চীনা জনগণের ধর্মচেতনার উৎস (ইংরেজি: The source of religious ideas of the Chinese people) ছিল কনফুসিয়াসবাদ, তাওবাদ ও বৌদ্ধবাদ। অন্যান্য অনেক সামন্তবাদী সংস্কৃতির মতোই চীনা সামন্তীয় সংস্কৃতির প্রধান ভিত্তি ছিল ধর্ম। ধর্মাচরণের ভিত্তি আবার ছিল কতকগুলো সামাজিক সম্বন্ধ ও ‘সান-কাং’ বা তিন-বন্ধন, ‘লু-চি’ বা ছয় বিভাগ, ‘উ-লুন’, বা পাঁচ কুটুম্বিতা এবং ‘চিউ-ৎসু’ বা নয় পুরুষ। ‘সান-কাং’-এর মধ্যে আছে—(১) রাজা-প্রজা, (২) পিতা-মাতা-সন্তান এবং (৩) স্বামী-স্ত্রী। ‘লুচি’র মধ্যে আছে—(১) ভাইবোন, (২) পিতা-পিতৃব্য, (৩) বংশানুক্রম, (৪) মাতা-মাতুল, ৫) শিক্ষক-ছাত্র এবং (৬) বন্ধু-বান্ধবী। “উ-লুন’ ও ‘চিও-ৎসু হলো বর্তমান ও ঊর্ধ্বতন পুরুষদের নিয়ে।
এইসব সম্বন্ধে আবদ্ধ চীনারা অনেক নীতিপালনের মধ্য দিয়ে ধর্মাচরণের সূচনা করেছিল। যুগযুগ ধরে চীনা মনীষীরা এইসব নীতি রচনা করেছিলেন। নীতিগুলোর প্রথমেই উল্লেখ্য ‘উং চাং’ বা পাঁচটি নীতি। এগুলো হলো: জেন—উপচিকীর্ষা, য়ি ন্যায়পরায়ণতা, লি—শিষ্টাচার, চিহ—জ্ঞান এবং শিন—সত্যবাদিতা। দ্বিতীয়ত উল্লেখযোগ্য ‘সু-শিং’ বা চার-কর্তব্য। এগুলো হলো শিয়াও—বাৎসল্য, তি—সৌভ্রাতৃত্ব, চুং—বিশ্বস্ততা, শিন—সত্যনিষ্ঠা। এছাড়াও চীনে বহুবিধ নীতি চালু ছিল। পরবর্তীকালে ডাঃ সান ইয়াৎ সেন এই সূত্রগুলোকে একত্র করে নতুন নীতিধারার প্রবর্তন করেন, তাকে বলা হয়, ‘পা-তেহ’ বা আটপ্রকার ধর্মনিষ্ঠা।
মধ্যযুগের চীনে যে প্রতিষ্ঠানিক ধর্মচেতনার বিকাশ ঘটে, তার তিনটি ধারা ছিল। এই তিন ধারার ভিত্তি রচনা করেছিল কনফুসীয় নীতিমালা, তাও-শিক্ষা ও বৌদ্ধ ধর্ম।
কনফুসিয়াসবাদ
কনফুসিয়াসবাদ বা কনফুসীয়বাদ (ইংরেজি: Confucianism), রুইবাদ নামেও পরিচিত, প্রাচীন চীনে উদ্ভূত চিন্তা ও আচরণের একটি ব্যবস্থা। বিভিন্ন প্রকারে কনফুসিয়াসবাদকে ঐতিহ্য, একটি দর্শন, একটি ধর্ম, একটি মানবতাবাদী বা যুক্তিবাদী ধর্ম, শাসনের একটি উপায়, বা সহজভাবে জীবনযাত্রা হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াসের (৫৫১-৪৭৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) শিক্ষা থেকে কনফুসিয়াসবাদের বিকাশ ঘটে যাকে পরবর্তীতে ‘শতদর্শন শিক্ষায়তন’ (ইংরেজি: Hundred Schools of Thought) বলা হয়।
মূল নিবন্ধ: কনফুসিয়াসবাদ বা কনফুসীয়বাদ প্রসঙ্গে
কনফুসীয় নীতিমালার প্রবক্তা দার্শনিক কনফুসিয়াস (৫৫১-৪৭৯ খ্রিস্টপূর্ব) শান্টুং প্রদেশের লু নামক সামন্তরাজ্যের এক অভিজাত পরিবারে জন্মেছিলেন। বাবা শিউ লিয়াং ছিলেন উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী এবং মা চেন সাই ছিলেন অভিজাত ‘ইয়েন’ বংশের মেয়ে। কনফুসিয়াস নামটি ল্যাটিন। এর চীনা নাম ‘ফুয়াং ফু জি’, অর্থাৎ মহাপ্রভু কুং।
