লিও তলস্তয় বা কাউন্ট লেভ নিকোলায়েভিচ তলস্তয় বা টলস্টয় বা টলষ্টয় বা ল্যেভ তলস্তোয় (ইংরেজি: Leo Nikolayevich Tolstoy; ২৮ আগস্ট ১৮২৮ – ২০ নভেম্বর ১৯১০) ছিলেন রুশ সাহিত্যিক। তিনি সাধারণত ইংরেজিতে কাউন্ট লিও তলস্তয় নামে পরিচিত। তাকে সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং প্রভাবশালী লেখক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একই সাথে তাঁকে রুশ সাহিত্যের অন্যতম ব্যক্তিত্ব হিসাবে বিবেচনা করা হয়।[১]
অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণকারী তলস্তয় বিশ বছর সময়কালের তাঁর আধা-আত্মজীবনীমূলক ত্রয়ী, শৈশব, বাল্যকাল ও যৌবন (১৮৫২-১৮৫৬) এবং ক্রিমিয়ান যুদ্ধের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে সেভাস্তোপল স্কেচেস (১৮৫৫) দিয়ে প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। তাঁর “যৌবনের পাপ” এর উপর ভিত্তি করে তাঁর যুদ্ধ ও শান্তি (১৮৬৯), আন্না কারেনিনা (১৮৭৮) এবং পুনরুত্থান (১৮৯৯)-কে প্রায়শই বাস্তববাদী কথাসাহিত্যের শীর্ষ এবং সর্বকালের সেরা তিনটি উপন্যাস হিসাবে উল্লেখ করা হয়। তাঁর রচনায় আলোশা দ্য পট (১৯১১) এবং আফটার দ্য বল (১৯১১) এর মতো ছোটগল্প এবং পারিবারিক সুখ (১৮৫৯), ইভান ইলিচের মৃত্যু (১৮৮৬), ক্রয়টজার সোনাটা (১৮৮৯), দ্য ডেভিল (১৯১১) এবং হাদজি মুরাত (১৯১২) এর মতো উপন্যাস অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তিনি দার্শনিক, নৈতিক এবং ধর্মীয় বিষয়বস্তু নিয়ে নাটক এবং প্রবন্ধও লিখেছেন।[২]
লিও তলস্তয় তাঁর জীবদ্দশায় এবং পরবর্তীকালে অগণিত লেখক এবং সমালোচকদের কাছ থেকে প্রশংসা পেয়েছিলেন। ভার্জিনিয়া উলফ তলস্তয়কে “সকল ঔপন্যাসিকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ” বলে অভিহিত করেছিলেন, এবং গ্যারি শৌল মরসন যুদ্ধ ও শান্তিকে সমস্ত উপন্যাসের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
জীবন এবং কর্ম
রাশিয়ার সবচেয়ে অভিজাত এক জমিদার পরিবারে তলস্তয়ের জন্ম হয়েছিল ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দের ৯ সেপ্টেম্বর। তুলা প্রদেশের ইয়াসনারা পলিয়ানায় তাদের জমিদারী ছিল। সোনার চামচ মুখে নিয়েই তিনি একরকম জন্মেছিলেন, বেড়ে উঠেছিলেন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য আর আদর প্রশ্রয়ের মধ্যে।
মাত্র নয় বছর বয়সেই তলস্তয় তাঁর বাবা ও মাকে হারান। ফলে তাকে ও তার ভাইবোনদের মানুষ হতে হয় পরিবারের অন্য আত্মীয়-স্বজনের কাছে। তাতিয়ানা নামে তাঁর এক খুড়িমা ছিলেন। স্বচ্ছল এবং বড় পরিবারের মানুষ হয়েও তিনি খুবই সরল জীবন যাপন করতেন। তার সরলতা ও ধর্মপ্রাণ তলস্তয়ের জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিল। এই প্রভাবই যৌবনের ভোগ সুখে মাতোয়ারা তলস্তয়কে বারবার মনের নিভৃতে নিজেকে অন্তরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিত।
জমিদার তলস্তয় আত্মজিজ্ঞাসু মানবপ্রেমিক তলস্তয় হয়ে পৃথিবীর শ্রদ্ধা লাভ করেছিলেন। তথাকথিত জমিদার পরিবারের সদস্য হিসেবে যৌবনের উচ্ছলতা তলস্তয়কে ভোগসুখের মধ্যে মাতিয়ে রেখেছিল। রাজধানী পিটার্সবার্গে নানারকম সামাজিক মেলামেশা, তাস-দাবা, মদ্যপান আর ফুর্তি নিয়েই তিনি মজে থাকতেন।
