উপন্যাস (ইংরেজি: Novel) সাধারণত গদ্য কথাসাহিত্যরূপে রচিত তুলনামূলক দীর্ঘ লেখা এবং সাধারণত একটি বই হিসাবে প্রকাশিত হয়। সাহিত্যের আঙ্গিকগুলোর মধ্যে উপন্যাসের সংজ্ঞার্থ নির্ণয়ই বোধ হয় সর্বাপেক্ষা দুরূহ কাজ। কেননা, সময় ও সমাজের এতো বিচিত্রমুখী ঘাত-প্রতিঘাত, উত্থান-পতন ও ভাঙা-গড়ার যুগে উপন্যাসের আবির্ভাব হয়েছে যে, নির্দিষ্ট কোনো মানদণ্ড দিয়ে উপন্যাসের স্বভাবধর্ম নিরূপণ করা সম্ভব নয়। উপন্যাসের উদ্ভবের সঙ্গে সমাজবিন্যাস, আর্থ-উৎপাদন কাঠামো, মানুষের মনোজাগতিক সুক্ষ্মতা এবং অস্তিত্ব জিজ্ঞাসার জটিল ক্রমবিকাশের প্রশ্ন জড়িত। রেনেসাঁ বা নবজাগরণ-পরবর্তী মানুষের নতুন জীবন-ভাবনা, বাণিজ্যপুঁজির আশ্রয়ে গড়ে-ওঠা মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিপুল বিস্তার এবং শিল্পবিপ্লব-উত্তর নাগরিক সভ্যতার দ্বন্দ্বসংঘাতপর্ণ, জটিল, বৈচিত্র্যময় ও গতিশীল জীবনের শিল্প-আঙ্গিক হিসেবে ইউরোপে উপন্যাসের উদ্ভব। সুতরাং উপন্যাস তার জন্মলগ্নেই সমাজ ও জীবনের বাস্তার অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে। এই বাস্তবতার চরিত্র সমাজ ও ব্যক্তিভেদে বিচিত্র।
উপন্যাসের সংজ্ঞার্থ নির্ণয়ে, তার বিষয় ও আঙ্গিকের স্বরূপ নির্ধারণে আলোচনার শেষ নেই। পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের সমালোচকগণ দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক ও বিশ্লেষণে আত্মনিয়োগ করেছেন, কিন্তু কোনো মীমাংসিত সিদ্ধান্তে তাঁরা উপনীত হতে পারেন নি। তবুও স্বভাবলক্ষণ এবং বিষয় ও আঙ্গিকের বৈশিষ্ট্য বিচার করে উপন্যাসের সংজ্ঞার্থ নির্ধারণ করা সম্ভব। এ-প্রসঙ্গে স্মরণীয় যে, উপন্যাসের সংজ্ঞার্থ নির্ণয় ও বিষয়-আঙ্গিক বিচার সময় ও সমাজের চরিত্র ও রুচি অনুসারী। যেমন আয়তন, চরিত্র এবং ঘটনা-বৈশিষ্ট্য বিচারে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘ওল্ডম্যান এন্ড দ্য সী’ এবং লিউ তলস্তয়ের ‘ওয়ার এন্ড পীস’ দুই ভিন্ন স্বভাবের সৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃত। হারমান মেলভিলের ‘মবিডিক’ এবং জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’, কিংবা বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কপালকুণ্ডলা’ এবং রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’, সৈয়দ ওয়ালীউলাহর ‘চাঁদের অমাবস্যা’, এবং শহীদুল কায়সারের ‘সংশপ্তক’ আয়তন, চরিত্রায়ন এবং বিষয়বিচারে ভিন্নধর্মী সৃষ্টি। কিন্তু সবগুলোই উপন্যাস হিসেবে চিহ্নিত ও বিশেষিত। তবুও উক্ত গ্রন্থগুলোতে মৌলিক কিছু লক্ষণ বিদ্যমান, যার ভিত্তিতে ঐসব গ্রন্থ উপন্যাসের পর্যায়ভুক্ত।
