চীনা লাল ফৌজ ১৯২৮ থেকে ১৯৩৭ পর্যন্ত চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সশস্ত্র বাহিনী

চীনা লাল ফৌজ বা চীনা লাল বাহিনী বা চীনা শ্রমিক ও কৃষকদের লাল ফৌজ (ইংরেজি: Chinese Red Army) বা চীনা শ্রমিক ও কৃষকদের বিপ্লবী সেনাবাহিনী, হচ্ছে ১৯২৮ সাল থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত বিরাজিত চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সশস্ত্র বাহিনী। এটি গঠিত হয়েছিল যখন নানচাং বিদ্রোহে জাতীয় বিপ্লবী সেনাবাহিনীর কমিউনিস্ট অংশগুলি বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং বিদ্রোহ করে। ১৯৩৭-১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধের সময় জাপানিদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য কুওমিনতাঙের সাথে দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্টের অংশ হিসাবে রেড আর্মিকে জাতীয় বিপ্লবী সেনাবাহিনীতে পুনর্গঠিত করা হয়েছিল। চীনের গৃহযুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ে তারা আবারও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং গণমুক্তি ফৌজ নাম ধারণ করে।

১৯২৭ সালের অক্টোবর মাসে চিংকাং পার্বত্য অঞ্চলে মাও সেতুং তার নবগঠিত সেনাবাহিনীকে স্থানান্তরিত করলেন। তিনি প্রতিষ্ঠিত করলেন হুনান-কিআংসি সীমান্ত অঞ্চলে শ্রমিক ও কৃষকের সরকার। ১৯২৯ সালে মাও সেতুং এবং চু তে-এর নেতৃত্বে লালফৌজ কিআংসির দক্ষিণে এবং ফুকিএন প্রদেশের পশ্চিমে এগিয়ে গেল। চুইআইচিন-এ (কিআংসিতে অবস্থিত) তাদের কর্মক্ষেত্রের কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুললেন কেন্দ্রীয় বিপ্লবী ঘাঁটি।

স্বাভাবিকভাবেই দুটি প্রশ্ন মনে জাগে। লালফৌজের বিকাশ এবং গ্রামীণ বিপ্লবী ঘাঁটির সৃষ্টি কেন সম্ভব হয়েছিল? তখন চিনের বিপ্লবী সংগ্রামে তারাই কেন প্রধান শক্তি ছিল ? এই দুটি প্রশ্নের তাত্ত্বিক উত্তর মাও দিয়েছিলেন দুটি প্রবন্ধে।

প্রথম প্রবন্ধ (Why it is possible for China’s Red State Power to Exist) প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৮ সালের অক্টোবর মাসে। প্রবন্ধটির মূল বক্তব্য হলোঃ

১. চিনে সর্বত্রই আঞ্চলিক কৃষি অর্থনীতি। বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি চিন খণ্ড বিচ্ছিন্ন করে আপন আপন প্রভাবমণ্ডল বিস্তারে উদ্যত। চিনের বিপ্লবীরা এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছে।
২. প্রথম বিপ্লবী গৃহযুদ্ধ চিনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে প্রভাবিত করেছে। 
৩. দেশব্যাপী বিপ্লবী পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
৪. লালফৌজ সৃষ্টি হয়েছে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের সুরক্ষা ও সমর্থনের শক্তিশালী ভিত্তি হিসাবে।
৫. সঠিক নীতি ও শক্তিশালী সংগঠনের মাধ্যমে কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালিত করবে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রশক্তিকে।

আরো পড়ুন:  প্রথম চীন-জাপান যুদ্ধের কারণ এবং যুদ্ধের পটভূমি

দ্বিতীয় প্রবন্ধ A Single spark will kindle a Prairie Fire লিখিত হয়েছিল ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে। বিমর্ষ কমিউনিস্ট কর্মীদের উৎসাহিত করতে মাও সে-তুং এই প্রবন্ধটি লেখেন। তিনি জানান প্রত্যককে বুঝতে হবে চিন একটি আধা-উপনিবেশ। অনেকগুলি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এখানে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী। এই সূত্রটি যথাযথ অনুধাবন করতে পারলেই কয়েকটি সংশয় কেটে যায়। যথাঃ

প্রথমত, চিনে যুদ্ধ চলবে দীর্ঘকাল ধরে। চিনে কখনও কোনো ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক শক্তি গড়ে ওঠেনি।

দ্বিতীয়ত, চিনে কৃষক সমস্যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমগ্র চিন জুড়ে কৃষক আন্দোলন গড়ে ওঠেনি।

তৃতীয়ত, এই পরিস্থিতিতে শ্রমিক ও কৃষকের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ক্ষমতার স্লোগান যুক্তিসিদ্ধ।

