হিপ্পোর অগাস্টিন বা সেন্ট অগাস্টিন বা আউরেলিয়ুস আউগুস্তিনুস (লাতিন: Aurelius Augustinus Hipponensis; ১৩ নভেম্বর ৩৫৪ – ২৮ আগস্ট ৪৩০) ছিলেন একজন ধর্মতত্ত্ববিদ, দার্শনিক এবং রোমান উত্তর আফ্রিকার খ্রিস্টীয় ধর্মাধ্যক্ষ। তাঁর লেখাগুলি পশ্চিমা দর্শন এবং পাশ্চাত্য খ্রিস্টধর্মের বিকাশের উপর প্রভাব ফেলেছিল এবং প্যাট্রিস্টিক সময়কালে তাঁকে লাতিন চার্চের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চার্চ ফাদার হিসাবে দেখা হয়। তাঁর অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে রয়েছে দ্য সিটি অফ গড, অন ক্রিশ্চান ডকট্রিন এবং কনফেসনস। তাঁর সমসাময়িক জেরোমের মতানুসারে অগাস্টিন “প্রাচীন বিশ্বাসকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন”। [১]
সেন্ট অগাস্টিন-এর জন্ম উত্তর আফ্রিকার হিপোতে। যৌবনকালে অগাস্টিন ছিলেন ধর্মীয় বিশ্বাসে প্যাগান বা প্রকৃতিবাদী। কিন্তু কিশোর বয়স থেকেই তাঁর মধ্যে সত্যানুসন্ধানের প্রবল আগ্রহ প্রকাশ পেতে থাকে। অগাস্টিনের রচনার আগ্রহ এবং ক্ষমতাও ছিল অসাধারণ। তাঁর সমকালীন জীবনের ধর্মীয়, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং ব্যক্তির জীবনের নীতিগত সমস্ত সমস্যাই তাঁর রচনাসমূহে আলোচিত হয়েছে। এই রচনার মধ্যে তাঁর ‘কনফেশন’ বা ‘স্বীকারোক্তি’ এবং ‘সিটি ব গাড’ বা ‘ঈশ্বরের রাজ্য’ প্রসিদ্ধ। তাঁর স্বীকারোক্তির মধ্যে তাঁর যৌবনকালের আচরণ এবং বিচিত্র ধর্মীয় অভিজ্ঞতার বর্ণনা আছে।
অগাস্টিন বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসরণ এবং বিচার শেষে ৩৩ বৎসর বয়সে খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেন। ৩৯১ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে হিপোর ধর্মযাজক রূপে ঘোষণা করা হয়। খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করার পর তিনি খ্রিস্ট ধর্মের একজন শক্তিশালী প্রচারক এবং রহস্যবাদী দার্শনিকরূপে জীবনযাপন করেন। দর্শনের ক্ষেত্রে অগাস্টিনের মূল কথা ছিল: বিশ্বাস ব্যতীত জ্ঞান সম্ভব নয়।
সেন্ট অগাস্টিনের ‘ঈশ্বরের রাজ্য’ বা ‘সিটি অব গড’ খন্ডাকারে তের বছর ধরে রচিত হয়। সর্বপ্রকার সমস্যাই তিনি তাঁর এই গ্রন্থে আলোচনা করেন। ‘ঈশ্বরের রাজ্য’ এবং ‘পাপের রাজ্য’কে অগাস্টিন পুণ্য এবং পাপ; সৎ এবং অসৎ-এর দ্বন্দ্বমান জগৎরূপে কল্পনা করেন। বিশ্ব সম্পর্কে খ্রিষ্টধর্মের বিশ্বাস অগাস্টিনের ইতিহাস ব্যাখ্যার ভিত্তি হিসাবে কাজ করেছে। ইতিহাসের এ ব্যাখ্যাকে অদৃষ্টবাদ বলা হয়। বিশ্বে যা কিছূ ঘটেছে, ঘটছে বা ঘটবে তা সবই ঈশ্বর কর্তৃক পূর্ব নির্ধারিত।[২]
আরো পড়ুন
- ডেভিড হিউম: অভিজ্ঞতাবাদ ও সংশয়বাদী দর্শনের এক অমর আখ্যান
- জ্যাক দেরিদা ছিলেন প্রতিক্রিয়াশীল ফরাসি দার্শনিক
- বারট্রান্ড রাসেল ছিলেন একজন ব্রিটিশ মহাজ্ঞানী, চিন্তাবিদ, দার্শনিক ও মনীষী
- ইমানুয়েল কান্ট ছিলেন অষ্টাদশ শতকের জার্মান ভাববাদী দার্শনিক ও বিজ্ঞানী
