চীনের পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা

গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের বিদেশনীতি বা চীনের পররাষ্ট্রনীতি (ইংরেজি: Foreign policy/relations of China) হচ্ছে পারস্পরিক সার্বভৌমত্ব এবং ভূখন্ডগত অখন্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনাগ্রাসন, অন্য রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত ধাকা, সমতা এবং পারস্পরিক স্বার্থরক্ষা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। জাতিসংঘের অন্যান্য ১৯২টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৮০টির সাথে চীনের পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে কুক দ্বীপপুঞ্জ, নিউ এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, যেকোনো রাষ্ট্রের তুলনায় চীনের সবচেয়ে বেশি কূটনৈতিক মিশন রয়েছে।

গণপ্রজাতন্ত্রী চীন হচ্ছে আধুনিক বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন শক্তি। হাজার আজার বছরের উত্থান পতনের ইতিহাসের মধ্যে দিয়ে বিশ্বের এই প্রাচীন সভ্যতার উন্নেষ ঘটেছে। অনেক পট পরিবর্তনের পর চীন এক সমৃদ্ধ সভ্যতা ও জীবনের অঙ্গনে প্রবেশ করেছে। উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দিতে এই দেশ সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও শোষণের অভিজ্ঞতা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছে। বহু এবং দীর্ঘস্থায়ি আপসহীন সংগ্রাম এবং রক্তপাতের মাধ্যমে ১৯৪৯ সালের ১ অক্টোবর চীন প্রকৃত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন এবং দেশের আভ্যন্তরীণ শোষণবাদের হাত থেকে কোটি কোটি মানুষকে মুক্তির সন্ধান দিতে সক্ষম হয়েছে।

চীনের স্থল সীমার আয়তন ২০,০০০ কিলোমিটারের বেশি। চীনের পূর্বদিকে কোরিয়া গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, উত্তরে মাঙ্গোলিয়া, উত্তর পশ্চিমে আছে তাজাকিস্থান, কিরঘিজিস্থান এবং কাজকাস্থান। পশ্চিমে আছে পাকিস্তান ও আফগানিস্থান। দক্ষিণে নেপাল, ভারত, ভূটান, মায়নমার, এবং ভিয়েতনাম। প্রশান্ত মহাসাগরের বিশাল তটরেখা জলপথে বহির্বিশ্বের সাথে চীনের যোগাযোগ সৃষ্টি করেছে। পূর্বদিকে চীন সাগর, দক্ষিণ-পূর্ব দিকে দক্ষিণ চীন সাগরের অন্যদিকে অবস্থিত জাপান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া। সুতরাং ভৌগলিক অবস্থানের দিক থেকে বিচার করলে চীনের পররাষ্ট্রনীতিতে ভৌগলিক উপাদানের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

চীনের বিদেশনীতি প্রণয়নের সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনা

গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের মূল সংবিধানে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনা সম্বন্ধে কোনো উল্লেখ নেই। তবে জাতীয় গণ কংগ্রেসই ছিল আইন প্রনয়নের প্রধান কেন্দ্র, এই সংস্থাটিই হচ্ছে রাষ্ট্রিয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ কেন্দ্র। এই কারণে পররাষ্ট্র সংক্রান্ত বিষয়ে ও চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এই সংস্থা। কিন্তু গণ কংগ্রেসের অধিবেশন বছরে একবার অনুষ্ঠিত হয়। যদিও বিশেষ অধিবেশন আহ্বনের ব্যবস্থা হয়। কিন্তু প্রায় ৩০০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি আইনসভার পক্ষে দীর্ঘ আলোচনার পর কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়া অত্যন্ত কন্ঠসাধ্য।

প্রকৃতপক্ষে জাতীয় গণ কংগ্রেসের দায়িত্ব বহন করে স্থায়ী কমিটি। এই কমিটিতে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা থাকেন। জাতিয় গণ কংগ্রেসের দুটি আধিবেশনের মধ্যবর্তী পর্যায়ে এই স্থায়ী কমিটিই জাতিয় কংগ্রেসের সকল ক্ষমতা প্রয়োগ করে। জাতিয় কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটিকে অন্য রাষ্ট্রে চীনের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের নিয়োগ এবং প্রত্যাহার করা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বিদেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সন্ধি ও চুক্তিকে গ্রহণ ও প্রত্যাখ্যানের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ন্যস্ত করা হয়েছে। রাষ্ট্রিয় পরিষদকে পররাষ্ট্র বিষয়ক পরিচালনা এবং বিদেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সন্ধি ও চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

