আরব লিগ, আনুষ্ঠানিকভাবে আরব রাষ্ট্রসমূহের লিগ (Arab League বা League of Arab States), হচ্ছে আরব বিশ্বের একটি আঞ্চলিক সংগঠন। আরব লীগ ১৯৪৫ সালের ২২ মার্চ কায়রোতে গঠিত হয়, প্রাথমিকভাবে সাত সদস্য নিয়ে: মিশর, ইরাক, ট্রান্সজর্ডান, লেবানন, সৌদি আরব, সিরিয়া এবং উত্তর ইয়েমেন। বর্তমানে, লিগের ২২টি সদস্য রাষ্ট্র রয়েছে।[১]
আরব লিগ ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে বিভিন্ন আরব দেশসমূহকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল। আগের বছর ১৯৪৪ সালে আলেকজান্দ্রিয়ায় একটি প্রস্তুতি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে ছিল মিশর, ইরাক, লেবানন, সৌদি আরব, সিরিয়া, জর্ডন এবং ইয়েমেন। পরে একের পর এক লিবিয়া, সুদান, তিউনিসিয়া, মরক্কো, কুয়েত, আলজেরিয়া, দক্ষিণ ইয়েমেন, বাহরাইন, কাতার, ওমান এবং পারস্য উপসাগরের উপকূলবর্তী আমিরশাহি রাজ্যগুলি তাতে যোগ দেয়।[২]
লিগের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য
লিগের মূল লক্ষ্য হচ্ছে “সদস্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করা এবং তাদের মধ্যে সহযোগিতার সমন্বয় সাধন করা, তাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং আরব দেশগুলির বিষয় এবং স্বার্থকে সাধারণভাবে বিবেচনা করা”। সংগঠনটি তার ইতিহাস জুড়ে তুলনামূলকভাবে নিম্ন স্তরের সহযোগিতা পেয়েছে।
আরব লিগ শিক্ষা, সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক সংস্থা (ALECSO) এবং এর কাউন্সিল অফ আরব ইকোনমিক ইউনিটি (CAEU) এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের মাধ্যমে, আরব লীগ আরব বিশ্বের স্বার্থ প্রচারের জন্য পরিকল্পিত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, বৈজ্ঞানিক এবং সামাজিক কর্মসূচিগুলিকে সহায়তা করে।
আরব লিগ (Arab League) হলো আরব দেশগুলির জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আরব দেশগুলির যেসব রাজনৈতিক বিষয়ে লিগের ভূমিকা বিভিন্ন সময়ে প্রবল হয়ে ওঠে সেগুলি হলো:
১. ফ্রান্সের দখল থেকে সিরিয়া ও লেবাননের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি সমর্থন;
২. ইজরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ও অস্তিত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম;
৩. আলজেরিয়াকে স্বাধীনতা প্রদানে ফ্রান্সের অহেতুক বিলম্বের বিরােধিতা এবং
৪. আরব দেশগুলির অর্থনৈতিক উন্নয়নে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস। ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে সংযুক্ত আরব রিপাবলিক সৃষ্টির পর লিগের শক্তিবৃদ্ধি হয়।
আরব লিগ এবং এর কার্যক্রম
প্রতি সদস্য রাষ্ট্রের একজন করে প্রতিনিধি এবং প্যালেস্তাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন সংস্থার একজন মুখপাত্রকে নিয়ে গঠিত কাউন্সিলের সভা কায়রোতে অনুষ্ঠিত হয়। আরব দেশগুলির মধ্যে অর্থনৈতিক ও কারিগরি বিষয়ে সহযোগিতা, আরব সংস্কৃতির উন্নয়ন এবং আরব দেশগুলির মধ্যে বিবাদ-বিসংবাদের নিষ্পত্তি লিগের কর্মসূচির অন্তর্গত। তবে আরব ভূখণ্ড থেকে ঔপনিবেশিক শক্তির উচ্ছেদ এবং ইজরায়েলের বিরুদ্ধে সমন্বিত সংগ্রামই এখন লিগের প্রধান কাজ হলেও সদস্য দেশগুলির মধ্যে ঐক্যবদ্ধ পুঁজিবাদী উন্নয়ন প্রয়াসও অব্যাহত আছে।
এটি সদস্য রাষ্ট্রগুলির নীতি সমন্বয়, সাধারণ উদ্বেগের বিষয়গুলির উপর গবেষণা এবং কমিটি গঠন, আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিরোধ নিষ্পত্তি এবং ১৯৫৮ সালের লেবানন সংকটের মতো দ্বন্দ্ব সীমিত করার জন্য একটি ফোরাম হিসেবে কাজ করেছে। লীগ অর্থনৈতিক একীকরণকে উৎসাহিত করে এমন অনেক যুগান্তকারী নথির খসড়া এবং সমাপ্তির জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে। এর একটি উদাহরণ হচ্ছে যৌথ আরব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সনদ, যা এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নীতিমালার রূপরেখা প্রদান করে।