কিন্তু এই আমোদ-প্রমোদের মধ্যেও মাঝে মাঝেই যেন কেমন থমকে যেতেন তিনি। কেমন যেন মনে হতো— এসব তিনি কি করছেন, জীবনের অপচয় ছাড়া এতো আর কিছু নয়। উচ্ছল প্রমোদের জীবন থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠত তাঁর মন। কিন্তু আশ্চর্য যে এই ভাবনা-চিন্তা স্থায়ী হতো না। কোন পরিকল্পনা সঙ্কল্পে রূপ নেবার আগেই ফের আনন্দ-ফুর্তির জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিতেন। কিন্তু মনের ভেতরে সূক্ষ্মভাবে জেগে থাকত একটা অতৃপ্তির অসাচ্ছন্দ।
এই টানা পোড়েনের মধ্যেই জীবন এগিয়ে চলছিল। তলস্তয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ হলো ১৮৫১ সালে। সেই সময়ে পারিবারিক জমিদারি দেখাশোনার জন্য তার উপস্থিতি জরুরি হয়ে পড়ল। তলস্তয় কঠিন এক সমস্যার সম্মুখীন হলেন। পড়াশোনা শেষ হয়েছে। এখন হয় গ্রামে জমিদারিতে ফিরে যেতে হবে, নয়তো অন্য ভাইকে সেই দায়িত্ব দিয়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দিতে হবে। কি করবেন সেই সিদ্ধান্ত স্থির করবার আগেই এক অদ্ভুত কান্ড করে বসলেন তলস্তয়।
তার এক ভাই, তার নাম নিকোলাস, সেনা বিভাগের অফিসার ছিল। তার সঙ্গে তিনি চলে গেলেন ককেশাস অঞ্চলে। সেখানে বিদ্রোহী তাতার উপজাতিদের সঙ্গে তখন জারের সেনাবাহিনীর প্রচন্ড লড়াই চলেছিল। তলস্তয় স্বেচ্ছাসেবক হয়ে সরকারি সেনাবাহিনীর সহযোগিতার কাজে লেগে গেলেন। প্রায় বছরখানেক সেনাবাহিনীর সঙ্গে থেকে যুদ্ধক্ষেত্র সম্বন্ধে বিচিত্র অভিজ্ঞতা লাভ হলো। এই অভিজ্ঞতাই তাকে কলম তুলে নেবার প্রেরণা জোগাল। পরের বছর তিনি ‘এরেইগ’ নামে একটি বই লিখলেন।
অল্প বয়সের লেখা হলেও বর্ণনার মাধুর্য পর্যবেক্ষণের গভীরতা এবং লেখকের বক্তব্যের অনাড়ম্বর ও তীক্ষ্ণতা বইটিতে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছিল। বইটি বিদগ্ধ মহলে সমাদৃত হলো। উৎসাহিত হয়ে তলস্তয় এবারে একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস রচনায় হাত দিলেন। ‘দ্য কসাকস’ নামের এই উপন্যাসটি প্রকাশিত হলো ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে।
এটি আত্মজীবনী মূলক লেখা না হলেও মূলত সৈনিক জীবনের অভিজ্ঞতা উপলব্ধি ও আন্তর জিজ্ঞাসা এমন গভীর অনুভূতির সঙ্গে বিবৃত হয়েছে যে দেশের শিক্ষিত মহল বুঝতে পারল যে নতুন এক শক্তিশালী লেখকের আবির্ভাব হয়েছে।
বস্তুত যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, তলস্তয়ের অন্তর্জগতে এক বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছিল। জীবন সম্পর্কে এক নতুন মূল্যবোধের সন্ধান পেলেন তিনি। এতকাল যে জীবন যাপন করেছেন তা যে প্রতিভা ও জীবনের সার্থকতার কঠিনতম অন্তরায় এই উপলব্ধি তাকে এক অজানা অতৃপ্তিতে পীড়ন করতে লাগল। জীবন কেন? তার সার্থকতা কোথায়? থেকে থেকে এই জিজ্ঞাসাই মনকে নাড়া দিতে লাগল।
বয়স যখন চব্বিশ হলো, তলস্তয় তাঁর জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজে পেলেন। তিনি উপলব্ধি করলেন, জীবন আনন্দময়! আর এই আনন্দ রয়েছে হিংসায় নয়, রক্তপাতে নয়, রয়েছে ভালবাসায়। ভালবাসারই অপর নাম ধর্ম। এই ধর্ম সাধনেই জীবনের সার্থকতা নিহিত।
