কুয়োমিনতাং বা চীনের কুয়োমিনটাং বা কেএমটি বা চীনের জাতীয়তাবাদী দল (ইংরেজি: Kuomintang এবং শব্দার্থে: ‘Chinese Nationalist Party‘), ইংরেজিতে প্রায়শই বলা হয় চায়না জাতীয়তাবাদী দল বা চীনা জাতীয়তাবাদী দল (CNP), হচ্ছে চীন ও তাইওয়ানের একটি প্রধান রাজনৈতিক দল। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান রূপে গঠিত হবার পর থেকে চীনের মূল ভূখণ্ড এবং তাইওয়ান উভয় অঞ্চলে এটি শক্তিশালী হয়েছিল। কুয়োমিনতাং ১৯২৮ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত মূল ভূখণ্ডে চীন প্রজাতন্ত্রের প্রভাবশালী শাসক দল ছিল।[১] ১৯৫০-এর দশকে, চীনা গৃহযুদ্ধে পরাজিত হয়ে দলটি মূল ভূখণ্ড থেকে নির্বাসিত হয়েছিল এবং তাইওয়ানের শাসকদলে পরিণত হয়েছিল।
কুয়োমিনতাং দলটি ছিলো চীনের প্রতিক্রিয়াশীল প্রধান রাজনৈতিক দল। এটি ছিলো সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা চালিত স্বৈরতন্ত্রী গণহত্যাকারী জনগণের শত্রুদের রাজনৈতিক দল। গণতন্ত্র ও উদারনৈতিক সমাজতন্ত্রী আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে তুং মেং-হুই নামে দলটির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সান ইয়াত সেন (১৮৬৭-১৯২৫)। চীন তখন সামরিক অধিকর্তাদের শাসনাধীন।
১৯১১ সালের অসমাপ্ত বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পরে সান-ইয়াৎ-সেন পরিচালিত তুং মেং-হুই পার্টির নামকরণ হয় “কুওমিনতাং”। এটা শুধুমাত্র একটা নামের পরিবর্তন ছিল না, একই সঙ্গে চরিত্রেরও পরিবর্তন বটে। পুরোনো সংগঠনটি ছিল অনেক বেশি বৈপ্লবিক; কিন্তু নতুন সংগঠন গড়ে উঠেছিল বিপ্লবী, অবিপ্লবী নানা ধরনের মানুষকে নিয়ে।[২]
১৯১১ ও ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে কুয়োমিনতাং-এর নেতৃত্বে মার্শাল উয়ান শিকাই-এর বিরুদ্ধে পরপর দুবার বিদ্রোহের প্রচেষ্টা নিস্ফল হয়। ১৯১৮-২১ সালের দিকে কুয়োমিনতাং-এর প্রভাব দক্ষিণ চীনে ক্যানটনকে কেন্দ্র করে সীমাবদ্ধ ছিল। উত্তরাঞ্চল সামন্তবাদী ও সামরিক অধিকর্তাদের শাসনাধীনেই থাকে।
কুড়ির দশকের দ্বিতীয়ার্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতায় (১৯২২-২৪) কুয়োমিনতাং নানকিঙ শহর অভিমুখে উত্তরাঞ্চলে সামরিক অভিযান চালায়। নেতৃত্ব দেন ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে সান ইয়াত সেনের স্থলাভিষিক্ত চিয়াং কাই-শেক। দলের ভিতরে বাম ও দক্ষিণপন্থীদের মধ্যে বিরোধ তখন তুঙ্গে। কমিউনিস্টদের সঙ্গেও বিবাদ ঘটে। দক্ষিণপন্থীদের নেতৃত্বে কুয়োমিনতাং ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে সরকার গঠনে সমর্থ হয়। ক্রমে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সমগ্র চীন তাদের শাসনাধীন হয়। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে একটি সংবিধানও গৃহীত হয়।
ত্রিশের দশকের প্রথমার্ধে শুরু হয় চীনের ভূখণ্ডে আগ্রাসী জাপানি বাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘসূত্রী সামরিক সংঘর্ষ। জাপানিদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে কুয়োমিনতাং-এর সঙ্গে চীনের কমিউনিস্টদের ঐক্য গড়ে ওঠে। দ্বিতীয় বিশ্ব-মহাযুদ্ধের সময় চীন ছিল মিত্রশক্তির অন্যতম। যুদ্ধ পরিসমাপ্তির পর কমিউনিস্টদের সঙ্গে কুয়োমিনতাং সরকারের বিরোধের ফলে তীব্র গৃহযুদ্ধ দেখা দেয় (১৯৪৬-৫০)। অভ্যন্তরীণ কলহ ও দুর্নীতিতে দীর্ণ কুয়োমিনতাং দল পরিচালিত সরকার মূল ভূখণ্ডে শাসনক্ষমতা হারিয়ে ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে ফরমোসা দ্বীপপুঞ্জে বা তাইওয়ানে স্থানান্তরিত হয়। সেই স্থানেই তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় একচ্ছত্র শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকে।[৩]