উপযুক্ত ধারণার আলোকে উপন্যাসের একটি সাধারণ সংজ্ঞার্থ আমরা নির্ণয় করতে পারি। তা হলো, যে বর্ণনাত্মক রচনায় মানুষের বাস্তব জীবনকথা লেখকের জীবনসম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে অভিব্যক্ত হয়, তাকেই উপন্যাস বলে। ঘটনামূলক ও বর্ণনাধর্মী হওয়ায় গদ্যভাষাই উপন্যাসের প্রকাশবাহন। মানুষের জীবন জটিল, সূক্ষ্ম এবং বিচিত্র। জীবনবৈশিষ্ট্যের বহুমুখী রূপের প্রতিফলন ঘটায় প্রতিটি উপন্যাসের আয়তন ভিন্নধর্মী। রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ এবং ‘শেষের কবিতা’ বিচার করলেই এর প্রমাণ পাওয়া যাবে। মনে রাখতে হবে, উপন্যাস কেবল কাহিনী কিংবা ঘটনামাত্র নয়। মানুষের জীবনে অসংখ্য ঘটনা ঘটে। কোনো ঘটনা যৌক্তিক শৃখলাযুক্ত আবার কোনোটার মধ্যে তা থাকে না। এজন্যেই উপন্যাসবিধৃত ঘটনাংশের মধ্যে যৌক্তিক শৃঙ্খলা থাকতে হবে। লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি, চরিত্র ও ঘটনার সমন্বয়ে একটি উপন্যাস হয়ে উঠবে যথার্থ।
উপন্যাসের উপাদান ও গঠনকৌশল
উপন্যাসের উপাদানের সংখ্যা ৭। এর মধ্যে শরীরী উপাদানের (Concrete elements) সংখ্যা-৬। যেমন, প্লট (plot), চরিত্র (Character), দৃষ্টিকোণ (Point of view), পশ্চাৎপট (Back ground), সময় (Time), এবং ভাষা (Language)। উপন্যাস বিশ্লেষণে অশরীরী উপাদান (Abstract elements) হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে লেখকের জীবন সম্পর্কিত দর্শনকে।
ইংরেজি সাহিত্যে উপন্যাস রচনার প্রথম দিকে গ্রীক সাহিত্যতাত্ত্বিক ও সমালোচক অ্যারিস্টটলের প্লট সম্পর্কিত ধারণার প্রভাবই ছিলো সর্বাধিক। অ্যারিস্টটল তাঁর Poetics গ্রন্থে প্লটের আলোচনায় বলেছেন – একটি মাত্র কর্মের সমগ্র রূপ অনুকৃত হয় প্লটে। বিভিন্ন অংশের মধ্যে গঠনগত ঐক্য এমনভাবে অক্ষুন্ন রাখার চেষ্টা করা হয়, যার ফলে একটি অংশকে তার ভেতর থেকে স্থানান্তরিত করলে প্লটের সমগ্র গঠনটিই ভেঙে পড়বে (So the plot being an imitation of an action, must imitate one action and that a whole, the structural vision of the parts being such that, if any one of them in displaced or removed, the whole will be disjoined and disturbed)।
অ্যারিস্টটলের মতে প্লট একটি সমগ্র ও সম্পর্ক ‘কর্ম’ (Action), অন্যত্র তিনি বলেছেন, প্লট হচ্ছে ঘটনাবলীর বিন্যাস (Arrangement of incidents) এবং এই ঘটনা বিন্যাসে আদি, মধ্য এবং অন্তের মধ্যে থাকবে ঐক্য। তিনি প্লটকে সরল (Simple) ও জটিল (Complex) এই দুই শ্রেণিতে ভাগ করেছিলেন। তাঁর জটিল প্লটের ধারণা প্লটভাবনার পরবর্তী রূপান্তরের সম্ভাবনার পথ প্রশস্ত করেছিলো।
আজকের বিচারে হয়তো অ্যারিস্টটলের ধারণার মধ্যে অপূর্ণতা লক্ষ করা যাবে, কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ পর্যন্ত এই ধারণাকেই উপন্যাসের তাত্ত্বিক এবং তত্ত্বচেতন ঔপনাসিকরা বহুলাংশে গ্রহণ করেছিলেন। ইংরেজি সাহিত্যের প্রথম যুগের ঔপন্যাসিকরা যেমন, রিচার্ডসন এবং হেনরি ফিলডিং Plot এবং Story (কাহিনী)-কে অভিন্ন অর্থে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা কাহিনীকে একটি ঐক্যবদ্ধ রূপ দেয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্লট ধারণারও পরিবর্তন ঘটে। উপন্যাসবিধৃত কর্ম বা Action যে