আন্তর্জাতিকতাবাদ (ইংরেজি: Internationalism) হচ্ছে একটি রাজনৈতিক নীতি যা রাষ্ট্র ও জাতিগুলির মধ্যে বৃহত্তর রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সহযোগিতার পক্ষপাতী। এটি অন্যান্য রাজনৈতিক আন্দোলন এবং মতাদর্শের সাথে সম্পর্কিত, তবে এটি একটি তত্ত্ব, বিশ্বাস ব্যবস্থা বা আন্দোলনকেও প্রতিফলিত করতে পারে।
আন্তর্জাতিকতাবাদের সমর্থকরা আন্তর্জাতিকতাবাদী হিসাবে পরিচিত এবং সাধারণত বিশ্বাস করেন যে মানুষের জাতীয়, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, বর্ণগত বা শ্রেণিগত সীমানা পেরিয়ে তাদের সাধারণ স্বার্থকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য একত্রিত হওয়া উচিত, অথবা সরকারগুলিকে সহযোগিতা করা উচিত কারণ তাদের পারস্পরিক দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থ তাদের স্বল্পমেয়াদী বিরোধের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।[১]
আন্তর্জাতিকতাবাদের বিভিন্ন ব্যাখ্যা এবং অর্থ রয়েছে, তবে সাধারণত আন্তর্জাতিকতাবাদ বলতে বোঝায় অতি-জাতীয়তাবাদ এবং বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরোধিতা; জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি সমর্থন; এবং অন্যান্য সংস্কৃতি এবং রীতিনীতিকে প্রচার এবং সম্মান করবার একটি বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি।
আন্তর্জাতিকতাবাদ, বিশেষ করে উদার আন্তর্জাতিকতাবাদ এবং বহুপাক্ষিকতাবাদ, কানাডার মতো মধ্যম শক্তির বৈদেশিক নীতির একটি কেন্দ্রীয় এবং জনপ্রিয় বৈশিষ্ট্য। এই পদ্ধতিকে প্রায়শই “মধ্যম শক্তির কূটনীতি” বলা হয়।
উৎপত্তি
আন্তর্জাতিকতাবাদ বা ইন্টারন্যাশনালিজমের একটি সাধারণ অর্থ বিশ্বের জাতিসমূহের মধ্যে সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্ক বজায় রাখার নীতি। কিন্তু শব্দটির বিকাশ ঘটেছে আধুনিককালে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ, অতি-জাতীয়তাবাদ এবং বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরোধী চিন্তা হিসাবে। সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের প্রবণতা হচ্ছে নিজের জাতি ও রাষ্ট্রের স্বার্থকে প্রধান বলে গণ্য করা এবং অপর জাতি এবং রাষ্ট্রের স্বার্থসমূহকে উপেক্ষা করা।[২]
সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের মারাত্মক প্রকাশ দেখা যায় এই শতকের বিশ এবং ত্রিশ শতকে ইতালি এবং জার্মানিতে। ইতালির ফ্যাসিবাদী দল এবং জার্মানির নাৎসী দল তাদের দলীয় এবং রাষ্ট্রীয় নীতি হিসাবে নিজেদের জাতি এবং রাষ্ট্রকে সর্বশ্রেষ্ঠ ঘোষণা করে এবং অপর জাতি এবং রাষ্ট্রকে অধম এবং পদানত হওয়ার যোগ্য বলে বিবেচনা করে। এই নীতিতে তারা জঙ্গীভাবে সংঘটিত হয় এবং পার্শ্ববর্তী দুর্বল রাষ্ট্রসমূহকে নানা অজুহাতে গ্রাস করতে শুরু করে। এই নীতির পরিণতিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং জার্মানী এবং ইতালি ও তাদের মিত্র জাপান যুদ্ধে পরাজিত হয়।
উগ্র জাতীয়তাবাদের এই অভিজ্ঞতার প্রতিক্রিয়ায় জাতিতে জাতিতে সমতাবোধ এবং শান্তিপূর্ণ সম্পর্কের প্রয়োজন অনুভূত হতে থাকে। অনেক চিন্তাবিদ জাতীয়তাবাদ তথা জাতীয় রাষ্ট্রের অবাঞ্চনীয়তার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন এবং একটি বিশ্বরাষ্ট্রের কল্পনা করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতা ওয়েনডেল উইলকী (১৮৯২-১৯৪৪) এর ‘ওয়ান ওয়ার্লড’ বা ‘এক পৃথিবী’ গ্রন্থখানির কথা এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়।
আন্তর্জাতিকতাবাদ অধিকতর সুনির্দিষ্ট ও বিশেষ অর্থে আধুনিককালের সকল দেশের সাম্যবাদী আন্দোলনে ব্যবহৃত হয়। সাম্যবাদী বা কমউনিস্ট দলসমূহ আন্তর্জাতিকতাবাদকে বিশ্বব্যাপী শ্রমিক আন্দোলন তথা শ্রেণীহীন সমাজ তৈরির সংগ্রামে আদর্শগত হাতিয়ার বলে গণ্য করে। সাম্যবাদী আন্দোলনের মূল শক্তি হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণি। শ্রমিক শ্রেণি পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় প্রত্যেক রাষ্ট্রে যেমন সবচেয়ে শোষিত শ্রেণি, তেমনি ধনিক শ্রেণির পাল্টা শক্তি হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণি।
