউনিয়নের রাহেলা গ্রামের কমরেড গঙ্গেশ সরকার, কিশোরগঞ্জে বিন্নাটি গ্রামের ডাঃ বিল্ম মঙ্গঁল চক্রবর্তী, করিমগঞ্জের জঙ্গলবাড়ী দেওয়ান কাজিম দাদ খান (কাজু মিয়া), ময়মনসিংহ শেরপুরের এহসা আলী ও ভূপেন হাজং। কমরেড নগেন সরকার ছিলেন উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের কিংবদন্তি পুরুষ কমরেড মণি সিংহের সহকর্মী। ’৪০ এর দশকে কিশোরগঞ্জে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কমরেড নগেন সরকারের বিশেষ ভূমিকা ছিল।[১]

আরো পড়ুন:  নির্মলা রায় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে একজন বিপ্লবী

১৯৪৩ সালে সর্বভারতীয় কৃষক সভার সম্মেলনের তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ওই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল নেত্রকোনা শহরের পাদদেশে। কিশোরগঞ্জের কৃষকদের সংগঠিত করে কমরেড নগেন সরকার হেঁটে মিছিল নিয়ে সম্মেলনে যোগদান করেন। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে পার্টি কংগ্রেসের আগে বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা সম্মেলনে তিনি জেলা কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৫০ সালে তিনি আবারও গ্রেফতার হন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের আগেই ছাড়া পান এবং ওই নির্বাচনে সংখ্যালঘু সংরক্ষিত আসনে নির্বাচন করে মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর মতো ব্যাপক জনপ্রিয় ও বিত্তশালী প্রার্থীর বিরুদ্ধে লড়ে সামান্য ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। ১৯৫০-এর দশকগুলোতে তিনি মনি সিংহ, ওয়ালী নেওয়াজ খান এবং অজয় রায় প্রমুখ কমিউনিস্ট রাজনীতিবিদদের সংগে একত্রে কাজ করেন। ১৯৭০-এর দশকে কাজী সালাহউদ্দীন মুকুল তার কাছে রাজনীতির প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ করেন।

কমরেড নগেন সরকার ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের পরে আবারও কারারুদ্ধ হন। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর তিনি মুক্তি লাভ করেন। ওই সময়কালেই তথাকথিত মস্কো-পিকিং বিতর্কে শেষ পর্যন্ত তিনি পিকিংপন্থিদের সঙ্গেই থাকেন। এ সময়কালে প্রকাশ্যে তিনি মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির কিশোরগঞ্জ জেলার অন্যতম নেতা হিসেবে কাজ করতে থাকেন।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী বর্বরোচিত আক্রমণের পর ভারতে পালিয়ে গিয়ে আত্মীয় বাড়িতে ওঠেন। ওই সময়কালে মস্কোপন্থি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ১৯৭২ সালে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিধাবিভক্ত হলে কমরেড সুখেন্দু দস্তিদারের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার সাম্যবাদী দলে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি পার্টির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৭৫ সালে অনুষ্ঠিত পার্টি কংগ্রেসে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। একই বছরের বিভিন্ন অভ্যুত্থান, বিদ্রোহ ও ষড়যন্ত্রের ঘটনা পরিক্রমায় পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সোভিয়েত ব্লক থেকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ব্লকে চলে যাবার এক পর্যায়ে জিয়াউর রহমানের সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে ওই সরকারকে তৎকালীন সাম্যবাদী দল (এম-এল) তোয়াহা গ্রুপ দেশপ্রেমিক সরকার হিসেবে মূল্যায়ন করে।

আরো পড়ুন:  কল্যাণী দাস ছিলেন যুগান্তর দলের বিপ্লবী নেত্রী ও লেখক

কমরেড নগেন সরকার, ননীগোপাল দত্ত, হাজী বশিরুল আলম, শাহ আলম মানিক, ফজলে হোসেন বাদশাসহ পার্টির একাংশ ওই ভ্রান্ত তত্ত্বের বিরোধিতা করতে থাকেন এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৭৭ সালের শেষ ভাগে পার্টি ভেঙে যায়। পার্টির বেশিরভাগ সদস্যই কমরেড নগেন সরকারের নেতৃত্বে সাম্যবাদী দল (এম-এল) পুনর্গঠন করলে তিনি তার সম্পাদক নির্বাচিত হন। ওই সময়ে কেন্দ্রীয় কমিটির গোপন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন কমরেড ননীগোপাল দত্ত।

১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের দিকে কমরেড নগেন সরকার তীব্র অসুস্থ হয়ে পড়লে পার্টি নেতৃবৃন্দ উদ্যোগ নিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে তাকে ভর্তি করেন। ওই সময়কালে একদিন কমরেড টিপু বিশ্বাস ও বিমল বিশ্বাস তার সাথে শেষ সাক্ষাত করেন এবং হাসপাতালে দেখতে যান। কিন্তু তিনি তখন এতটাই অসুস্থ ছিলেন যে, তাদের সঙ্গে কথাও বলতে পারেননি। ১৯৮১ সালের ২৬ জুন তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ৩২ বছর কারাজীবন এবং অনেক সময় আত্মগোপন জীবন তাকে ভোগ করতে হয়েছে। বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলনে নিবেদিত প্রাণ কমরেড নগেন সরকারের জনস্বার্থে আত্মত্যাগ যুগে যুগে বিপ্লবীদের অনুপ্রেরণা জোগাবে বলে।

তথ্যসূত্র

১. ডা. এনামূল হক ইদ্রিস, ১৫ অক্টোবর, ২০১৭, “অগ্নিযুগের বিপ্লবী কমরেড নগেন সরকার”, সাপ্তাহিক একতা, ইউআরএল: http://weeklyekota.net/printPaper.php?serial=4608

Leave a Comment

error: Content is protected !!