মানব চরিত্রের রূপায়ণ এ-সত্যটি সুস্পষ্ট হতে থাকে। ঘটনা, চরিত্র, চরিত্রের চিন্তা-অনুভূতি, তার জীবন সম্পর্কিত তত্ত্ব বা দর্শনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। হেনরি জেমস তাঁর The Art of Fiction (১৮৮৪) প্রবন্ধে প্লট এবং কাহিনীর সঙ্গে উপন্যাসের বিষয়বস্তুর সাদৃশ্য সন্ধান করেছেন। বিংশ শতাব্দীতে এসে উপন্যাসের প্লটভাবনায় সময়ের গুরুত্ব স্বীকৃত হলো। মানবজীবনে সংঘটিত ঘটনা যে আসলে সময়েরই বহিঃপ্রকাশ —এই বোধ থেকে প্লটকে বলা হলো কার্যকারণ শৃঙ্খলাযুক্ত সময়। এই সময়ের বহমানতা বাহ্যিক দৃষ্টিতে এক রকম আর চিন্তা-অনুভূতি, স্মৃতি-স্বপ্ন-কল্পনার মানদণ্ড আরেক রকম। বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্লটকে ঘটনার পারম্পর্য হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর কপালকুণ্ডলা উপন্যাস প্লটবিন্যাসের নির্ভুল দৃষ্টান্ত। ঐতিহাসিক ঘটনার রূপায়নেও ‘রাজসিংহ’ কিংবা ‘আনন্দমঠ’-এ প্লটবিন্যাসের প্রচলিত রীতির অনুসারী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই প্রথম প্লটকে সময় ও চেতনার ঐক্যে সুগ্রথিত করলেন। তাঁর শেষের কবিতা উপন্যাসের প্লট কাহিনী (Story) কিংবা ‘ঘটনা’র (Events) পারম্পর্য শৃঙ্খলাযুক্ত বিন্যাসমাত্র নয়, আধুনিক শিক্ষিত মানব-মানবীর চেতনা, অনুভূতি, কল্পনা ও দর্শনের অন্ত প্রকাশের মাধ্যমও ঘটে।
চরিত্র
উপন্যাসের শরীরী উপাদানসমূহের মধ্যে চরিত্রের গুরুত্ব সর্বাধিক। কেননা, উপন্যাস মানুষের সৃষ্টি এবং অন্তর-বাহির সমেত মানব-মানবীর সমগ্র জীবনের রূপায়ণের প্রয়োজনবোধই উপন্যাসের জন্মকে সম্ভব করে তুলেছিলো। অ্যারিস্টটল চরিত্র অপেক্ষা প্লটকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ট্র্যাজেডির গঠনবৈশিষ্ট্য আলোচনা করতে গিয়ে তিনি ছয়টি অংশ প্রত্যক্ষ করেছেন। যেমন, প্লট, চরিত্র , ভাষা, ভাবনা (Thought), দৃশ্য এবং সঙ্গীত। প্রথমে তিনি প্লটের আলোচনা করেছেন। অতঃপর চরিত্রের। কিন্তু প্লট যে জীবনের কাজের অনুকরণ, তা নিঃসন্দেহে মানুষের। অভিজ্ঞতা এবং দৃষ্টান্তের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও অ্যারিস্টটল চরিত্রের প্রকৃত ক্ষেত্রটি নির্দেশ করতে পেরেছিলেন।
ঊনবিংশ শতাব্দীর ঔপন্যাসিকরা পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনাকে (Narration) অধিক গুরুত্ব দিতেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের অনেক উপন্যাসেও বর্ণনাবাহুল্য চোখে পড়ে। কিন্তু বর্ণনার মধ্য দিয়ে চরিত্রের বাইরের অবয়ব, গতিবিধি, দৈনন্দিন জীবনের ঘটনাবলিই উপস্থাপন করা যায়। চরিত্রের স্বরূপ উন্মোচনের জন্যে বর্ণনার অতিরিক্ত আরো কিছু প্রয়োজন। জর্জ মেরিডিথ এই ভাবনা থেকেই সম্ভবত বলেছিলেন: “কেবল চোখের পাতায় রঙ দিলেই চলবে না, চোখের মধ্যে অন্তর্দৃষ্টিও ফোটাতে হবে। ফরাসি বিপ্লব ও শিল্প-বিপ্লবোত্তর কালে মানুষের ব্যক্তিসত্তার গুরুত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উপন্যাসেও চরিত্রের অবস্থান দৃঢ়তর হতে থাকে। