উপন্যাস কী? রূপকথা থেকে আধুনিক উপন্যাসের আত্মপ্রকাশের ইতিহাস

উপন্যাস (ইংরেজি: Novel) সাধারণত গদ্য কথাসাহিত্যরূপে রচিত তুলনামূলক একটি দীর্ঘ লেখা এবং এটি সচরাচর একটি স্বতন্ত্র বই হিসাবে প্রকাশিত হয়। সাহিত্যের বিভিন্ন আঙ্গিকগুলোর মধ্যে উপন্যাসের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞার্থ নির্ণয় করাই বোধ হয় সর্বাপেক্ষা দুরূহ ও কঠিন কাজ। কেননা, সময় ও সমাজের নানা বিচিত্রমুখী ঘাত-প্রতিঘাত, উত্থান-পতন এবং ভাঙা-গড়ার এক যুগসন্ধিক্ষণে উপন্যাসের আবির্ভাব হয়েছে। আর এই গতিশীলতার কারণে নির্দিষ্ট কোনো গণ্ডি বা মানদণ্ড দিয়ে উপন্যাসের স্বভাবধর্ম নিরূপণ করা সম্ভব নয়। উপন্যাসের উদ্ভবের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এর সঙ্গে সমাজবিন্যাস, আর্থ-উৎপাদন কাঠামো, মানুষের মনোজাগতিক সূক্ষ্মতা এবং অস্তিত্ব জিজ্ঞাসার জটিল ক্রমবিকাশের প্রশ্নটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

উপন্যাসের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট

ইউরোপে উপন্যাসের উদ্ভব ঘটেছিল রেনেসাঁ বা নবজাগরণ-পরবর্তী মানুষের নতুন জীবন-ভাবনা, বাণিজ্যপুঁজির আশ্রয়ে গড়ে ওঠা মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিপুল বিস্তার এবং শিল্পবিপ্লব-উত্তর নাগরিক সভ্যতার দ্বন্দ্বসংঘাতপূর্ণ, জটিল, বৈচিত্র্যময় ও গতিশীল জীবনের এক অনন্য শিল্প-আঙ্গিক হিসেবে। সুতরাং, উপন্যাস তার জন্মলগ্নেই সমাজ ও জীবনের বাস্তবতার এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে। আর এই বাস্তবতার চরিত্র ও রূপ সমাজ এবং ব্যক্তিভেদে অত্যন্ত বিচিত্র ও বহুমুখী।[১]

কথাশিল্পের ইতিহাস ও আধুনিক মাধ্যম হিসেবে উপন্যাস

মূলত প্রাচীনকালের রূপকথা, উপাখ্যান ইত্যাদি হচ্ছে আধুনিক কথাশিল্পের পূর্বপুরুষ। প্রাচীন আমলের এই সব উপাদানের মধ্যেই রূপ পেয়েছিল সেকালের মানুষের বহুমুখী অভিজ্ঞতা, আবেগ-অনুভূতি, উৎকণ্ঠা, সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও নৈতিকতার চিত্র। জীবন ঠিক এমনিভাবেই নিজেকে নানারূপে প্রকাশ করে বিজয়ী করে তোলে—আর তার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো কথা সাহিত্যের প্রধান শাখা—উপন্যাস। উপন্যাস আধুনিক যুগের একটি অনন্য শিল্পরূপ, যার মূলে রয়েছে এক বিশেষ ধরনের বর্ণিত গল্প। এখানে গল্পটা কেবলই একটি কাঁচামাল বা উপাদান, আর উপন্যাস হচ্ছে সেই উপাদানটিকে পরিবেশন বা বলার এক বিশেষ ‘পদ্ধতি’ বা শৈলী। উপন্যাসের সংজ্ঞার্থ নির্ণয়ে এবং তার বিষয় ও আঙ্গিকের স্বরূপ নির্ধারণে আলোচনার কোনো শেষ নেই। পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের সমালোচকগণ দীর্ঘকাল ধরে এই নিয়ে নানা বিতর্ক ও বিশ্লেষণে আত্মনিয়োগ করেছেন; কিন্তু এখনো সর্বসম্মত কোনো মীমাংসিত সিদ্ধান্তে তাঁরা উপনীত হতে পারেন নি। তবুও উপন্যাসের স্বভাবলক্ষণ এবং বিষয় ও আঙ্গিকের বৈশিষ্ট্য বিচার করে এর একটি যৌক্তিক সংজ্ঞার্থ নির্ধারণ করা সম্ভব।

