চীনা ইতিহাসের রাজবংশ বা চীনা রাজবংশগুলি (ইংরেজি: Dynasties in Chinese history, or Chinese dynasties) ছিল বংশগত রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা যা চীনের ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় শাসন করেছিল। আনুমানিক ২০৭০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ইউ দ্য গ্রেটের রাজবংশীয় শাসনের উদ্বোধন থেকে শুরু করে ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯১২ সালে সিনহাই বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে জুয়ানটং সম্রাটের পদত্যাগ পর্যন্ত, চীন ধারাবাহিক রাজবংশ দ্বারা শাসিত হয়েছিল।
চীনদেশে প্রচলিত উপকথা অনুসারে প্রাচীনতম রাজাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ফু-সি (Fu-Hsi) শেন নুং (Shen Nung) এবং হুয়াং তি (Huang Ti)। এরা ছিলেন একাধারে রাজা ও ধর্মগুরু। চীনের প্রাচীনতম ইতিহাসভিত্তিক সাহিত্য সু-তিং (Shu Ching) এ চতুর্থ সম্রাট ইয়াও-এর যুগ থেকে প্রাচীন চীনের রাজাদের কথা বলা আছে। ইয়াং-এর পর সুন ও তারপর রাজা হন ই-উ (Yu)। খ্রিস্টপূর্ব ২১৭৬, মতান্তরে ২২০৫ অব্দে ইউ সিয়া (Hsia) রাজবংশের পত্তন করেন। পরবর্তী রাজবংশ ছিল চেৎ ট্যাং প্রতিষ্ঠিত সান বা ইন (Shan/Yin)।
খ্রিস্টপূর্ব ১১২২ অব্দে প্রতিষ্ঠিত চৌ (Chau) বংশ দীর্ঘ ৯০০ বছর চীন শাসন করে। এই সময়েই লাওজু ও কনফুসিয়াসের জন্ম হয়। চৌএর পর ছিল প্রথম সার্বভৌম সম্রাট শি হুয়াং তি (Shi Huang Ti)-র চিন বংশ, যার নামানুসারেই ঐ দেশের নাম হয় চীন। চীনের মহাপ্রাচীর এই সম্রাটই নির্মাণ করেছিলেন।
চীন বংশের পর আসে হান বংশ (Han, খ্রিস্টপূর্ব ২০৬খ্রি. ২২০)। এই সময় চীনের ইতিহাসের একটি স্বর্ণযুগ। সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিল্প, ললিতকলা, সব ক্ষেত্রেই সমৃদ্ধি আসে। চান্দ্র পঞ্জিকার প্রবর্তন, ভূমিকম্প নির্দেশক যন্ত্র, পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ, জীর্ণ বস্ত্র থেকে কাগজ তৈরি—এইসব এই সময়ের ঘটনা। এই কারণেই বোধহয় বহু চীনা নিজেদের “Sons of Han” বলতে ভালোবাসেন।
হান বংশের পর আসে ট্যাং (Tang) বংশ (৬১৮-৯০৭), কিন্তু তারপর দীর্ঘ রাজনৈতিক, অনিশ্চয়তার কাল। অবশেষে ৯৬০-এ সুং (Sung) বংশের আমলে স্থিতি আসে বটে, কিন্তু ১২৭৯ তে মোঙ্গলরা চীন দখল করে এবং মোঙ্গল শাসন বজায় থাকে ১৩৬৮ সাল পর্যন্ত।
১৩৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মিং (Ming) বংশের শাসন, কিন্তু ১৬৪৪-এ মাঞ্চুরিয়ার অরণ্য থেকে এসে মাউপজাতি চীনে নতুন রাজবংশ স্থাপন করে। বেজিং-এ রাজধানী বসিয়ে এই মাঞ্চু বা চিং (Ching)-রাই ১৯১১-র বিপ্লবের আগে পর্যন্ত চীন শাসন করে।
দশজন মাঞ্জু সম্রাটের মধ্যে কাং সি (Kang-hsi, ১৬৬২-১৭২২) ছিলেন সবচাইতে উল্লেখযোগ্য। ফরাসি সম্রাট চতুর্দশ লুই-এর ভারতের মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সমসাময়িক কাং সি উদারচেতা শাসক হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। কনফুসীয় নীতিধর্মে আস্থাবান হয়েও তিনি তাওবাদ বৌদ্ধধর্মকে, এমনকি পর্তুগিজ পাদ্রীদের খ্রিস্টধর্মকেও যথেষ্ট সম্মান দেখান। কয়েকজন জেসুইট খ্রিস্টান পাদ্রীকে তিনি সরকারি কাজেও নিয়োগ করেছিলেন। অবশ্য পাদ্রীদের পরবর্তী স্বার্থসন্ধানে বিরক্ত হয়ে ১৭১৭ সালে বিদেশিদের ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেছিলেন।
আরো পড়ুন
- চীনের পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা
