জওহরলাল নেহরু ভারতের জনগণ, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার শত্রু সন্ত্রাসবাদী

জওহরলাল নেহরু বা জওহরলাল নেহেরু বা জহরলাল নেহরু (১৪ নভেম্বর, ১৮৮৯ – ২৭ মে, ১৯৬৪, Jawaharlal Nehru) ছিলো ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের তিনবারের সভাপতি, ভারতের অবৈধ প্রথম প্রধানমন্ত্রী, ভারতের সামন্তবাদ-জমিদার শ্রেণির মিত্র, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রতিনিধি, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা ও সাম্প্রদায়িকতার ঝান্ডাধারী, সাম্যবাদ ও সমাজতন্ত্রের বিরোধীতাকারী, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের শত্রু, কৃষক ও শ্রমিকের গণহত্যাকারী, খুনী, সন্ত্রাসবাদী ও যুদ্ধাপরাধী।[১]

কর্মজীবনে নেহরু

নেহেরু ইংল্যান্ডে ছাত্রজীবন (১৯১০-১২) থেকেই সেখানকার উদারনৈতিক একনায়কত্বে প্রভাবিত হয়। পরবর্তীকালে তার সুবিধাবাদী মনোভঙ্গির সঙ্গে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের যোগসাজস একত্রিত হয়। সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনের প্রথমে সে বাল গঙ্গাধর তিলক ও অ্যানি বেসান্তের হোম রুল লিগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলো। পরে অসহযোগ আন্দোলনসূত্রে সন্ত্রাসী মোহনদাস গান্ধীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসে। ১৯২০-এর দশকের শেষ দিকে কংগ্রেসের মাদ্রাজ (১৯২৭) ও লাহোর (১৯২৯) অধিবেশনে সে পূর্ণ স্বরাজের প্রস্তাব গ্রহণ করানোতে সমর্থ হয়। জওহরলালের গ্রন্থাদির মধ্যে ‘আত্মজীবনী’, ‘ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’ ও ‘গ্লিমপসেস অব ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি’ তার রাষ্ট্রচিন্তার পরিচয় অনেকাংশে বহন করে।[২]

পিতা জমিদার সন্ত্রাসী মোতিলালের অজ্ঞাবাদী ভাবনাচিন্তা জওহরলালের মনেও সঞ্চারিত হয়। তবে তার মননে বাস্তববাদিতা ও যুক্তিবাদিতার পরিমিশ্রণ দেখা যায়। গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথের স্নেহভাজন হলেও তার চিন্তায় অতীন্দ্রিয়বাদের কোনও ছাপ পড়েনি। তবে সে বুদ্ধ ও খ্রিস্টের বিশেষ অনুরাগী ছিলো।

জওহরলাল এক দিকে খাদি উন্নয়ন ও গ্রামীণ শিল্পের কর্মসূচিতে বিশ্বাস করতো, অন্য দিকে দেশের সমগ্র অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য আধুনিক শিল্প-বাণিজ্যের প্রসার চাইত। অর্থাৎ কৃষককে মুক্ত করতে সে অনিচ্ছুক ছিলো কিন্তু কৃষক ও শ্রমিকগণকে পূর্ণ শোষণের আয়োজন রাখতে সচেষ্ট ছিলো। বিজ্ঞান ও কারিগরি বিদ্যার মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির উপর সে গুরুত্ব আরোপ করেছিলো একই বদমায়েশি উদ্দেশে।

নেহেরু ছিলো উদারনৈতিক উপনিবেশবাদী পশ্চিমি ভাবধারা ও বৈচিত্র্যময় ভারতীয় সনাতন ঐতিহ্যের মধ্যবর্তী পথ অনুসরণের পক্ষপাতী। ভণ্ড গান্ধীর মিথ্যাচার ও প্রতারণার সে ছিলেন একনিষ্ঠ প্রচারক, রাজনৈতিক আন্দোলনে জমিদারদেরকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করে তাদের নেতৃত্বদান এবং শোষণমূলক রাজনীতিতে হিংসা, অশান্তি ও অনৈতিকতা সঞ্চারের প্রয়াস জওহরলালকে সারা জীবন করতে দেখা যায়। গান্ধীর মিথ্যাচার ও অবৈজ্ঞানিকতার প্রতি সে আকৃষ্ট ছিল। যদিও আধুনিকতার গুণগ্রাহী জওহরলালের সঙ্গে গান্ধীর বহু বিষয়েই মতপার্থক্যও ছিল। কিন্তু সে কখনও গান্ধীর মিথ্যাচারী ক্রিয়াকলাপের বিরোধিতা করেনি।