‘উপন্যাস’ শব্দের উৎপত্তি ও ব্যুৎপত্তিগত অর্থ

‘উপন্যাস’ একটি খাঁটি সংস্কৃত শব্দ। এর ব্যাকরণগত ব্যুৎপত্তি হলো এ রকম: উপ-নি-অস + অ (ঘঞ) = উপন্যাস। প্রাচীন সাহিত্যে মহাকবি কালিদাসের কাব্যে এই শব্দটির প্রথম প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। ‘উপন্যাস’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ‘কল্পিত কাহিনী’। কিন্তু আধুনিক পরিভাষায় উপন্যাস শব্দটি অনেকগুলো গভীর বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এ কারণে আধুনিক সাহিত্যে উপন্যাস শব্দের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে—উপস্থাপন। অর্থাৎ, বিশেষ রীতি ও নিয়মের মধ্যে নির্দিষ্ট পরিকাঠামোয় যে কাহিনী বিস্তৃত বা উপস্থাপিত হয়, তা-ই হলো উপন্যাস।

বিশ্বখ্যাত মনীষী ও কোষগ্রন্থের আলোকে উপন্যাসের সংজ্ঞা

ইংরেজি ‘Novel’-এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে আমরা ‘উপন্যাস’ শব্দটিকে ব্যবহার করি। Novel সম্পর্কে প্রখ্যাত ইংরেজ ঔপন্যাসিক ই. এম. ফরস্টার (E. M. Forster) বলেন, “Novel is prose narrative of sufficient length to fill one or two volumes.” (অর্থাৎ, উপন্যাস হলো পর্যাপ্ত দৈর্ঘ্যের এমন একটি গদ্যের আখ্যান, যা এক বা একাধিক খণ্ডকে পূর্ণ করতে পারে)।

নভেল সম্পর্কে বিখ্যাত অভিধান Chamber’s Twentieth Century Dictionary & Reader’s Digest Encyclopedia গ্রন্থে বলা হয়েছে—“a fictitious prose narrative or tale presenting a picture of a real life of the men and women portrayed” (অর্থাৎ, এটি মানুষের বাস্তব জীবনের ছবি ফুটিয়ে তোলা এক ধরণের কাল্পনিক গদ্যের আখ্যান বা গল্প)।

এই প্রসঙ্গে প্রখ্যাত সাহিত্যিক হেনরি জেমস (Henry James) বলেন, “A novel is a living thing all one and continuous like every other organism and in proportion as it lives will it be found, I think that in each of the parts there is something of each other parts.” (অর্থাৎ, উপন্যাস হলো অন্য যেকোনো জীবন্ত প্রাণীর মতোই এক অখণ্ড ও অবিচ্ছিন্ন সত্তা এবং এর প্রতিটি অংশের ভেতরেই অন্য অংশের অস্তিত্বের ছোঁয়া পাওয়া যায়)।

দেশীয় সমালোচকের দৃষ্টিতে উপন্যাসের রূপরেখা

নভেলের প্রতিশব্দ ‘উপন্যাস’ সম্পর্কে বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত সমালোচক শ্রীশচন্দ্র দাস অত্যন্ত চমৎকার একটি সংজ্ঞা দিয়েছেন। তাঁর মতে:

“গ্রন্থাকারের ব্যক্তিগত জীবন-দর্শন ও জীবনানুভূতি কোন বাস্তব কাহিনী অবলম্বন করিয়া যে-বর্ণনাত্মক শিল্পকর্মে রূপায়িত হয় তাহাকে উপন্যাস কহে।”