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে চরিত্রের রূপায়ণ মূলত বর্ণনাধর্মী। চরিত্রের ক্রিয়াশীলতা সমাজ, উপন্যাসবিধৃত ঘটনা এবং ঔপন্যাসিকের আদর্শবোধের কাছে দায়বদ্ধ। ‘দুর্গেশনন্দিনী’ উপন্যাসে আয়েষা চরিত্র সম্পর্কে লেখকের উক্তি: ‘যেমন উদ্যান মধ্যে পদ্মফুল, এ আখ্যায়িকা মধ্যে তেমনি আয়েষা। অর্থাৎ পুরো উপন্যাসে আয়েষা ঘটনার প্রয়োজনে উপস্থাপিত। আপন ব্যক্তিত্ব ও কর্মধারায় সে স্বাবলম্বী নয়। ই.এম. ফরস্টার এ-ধরনের চরিত্রকে বলেছেন Flat Character বা সমতল চরিত্র। এ-ধরনের চরিত্র উপন্যাসের ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করে না। ঘটনাধারার সঙ্গে অক্রিয় (Passive) অবস্থান করে মাত্র।
কিন্তু যে চরিত্র উপন্যাসের শুরু থেকেই আকৃতি প্রকৃতিসহ উপস্থাপিত হয় এবং তার ভবিষ্যৎ গতিবিধি, প্রাধান্য, মনোজাগতিক পরিবর্তন ও বিবর্তনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিতসহ ক্রিয়াশীল থাকে, তাকে বলা হয় Round Character বা নিটোল চরিত্র। ‘চোখের বালি’ উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ বিনোদিনী চরিত্রকে গোড়া থেকেই তার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা চিত্রিত করেছেন। ফলে, চরিত্রটি হয়ে উঠেছে সমগ্র। ‘চতুরঙ্গ’ উপন্যাসের চরিত্রায়নকে এ-প্রসঙ্গে দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। শচীশ, জগমোহন, দামিনী এবং শ্রীবিলাস – এই চারটি চরিত্রের রূপায়ণে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি অভিন্ন। শ্রীবিলাস সমতল চরিত্র (Flat Character)। তার চরিত্রের বিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত উপন্যাসে নেই – আগাগোড়া একই রকম। তার মানসিক পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত বা প্রাসঙ্গিকতা উপন্যাসে নেই। শচীশ এবং দামিনীর স্বভাবধর্ম ও বিবর্তনের ইঙ্গিত গোড়া থেকেই সুস্পষ্ট। রবীন্দ্রনাথের প্রায় প্রতিটি উপন্যাসের চরিত্রায়নে এই পদ্ধতি অবলম্বিত হয়েছে। ‘চোখের বালি’র বিনোদিনী, ‘গোরা’ উপন্যাসের গোরা, ‘যোগাযোগে’র কুমুদিনী, ‘শেষের কবিতা’র অমিত ও লাবণ্য তীক্ষ্ণ রেখায় চিত্রিত এবং ব্যঞ্জনাগর্ভ। ‘চতুরঙ্গে’ শচীশ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ভাষ্য চরিত্রটির সমগ্র স্বরূপ উন্মোচন করে। যেমন,
‘শচীশ দেখিলে মনে হয় যেন একটা জ্যোতিষ্ক তার চোখে জ্বলিতেছে। তার সরু সরু লম্বা আঙুলগুলি যেন আগুনের শিখা, তার গায়ের রং যেন রং নহে, তা আভা। শচীশকে যখন দেখিলাম অমনি যেন তার অন্তরকে দেখিলাম।’
দামিনী সম্পর্কে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি অভিন্ন। যেমন,
‘দামিনী যেন শ্রাবণ মেঘের ভিতরকার কামিনী। বাহিরে সে পুঞ্জ পুঞ্জ যৌবনে পূর্ণ, অন্তরে চঞ্চল আগুন ঝিকমিক করিয়া উঠিতেছে।’
