চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় কংগ্রেস (সংক্ষেপে: NCCCP; আক্ষরিক অর্থে: Chinese Communist Party National Representatives Congress) হলো একটি পার্টি কংগ্রেস যা প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় কংগ্রেস তাত্ত্বিকভাবে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি) মধ্যে সর্বোচ্চ সংস্থা। ১৯৮৭ সাল থেকে জাতীয় কংগ্রেস অক্টোবর বা নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ১৯৫৬ সালে শুরু হওয়ার পর থেকে এই ঘটনার স্থান হলো বেইজিংয়ের জনগণের মহাকক্ষ। কংগ্রেস হলো CCP-তে শীর্ষ-স্তরের নেতৃত্বের পরিবর্তনের জন্য সর্বজনীন স্থান এবং পার্টির সংবিধানে পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান। বিগত দুই দশকে সিসিপির জাতীয় কংগ্রেস নেতৃত্বের পরিবর্তনের প্রতীকী অংশ হিসেবে অন্তত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং তাই আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যপদ অনুমোদন করে; যেই কেন্দ্রীয় কমিটি হচ্ছে পার্টি, রাজ্য এবং সমাজের শীর্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি সংস্থা। অনুশীলনে, যা হোক, কেন্দ্রীয় কমিটির জন্য উন্মুক্ত আসনের চেয়ে সামান্য বেশি প্রার্থী মনোনীত করা হয়, যা খুব অজনপ্রিয় প্রার্থীদের নির্মূল করার জন্য নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কংগ্রেসের ভূমিকাকে সীমিত করে। জনগণের জাতীয় কংগ্রেসের পাঁচ-বছরের আবর্তনে কেন্দ্রীয় কমিটির প্লেনামগুলির একটি ধারাক্রম রয়েছে যা ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে কমবেশি প্রতি বছর একবার নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ২০১০-এর দশকের শেষের দিকে, সিসিপি একটি মসৃণ এবং সুশৃঙ্খল উত্তরাধিকার বজায় রাখার চেষ্টা করেছে এবং ব্যক্তিপূজাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে। সিসিপি প্রতি দশ বছর পরপর পার্টি কংগ্রেসে সমান সংখ্যক কর্মীদের একটি বড় পরিবর্তন করেছে এবং বিজোড় সংখ্যার পার্টি কংগ্রেসে এই পরিবর্তনের প্রস্তুতি জনগণের মধ্যে প্রচার করেছে। এ ছাড়া দলের শীর্ষ পর্যায়ের লোকজন অবসরে যাওয়ায় দলের তরুণ সদস্যদের এক স্তর ওপরে যাওয়ার জায়গা তৈরি হয়েছে।
তাই পার্টি কংগ্রেস হচ্ছে সাধারণ কর্মীদের রদবদলের সময়, এবং শুধুমাত্র শীর্ষ নেতৃত্বই নয়, চীনের কার্যত সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থানগুলিতে আলাপ-আলোচনার শীর্ষবিন্দুকে জড়িত করে৷ পার্টির পিরামিড কাঠামো এবং বাধ্যতামূলক অবসরের বয়সের অস্তিত্বের কারণে, পার্টি কংগ্রেসে পদোন্নতি না পাওয়া ক্যাডারদের তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জাতীয় গণকংগ্রেসের অনুশীলনের মতোই, কংগ্রেসের সম্মেলন-প্রতিনিধিদের আনুষ্ঠানিকভাবে তৃণমূল দলীয় সংগঠনগুলি থেকে নির্বাচিত করা হয় এবং এনপিসি-র মতোই স্থবির নির্বাচনের একটি ব্যবস্থা রয়েছে যেখানে দলের প্রতিনিধিদের এক স্তর পরবর্তী উচ্চ স্তরের নেতৃবৃন্দকে ভোট দেয়। একটি নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জাতীয় কংগ্রেসের জন্য সম্মেলন-প্রতিনিধিরা সিসিপি-র প্রাদেশিক স্তরের পার্টি কংগ্রেস বা তাদের সমতুল্য ইউনিটগুলি দ্বারা নির্বাচিত হয় এবং এই নির্বাচন প্রক্রিয়া পলিটব্যুরো স্ট্যান্ডিং কমিটির নির্দেশ অনুসারে পার্টির সংগঠন বিভাগ দ্বারা পরীক্ষণ এবং তত্ত্বাবধান করা হয়।
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ষষ্ঠ জাতীয় কংগ্রেস