স্বাভাবিক ভাবেই জীবনের লক্ষ স্থির হয়ে গেল তার। কিন্তু লক্ষ পুরনের জন্য কর্মক্ষেত্রে যে প্রস্তুতির আবশ্যক তা তার ছিল না। তাই লক্ষে সচেতনতা অবিচল রেখে চলল তার অপেক্ষার পালা। সৈনিক দলের কাজে ইস্তফা দিয়ে তলস্তয় কিছুকাল পিটার্সবার্গে বসবাস করলেন। পরে ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়লেন।
মানুষের জীবনবোধ ও জীবনচর্যা সম্পর্কে অভিজ্ঞতার সঞ্চয় বৃদ্ধির সহায়ক হয়েছিল তার এই ভ্রমণ। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি রাশিয়ায় ফিরে এলেন। দেশের নিরক্ষর দরিদ্র মানুষের জীবন সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভের অভিপ্রায় নিয়ে তিনি পৈতৃক জমিদারী দেখা শোনার কাজ শুরু করলেন। সেই সঙ্গে শুরু হলো নিরলস সাহিত্য সাধনা।
তলস্তয় এখন শতশত দরিদ্র প্রজার দণ্ডমুন্ডের কর্তা। কিন্তু প্রজাদের অবস্থা দেখে নিজেই লজ্জিত হলেন। একদম পাশাপাশি দুটি জীবনধারা, একটিতে চরম ভোগ, অপরটিতে চরম বঞ্চনা আর হতাশা। জীবনের এই অসম প্রবাহ চলতে পারে না।
অথচ বঞ্চিত জনের বঞ্চনা সম্পর্কে নেই উপলব্ধি। শিক্ষার অভাবেই এই চেতনাহীনতা। তলস্তয় নিজের চেষ্টায় স্কুল স্থাপন করে ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দিতে শুরু করলেন। শিক্ষা দেবার নতুন প্রণালীও তিনি উদ্ভাবন করলেন। আর এদিকে নিজে ত্যাগ করলেন ঐশ্বর্য আর বিলাসিতার জীবন। দরিদ্র কৃষকদের সঙ্গে নিজেও হয়ে গেলেন তাদেরই একজন।
ইতিপূর্বে ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে তলস্তয় বিয়ে করেছিলেন এক পরিচিত পরিবারের মেয়ে বেহরকে। তাদের বিবাহিত জীবনও সুখের হয়েছিল। বিবাহের পরে পরেই তিনি লিখতে শুরু করেছিলেন বিখ্যাত ‘ওয়ার অ্যান্ড পীস’ উপন্যাসটি।
এই উপন্যাসেই তলস্তয় প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল। সাহিত্য সমালোচকদের মতে উপন্যাস সাহিত্যের ইতিহাসে ‘ওয়ার অ্যান্ড পীস’ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস।
এদিকে তার জীবনচর্যায়ও ঘটে চলেছিল পরিবর্তন। দিনে দিনে তিনি কৃষকদের সঙ্গে মিশে তাদের মতই সাধারণ স্তরের জীবনযাত্রা শুরু করেছিলেন। এই সূত্রে স্ত্রীর সঙ্গেও শুরু হয়েছিল বাদানুবাদ। কিন্তু তলস্তয় জীবন-সত্যের সন্ধান পেয়েছেন, কোনো প্রতিকূলতাই তাকে লক্ষভ্রষ্ট করতে পারল না।
বর্তমান ভোগ সর্বস্ব সভ্যতার অন্তঃসারশূন্যতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ছিল। নিজের উপলব্ধি সাধারণকে বোঝাবার জন্য ছোট ছোট গল্প লিখতে লাগলেন তলস্তয়। তার এই গল্পগুলো জগতের সাহিত্যে অতুলনীয়।
তলস্তয় তাঁর বিখ্যাত দ্বিতীয় উপন্যাস লেখা শুরু করলেন ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে। এই সময়ে তার ব্যক্তিগত জীবনেও একের পর এক বিপর্যয় ঘটতে লাগল। তার দুটি সন্তান মারা গেল। ছোটবেলার যে খুড়িমা ছিলেন তার পরম স্নেহময়ী অভিভাবিকা—তাতিয়ানা, তলস্তয়ের জীবনের প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি তিনিও মারা গেলেন। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে স্ত্রীও অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