কনফুসিয়াসের উপদেশাবলী মানুষের জীবনের সর্বক্ষেত্রেই ব্যাপ্ত ছিল। প্রাচীন সমাজে তিনি কোনো বিশেষ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে যত পরিচিত নন তার চেয়ে চীন সমাজের সংরক্ষণকারী হিসাবেই তাঁর ঐতিহাসিক পরিচয়। মানুষ ব্যক্তিগত জীবনে, পারিবারিক ক্ষেত্রে, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় সংস্থায় এবং ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্ক কিরূপ জীবন যাপন করবে এর প্রতিটি বিষয়ে কনফুসিয়াস তাঁর অভিমত প্রকাশ করেছেন। তাঁর সমস্ত উপদেশের লক্ষ্য ছিল প্রচলিত সামাজিক ব্যবস্থায় ভারসাম্য রক্ষা করা।
তাওবাদ
কনফুসীয় নীতিবিদ্যার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ছিল তাঁরই সমসাময়িক কিন্তু অগ্রজ লাওজু (Lao-tzu) বা লাওৎসির (Lao-tse) তাও-শিক্ষা বা তাওবাদ। তাও কথাটির অর্থ পথ। কিন্তু কনফুসিয়াস সাধারণ মানুষকে দৈনন্দিন সমাজজীবনের সুস্থতার পথ দেখিয়েছিলেন, আর লাওজু দেখিয়েছিলেন বুদ্ধিচর্চার পথ, ব্রহ্মবাদী নিষ্কাম কর্মযোগের পথ, যে পথ ধরলে মানুষ ধৈর্য, বিনয়, প্রজ্ঞা, প্রেম, করুণা, অহিংসা প্রভৃতি সদগুণের অধিকারী হতে পারে। রাজার দেশ শাসনের ক্ষেত্রেও লাওজু হস্তক্ষেপ বিনা দেশ শাসন বা নিঃস্বার্থ প্রজাপালনের কথা বলেছিলেন, যা আসলে ছিল অবাস্তব। অবাস্তব এবং সহজবুদ্ধিগ্রাহ্য নয় বলেই তাও-শিক্ষা বা লাওজু-র শিষ্য চুয়াংসু (Chuang-tzu)-র ব্যাখ্যা, এবং তাও শিক্ষার দুটো বই তাও এবং তি, একত্রে তাও-তে চিং (Tao-Te-Ching) সাধারণের মধ্যে তেমন জনপ্রিয় হয়নি।
আরো পড়ুন
- চীনের পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা
- লু স্যুনের ছোটগল্প-এর চরিত্রগুলো সামন্তবাদের বিরুদ্ধে লড়ায় করেছে
- গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা
- চীনা সমাজের শ্রেণি বিশ্লেষণ
- লং মার্চ বা দীর্ঘ যাত্রা ছিল একটি সামরিক পশ্চাদপসরণ যা লাল ফৌজ নিয়েছিল
- চীনা লাল ফৌজ ১৯২৮ থেকে ১৯৩৭ পর্যন্ত চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সশস্ত্র বাহিনী
- চীনের পার্টির জাতীয় কংগ্রেস হচ্ছে সর্বোচ্চ সংস্থার সম্মেলন
- চীনা গৃহযুদ্ধ চীনের কুওমিনতাং ও কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে চলা গৃহযুদ্ধ
- চীন থেকে অস্ত্র আমদানি বাংলাদেশকে সাম্রাজ্যবাদের অধীনস্থ করেছে
- মাও সেতুং-এর গণচীনের হারিয়ে যাওয়া লাল রং এবং বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী চীন
- চীনের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ
- প্রথম চীন-জাপান যুদ্ধের কারণ এবং যুদ্ধের পটভূমি
- তাইপিং বিদ্রোহ ছিল একটি বিশাল বিদ্রোহ বা গৃহযুদ্ধ যা চীনে সংঘটিত হয়েছিল