১৯২৮ সালের ১৮ জুন থেকে ১১ জুলাই অনুষ্ঠিত হয় চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ষষ্ঠ জাতীয় কংগ্রেস। এই কংগ্রেসে অনুমোদিত হয় কয়েকটি সিদ্ধান্ত।
১. চিন বিপ্লব গণতান্ত্রিক বিপ্লব।
২. পার্টির সাধারণ লক্ষ্য হলো সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সামন্ত্রবাদ-বিরোধী শ্রমিক ও কৃষকের গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব গড়ে তোলা এবং লালফৌজ গঠন করা।
৩. গ্রামাঞ্চলে বিপ্লবী ঘাঁটি গড়ে তোলা।
৪. জমি বণ্টন সম্পন্ন করা।
৫. সর্বত্র গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত করা দলের লক্ষ্য নয়। গণসমর্থনের ভিত্তি প্রসারিত করাই হবে দলের প্রধান লক্ষ্য।
ষষ্ঠ কংগ্রেসের কিছু বিচ্যুতি ছিল। এগুলি হলো
১. গণতান্ত্রিক বিপ্লবের শনৈঃ শনৈঃ গতি সম্পর্কে ষষ্ঠ কংগ্রেস অবহিত ছিল না।
২. মধ্যবর্তী শ্রেণির ভূমিকা সম্পর্কে কমিউনিস্ট পার্টি যথেষ্ট অবহিত ছিল। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি ছিল দ্বন্দ্বপীড়িত, দল তা ধারণা করতে পারেনি।
৩. শহরাঞ্চলে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি ছিল প্রভাবশালী কিন্তু গ্রামাঞ্চলে দুর্বল। সুতরাং দলের লক্ষ্য হওয়া উচিত শহরাঞ্চল ছেড়ে গ্রামাঞ্চলে শক্তি সংহত করা।[১]
ষষ্ঠ কংগ্রেসে ১৪ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি নিরবাচিত হয়। মাও সেতুং কংগ্রেসে উপস্থিত ছিলেন না। কিন্তু তিনি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।
মাও সেতুং এবং ওয়াং মিং পার্টি লাইনগত দ্বন্দ্ব
মাও সেতুং এবং ওয়াং মিংয়ের মধ্যে পার্টি লাইনগত দ্বন্দ্ব (১৯৩০-১৯৪০) ছিল চিনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি) নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আদর্শিক এবং ক্ষমতার লড়াই, যেখানে মাওয়ের গ্রামীণ গেরিলা কৌশল ওয়াং মিংয়ের মস্কো-সমর্থিত, গোঁড়া মার্কসবাদী-লেনিনবাদী গোঁড়ামির বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। মাও সেতুং ওয়াংয়ের “বামপন্থী” লাইনকে পরাজিত করে তার নেতৃত্বকে দৃঢ় করেছিলেন। ওয়াং মিংয়ের বামপন্থী লাইন মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়েছিল।
পার্টি লাইনগত দ্বন্দ্বের মূল দিক
মাওয়ের লাইন এবং ওয়াং মিংয়ের লাইনের ভেতরে ছিল মতাদর্শগত পার্থক্য। ওয়াং মিং, “আন্তর্জাতিকতাবাদীদের” প্রতিনিধিত্ব করেন এবং মস্কোতে প্রশিক্ষিত, শহুরে বিদ্রোহ এবং কঠোর, সোভিয়েত-শৈলীর কৌশলগুলির পক্ষে সমর্থন করেন। বিপরীতে, মাও সেতুং গ্রামাঞ্চল থেকে শহরগুলিকে ঘিরে গেরিলা যুদ্ধ ব্যবহার করে “কৃষক-ভিত্তিক বিপ্লব”-এর উপর জোর দিয়েছিলেন।
এছাড়াও ক্ষমতার সংগ্রাম ও নেতৃত্বের সংগ্রামও বিদ্যমান ছিল। লং মার্চের সময় ১৯৩৫ সালের জুনি কনফারেন্সের পর, মাও সেতুং মস্কো-সংযুক্ত দল থেকে ক্ষমতা সরিয়ে নিতে শুরু করেন।
যুক্ত ফ্রন্ট কৌশলের ক্ষেত্রেও দুটি লাইনে ভিন্নতা ছিল। চীন-জাপান যুদ্ধের সময় (১৯৩৭ থেকে শুরু), ওয়াং মিং জাপানের বিরুদ্ধে একটি ঐক্যফ্রন্ট বজায় রাখার জন্য সিসিপিকে কুওমিনতাং (কেএমটি) এর অধীনস্থ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। মাও সেতুং স্বাধীন সিসিপি শক্তি এবং গেরিলা কৌশল সংরক্ষণের জন্য যুক্তি দিয়েছিলেন, যা তীব্র বিবাদের দিকে চালিত করে।