এর মধ্যেই আনা কারেনিনা প্রকাশিত হলো এবং অসাধারণ উপন্যাস রূপে স্বীকৃতি লাভ করল। এই উপন্যাসে নরনারীর মানসিক সম্পর্ক ও বৈচিত্র্য নিয়ে তলস্তয়ের যে সুগভীর জ্ঞানের পরিচয় প্রকাশিত হলো তা কেবল শেকসপীয়র ছাড়া আর কেউ সেই জ্ঞানের পরিচয় দিতে পারেননি।
যতই বয়স বাড়তে থাকে ততই তার ধারণা হতে থাকে যে সর্ব-ত্যাগের আদর্শ তিনি প্রচার করছেন সাহিত্যে, নিজের জীবনে তিনি তাকে পূর্ণমাত্রায় রূপায়িত করতে পারছেন না। এই অন্তর্দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হতে হতেই তিনি একে একে রচনা করলেন দ্য পাওয়ার অব ডার্কনেস এবং ক্রুয়েটজার সোনাটা। পরে পরেই রচনা করলেন দ্য রেজারেকশান নামের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাসটি। এই বইতে তিনি মানবজাতির ভ্রাতৃত্বের বাণী প্রচার করেছেন।
তলস্তয় নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি থেকে যেসব উপন্যাস রচনা করেছেন তার মধ্যে ওয়ার অ্যান্ড পীস, আনা কারেনিনা এবং দ্য রিজারেকশান এই তিনটি আজ জগতের ক্লাসিকরূপে পরিগণিত।
তলস্তয় চরম মানসিক অতৃপ্তিতে ভুগছিলেন। ঘরের বন্ধন, প্রেম-ভালবাসা সবই বাধা বলে মনে হচ্ছিল নিজের সঙ্কল্প পূরণের পথে। কৃষকদের বেশভূষায় কৃষকদের মত জীবন যাত্রায় আরও বেশি করে একাত্ম হতে পারছেন না।
সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের দুঃখ শোকের অংশীদার হতে পারছেন না। ঈশ্বরপ্রেম মানবপ্রেমের পূর্ণতায় সার্থক করে তুলতে পারছেন না এই ছিল দ্বন্দ্ব। এই নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গেও দীর্ঘস্থায়ী প্রেমের পরিসমাপ্তি ঘটল। শেষ পর্যন্ত বিরাশি বছর বয়সে একদিন শীতের রাতে সামান্য দরিদ্র লোকের পোশাকে তলস্তয় ঘরের আশ্রয় ত্যাগ করে পথে বেরিয়ে পড়লেন। এই পথই হলো তাঁর শেষ আশ্রয়স্থল।
যেই ট্রেনে চড়েছিলেন, সেখানেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তার এগার দিন পরে চিরতরে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন ১৯১০ খ্রিস্টাব্দের ৭ নভেম্বর।[৩]
তলস্তয় মূল্যায়ন
তলস্তয় বিশ্বমানবতার স্বার্থেই মানসিক দ্বন্দ্বের শিকার হয়েছিলেন। পত্নীর ভালবাসাহীন রূঢ় ব্যবহার তার বার্ধক্যের দিনগুলোকে বিষময় করে তুলেছিল। তবুও তিনি নিজের লক্ষে ছিলেন স্থির। এই মহামনীষীর বেদনার্ত জীবনের পরিসমাপ্তি শুধু রাশিয়ার নয়, সমগ্র মানবজাতির বেদনাপূর্ণ স্মৃতি হয়ে রয়েছে।
রাশিয়ার কাউন্ট তলস্তয়কে যুগাবতার বললেও অত্যুক্তি হয় না। সকল দেশেই দেখা যায়, সাধারণত মধ্যবিত্ত অবস্থাপন্ন শ্রেণিতেই ধর্মবীর, সাহিত্যরথী, বিজ্ঞানাচার্য, রাজনীতিক নেতা প্রভৃতির আবির্ভাব হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে সে নিয়মের ব্যতিক্রম হয়। কাউন্ট তলস্তয় তাহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। তিনি রাশিয়ার ক্ষমতাগর্বিত স্বাধিকার প্রমত্তবিলাসী অভিজাত সম্প্রদায়ে জন্ম গ্রহণ করে সমাজের দরিদ্র, অজ্ঞাত ও উপেক্ষিত লোকের দুঃখে অশ্রুবিসর্জন করেছেন। তার শিক্ষা যদি জগতে গৃহীত হয় তবে এই শোকদুঃখময় সংসার নন্দনে পরিণত হবে। যখন জার্মান যুদ্ধে বিধ্বস্ত হবার পূর্বে রাশিয়ার অবস্থা বিবেচনা করা যায়, তখন সেই দেশে বিলাসী অভিজাত সম্প্রদায়ে টলস্টয়ের আবির্ভাব পঙ্কিল সলিল পঙ্কজের বিকাশের মতই বোধ হয়। যে প্রাকৃতিক নিয়মে পঙ্কিল জলে পদ্মের ও অভিজাত সম্প্রদায়ে টলস্টয়ের আবির্ভাব সে নিয়ম যে ব্যতিক্রম তা প্রায় সকলেই বলবে?[৪]