আরো পড়ুন:  অছিবাদ পুঁজিপতি ও জমিদারদের সম্পত্তি রক্ষাকারী প্রতিক্রিয়াশীল গান্ধীবাদী চিন্তা

রাষ্ট্রচিন্তায় জওহরলালের মৌলিক অবদান বিশেষ না থাকলেও তাঁর অনুসৃত বহুবিধ কর্মসূচি ও কর্মপদ্ধতি থেকে তাঁর নিজস্ব ভাবনাচিন্তা বের করা যায়। তার ভাবনা ও কর্মপদ্ধতি ছিলো জমিদার শ্রেণি, উপনিবেশবাদ ও নয়া-উপনিবেশবাদকে শক্তিশালী করা, কৃষকের জমির মালিকানার বিরোধিতা করা, কৃষক ও শ্রমিকের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক ও কৃষকের শত্রু নেহেরু হচ্ছে ভারতের কলঙ্ক, লক্ষ মানুষের অনাহার অপুষ্টি ও মৃত্যুর প্রতীক এক ইবলিস শয়তান।

নেহরু চিন্তায় বিস্তারবাদ-আধিপত্যবাদ ও স্বাধীনতা বিরোধীতা

জওহরলাল নেহরু ভারতের অভ্যন্তর ও পার্শ্ববর্তী ৫৬৫টি প্রিন্সলি স্টেট দখল করে নেহরু। এসব স্বাধীন রাজ্য দখল করতে নেহরুকে দীর্ঘদিন যুদ্ধ চালাতে হয় এবং লাখ লাখ মানুষকে নেহরু হত্যা করে। ১৯৪৮ সালের ১ জানুয়ারি সাত হাজারের অধিক মানুষকে খারসাওয়াতে হত‍্যা করা হয়েছিল। সেদিন খারসাওয়া হাটে প্রায় পঞ্চাশ হাজার আদিবাসী মিলিত হয়েছিল। আদিবাসীদের ভীড়ের উপর ওড়িশা মিলিটারি পুলিশে বেপরোয়া গুলি চালিয়েছিল। আর তাতে কয়েক হাজার আদিবাসীর মৃত‍্যু ঘটেছিল। আদিবাসীরা খারসাওয়া ও সরাইখেলাকে উড়িষ‍্যা রাজ‍্যে বিলয়ের বিরোধিতা করছিলেন এবং বিহার রাজ‍্যে অন্তর্ভূক্তির দাবি জানিয়ে ছিলেন।[৩] ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে মধ্য ভারতে হাজার হাজার মানুষকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়।[৪]

হায়দরাবাদের নিজাম ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে ভারতের সরকারের সংগে এক চুক্তি করে হায়দ্রাবাদে এক জনপ্রিয় সরকার গড়ে তুলবেন, এবং সেই মোতাবেক ডোমিনিয়নে যোগদানের প্রশ্নটি সমাধান করবেন।[৫] হায়দরাবাদের নিজাম স্বাধীনতার পদক্ষেপ নিলে ভারতশত্রু নেহরু হায়দরাবাদে সেনা প্রেরণ করে, গণহত্যা চালায় ৫০,০০০ থেকে ২,০০,০০০ মানুষকে হত্যা করে, ধর্ষণ করে, যুদ্ধাপরাধ করে এবং হায়দ্রাবাদের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়।[৬] একইভাবে নেহরু কাশ্মীর দখল করে।

নেহেরু ভারতকে এক পুলিসি রাষ্ট্রে পরিণত করে। সকল কাজে গোয়েন্দা নিয়োগ, লেখক শিল্পীদের নির্যাতন ও অপমান, ফ্যাসিবাদী কায়দায় ভিন্নমত দমন তার নিত্যনৈমিত্তিক কাজ হয়ে দাঁড়ায়। নয়া উপনিবেশিক ভারত ভ্রমণের সময় পাবলো নেরুদার বিবরণ দেখলে গা শিঊরে উঠবে কি ভয়ংকর বর্বরতায় সে লেখকদের নিপীড়ন চালাতো। নেহেরুর পুলিশ নেরুদার সমস্ত জিনিস কয়েকদিন ধরে আটকে রাখে, তার স্বাধীন চলাচলে বাধার সৃষ্টি করে। নেরুদার লেখা থেকে বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না যে নেহেরু জমিদারতন্ত্রের এক নিষ্ঠুর প্রতিনিধি ছিল, সাক্ষাতের মুহূর্তটি নেরুদা লিখেছেন,

