দেং জিয়াওপিং ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের একজন প্রতিবিপ্লবী কুচক্রী রাজনীতিবিদ

দেং জিয়াওপিং বা তেঙ শিয়াওপিং বা তেং শিয়াওফিং (Deng Xiaoping; ২২ আগস্ট ১৯০৪ – ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭) ছিল একজন চীনা প্রতিবিপ্লবী কুচক্রী রাজনীতিবিদ যে ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের অবৈধ নেতা ছিল। ১৯৭৬ সালে চেয়ারম্যান মাও সেতুং-এর মৃত্যুর পরে, কুচক্রী দেং ধীরে ধীরে ক্ষমতায় ওঠে আসে এবং একাধিক সুদূরপ্রসারী বাজার-অর্থনীতি সংস্কারের মাধ্যমে চীনকে পুঁজিবাদী পথে চালনা করে, যা তাকে “আধুনিক পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী চীনের স্থপতি” হিসাবে পরিচিত করে।[১]

চীনে ‘মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবে’ (জিপিসিআর)-এর সময় মাও লাইন বিরোধী সংগ্রামের অন্যতম প্রধান নেতা তেঙ শিয়াও-পিং পুঁজিবাদের পথগামী হিসেবে গণসমালোচনার মুখে ১৯৬৬ সালে ক্ষমতাচ্যুত হয় । পরবর্তীতে মাও জীবিত থাকা কালেই তেঙ আত্মসমালোচনার মাধ্যমে পার্টিতে পুনর্বাসিত হয়। কিন্তু পুনরায় পুঁজিবাদের পথগামী এই ব্যক্তিটি সংশোধনবাদী লাইন আমদানি করে। ফলে ১৯৭৬ সালে মাও-এর নেতৃত্বে তাকে পুনরায় ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। কিন্তু অল্প পরেই মাও-এর মৃত্যু হলে সে পুনরায় তার সহযোগীদের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসীন হয় এবং সমাজতান্ত্রিক চীনকে পুঁজিবাদে অধঃপতনের ক্ষেত্রে আমৃত্যু প্রধান ভূমিকা পালন করে।[২]

দেং-এর পুঁজিবাদী পথ

জিপিসিআর সময়কালে দুই লাইনের সংগ্রামে প্রধান প্রশ্নটি ছিল বিপ্লবকে আঁকড়ে ধরার প্রশ্ন। মাওয়ের লাইন ছিল, শ্রেণি সংগ্রামকে চাবিকাঠি হিসেবে আঁকড়ে ধরে উৎপাদন বাড়াতে হবে। বিপরীতে তেঙ-এর কুখ্যাত পুঁজিবাদের পথগামী লাইন ছিলো বিড়ালটা সাদা না কালো সেটা দেখার বিষয় নয়; আসল কথা হলো বিড়ালটা ইঁদুর ধরে কিনা। অর্থাৎ উৎপাদন সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতি না পুঁজিবাদী পদ্ধতিতে হলো সেটা আসল বিষয় নয়, দেখতে হবে উৎপাদন বাড়ে কিনা। এটা ছিল তেঙ-এর উপযোগবাদী সংশোধনবাদী লাইনের নির্যাস, যাকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা বিরাটভাবে তুলে ধরেছিল ও মদদ দিয়েছিল। বহু দেশে বুর্জোয়ারা এই কুখ্যাত “সাদা বিড়াল কালো বিড়াল” তত্ত্বকে বিভিন্ন জায়গায় আওড়ায়।

আরো পড়ুন:  গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা

তেং চীনের অর্থনীতিকে বাজারের শক্তির উপর ক্রমশ বেশি বেশি নির্ভরশীল করে তোলে। সে দাবি তোলে যে এসব পদক্ষেপ চীনের অর্থনৈতিক সমস্যা অতিক্রম করতে পারবে। সে আরো অভিযোগ করে, অর্থনৈতিক সমস্যার জন্য মাও নির্দেশিত অতি কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও উৎপাদন দায়ী ছিল। দেং-এর পুঁজিপতি সমর্থকরা সমস্যাকে বাড়িয়ে দেখিয়েছিল, সমাজতন্ত্র অভিমুখী বাজারের বিকল্প পথ ও সেসব আলোচনাকে এই প্রতিবিপ্লবী গণশত্রুরা উপেক্ষা করেছিল। আসল ঘটনা ঘটে এটা যে, ১৯৭৮ পরবর্তী চীনা সংশোধনবাদী পার্টির কর্মসূচি শেষ হয় চীনের অর্থনীতিকে নাটকীয়ভাবে একটি পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে রূপান্তর করে।[৩]