লিও তলস্তয় ঋষি—তলস্তয় সাহিত্য-শিল্পী। তলস্তয়ের ঋষিত্ব-গৌরব অধিক কি সাহিত্য-শিল্পীর কৃতিত্ব অধিক, তার বিচারে আমরা প্রবৃত্ত হবার দরকার নেই। তবে এ কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, তার সাহিত্য-সাধনাও শেষে তার উদার মতে প্রভাবিত হয়েছিল; তিনি সাহিত্যের পথে তাহার মত জগতে ব্যক্ত করেছিলেন। তলস্তয়ের মত প্রতিভাবান ঔপন্যাসিক পৃথিবীতে অল্প। তার রচনায় জটিল মনস্তত্বের যেরূপ বিশ্লেষণ দেখা যায়—মানব চরিত্রাতিজ্ঞতার যে পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায়, তা সচরাচর দেখা যায় না।
উত্তরাধিকার
যদিও তলস্তয়কে প্রাথমিকভাবে একজন খ্রিস্টান নৈরাজ্যবাদী হিসেবে বিবেচনা করা হত, তবুও তার ধারণা এবং কাজ ইতিহাস জুড়ে অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক চিন্তাবিদদের প্রভাবিত করেছিল। তিনি সরকারগুলিকে মূলত হিংসাত্মক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করতেন, যা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ভয় দেখানো, কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে দুর্নীতি এবং অল্প বয়স থেকেই মানুষকে ধর্মান্তরিত করার মাধ্যমে একত্রিত করা হয়েছিল। অর্থনীতি সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, তিনি জীবিকা নির্বাহের জন্য কৃষিতে ফিরে আসার পক্ষে ছিলেন। তার দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, একটি সরলীকৃত অর্থনীতি পণ্য বিনিময়ের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেবে এবং এর ফলে, কারখানা এবং শহরগুলি – শিল্পের কেন্দ্র – সেকেলে হয়ে পড়বে।
তাঁর প্রভাব আজ দেশের বাইরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের শত্রু মোহনদাস গান্ধীও তাঁর শান্তিপূর্ণ অসহযোগের প্রেরণা পেয়েছিলেন তলস্তয়ের কাছ থেকেই।
রুশ দেশে
লিও তলস্তয় নিজের লেখা গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধে তলস্তয় দেখিয়েছেন ১৯০৫ সালের প্রথম রুশ প্রাক-বৈপ্লবিক রাশিয়ার জীবন। তিনি তার লেখায় ফুটিয়ে তুলেছেন সেই সময়ের পরস্পরবিরোধী পরিস্থিতি যাতে গড়ে উঠত রুশ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও স্তরের মানস গঠন ও বিভিন্ন রূপ।[৫] বিশেষত তার উপন্যাসে সমসাময়িক রুশ সমাজের যে চিত্র মানসপটে প্রতিফলিত হয় তা সযত্নে সংরক্ষিত হবার উপযুক্ত।
আনন্দের বিষয় বাঙ্গালী পাঠক বিশ এবং একুশ শতকে তলস্তয়ের রচনার সহিত পরিচিত হয়েছেনন। রুশ সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ বাংলা ভাষায় এখন সুলভ। আমরা আশা করি, বাঙ্গালী পাঠক তলস্তয়ের এই রচনা পাঠ করে আনন্দ ও শিক্ষা লাভ করবেন এবং তাদের আদরে উৎসাহিত হয়ে তলস্তয়ের সমগ্র রচনা বাংলা ভাসায় সহজলভ্য হবে।