শচীশ এবং দামিনীর বহিরাবয়বের সঙ্গে তাদের অন্তর্জগতও এভাবে উন্মোচিত হয়েছে। ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে অমিত রায় এবং লাবণ্য চরিত্রের রূপ, স্বরূপ এবং পরিণতি সূক্ষ্ম ইঙ্গিতে রেখায়িত করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
১. অমিতর নেশাই হল স্টাইলে। কেবল সাহিত্য-বাছাই কাজে নয়, বেশে ভূষায় ব্যবহারে। ওর চেহারাতেই একটা বিশেষ ছাঁদ আছে। পাঁচজনের মধ্যে এ যে-কোনো একজন মাত্র নয়, ও হলো একেবারে পঞ্চম। … দাঁড়িগোফ কামানো চাঁছা মাজা চিকন শ্যামবর্ণ পরিপুষ্ট মুখ, স্ফূর্তি ভরা ভাবটা, চোখ চঞ্চল, হাসি চঞ্চল, নড়াচড়া চলাফেরা চঞ্চল, কথার জবাব দিতে একটুও দেরি হয় না; মনটা এমন এক রকমের চকমকি যে ঠুন করে একটু ঠুকলেই স্ফুলিঙ্গ ছিটকে পড়ে।
২. বাপের একমাত্র শখ ছিল বিদ্যায়, মেয়েটির মধ্যে তাঁর সেই শখটির সম্পূর্ণ পরিতৃপ্তি হয়েছিল। নিজের লাইব্রেরির চেয়েও তাকে ভালোবাসতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, জ্ঞানের চর্চায় যার মনটা নিরেট হয়ে ওঠে সেখানে উড়ো ভাবনার গ্যাস নিচে থেকে ঠেলে ওঠার মতো সমস্ত ফাটল মরে যায়। সে মানুষের পক্ষে বিয়ে করবার দরকার হয় না। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস যে তাঁর মেয়ের মনে স্বামী সেবা-আবাদের যোগ্য যে নরম জমিটুকু বাকি থাকতে পারত সেটা গণিতে ইতিহাসে সিমেন্ট করে গাঁথা হয়েছে — খুব মজবুত পাকা মন যাকে বলা যেতে পারে – বাইরে থেকে আঁচড় লাগলে দাগ পড়ে না।
উপন্যাসে চরিত্রায়ণের ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গির বহুল পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু জীবনের যে কোনো সত্যের উন্মোচনে চরিত্রের অনিবার্যতা অক্ষুন্নই রয়ে গেছে।
উপন্যাসের দৃষ্টিকোণ (Point of view)
বিংশ শতাব্দীর পাশ্চাত্য উপন্যাসতাত্ত্বিকদের মতে দৃষ্টিকোণই হলো উপন্যাসের সর্বাপেক্ষা কার্যকর উপাদান। ঘটনাংশ, চরিত্র কিংবা অন্যান্য উপাদানের উপস্থাপন কৌশল নির্ভর করে দৃষ্টিকোণের ওপর। ঔপন্যাসিকের জীবনকে দেখা এবং দেখানোর পদ্ধতি দৃষ্টিকোণই নির্ধারণ করে দেয়। উপন্যাস রচনার প্রথম পর্যায়ে ঘটনার যে বর্ণনাত্মক (Narrative) উপস্থাপন লক্ষ করি, সেখানে সমস্ত ঘটনা, চরিত্রের গতিপ্রকৃতি ও আনুষঙ্গিক প্রসঙ্গ লেখক স্বয়ং বিধৃত করতেন। অতঃপর উপন্যাসে মানবচরিত্রের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার পর প্রধানত কেন্দ্রীয় চরিত্রের দৃষ্টিকোণের প্রয়োগ ঘটতে থাকে। স্মৃতিমূলক কিংবা আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসে মুখ্য-চরিত্র নিজেই নিজের কথা বিধৃত করে। সমগ্র ঘটনার ওপর লেখকের দৃষ্টির একক নিয়ন্ত্রণ কিংবা মুখ্য চরিত্রের দৃষ্টিকোণ ছাড়াও তৃতীয় কোনো চরিত্রও ঘটনা বর্ণনা করতে পারে উপন্যাসে।
