রেবতী মোহন বর্মণ ছিলেন বিশ শতকের সাম্যবাদী ধারার লেখক ও বিপ্লবী

রেবতী মোহন বর্মণ বা রেবতী বর্মণ (ইংরেজি: Reboti Barman, ১৯০৩ – ৬ মে, ১৯৫২) ছিলেন বিশ শতকের একজন সাম্যবাদী ধারার লেখক ও ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী বিপ্লবী। তিনি অনেকগুলো পুস্তক রচনা করে বাংলাদেশ অঞ্চলে মার্কসবাদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

রেবতী বর্মণের জন্ম ১৯০৩ সালে তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে জেলা) বর্তমান ভৈরব উপজেলাধীন শিমুলকান্দি গ্রামে। ১৯২১ সালের অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি কুমিল্লা জিলা স্কুল বর্জন করেন। ঐ বছরে অনুষ্ঠিত ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় তিনি উপস্থিত ছিলেন না। সে বছরই বরিশালে অনুষ্ঠিত রাজনৈতিক সম্মেলনে যোগদান করেন। চাঁদপুরে আসাম প্রত্যাগত চা বাগানের শ্রমিকদের উপর অত্যাচারের প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত বিখ্যাত ধর্মঘটেও তিনি অংশগ্রহণ করেন। ঐ সময় চা শ্রমিকদের ধর্মঘট সারা দেশে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ঐ সময় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তাঁর স্ত্রী বাসন্তী দেবীকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতা থেকে ছুটে এসেছিলেন। চাঁদপুরে এসে তিনি চা শ্রমিকদের সমর্থনে কাজ করেন। অসহযোগ আন্দোলন ও চা শ্রমিক ধর্মঘটে অংশগ্রহণের অভিযোগে ঐ সময় রেবতী বর্মণকে কিছুকাল কারা নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে।

রেবতী বর্মণের প্রথম জীবনে শ্রমিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ার প্রভাব তাঁর সারা জীবনে ব্যাপ্ত ছিল। পরবর্তীকালে তিনি সাম্যবাদ নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করেছেন এবং শ্রমিক আন্দোলনকে বিশ্লেষণ করে বহু গ্রন্থ লিখেছেন। তার রচিত প্রতিটি গ্রন্থই তীক্ষ্ণবুদ্ধি ও বৈপ্লবিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন। বাংলাদেশে সাম্যবাদী ধারার সাহিত্য সৃজনের প্রাথমিক পর্যায়ে তার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর লেখা বই ও প্রবন্ধাদি পড়ে বহু লোক রুশ কমিউনিস্ট পার্টি ও সাম্যবাদ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেছেন।

মেধাবী ছাত্র রেবতী বর্মণ কৈশোরে স্কুল ছাড়লেও লেখাপড়া ত্যাগ করেননি। ১৯২২ সালে কিশোরগঞ্জের আজিমুদ্দিন হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন। এরপর কলেজে পড়ার জন্য তিনি কলকাতায় যান। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে আই.এ এবং সেন্টপলস কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। অতঃপর অর্থনীতিতে এম.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এম.এ পরীক্ষায় কৃতিত্বের জন্য তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বর্ণপদক লাভ করেন। অধ্যয়ন ও সক্রিয় রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল তাঁর জীবন-দর্শন। রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী ও আদর্শভিত্তিক গ্রন্থ রচনা করে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন।

আরো পড়ুন:  বিমলপ্রতিভা দেবী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কর্মী

১৯২১ সালের অসহযোগ আন্দোলন থেমে যাবার পর দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে তিনি বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দেন। বিপ্লবী নায়ক হেমচন্দ্র ঘোষ, অনিল রায়, লীলা নাগ, ললিত মোহন বর্মণ প্রমুখের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। গুপ্ত বিপ্লবী দলের সদস্য হয়ে তিনি যুব আন্দোলন ও ছাত্র আন্দোলন সংগঠিত করেছেন। পাশাপাশি শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গেও তিনি জড়িত ছিলেন। বিপ্লবীদের মুখপত্র হিসেবে ‘বেণু’ নামে তিনি একটি পত্রিকাও প্রকাশ করেছিলেন। পত্রিকাটি ব্রিটিশ সরকারের রোষানলে পড়েছিল। এর বিভিন্ন সংখ্যা সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়েছে।

১৯৩০ সালে ডালহৌসী স্কোয়ারে কুখ্যাত পুলিশ কমিশনার টেগার্টের গাড়ির উপর বোমা হামলা হয়। টেগার্ট বেঁচে যায়, কিন্তু ঘটনাস্থলেই মারা যান বিপ্লবী অনুজা সেন। তারপর পুলিশ সারা কোলকাতা তোলপাড় করে ফেলে। চারদিকে হানা দিয়ে বিপ্লবীদের গ্রেপ্তার করতে থাকে পুলিশ। সেদিনই রেবতী বর্মণ ধরা পড়ে যান এবং বিনা বিচারে ৮ বছর কারা নির্যাতন ভোগ করেন।

১৯৩৮ সালে মুক্তিলাভের পর তিনি মার্কসবাদ-লেলিনবাদ প্রচার কাজে এবং শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করেন। মার্কসবাদ সহজবোধ্য করার জন্য তিনি ঢাকা থেকে ‘গণশিক্ষা সিরিজ’ প্রকাশ করেন। বাংলা ভাষায় সহজবোধ্যরূপে মার্কসবাদ শিক্ষাদায়ক বহু গ্রন্থ তিনি রচনা করেছেন। মার্কসের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ক্যাপিটাল’- এর বঙ্গানুবাদও করেছেন তিনি। এ গ্রন্থটি সর্বপ্রথম তিনিই বাংলায় অনুবাদ করেছেন। মার্কসবাদ ও লেলিনবাদ বিষয়ক বই প্রকাশের জন্য তিনি প্রকাশনা সংস্থাও স্থাপন করেছেন। মার্কসবাদী সাহিত্য প্রকাশের প্রখ্যাত সংস্থা ‘ন্যাশনাল বুক এজেন্সি লিমিটেড’ তার উদ্যোগেই প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এ প্রকাশনা সংস্থা থেকেই তার অধিকাংশ বই প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া বর্মণ পাবলিসিং হাউস থেকেও তার কিছু বই প্রকাশিত হয়েছে। 

তাঁর রচিত গ্রন্থের মধ্যে ‘তরুণ রুশ’, ‘মার্কসীয় অর্থনীতি’, ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন’, ‘পরিবার’, ‘হেগেল ও মার্কস’, ‘লেনিন ও বলশেভিক পার্টি’, ‘সমাজের বিকাশ’, ‘মার্কস প্রবেশিকা’, ‘ধর্ম’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তাঁর রচিত সর্বশেষ বই ‘মানব সভ্যতার উৎপত্তি ও বিকাশ’ তাঁর মৃত্যুর পর ন্যাশনাল বুক এজেন্সি লিমিটেড’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

আরো পড়ুন:  তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন জনপ্রিয় বাঙালি কথাসাহিত্যিক

১৯৪৭ সালের বাংলা বিভক্তির পরে ১৯৫১ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে তাকে বাধ্য হয়ে মাতৃভূমি ছেড়ে আগরতলা চলে যেতে হয়। ১৯৫২ সালের ৬ মে তারিখে আগরতলার কাছে মৃত্যুবরণ করেন রেবতী বর্মণ।

তথ্যসূত্র

১. জয়দুল হোসেন, অবিভক্ত বাংলার অসমাপ্ত বিপ্লব, গতিধারা, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, পৃষ্ঠা ৩০১-৩০৩।

Leave a Comment

error: Content is protected !!