চতুর্থত, বিশ্বে চিনই একমাত্র দেশ যেখানে লালফৌজ আছে এবং ছোটো-ছোটো বিকাশশীল লাল অঞ্চল আছে। এই লাল অঞ্চল গড়ে উঠেছে পরাক্রান্ত সাদা রাজনৈতিক শক্তির পরিমণ্ডলের মধ্যে।

পঞ্চমত, চীনা লাল ফৌজ, গেরিলা সেনাবাহিনী এবং লাল মুক্তাঞ্চল চিনের মতো আধা-ঔপনিবেশিক দেশে সর্বহারা শ্রেণির নেতৃত্বে সংগঠিত সর্বোন্নত কৃষক শ্রেণির সংগ্রামের অস্ত্র। দেশব্যাপী বিপ্লবী অভ্যুত্থানের প্রসারে এগুলি হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ।

ষষ্ঠত, শুধুমাত্র গেরিলা যুদ্ধের কার্যক্রম দিয়ে দেশব্যাপী বিপ্লব সৃষ্টি সম্ভব নয়। এজন্য মাও সে-তুং, চু তে এবং ফাং চড় মিন প্রমুখ নেতৃবৃন্দ অন্যান্য পদক্ষেপও নিয়েছিলেন। বিভিন্ন স্থানে ঘাঁটি গড়ে তোলা, পরিকল্পনা মতো রাজনৈতিক শক্তি প্রসারিত করা, কৃষি বিপ্লবকে গভীর তাৎপর্যে মহিমান্বিত করা এবং জনগণের সশস্ত্র বাহিনীরূপে গড়ে তোলার জন্য প্রথমে শিআং (hsiang) রেড গার্ড, জেলা রেড গার্ড, কাউন্টি রেড গার্ড সংগঠিত করা হয়। পরের স্তরে গঠিত হয় আঞ্চলিক রেড আর্মি এবং স্থায়ী পেশাদার রেড আর্মি।

গেরিলা যুদ্ধের কৌশল 

গেরিলা যুদ্ধ দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত। প্রতিদিন তা প্রসারিত হয়েছে। গেরিলা যুদ্ধের মূলনীতি ও নির্দেশ এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে। গণজাগরণের জন্য গেরিলা সেনারা জনগণের মধ্যে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। কিন্তু শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামের সময় তারা সুসংহত হবে।

‘শত্রু এগিয়ে যায়। আমরা পিছু হটি। শত্রু থেমে যায়, আমরা তাদের হয়রান করি। শত্রু ক্লান্ত, আমরা আক্রমণ করি। শত্রু পালিয়ে যায়, আমরা পশ্চাদ্ধাবন করি। সুসংহত স্বাধীন অঞ্চলে আমরা তরঙ্গের মতো এগিয়ে যাই। শক্তিশালী শত্রু আমাদের পিছু নিলে আমরা বোঁ বোঁ গতিতে তাদের ঘিরে ফেলি। যত কম সময়ের মধ্যে সম্ভব সর্বোত্তম উপায়ে সর্বাধিক মানুষকে জাগ্রত করার এই কৌশল হলো অনেকটা জাল বিছানোর মতো। বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে জাল ছড়িয়ে দেওয়া এবং যে-কোনো মুহূর্তে জাল টেনে নিয়ে আসা। এটা আমাদের শিখতে হবে। জনগণকে জয় করার জন্য জাল ছড়িয়ে দেব এবং শত্রুকে পরাভূত করার জন্য জাল গুটিয়ে নেব।’

আরো পড়ুন:  মাও সেতুং ছিলেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এবং সাম্যবাদী বিপ্লবী

গেরিলা যুদ্ধের এইসব নীতি মাও বিশ্লেষণ করেছেন তার দ্বিতীয় প্রবন্ধে বিমর্ষ। জনগণকে উজ্জীবিত করার জন্য। 

ওই দিন বিপ্লব অবশ্যই ঘটবে। এমন কথা মার্কসবাদীরা বলতে পারেন না। মার্কসবাদীরা গণৎকার নন। ভবিষ্যৎ কালের সাধারণ দিশা নির্ণয় তারা করতে পারেন এবং তা করা সংগত বটে। কিন্তু নির্দিষ্ট তারিখ এবং সময় তাদের পক্ষে বলা সম্ভব নয়, সংগতও নয়। মাও লিখেছেন বিপ্লব সম্পর্কেঃ

It is like a ship on the sea whose mast-head is already seen at a distance by people standing on the shore; it is like the morning sun which, rising with radiant beams in the east, is already seen from afar by people standing on the top of a mountain; it is like an almost fully formed child stirring in y the mother’s womb.