আরো পড়ুন
- চীনের পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা
- লু স্যুনের ছোটগল্প-এর চরিত্রগুলো সামন্তবাদের বিরুদ্ধে লড়ায় করেছে
- গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা
- চীনা সমাজের শ্রেণি বিশ্লেষণ
- লং মার্চ বা দীর্ঘ যাত্রা ছিল একটি সামরিক পশ্চাদপসরণ যা লাল ফৌজ নিয়েছিল
- চীনা লাল ফৌজ ১৯২৮ থেকে ১৯৩৭ পর্যন্ত চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সশস্ত্র বাহিনী
- চীনের পার্টির জাতীয় কংগ্রেস হচ্ছে সর্বোচ্চ সংস্থার সম্মেলন
- চীনা গৃহযুদ্ধ চীনের কুওমিনতাং ও কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে চলা গৃহযুদ্ধ
- চীন থেকে অস্ত্র আমদানি বাংলাদেশকে সাম্রাজ্যবাদের অধীনস্থ করেছে
- মাও সেতুং-এর গণচীনের হারিয়ে যাওয়া লাল রং এবং বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী চীন
- চীনের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ
- প্রথম চীন-জাপান যুদ্ধের কারণ এবং যুদ্ধের পটভূমি
- তাইপিং বিদ্রোহ ছিল একটি বিশাল বিদ্রোহ বা গৃহযুদ্ধ যা চীনে সংঘটিত হয়েছিল
- আফিম যুদ্ধ ১৯ শতকে কিং রাজবংশ এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে সংঘটিত দুটি যুদ্ধ
- দেং জিয়াওপিং ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের একজন প্রতিবিপ্লবী কুচক্রী রাজনীতিবিদ
- চীনা ইতিহাসের রাজবংশগুলি ছিল বংশগত রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা
- চীনে শ্রেণিসংগ্রাম প্রকাশিত হয়েছে শোষক ও নির্যাতকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রূপে
- পুরনো চীনের অর্থনীতি ছিল গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক
- চীনা জনগণের ধর্মচেতনার উৎস হচ্ছে কনফুসিয়াসবাদ, তাওবাদ ও বৌদ্ধবাদ
- কনফুসিয়াসবাদ বা কনফুসীয়বাদ প্রাচীন চীনে উদ্ভূত চিন্তা ও আচরণের ব্যবস্থা
- তাওবাদ হচ্ছে প্রাচীন চীনের দর্শনের একটি মৌলিক সূত্র
- কুয়োমিনতাং ছিল সাম্রাজ্যবাদ চালিত চীনের প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দল
- আধা-সামন্তবাদী আধা-ঔপনিবেশিক চীন হচ্ছে ১৮৪০-১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ইতিহাস
- চীনের সামন্তবাদী সমাজ হচ্ছে একাদশ খ্রিস্টপূর্ব থেকে সপ্তদশ শতাব্দীর সমাজ
- চীনের দাস সমাজ হচ্ছে অষ্টাদশ থেকে একাদশ খ্রিস্টপূর্বাব্দ অবধি বিরাজিত কাল
- চীনের আদিম গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজের ইতিহাস ও সংস্কৃতি এবং দাসব্যবস্থার রাষ্ট্র
- চীনের ইতিহাস হচ্ছে প্রাচীন থেকে আধুনিককাল পর্যন্ত মুক্তির লড়াইয়ের ইতিহাস
- চীনা দর্শন হচ্ছে চীন দেশে উল্লেখযোগ্য মনীষাগত ও সাংস্কৃতিক বিকাশ
- মাও সেতুং ছিলেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এবং সাম্যবাদী বিপ্লবী
- কনফুসিয়াস ছিলেন শরত বসন্তকালের একজন চীনা দার্শনিক এবং রাজনীতিবিদ
তথ্যসূত্র:
১. অনুপ সাদি, ৫ জানুয়ারি, ২০১৯, “কুয়োমিনতাং সাম্রাজ্যবাদ চালিত চীনের প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দল”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/international/kuomintang/
২. অমিত ভট্টাচার্য, “চীনের ইতিহাস”, নেতাজী সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা, ষষ্ঠ মুদ্রণ মে ২০১০, পৃষ্ঠা ৬-৮।
৩. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ৮১।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