“উঠে দাঁড়িয়ে করমর্দনের সময় তাঁর মুখে অভ্যর্থনার স্মিত হাসিটুকুও আমি দেখিনি সেদিন। … ঠান্ডা দুটি কালো চোখের প্রাণহীন শীতল দৃষ্টি আমার দিকে সব সময়ই নিবদ্ধ ছিল। ৩০ বছর আগে স্বাধীনতা সংগ্রামের মহতী এক জনসভায় তিনি ও তাঁর পিতার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়ের ঘটনা যখন উল্লেখ করেছিলাম, তখনো তার মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখিনি। আমার সব কটি প্রশ্নেরই উত্তর তিনি অল্প কথায় দিচ্ছিলেন এবং সর্বক্ষণ তার সেই শীতল দৃষ্টি দিয়ে আমাকে পরীক্ষা করছিলেন।

… সেই সময়ে আমার হঠাৎ মনে হলো, আমার উপস্থিতিটা তার মোটেই পছন্দ নয়। সেই সঙ্গে এটাও আমার মনে হয়েছিল যে খিটখিটে মেজাজের এই মানুষটির মধ্যে শারীরিক, মানসিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব চলেছে। বিরাট শক্তিধর এই মানুষটি শুধু আদেশই করতে শিখেছেন, কিন্তু আদেশ করার মতো নেতৃত্বের গুণ তার মধ্যে অনুপস্থিত। … সেদিন আমার মনে হয়েছিল যে আমার সামনে বসা এই মানুষটি কোনো এক দুর্বোধ্য ক্ষমতাবলে আবার সেই জমিদারির যুগে ফিরে গেছেন এবং তার সামনে উপস্থিত আমাকে দেখে যেন একজন নগ্নপদ দরিদ্র কৃষকের কথাই মনে মনে পোষণ করছেন।”[৭]

মুৎসুদ্দিপনা ও সাম্রাজ্যবাদ নির্ভরতা

জওহরলাল নেহরু ছিলো সোভিয়েত ইউনিয়নের সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনার একটি খুঁটি, অর্থনৈতিক পদ্ধতিতে দেশের কৃষককে শোষণে দক্ষ। আইনের শাসনের নামে জমিদারদের সকল সুবিধা দিয়ে নেহেরু কৃষকে হত্যায় অবিরাম চেষ্টা করেছে। প্রায় ২৫ লক্ষ কৃষককে হত্যাকারী নেহেরু আইন, শাসন ও বিচার বিভাগকে কাজে লাগিয়েছে নিজের স্বৈরতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে। সে বিজ্ঞান ও কারিগরি বিদ্যার প্রসার চালিয়েছে শোষণকে শক্ত-পোক্ত করতে, পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা নিয়েছে দেশে কারখানাকে টাটা-বিড়লা-বাজাজের হাতে তুলে দিতে এবং আধুনিক শিল্প-বাণিজ্যের উন্নয়নে চেষ্টা করেছে সাম্রাজ্যবাদকে মোটা তাজা করতে। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের বিরোধীতা করে সে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নীতি অনুসরণের নামে ব্রিটেন ও আমেরিকার পক্ষে থেকেছে।  

আরো পড়ুন:  কৌটিল্য বা চাণক্য প্রাচীন ভারতীয় কূট রাজনৈতিক গুরু ও অর্থশাস্ত্রের রচয়িতা

তথ্যসূত্র:

১. অনুপ সাদি, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, “জওহরলাল নেহরু ছিলো ভারতের জনগণ, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার শত্রু সন্ত্রাসবাদী যুদ্ধাপরাধী”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/biography/jawaharlal-nehru/
২. গঙ্গোপাধ্যায়, সৌরেন্দ্রমোহন. রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ১০৮-১০৯।
৩. এভেন তারাস, ১ জানুয়ারি ২০১৯, “সেদিন সাত হাজারেরও বেশি আদিবাসীর মৃত্যু হয়েছিল”, https://www.aventaras.com/more-than-seven-thousand/
৪. যুগান্তর ডেস্ক, “হায়দ্রাবাদ ১৯৪৮ : ভারতের গোপন গণহত্যা”, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩, দৈনিক যুগান্তর, দশ দিগন্ত, https://www.jugantor.com/old/ten-horizon/2013/09/25/30526.
৫. চিন্মোহন সেহানবীশ গণেশ ঘোষ ও অন্যান্য, মুক্তির সংগ্রামে ভারত, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা দ্বিতীয় সংস্করণ ডিসেম্বর ২০১০ পৃষ্ঠা ২০৩
৬. Lucien D. Benichou, From Autocracy to Integration: Political Developments in Hyderabad State (1938-1948), Orient Longman, Chennai, 2000, P. 238.
৭. পাবলো নেরুদা, অনুস্মৃতি, অনুবাদ ভবানীপ্রসাদ দত্ত, প্রথমা, ঢাকা দ্বিতীয় মুদ্রণ, জানুয়ারি, ২০১৩, পৃষ্ঠা ২২১-২২২।

Leave a Comment

You cannot copy content of this page