সংক্ষেপে বলা যায়, লেখকের ভেতরের গভীর দর্শন ও অনুভূতি যখন কোনো বর্ণনাত্মক কাহিনীর রূপ ধারণ করে, তখনই তা সার্থক উপন্যাস হয়ে ওঠে। অতএব, উপন্যাস হচ্ছে ‘এমন কোনো ঐতিহাসিক বাস্তব বা কাল্পনিক কাহিনী যা চরিত্র বিশ্লেষণ, ঘটনা সংস্থাপন, সংলাপ কুশলতা এবং লেখকের বিশেষ জীবন উপলব্ধির ইঙ্গিত বহন করে রস ও শৈল্পিক সার্থকতা লাভ করে।’ এই কথাটিকে আরও সুন্দরভাবে সাজিয়ে উপন্যাসের চূড়ান্ত সংজ্ঞা হিসেবে বলা যায়—যে বর্ণনাত্মক রচনায় মানুষের বাস্তব জীবনকথা লেখকের জীবন সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির নিপুণ সমন্বয়ে অভিব্যক্ত হয়, তাকেই উপন্যাস বলে।[২]

উপন্যাসের সাধারণ সংজ্ঞার্থ ও এর কাঠামোগত শৃঙ্খলা

উপযুক্ত সমস্ত আলোচনা ও ধারণার আলোকে উপন্যাসের একটি সাধারণ ও সর্বজনীন সংজ্ঞার্থ আমরা অনায়াসেই নির্ণয় করতে পারি। তা হলো: যে বর্ণনাত্মক রচনায় মানুষের বাস্তব জীবনকথা লেখকের জীবনসম্পর্কিত নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে শিল্পসম্মতভাবে অভিব্যক্ত হয়, তাকেই উপন্যাস বলে। যেহেতু উপন্যাস মূলত ঘটনামূলক ও বর্ণনাধর্মী সাহিত্য, তাই গদ্যভাষাই হলো উপন্যাসের প্রধান ও একমাত্র প্রকাশবাহন। মানুষের বাস্তব জীবন অত্যন্ত জটিল, সূক্ষ্ম এবং বিচিত্র। আর জীবনের এই বহুমুখী রূপের প্রতিফলন ঘটায় প্রতিটি উপন্যাসের গঠন ও আয়তন স্বাভাবিকভাবেই ভিন্নধর্মী হয়ে থাকে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুটি ভিন্ন ধাঁচের উপন্যাস ‘গোরা’ এবং ‘শেষের কবিতা’ বিচার করলেই এর সত্যতা ও প্রমাণ স্পষ্টভাবে পাওয়া যাবে।

এখানে মনে রাখতে হবে যে, উপন্যাস কেবল কতগুলো কাহিনী কিংবা বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমষ্টিমাত্র নয়। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে অসংখ্য ঘটনা ঘটে; যার কোনো ঘটনা যৌক্তিক শৃঙ্খলাযুক্ত থাকে, আবার কোনোটার মধ্যে কোনো যুক্তির বালাই থাকে না। কিন্তু উপন্যাসের ক্ষেত্রে এমনটি হলে চলবে না; উপন্যাসবিধৃত ঘটনাংশের মধ্যে অবশ্যই একটি সুনির্দিষ্ট যৌক্তিক শৃঙ্খলা থাকতে হবে। মূলত লেখকের জীবনমুখী দৃষ্টিভঙ্গি, জীবন্ত চরিত্র এবং সুশৃঙ্খল ঘটনার নিখুঁত সমন্বয়েই একটি উপন্যাস হয়ে ওঠে শৈল্পিকভাবে সার্থক ও যথার্থ।[৩]

এক নজরে বাংলাদেশের উপন্যাসের ইতিহাস ও বিষয়বৈচিত্র্য

বাংলাদেশের কথাসাহিত্য কলকাতার মধ্যবিত্ত-কেন্দ্রিক ধারার সমান্তরাল হয়েও নদীমাতৃক প্রকৃতি, কৃষিনির্ভর গ্রামীণ জীবন এবং এ অঞ্চলের মানুষের স্বতন্ত্র মনস্তত্ত্বে বিকশিত হয়েছে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মতো ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ এই সাহিত্যের গতিপথ নির্ধারণ করেছে। মোহাম্মদ নজিবর রহমানের ‘আনোয়ারা’ থেকে শুরু করে প্রথিতযশা অগ্রজ লেখকদের কালজয়ী সৃষ্টির মাধ্যমে এই সমৃদ্ধ সাহিত্যের এক মজবুত ভিত্তিপ্রস্তর নির্মিত হয়েছে।