- আফিম যুদ্ধ ১৯ শতকে কিং রাজবংশ এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে সংঘটিত দুটি যুদ্ধ
- দেং জিয়াওপিং ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের একজন প্রতিবিপ্লবী কুচক্রী রাজনীতিবিদ
- চীনা ইতিহাসের রাজবংশগুলি ছিল বংশগত রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা
- চীনে শ্রেণিসংগ্রাম প্রকাশিত হয়েছে শোষক ও নির্যাতকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রূপে
- পুরনো চীনের অর্থনীতি ছিল গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক
- চীনা জনগণের ধর্মচেতনার উৎস হচ্ছে কনফুসিয়াসবাদ, তাওবাদ ও বৌদ্ধবাদ
- কনফুসিয়াসবাদ বা কনফুসীয়বাদ প্রাচীন চীনে উদ্ভূত চিন্তা ও আচরণের ব্যবস্থা
- তাওবাদ হচ্ছে প্রাচীন চীনের দর্শনের একটি মৌলিক সূত্র
- কুয়োমিনতাং ছিল সাম্রাজ্যবাদ চালিত চীনের প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দল
- আধা-সামন্তবাদী আধা-ঔপনিবেশিক চীন হচ্ছে ১৮৪০-১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ইতিহাস
- চীনের সামন্তবাদী সমাজ হচ্ছে একাদশ খ্রিস্টপূর্ব থেকে সপ্তদশ শতাব্দীর সমাজ
- চীনের দাস সমাজ হচ্ছে অষ্টাদশ থেকে একাদশ খ্রিস্টপূর্বাব্দ অবধি বিরাজিত কাল
- চীনের আদিম গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজের ইতিহাস ও সংস্কৃতি এবং দাসব্যবস্থার রাষ্ট্র
- চীনের ইতিহাস হচ্ছে প্রাচীন থেকে আধুনিককাল পর্যন্ত মুক্তির লড়াইয়ের ইতিহাস
- চীনা দর্শন হচ্ছে চীন দেশে উল্লেখযোগ্য মনীষাগত ও সাংস্কৃতিক বিকাশ
- মাও সেতুং ছিলেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এবং সাম্যবাদী বিপ্লবী
- কনফুসিয়াস ছিলেন শরত বসন্তকালের একজন চীনা দার্শনিক এবং রাজনীতিবিদ
বৌদ্ধধর্ম
এই দুই ধর্মপথ ছাড়াও খ্রিস্ট্রিয় প্রথম শতকে তৃতীয় ধর্মপথের সন্ধান চীনারা পেয়েছিল—তা হলো বৌদ্ধধর্ম। কথিত আছে, হানবংশীয় সম্রাট মিং তি বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্য ভারত থেকে দুজন বৌদ্ধ শ্রমণকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে যান। এঁরা হলেন কাশ্যপ মাতঙ্গ ও ধর্মারণ্য। মহাযান বৌদ্ধধর্মই চীনে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়, যদিও হীনযান শাখারও প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। শ্রেণি নির্বিশেষে চীনা সমাজ বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল, কারণ চীনা নৈতিকতার সঙ্গে বৌদ্ধ জীবনদর্শনের সাদৃশ্য ছিল।
তথ্যসূত্র
১. অলোক কুমার ঘোষ, “চীনের ইতিহাস”, নেতাজী সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা, ষষ্ঠ মুদ্রণ মে ২০১০, পৃষ্ঠা ১১-১২।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