দেং জিয়াওপিং তত্ত্ব

দেং-এর সংশোধনবাদী লাইন বা তার প্রতিক্রিয়াশীল গণবিরোধী রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক মতাদর্শের সিরিজ কার্যক্রমকে দেং জিয়াওপিং তত্ত্ব বা তেঙ-পন্থা বলা হয়। তার তত্ত্বটি মার্কসবাদ – লেনিনবাদ বা মাও সেতুং চিন্তাধারাকে প্রত্যাখ্যান করার দাবি করে না বরং মালেমাবাদী তত্ত্বের পরিবর্তে চীনের বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক অবস্থার সাথে সেগুলোকে খাপ খাইয়ে নিতে চায়।

দেং চীনকে বাইরের বিশ্বে উন্মুক্ত করেন, উন্নত দেশগুলির কাছ থেকে শেখার ওকালতি করেন।[৪] এক দেশ, দুই নীতি বাস্তবায়ন করেন এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োগবাদকে সমর্থনকারী “ঘটনা থেকে সত্যের সন্ধান করুন” এই প্রবাদ বাক্যটির উপর জোর দিয়েছিলেন।

রিচার্ড বাউম তার মাওয়ের দাফন: দেং জিয়াওপিংয়ের যুগে চিনের রাজনীতি গ্রন্থে লিখেছেন যে, দেং জিয়াওপিংয়ের তত্ত্বে মাও সেতুং চিন্তাধারার অল্প প্রমাণ বেঁচে ছিল।[৪] দেং জিয়াওপিং তত্ত্ব যুক্তি দিয়েছিল যে মাও সেতুং চিন্তাধারাকে সমুন্নত রাখার অর্থ হুয়া গুয়োফেংয়ের সরকারে যেমন দেখা গেছিল তেমন বিচ্যুতি ছাড়াই মাওয়ের ক্রিয়াকলাপ অন্ধভাবে অনুকরণ করা নয় এবং এরূপ করা আসলে “মাও সেতুং চিন্তাধারাকে বিরোধিতা করবে”।[৫]

দেং এর মৃত্যু

দেং ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭ তারিখে বেইজিং সময় রাত ৯:০৮ মিনিটে মারা যান। তিনি তখন ফুসফুসের সংক্রমণ এবং পারকিনসন্স রোগে ভুগছিলেন এবং বয়স ৯২ বছর হয়েছিল। পরের দুই সপ্তাহ ধরে, চীনা রাষ্ট্রীয় মিডিয়া দেং-এর জীবন ও মৃত্যুর সাথে সম্পর্কিত খবর এবং তথ্যচিত্র প্রচার করে। নিয়মিত সম্প্রচারের সময় ছাড়াও সন্ধ্যা ১৯:০০ সময়ে জাতীয় সংবাদ অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত প্রায় দুই ঘন্টা স্থায়ী খবর এবং তথ্যচিত্র সম্প্রচারিত হয়।

আরো পড়ুন:  চীনে শ্রেণিসংগ্রাম প্রকাশিত হয়েছে শোষক ও নির্যাতকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রূপে

তথ্যসূত্র

১. অনুপ সাদি, ১৮ আগস্ট ২০২০, “দেং জিয়াওপিং ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের একজন প্রতিবিপ্লবী কুচক্রী রাজনীতিবিদ”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/biography/deng-xiaoping/
২. রায়হান আকবর, রাজনীতির ভাষা পরিচয়, আন্দোলন প্রকাশনা, ঢাকা, জুন ২০২০, পৃষ্ঠা ২১।
৩. মার্টিন হার্ট-ল্যান্ডসবার্গ, “মার্কিন অর্থনীতি ও চীন: পুঁজিবাদ শ্রেণী এবং সংকট” অনুবাদ শুভাশিস মুখোপাধ্যায়, মান্থলি রিভিউ: ফেব্রুয়ারি ২০১০, আজকের চীন একটি মান্থলি রিভিউ সংকলন, সম্পাদনা দীপংকর চক্রবর্তী, পিপলস বুক সোসাইটি, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ, বইমেলা ২০১৩, পৃষ্ঠা ৮১
৪. দেং জিয়াওপিং, ১০ অক্টোবর ১৯৭৮. “Carry out the policy of opening to the outside world and learn advanced science and technology from other countries“. ইউআরএল: http://en.people.cn/dengxp/vol2/text/b1240.html,
সংগৃহীত ১৮ আগস্ট ২০২০
৫. Richard Baum, Burying Mao: Chinese politics in the age of Deng Xiaoping ( Princeton UP, 1996).
৬. দেং জিয়াওপিং, ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮. “Hold high the banner of Mao Zedong Thought and adhere to the principle of seeking truth from facts”. ইউআরএল: http://en.people.cn/dengxp/vol2/text/b1220.html, সংগৃহীত ১৮ আগস্ট ২০২০

Leave a Comment

error: Content is protected !!