আরো পড়ুন

চীনের বিদেশনীতির মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ

চীন সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সনদের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। চীনের পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক নির্দেশিকা হচ্ছে তৃতীয় বিশ্ব এবং সকল শান্তীকামী দেশের সঙ্গে ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্বশান্তি রক্ষা করা।

স্বাধীনতা ও নির্ভরশিলতা চীনের বিদেশ নীতির অন্যতম লক্ষ্য। কোন দেশই চীনকে তার করদ রাজ্যে পরিণত করতে পারবে না। কোন দেশ তার নিজের স্বার্থে চীনকে কোন কিছু করাতে বাধ্য করতে পারবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ৩০ বছর ধরে কোরিয়া ও ভিয়েতনামের রণক্ষেত্র এবং কূটনীতির ক্ষেত্রে একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নানাভাবে চীনকে অন্য সব রাষ্ট্রের থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেছে।

চীনের বিদেশনীতি সংক্রান্ত বক্তব্য হচ্ছে, চীন পারস্পরিক সার্বভৌমত্ব এবং ভূখন্ডগত অখন্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনাগ্রাসন, অন্য রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত ধাকা, সমতা এবং পারস্পরিক স্বার্থরক্ষা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছিল যে, চীন কখনও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা বা মহাশক্তিধর রাষ্ট্রের মর্যাদা অর্জনের চেষ্টা করবে না।

চীনা নেতৃবৃন্দের তিন বিশ্বের তত্ত্বানুসারে চীন বিশ্বব্যাপী সকল প্রলেতারিয়েত, নির্যাতিত জনগণ, সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহ তৃতীয় বীশ্বের জাতিসমূহের ঐক্যবিধানের নীতি অনুসরণ করবে। আগ্রাসন, নাশকতামুলক ক্রিয়াকলাপ, অবৈধ হস্তক্ষেপ, সামাজিক সাম্রাজ্যবাদমূলক ক্রিয়াকলাপ, অবৈধ হস্তক্ষেপ, সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী এবং সাম্রাজ্যবাদী মহাশক্তিধর রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে চীন ঐক্যের সূত্রে আবদ্ধ হবে। মহাশক্তিধর রাষ্ট্রসমূহের চক্রান্তের দ্বারা আক্রান্ত দেশসমূহের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্তর্জাতিক মোর্চা গঠন মানবজাতির প্রগতি এবং মুক্তিকে চীন আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে ভিত্তিগত নীতিরূপে গ্রহণ করেছিল।

চীন শান্তিপূর্ণ উপায়ে সকল আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধানে বিশ্বাসী। পারস্পরিক আলাপ আলোচনা এবং শির্ষ বৈঠকের মাধ্যমে চিন বিরোধের নিষ্পত্তিতে আস্থাশীল।

সাম্প্রতিককালে চীন ভারত শীর্ষ বৈঠক ভারতের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সীমান্ত বিরোধের মীমাংসার আগ্রহ সেই আস্থাকে স্পষ্ট করে তুলেছে। চীন, নেপাল, মঙ্গোলিয়া, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে সীমান্ত সমস্যার সমাধান করেছে।

গণপ্রজাতন্ত্রী চীন জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেছে। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার শোষিত জাতিসমূহের প্রতি তার দ্বিধাহীন সমর্থন স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। চীন কোরিয়া ও ভিয়েতনামের জনগণের সংগ্রামের প্রতি সক্রিয় সমর্থন জ্ঞাপন এবং সাহায্যের হাত প্রসারিত করেছিল। দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারের বর্ণ-বিদ্বেষী নীতি, নামিবিয়ায় তার অবৈধ দখলদারী, আরব রাষ্ট্রসমূহের উপর ইজরায়েলের আগ্রাসনের তীব্র বিরোধীতা করেছে। নয়া-ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে লাতিন আমেরিকার দেশসমূহের প্রতিও চীনের সমর্থন ছিল দ্বিধাহীন এবং বলিষ্ঠ।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. সনৎ কুমার দাস সম্পাদিত, পলাশ বিশ্বাস, বিশ্বজিৎ গায়েন ও গোবিন্দ নস্কর রচিত, ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস অ্যান্ড অর্গানাইজেশন, ডাইরেক্টরেট অফ ডিসট্যান্ট এডুকেশন, ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়, ২০১৬, দিল্লি, পৃষ্ঠা ৬৪-৬৭।

Leave a Comment