এছাড়াও সংশোধন আন্দোলন নিয়েও দুটি লাইনে ভিন্নতা দেখা যায়। এই দুই লাইনের বিরোধের সমাপ্তি ঘটে ১৯৪২-১৯৪৫ ইয়ান’আন সংশোধন আন্দোলনে, যেখানে মাও পার্টির মতাদর্শ সংস্কারের জন্য একটি প্রচারাভিযান শুরু করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত ওয়াং মিংকে প্রান্তিক করে এবং “মাও সেতুং চিন্তা”কে পার্টি লাইন হিসাবে শক্তপোক্ত করে।
১৯৪৫ সালের মধ্যে, মাও সেতুংয়ের শ্রেষ্ঠত্ব দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং ওয়াং মিং-এর প্রভাব কার্যকরভাবে ধ্বংস হয়েছিল।
আরো পড়ুন
- চীনের পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা
- লু স্যুনের ছোটগল্প-এর চরিত্রগুলো সামন্তবাদের বিরুদ্ধে লড়ায় করেছে
- গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা
- চীনা সমাজের শ্রেণি বিশ্লেষণ
- লং মার্চ বা দীর্ঘ যাত্রা ছিল একটি সামরিক পশ্চাদপসরণ যা লাল ফৌজ নিয়েছিল
- চীনা লাল ফৌজ ১৯২৮ থেকে ১৯৩৭ পর্যন্ত চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সশস্ত্র বাহিনী
- চীনের পার্টির জাতীয় কংগ্রেস হচ্ছে সর্বোচ্চ সংস্থার সম্মেলন
- চীনা গৃহযুদ্ধ চীনের কুওমিনতাং ও কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে চলা গৃহযুদ্ধ
- চীন থেকে অস্ত্র আমদানি বাংলাদেশকে সাম্রাজ্যবাদের অধীনস্থ করেছে
- মাও সেতুং-এর গণচীনের হারিয়ে যাওয়া লাল রং এবং বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী চীন
- চীনের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ
- প্রথম চীন-জাপান যুদ্ধের কারণ এবং যুদ্ধের পটভূমি
- তাইপিং বিদ্রোহ ছিল একটি বিশাল বিদ্রোহ বা গৃহযুদ্ধ যা চীনে সংঘটিত হয়েছিল
- আফিম যুদ্ধ ১৯ শতকে কিং রাজবংশ এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে সংঘটিত দুটি যুদ্ধ
- দেং জিয়াওপিং ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের একজন প্রতিবিপ্লবী কুচক্রী রাজনীতিবিদ
- চীনা ইতিহাসের রাজবংশগুলি ছিল বংশগত রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা
- চীনে শ্রেণিসংগ্রাম প্রকাশিত হয়েছে শোষক ও নির্যাতকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রূপে
- পুরনো চীনের অর্থনীতি ছিল গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক
- চীনা জনগণের ধর্মচেতনার উৎস হচ্ছে কনফুসিয়াসবাদ, তাওবাদ ও বৌদ্ধবাদ
- কনফুসিয়াসবাদ বা কনফুসীয়বাদ প্রাচীন চীনে উদ্ভূত চিন্তা ও আচরণের ব্যবস্থা
- তাওবাদ হচ্ছে প্রাচীন চীনের দর্শনের একটি মৌলিক সূত্র
- কুয়োমিনতাং ছিল সাম্রাজ্যবাদ চালিত চীনের প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দল
- আধা-সামন্তবাদী আধা-ঔপনিবেশিক চীন হচ্ছে ১৮৪০-১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ইতিহাস
- চীনের সামন্তবাদী সমাজ হচ্ছে একাদশ খ্রিস্টপূর্ব থেকে সপ্তদশ শতাব্দীর সমাজ
- চীনের দাস সমাজ হচ্ছে অষ্টাদশ থেকে একাদশ খ্রিস্টপূর্বাব্দ অবধি বিরাজিত কাল
- চীনের আদিম গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজের ইতিহাস ও সংস্কৃতি এবং দাসব্যবস্থার রাষ্ট্র
- চীনের ইতিহাস হচ্ছে প্রাচীন থেকে আধুনিককাল পর্যন্ত মুক্তির লড়াইয়ের ইতিহাস
- চীনা দর্শন হচ্ছে চীন দেশে উল্লেখযোগ্য মনীষাগত ও সাংস্কৃতিক বিকাশ
- মাও সেতুং ছিলেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এবং সাম্যবাদী বিপ্লবী
- কনফুসিয়াস ছিলেন শরত বসন্তকালের একজন চীনা দার্শনিক এবং রাজনীতিবিদ
তথ্যসূত্র
১. জহর সেন, এ যুগের চিনকথা, মিত্রম, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ জুন ২০০৭, পৃষ্ঠা ২৩৭-২৩৮।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।