তাইপিং বিদ্রোহ ছিল একটি বিশাল বিদ্রোহ বা গৃহযুদ্ধ যা চীনে সংঘটিত হয়েছিল

তাইপিং বিদ্রোহ বা তাইপিং বিপ্লব বা থায়ফীং বিপ্লব বা তাইপিং গৃহযুদ্ধ (ইংরেজি: Taiping Rebellion) ছিল একটি বিশাল বিদ্রোহ বা গৃহযুদ্ধ যা চীনে মাঞ্চু কিং রাজবংশ এবং হান, হাক্কা নেতৃত্বাধীন তাইপিং স্বর্গীয় রাজ্যের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল। এটি ১৮৫০ থেকে ১৮৬৪ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল, যদিও নানজিংয়ের পতনের পরে ১৮৭১ সাল পর্যন্ত শেষ বিদ্রোহী সেনাবাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করা যায়নি। বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে ২০ থেকে ৩০ মিলিয়ন লোক নিহত হওয়ার পরে, প্রতিষ্ঠিত কিং সরকার চূড়ান্তভাবে জয়লাভ করেছিল, যদিও এর আর্থিক এবং রাজনৈতিক কাঠামোর জন্য একটি বিশাল মূল্য দিতে হয়েছিল।

আফিম যুদ্ধের পর চীনের ছীন সরকারকে বিদেশিদের ক্ষতিপূরণ স্বরূপ অত্যধিক অর্থ দিতে হয়েছিল। এই অর্থ আহরণের জন্য সরকার নানাপ্রকার রাজস্ব ও ব্যবসায়িক শুল্ক আদায় করতে থাকেন। এই অর্থের ভার জনগণের উপরই পড়ছিল। উত্তরোত্তর গুরুভার শুল্কের ফলে জনতা অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। শোষণের অত্যাচারে জর্জরিত জনতা ও কৃষকরা ক্রমে সংগঠিত হয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে এই গণ অভ্যুত্থান প্রবল বিদ্রোহের আকার ধারণ করে।

এই তাইপিং বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন, হুং শিউছোয়ান (Hong Xiuquan) (১৮১৪-১৮৬৪) নামে এক কৃষক নেতা। দক্ষিণ-পূর্ব চীনের কোয়াংশি প্রদেশকে কেন্দ্র করে তিনি তাইপিং থিয়েনকুড (Taiping Heavenly Kingdom—মহাসমতা স্বর্গীয় রাজ্য) নামে এক স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করেন। বিক্ষুব্ধ জনতার প্রবল সমর্থনে এই রাজ্য শীঘ্রই বিস্তারলাভ করল এবং ১৮৫৩ সালে দক্ষিণ চীনের প্রধান শহর নানচিং (Nanjing/Nanking)-এ রাজধানী স্থাপন করেন। চীনের ১৭টি প্রদেশের ৬০০-র বেশি শহরে এই রাজ্যের অধিকার ছিল। তাইপিং কর্তৃপক্ষ ভূমিসংস্কার করে কৃষকদের মধ্যে ভূমির সমভাবে বন্টন (equal division) করে। নরনারীদের মধ্যে সমতার নীতি গৃহীত হয় ও প্রাচীন রক্ষণশীল কনফুসীয় আদর্শের কঠোর সমালোচনা করা হয়।

বিদেশি হস্তক্ষেপ ও দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ

তাইপিং সরকারের উপর্যুপরি আক্রমণে ছীং সাম্রাজ্য যখন পর্যুদস্ত, তাদের এই শোচনীয় অবস্থার সুযোগে ব্রিটেন ও ফ্রান্স দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ (১৮৫৬-৫৮) শুরু করে ও টলটলায়মান ছীং সম্রাটের কাছ থেকে আরও অনেক সুবিধা ও মুক্তবন্দরের বিশেষ অধিকার আদায় করেন। এই সুযোগে রাশিয়া উত্তরপূর্ব চীনের হেইলুংচিয়াং অঞ্চল অধিকার ও অন্যান্য বিশেষ অধিকার ছিনিয়ে নেন। তাইপিং সরকারের অস্তিত্বকে এই শক্তিগুলো শুধু চীন সম্রাট নয় বিদেশি শক্তির পক্ষেও বিপজ্জনক বলে মনে করেন এবং এই বিপদ থেকে ত্রাণ পাওয়ার জন্য ছীং সেনার সঙ্গে মিলিত হয়ে সমস্ত বিদেশী শক্তি উদীয়মান তাইপিং রাজ্যকে ১৮৬৪ সালে কঠোরভাবে দমন করেন।

আরো পড়ুন:  চীনে শ্রেণিসংগ্রাম প্রকাশিত হয়েছে শোষক ও নির্যাতকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রূপে

১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের পর পুঁজিবাদের প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়ে সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হলো, অবাধ প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্য একচেটিয়া ব্যবসায়ীদের কুক্ষিগত হলো। চীনের বাজারে আধিপত্য বিস্তারের জন্য পুঁজিবাদীদের মধ্যে হুটোপুটি শুরু হলো।

তথ্যসূত্র

১. অলোক কুমার ঘোষ, “চীনের ইতিহাস”, নেতাজী সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা, ষষ্ঠ মুদ্রণ মে ২০১০, পৃষ্ঠা ৪৩।

Leave a Comment

error: Content is protected !!