নব্বইয়ের দশকের প্রথমার্ধে মধ্যপ্রাচ্যে ইজরায়েলের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলির সম্পর্কে শান্তির পরিবেশ গড়ে উঠতে থাকায় সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন আরব লিগকে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেবার আবেদন জানান। আরব লিগ সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে এই বলে যে অধিকৃত আরব ভূখণ্ডসমূহ থেকে ইজরায়েল সরে না গেলে ওই প্রশ্ন বিবেচিত হবে না।
আরব লিগ ইজরায়েলের উপর হতে অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে না নিলেও ২২ সদস্য বিশিষ্ট লিগের অন্যতম সদস্য তিউনিসিয়া ইজরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের কিছু সদস্য আরব লিগকে ইজরায়েল সম্পর্কে নমনীয় মনোভাব গ্রহণের সুপারিশ করে। তাতে সিরিয়া, লেবানন ও লিবিয়া আপত্তি জানিয়ে বলে যে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে আংশিক বয়কট নীতি অনুসৃত হওয়া প্রয়োজন। এদিকে শান্তির পরিবেশ ফিরে এলেও আরব ও ইজরায়েলি উগ্রপন্থীরা হিংসাত্মক ক্রিয়াকলাপ থেকে সম্পূর্ণ বিরত হয়নি।
সমালোচনা
যদিও সব দেশগুলিই মূলত পুঁজিবাদ অভিমুখী এবং সাম্রাজ্যবাদী ইউরো-মার্কিন শক্তির অনুগামী। ইরান বিভিন্ন সময় আরব লিগের সমালোচনা করেছে এবং উল্লেখ করেছে যে সংস্থাটির এখন আর কোনো কার্যকারিতা নেই। ইয়েমেন সৌদি আরব যুদ্ধে সৌদি আরবের অপরাধ নিয়ে আরব লীগ তেমন কোনো কার্যকর কিছু করে নি। এছাড়াও সংস্থাটি ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কোনো ভূমিকা না নেয়ায় ইরানের প্রেসিডেন্ট রুহানি আরব লীগের নিন্দা জানান। এছাড়া, ফিলিস্তিনিদের ওপর জায়নবাদী ইসরাইলের অব্যাহত আগ্রাসনের ব্যাপারে সংস্থাটি চোখ বন্ধ রাখায় আরব লীগের সমালোচনা করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট।[৩]
আরো পড়ুন
- আরব লিগ বা আরব রাষ্ট্রসমূহের লিগ, হচ্ছে আরব বিশ্বের আঞ্চলিক সংগঠন
- সমাজতান্ত্রিক আন্তর্জাতিক সুবিধাবাদী দলসমূহ নিয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক
- সাম্যবাদী আন্তর্জাতিক বা কমিন্টার্ন ছিল একটি রাজনৈতিক আন্তর্জাতিক
- দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক প্যারিসে গঠিত সমাজতান্ত্রিক দলগুলির রাজনৈতিক আন্তর্জাতিক ছিল
- প্রথম আন্তর্জাতিক বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক সমিতি ছিল একটি রাজনৈতিক আন্তর্জাতিক
- আন্তর্জাতিকতাবাদ হচ্ছে রাষ্ট্র ও জাতিগুলির সহযোগিতার পক্ষপাতী রাজনৈতিক নীতি
- চীনের পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা
- রাজনৈতিক আন্তর্জাতিক হচ্ছে একই রকম মতাদর্শের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন
- আন্তর্জাতিক আইন কাকে বলে
- গদর আন্দোলন ছিলো একটি বিপ্লবী আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক আন্দোলন
- সমাজতন্ত্রের ইতিহাস কয়েক শতাব্দীব্যাপী সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক লড়াই
- দুই বিশ্ব ব্যবস্থা হচ্ছে স্নায়ুযুদ্ধ-পূর্ব সময়ের পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম
তথ্যসূত্র
১. অনুপ সাদি, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮; রোদ্দুরে.কম, “আরব লিগ আরবের দেশ নিয়ে গঠিত পুঁজিবাদের সেবাকারী সংগঠন”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/international/arab-league/
২. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ৩৮।
৩. খবর, আরব লীগ হলো অকার্যকর বিধ্বস্ত বুড়ো: প্রেসিডেন্ট রুহানি, ২১ নভেম্বর ২০১৭, ইউআরএল: http://parstoday.com/bn/news/iran-i48691
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।