- লু স্যুনের ছোটগল্প-এর চরিত্রগুলো সামন্তবাদের বিরুদ্ধে লড়ায় করেছে
- গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা
- চীনা সমাজের শ্রেণি বিশ্লেষণ
- লং মার্চ বা দীর্ঘ যাত্রা ছিল একটি সামরিক পশ্চাদপসরণ যা লাল ফৌজ নিয়েছিল
- চীনা লাল ফৌজ ১৯২৮ থেকে ১৯৩৭ পর্যন্ত চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সশস্ত্র বাহিনী
- চীনের পার্টির জাতীয় কংগ্রেস হচ্ছে সর্বোচ্চ সংস্থার সম্মেলন
- চীনা গৃহযুদ্ধ চীনের কুওমিনতাং ও কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে চলা গৃহযুদ্ধ
- চীন থেকে অস্ত্র আমদানি বাংলাদেশকে সাম্রাজ্যবাদের অধীনস্থ করেছে
- মাও সেতুং-এর গণচীনের হারিয়ে যাওয়া লাল রং এবং বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী চীন
- চীনের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ
- প্রথম চীন-জাপান যুদ্ধের কারণ এবং যুদ্ধের পটভূমি
- তাইপিং বিদ্রোহ ছিল একটি বিশাল বিদ্রোহ বা গৃহযুদ্ধ যা চীনে সংঘটিত হয়েছিল
- আফিম যুদ্ধ ১৯ শতকে কিং রাজবংশ এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে সংঘটিত দুটি যুদ্ধ
- দেং জিয়াওপিং ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের একজন প্রতিবিপ্লবী কুচক্রী রাজনীতিবিদ
- চীনা ইতিহাসের রাজবংশগুলি ছিল বংশগত রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা
- চীনে শ্রেণিসংগ্রাম প্রকাশিত হয়েছে শোষক ও নির্যাতকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রূপে
- পুরনো চীনের অর্থনীতি ছিল গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক
- চীনা জনগণের ধর্মচেতনার উৎস হচ্ছে কনফুসিয়াসবাদ, তাওবাদ ও বৌদ্ধবাদ
- কনফুসিয়াসবাদ বা কনফুসীয়বাদ প্রাচীন চীনে উদ্ভূত চিন্তা ও আচরণের ব্যবস্থা
- তাওবাদ হচ্ছে প্রাচীন চীনের দর্শনের একটি মৌলিক সূত্র
- কুয়োমিনতাং ছিল সাম্রাজ্যবাদ চালিত চীনের প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দল
- আধা-সামন্তবাদী আধা-ঔপনিবেশিক চীন হচ্ছে ১৮৪০-১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ইতিহাস
- চীনের সামন্তবাদী সমাজ হচ্ছে একাদশ খ্রিস্টপূর্ব থেকে সপ্তদশ শতাব্দীর সমাজ
- চীনের দাস সমাজ হচ্ছে অষ্টাদশ থেকে একাদশ খ্রিস্টপূর্বাব্দ অবধি বিরাজিত কাল
- চীনের আদিম গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজের ইতিহাস ও সংস্কৃতি এবং দাসব্যবস্থার রাষ্ট্র
- চীনের ইতিহাস হচ্ছে প্রাচীন থেকে আধুনিককাল পর্যন্ত মুক্তির লড়াইয়ের ইতিহাস
- চীনা দর্শন হচ্ছে চীন দেশে উল্লেখযোগ্য মনীষাগত ও সাংস্কৃতিক বিকাশ
- মাও সেতুং ছিলেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এবং সাম্যবাদী বিপ্লবী
- কনফুসিয়াস ছিলেন শরত বসন্তকালের একজন চীনা দার্শনিক এবং রাজনীতিবিদ
চীনা রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাজবংশের স্থান ছিল খুবই উঁচুতে। সম্রাটের ঐশ্বরিক ক্ষমতায় বিশ্বাস করা হতো, তাকে বলা হত ‘স্বর্গের বরপুত্র’। সম্মান ও অধীনতার একটি রূপ হিসাবে, চীনা করদ-রাজ্যগুলি চীনা রাজবংশকে “Tiāncháo Sàngguó” (天朝上國; “উচ্চ রাজ্যের স্বর্গীয় রাজবংশ”) বা “Tiāncháo Dàguó” (天朝大國 ; মহান রাজ্যের স্বর্গীয় রাজবংশ; “) বলা হতো।
তথ্যসূত্র
১. অলোক কুমার ঘোষ, “চীনের ইতিহাস”, নেতাজী সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা, ষষ্ঠ মুদ্রণ মে ২০১০, পৃষ্ঠা ১১-১২।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।