📌 আরও পড়ুন: 👉 বাংলাদেশের উপন্যাসের ইতিহাস ও বিকাশ ধারা: স্বাতন্ত্র্য ও সমৃদ্ধির এক শতাব্দী 📚✨

এদেশের উপন্যাস গ্রামীণ কৃষিজীবন, নাগরিক মধ্যবিত্তের জটিল মনস্তত্ত্ব এবং ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে উপজীব্য করে এগিয়ে চলেছে। স্বাধীনতা-উত্তরকালে আহমদ ছফা, শহীদুল জহিরসহ সমকালীন ঔপন্যাসিকদের লেখনীতে সদ্য স্বাধীন দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক সংকট এবং সাধারণ মানুষের স্বপ্নভঙ্গের রূঢ় বাস্তবতা নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। ঐতিহাসিক সত্য আর নান্দনিক গঠন-কৌশলের এই মেলবন্ধনেই বাংলাদেশী উপন্যাস বিশ্বসাহিত্যের দরবারে নিজের এক অনন্য ও গৌরবময় স্থান তৈরি করেছে।

আরো পড়ুন

বস্তুসংক্ষেপ: 

যে বর্ণনাত্মক গদ্য রচনায় মানুষের বাস্তব জীবনকথা লেখকের জীবন সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে অভিব্যক্ত হয়, তাকেই উপন্যাস বলে। ঘটনামূলক ও বর্ণনাধর্মী হওয়ায় গদ্যভাষাই উপন্যাসের প্রকশবাহন। মানুষের জীবন জটিল, সুক্ষ্ম এবং বিচিত্র। জীবন বৈশিষ্ট্যের বহুমুখী রূপের প্রতিফলন ঘটার জন্য প্রতিটি উপন্যাসের আয়তন ভিন্নধর্মী।

জন্ম লগ্ন থেকেই যে উপাদানের কারণে উপন্যাস অন্যান্য সহিত্যরূপ থেকে স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে, তা হলো তার ভাষা। কাহিনী, চরিত্র প্রভৃতি উপাদানগুলো ট্রাজেডি কিংবা মহাকাব্যের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। কিন্তু জীবনের বাস্তবমুখী, কৃত্রিম, জটিল ও বহুকৌণিক রূপ অঙ্কনের প্রয়োজনে গদ্যভাষা হলো উপন্যাসের প্রকাশ মাধ্যম। লেখকের জীবনদৃষ্টি ও জীবন সৃষ্টির ভাষা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উপন্যাসের বর্ণনা, পরিচর্যা, স্থান বা পশ্চাৎপট উপস্থাপন, চরিত্রের রূপ ও স্বরূপ নির্ণয়ে অনিবার্য ভাষারীতির প্রয়োগ যে কোনো ঔপন্যাসিকের কাম্য। উপন্যাসে বিষয়ের সঙ্গে ভাষার সামঞ্জস্য রক্ষার মাধ্যমেই কোনো উপন্যাস যথার্থ ও সমগ্র হয়ে ওঠে।

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. আবুল ফজল ও রেজাউল ইসলাম, সাহিত্য তত্ত্ব-কথা, দুরন্ত পাবলিকেশন্স, ঢাকা, পুনর্মুদ্রণ ২০০৯; পৃষ্ঠা ৫১-৫২।
২. বেগম আকতার কামাল, ভীষ্মদেব চৌধুরী, রফিকউল্লাহ খান ও অন্যান্য, বাংলা ভাষা: সাহিত্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর, পুনর্মুদ্রণ ২০১১, পৃষ্ঠা ২৫।
৩. রচনা ও প্রকাশকাল সংক্রান্ত টীকা: এই প্রবন্ধটি প্রথম ১৪ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে অনলাইন পোর্টাল ফুলকিবাজ.কম-এ প্রকাশিত হয়েছিল। দীর্ঘ সময় পর আজ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বর্তমান ডিজিটাল সংস্করণের জন্য লেখাটি সম্পূর্ণ পরিমার্জন, পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সংস্কার ও উন্নত সংস্করণে রূপান্তর করা হলো।

Leave a Comment