- রেনে দেকার্ত ছিলেন সপ্তদশ শতকের ফরাসি দার্শনিক, গণিতশাস্ত্রবিদ ও বিজ্ঞানী
- জেরেমি বেনথাম ছিলেন ইংরেজ দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, সংস্কারক ও আইনবিদ
- প্লেটো ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের প্লেটোবাদী স্কুল ও একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা দার্শনিক
- এরিস্টটল প্রাচীন গ্রিসের ধ্রুপদী সময়কালের একজন দার্শনিক এবং বহু জ্ঞানী
- সেন্ট অগাস্টিন ছিলেন উত্তর আফ্রিকার প্রকৃতিবাদী ধর্মতত্ত্ববিদ ও খ্রিস্টীয় দার্শনিক
- সেন্ট টমাস একুইনাস ছিলেন ইতালীয় খ্রিস্টীয় সন্ন্যাসী, দার্শনিক ও যাজক
- আল্লামা মহম্মদ ইকবাল ছিলেন একজন মুসলিম লেখক, দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ
- আল কিন্দি নবম শতাব্দীর মুসলিম দার্শনিক, গণিতবিদ, চিকিৎসক এবং সংগীতজ্ঞ
- ইবনে সিনা ছিলেন সামন্ত যুগের দার্শনিক, চিকিৎসাবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী এবং কবি
- আল ফারাবির রাষ্ট্রচিন্তা বা রাষ্ট্রদর্শনে আল ফারাবির অবদান সম্পর্কে আলোচনা
- ইমাম আল গাজ্জালী ছিলেন সামন্তবাদী সাধক, ধর্ম বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞ ও দার্শনিক
- ইবনে খালদুন সামন্তযুগের আরব সভ্যতার ঐতিহাসিক, সমাজতাত্ত্বিক ও দার্শনিক
- ইবনে রুশদ ছিলেন আরব সভ্যতার সামন্ত যুগের বিখ্যাত দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক
- আল ফারাবি সামন্তযুগের প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তায় এক গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক
- হার্বার্ট স্পেন্সার ছিলেন ইংরেজ দার্শনিক, জীববিজ্ঞানী, নৃতাত্ত্বিক ও সমাজবিজ্ঞানী
- টমাস হিল গ্রীন ছিলেন উনিশ শতকের ইংল্যাণ্ডের শিক্ষাবিদ এবং দার্শনিক
- কৌটিল্য বা চাণক্য প্রাচীন ভারতীয় কূট রাজনৈতিক গুরু ও অর্থশাস্ত্রের রচয়িতা
- কনফুসিয়াস ছিলেন শরত বসন্তকালের একজন চীনা দার্শনিক এবং রাজনীতিবিদ
- অরবিন্দ ঘোষ ছিলেন অগ্নিযুগের মহানায়ক ও সিদ্ধযোগী একজন কবি ও গুরু
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বাংলা ভাষার লেখক, কবি দার্শনিক ও চিন্তাবিদ
- আবুল ফজল ছিলেন আকবরের এক নবরত্ন, সুপণ্ডিত, ইতিহাসবেত্তা ও রাজনীতিক
- মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ছিলেন ভারতের মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণির নেতা
- জর্জ উইলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেল: জার্মান ভাববাদী দর্শনের চরম উৎকর্ষ ও পরম ভাববাদ
তথ্যসূত্র
১. অনুপ সাদি, ৩০ এপ্রিল ২০১৯, “সেন্ট অগাস্টিন প্রসঙ্গে”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/biography/saint-augustine/
২. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; ৫ম মুদ্রণ জানুয়ারি, ২০১২; পৃষ্ঠা ৭১।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