কোনো দেশের শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলন কেবলমাত্র কোনো বিশেষ দেশের শ্রমিকদের উপর শোষণ বিলোপের আন্দোলন নয়। এককভাবে কোনো দেশের শ্রমিক চূড়ান্তভাবে শোষণহীন সমাজ ও রাষ্ট্র তৈরি করতে পারে না। কারণ পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় কেবলমাত্র কোনো বিশেষ দেশের শোষণকারী শ্রেণি নয়। সকল দেশের ধনিকগণই তাদের নিজেদের স্বার্থরক্ষায় পরস্পরযুক্ত। ধনিক শ্রেণী আন্তর্জাতিক শ্রেণী, তারা আন্তর্জাতিকভাবে সংঘবদ্ধ। শোষিত শ্রমিক শ্রেণিও আন্তর্জাতিক শ্রেণি। দেশ নির্বিশেষে তাদের মৌলিক স্বার্থ অভিন্ন। এ কারণে আন্তর্জাতিক ধনিক শ্রেণির বিরুদ্ধে আন্দোলনে আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণিকেও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এক দেশের শ্রমিক শ্রেণিকে অপর দেশের শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামের পাশে দাঁড়াতে হবে। সাম্যবাদী আন্তর্জাতিকতার এই হচ্ছে মৌলভাব। এই আদর্শের ক্ষেত্রে তাই কোনো বিশেষ দেশ বা জাতির শ্রেষ্ঠত্বের কথা আসতে পারে না।
ছোট বড় সকল জাতি ও রাষ্ট্রের শোষিত মানুষই হচ্ছে সমান এবং তাদের মূল লক্ষ্য এবং স্বার্থ এক। এই নীতির প্রকাশ করে কার্ল মার্কস এবং ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁদের রচিত ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’-তে বিশ্বের সকল দেশের সর্বহারাদের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেছেন: ‘ওয়ার্কারস অব অল কান্ট্রিজ, ইউনাইট :‘সকল দেশের সর্বহারাগণ এক হও’।
শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিকতাবোধকে প্রকাশ করে সাম্যবাদী দলসমূহ একটি আন্তর্জাতিক সঙ্গীতও রচনা করেছে। ইউরোপে সংঘটিত শ্রমিক এবং সাম্যবাদী দলসমূহ নিজেদের সমন্বয়ে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংস্থা’ ও স্থাপন করেছিলেন। এই সংগঠন ওয়ার্কার্স ইন্টারন্যাশনাল বা শ্রমিক আন্তর্জাতিক নামে পরিচিত ছিল।[৩]
আরো পড়ুন
- আরব লিগ বা আরব রাষ্ট্রসমূহের লিগ, হচ্ছে আরব বিশ্বের আঞ্চলিক সংগঠন
- সমাজতান্ত্রিক আন্তর্জাতিক সুবিধাবাদী দলসমূহ নিয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক
- সাম্যবাদী আন্তর্জাতিক বা কমিন্টার্ন ছিল একটি রাজনৈতিক আন্তর্জাতিক
- দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক প্যারিসে গঠিত সমাজতান্ত্রিক দলগুলির রাজনৈতিক আন্তর্জাতিক ছিল
- প্রথম আন্তর্জাতিক বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক সমিতি ছিল একটি রাজনৈতিক আন্তর্জাতিক
- আন্তর্জাতিকতাবাদ হচ্ছে রাষ্ট্র ও জাতিগুলির সহযোগিতার পক্ষপাতী রাজনৈতিক নীতি
- চীনের পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা
- রাজনৈতিক আন্তর্জাতিক হচ্ছে একই রকম মতাদর্শের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন
- আন্তর্জাতিক আইন কাকে বলে
- গদর আন্দোলন ছিলো একটি বিপ্লবী আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক আন্দোলন
- সমাজতন্ত্রের ইতিহাস কয়েক শতাব্দীব্যাপী সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক লড়াই
- দুই বিশ্ব ব্যবস্থা হচ্ছে স্নায়ুযুদ্ধ-পূর্ব সময়ের পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম
চিত্র প্রসঙ্গে: বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং আন্তর্জাতিকতার প্রবক্তা, জাতিসংঘের পতাকা
তথ্যসূত্র
১. Fred Halliday, Three concepts of internationalism, International Affairs, Volume 64, Issue 2, Spring 1988, Pages 187–198.
২. অনুপ সাদি, ২ জুন ২০১৯; রোদ্দুরে.কম, “আন্তর্জাতিকতাবাদ হচ্ছে বিশ্বের জাতিসমূহের মধ্যে সৌহার্দ্য বজায় রাখার নীতি”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/international/on-internationalism/
৩. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ২৩৫-২৩৬।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।