এটা সমুদ্রের মধ্যে জাহাজের মতো, সমুদ্র তীরে দাঁড়িয়ে দূর থেকে ইতিমধ্যেই মানুষ যার মাস্তুলশীর্ষ দেখতে পেয়েছে। এটা ঊষার সূর্যের মতো, পর্বতচূড়ায়। দাঁড়িয়ে দূর থেকে ইতিমধ্যেই মানুষ যার উজ্জ্বল বিকিরণ দেখতে পেয়েছে। এটা একটা পূর্ণ গঠিত শিশু যে আলোড়িত হচ্ছে মাতার গর্ভে।

লালফৌজের ভূমিকা

কৃষিবিপ্লব ছিল মাও-এর সাধনার বীজমন্ত্র। তিনি সবচেয়ে বেশি নির্ভর করেছিলেন দরিদ্র কৃষক ও খেতখামারের মজুরদের ওপর। মাঝারি কৃষকের সঙ্গে তারা ছিলেন ঐক্যসূত্রে আবদ্ধ। ধনবান কৃষকদের ভূমিকা তিনি প্রতিরোধ করেছিলেন। শুধুমাত্র ভূস্বামীবর্গের বিনাশ তার কাম্য ছিল। মাঝারি এবং ছোটো শিল্পপতি ও বণিককুলকে তিনি রক্ষা করতে চেয়েছিলেন।

কৃষিবিপ্লব মূলত সংগ্রাম। যুদ্ধও একধরনের সংগ্রাম। সে সময়ে চিন বিপ্লবে স্থলবাহিনীই ছিল প্রধান সংগঠন। শত্রুপক্ষ ছিল শক্তিমান, কমিউনিস্টরা দুর্বল। শত্রুপক্ষ ছিল বিশাল, কমিউনিস্টরা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র। শত্রুপক্ষ ছিল জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন। কিন্তু কমিউনিস্টরা ছিল জনগণের সঙ্গে নিবিড়ভাবে অঙ্গবদ্ধ। মাও সেতুংয়ের মতে লালফৌজের দায়িত্ব হবে বিবিধ।

১. কমিউনিস্ট পার্টি, গণরাষ্ট্র, কৃষি সংস্কার এবং অন্যান্য যাবতীয় আঞ্চলিক কাজে লালফৌজ হবে প্রচারক এবং সংগঠক।
২. দলীয় সদস্যদের মধ্যে লালফৌজ গড়ে তুলবে প্রবল রাজনৈতিক কর্মোন্মাদনা এবং গণশৃঙ্খলাবোধ।
৩. লালফৌজের যুদ্ধ হবে গণযুদ্ধ। সাধারণ মানুষ অংশ নেবে গেরিলা যুদ্ধে বা সতত পরিবর্তনশীল যুদ্ধে।
৪. দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে লালফৌজ অবতীর্ণ হবে। দ্রুত সিদ্ধান্ত মতো যুদ্ধও করতে হবে।
৫. সাধারণ সময়ে গণসমাবেশের জন্য লালফৌজ সাধারণ সেনা পাঠাবে। কিন্তু যুদ্ধের সময় শুক্রকে ঘেরাও করা বা ধ্বংস করার জন্য শ্রেষ্ঠ বাহিনী পাঠাবে।

আরো পড়ুন:  আফিম যুদ্ধ ১৯ শতকে কিং রাজবংশ এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে সংঘটিত দুটি যুদ্ধ

লাল ফৌজের জয়যাত্রা অব্যাহত থাকে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। উত্তর-পূর্ব চিনে জাপানের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন শুরু হয় ১৯৩১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর। চীনের বিশাল অংশ ১৯৩৫ সালের ভেতরে জাপানের অধিকারে চলে যায়। ১৯৩৩ সালের অক্টোবর মাসে লালফৌজের বিরুদ্ধে চিআং কাইসেক শুরু করেন পঞ্চম ঘেরাও অভিযান। এক্ষেত্রে লালফৌজ ব্যর্থ হয় কুঅমিনতাং-এর পঞ্চম ঘেরাও-অভিযান ধ্বংস করতে। লালফৌজের ভূমিকা ছিল আত্মরক্ষামূলক। কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃবর্গের মধ্যেও মতৈক্য ছিল না। ফলশ্রুতিতে ১৯৩৪-৩৫ সালে পশ্চাদপসরণ করতে হয় লাল ফৌজকে যা ইতিহাসে লং মার্চ নামে বিখ্যাত হয়েছে।

তথ্যসূত্র

১. জহর সেন, এ যুগের চিনকথা, মিত্রম, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ জুন ২০০৭, পৃষ্ঠা ২৩৭-২৩৮।

Leave a Comment

error: Content is protected !!