আরো পড়ুন
- নোয়াম চমস্কি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মার্কিন দার্শনিক
- মার্শাল ম্যাকলুহান ছিলেন কানাডীয় প্রতিক্রিয়াশীল দার্শনিক
- জ্যাক দেরিদা ছিলেন প্রতিক্রিয়াশীল ফরাসি দার্শনিক
- বারট্রান্ড রাসেল ছিলেন একজন ব্রিটিশ মহাজ্ঞানী, চিন্তাবিদ, দার্শনিক ও মনীষী
- ইমানুয়েল কান্ট ছিলেন অষ্টাদশ শতকের জার্মান ভাববাদী দার্শনিক ও বিজ্ঞানী
- রেনে দেকার্ত ছিলেন সপ্তদশ শতকের ফরাসি দার্শনিক, গণিতশাস্ত্রবিদ ও বিজ্ঞানী
- জন স্টুয়ার্ট মিল উনিশ শতকের ইংল্যান্ডের দার্শনিক, যুক্তিবিদ এবং অর্থনীতিবিদ
- প্লেটো ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের প্লেটোবাদী স্কুল ও একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা দার্শনিক
- এরিস্টটল প্রাচীন গ্রিসের ধ্রুপদী সময়কালের একজন দার্শনিক এবং বহু জ্ঞানী
- সেন্ট অগাস্টিন ছিলেন উত্তর আফ্রিকার প্রকৃতিবাদী ধর্মতত্ত্ববিদ ও খ্রিস্টীয় দার্শনিক
- সেন্ট টমাস একুইনাস ছিলেন ইতালীয় খ্রিস্টীয় সন্ন্যাসী, দার্শনিক ও যাজক
- চার্লস লুই দ্য মন্টেস্কু স্বৈরতন্ত্র ও রাজতন্ত্রবিরোধী একজন পুঁজিবাদী দার্শনিক
- মেকিয়াভেলি ইতালীয় রেনেসাঁর কূটনীতিক, দার্শনিক এবং জাতীয়তাবাদী লেখক
- জাঁ জ্যাক রুশো ফরাসি বিপ্লবের তাত্ত্বিক এক পুঁজিবাদী দার্শনিক, লেখক ও সুরকার
- জন লক ছিলেন সপ্তদশ শতকের ইংরেজ বস্তুবাদী দার্শনিক ও রাজনৈতিক লেখক
- লেনিন ছিলেন বিশ শতকের ইউরোপের মহত্তম মানব এবং মার্কসবাদের উত্তরসূরি
- কনফুসিয়াস ছিলেন শরত বসন্তকালের একজন চীনা দার্শনিক এবং রাজনীতিবিদ
- আবুল ফজল ছিলেন আকবরের এক নবরত্ন, সুপণ্ডিত, ইতিহাসবেত্তা ও রাজনীতিক
- মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ছিলেন ভারতের মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণির নেতা
- টমাস হবস আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক
- লিও তলস্তয় ছিলেন সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং প্রভাবশালী লেখক
- জর্জ উইলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেল: জার্মান ভাববাদী দর্শনের চরম উৎকর্ষ ও পরম ভাববাদ
তথ্যসূত্র
১. অনুপ সাদি, ২৪ ডিসেম্বর ২০২০; রোদ্দুরে.কম, “রুশ সাহিত্যের ব্যক্তিত্ব তলস্তয় নিজের লেখায় দেখিয়েছেন রুশ প্রাক-বৈপ্লবিক জীবন”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/biography/leo-tolstoy/
২. ইংরেজি উইকিপিডিয়া, সংগ্রহের তারিখ ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।
৩. যাহেদ করিম সম্পাদিত নির্বাচিত জীবনী ১ম খণ্ড, নিউ এজ পাবলিকেশন্স, ঢাকা; ২য় প্রকাশ আগস্ট ২০১০, পৃষ্ঠা ১১৫-১১৯।
৪. হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ, ভূমিকা, টলস্টয়ের গল্প, বৃন্দাবন ধর এণ্ড সন্স লি. কলকাতা, দ্বাদশ সংস্করণ ১৩৬২।
৫. ভি. আই. লেনিন, অনুপ সাদি সম্পাদিত সাহিত্য প্রসঙ্গে, টাঙ্গন, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০২০, পৃষ্ঠা ২৪
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।