উপন্যাসবিধৃত ঘটনা যখন লেখক নিরাসক্তভাবে প্রত্যক্ষ করে বিবৃত করেন, তখন বলা হয় লেখকের সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণ (Author’s Omnscient point of view)। মুখ্য চরিত্র কিংবা নায়কের জবানিতে যখন ঘটনা বিবৃত হয়, তখন তাকে অভিহিত করা হয় উত্তম পুরুষের দৃষ্টিকোণ হিসেবে (First person’s point of view)। ঘটনার প্রান্তে অবস্থানকারী কোনো চরিত্রের দৃষ্টিকোণ ব্যবহৃত হলে বলা হয়, প্রান্তিক চরিত্রের দৃষ্টিকোণ (Peripherid character)। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের একজন প্রখ্যাত উপন্যাসতত্ত্ববিদ পার্সি লুবক তাঁর Craft of Fiction (১৯২১) গ্রন্থে দৃষ্টিকোণের অনিবার্যতা প্রথম সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করলেন। তাঁর মতে, উপন্যাসশিল্পের যাত্রা সেদিন থেকেই কার্যকরভাবে সচিত হলো, যেদিন ঔপন্যাসিক ভাবতে আরম্ভ করলেন যে, তাঁর গল্প এমন একটি বিষয় যাকে ঘটমান অবস্থায় দেখাতে হবে এবং এমনভাবে দেখাতে হবে যেন গল্পটি নিজেই নিজের কথা বলছে। অর্থাৎ ঔপন্যাসিক নিজে গল্পটির বিবরণ দিলে সেটা উপন্যাসের সার্থক শিল্পকলা হলো না। ঘটনাবলি এবং চরিত্রগুলো যেন আমাদের সামনে উপস্থিত হয়ে নিজেদের কথা বলে ও কাজও করে গল্পটিকে ফুটিয়ে তুলবে। বলা (Telling) নয়, দেখানোই (Showing) হলো উপন্যাসের নিজস্ব শিল্পরীতি। লুবকের মতে দৃষ্টিকোণই হলো উপন্যাসের শিল্পরীতির সবচেয়ে জটিল বিষয়। পার্সি লুবকের পরে ই.এম.ফরস্টার, জে. ডব্লিউ, বীচ, মার্ক স্কোরার, নরম্যান ফ্রায়াডম্যান প্রমুখ উপন্যাসতত্ত্ববিদ দৃষ্টিকোণের তাৎপর্যকে উপন্যাস বিচারের কেন্দ্রে স্থাপন করলেন।
কোনো উপন্যাস গভীরভাবে অনুধাবন করতে গেলে লেখকের দৃষ্টিকোণের স্বরূপ বুঝতে হবে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একমাত্র ‘রজনী’ ছাড়া সকল উপন্যাসই সর্বজ্ঞ লেখকের দৃষ্টিকোণ থেকে বিস্তৃত হয়েছে। ‘রজনী’তে মুখ্য-চরিত্রের দৃষ্টিকোণের প্রয়োগ ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথ দৃষ্টিকোণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন। তাঁর ‘চোখের বালি’ এবং ‘গোরা’ সর্বজ্ঞ লেখকের দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপিত। ‘চতুরঙ্গ’ উপন্যাসে একাধিক চরিত্রের দৃষ্টিকোণ ব্যবহৃত হয়েছে। ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসে নিখিলেশ, সন্দীপ এবং বিমলার দৃষ্টিকোণ ব্যবহারের ফলে উপন্যাসশিল্পে নতুন মাত্রা সংযোজিত হয়েছে। ‘শেষের কবিতা’য় লেখকের সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণ ব্যবহৃত হলেও চরিত্রসমূহের (বিশেষ করে অমিত ও লাবণ্য) অন্তর্লোক উন্মোচনের প্রয়োজনে তাদের দৃষ্টিকোণকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রবীন্দ্র পরবর্তীকালে দৃষ্টিকোণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। দৃষ্টিকোণ প্রয়োগের কৌশল উপন্যাস বিচারে অন্যতম প্রধান মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে।
পশ্চাৎপট (Background)
উপন্যাসবিধৃত প্রতিটি ঘটনা এবং চরিত্রের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার একটি স্থান বা পটভূমিগত ভিত্তি থাকে। কোনো ঘটনা কিংবা কাজ নিরবলম্ব বা শূন্য থেকে ঘটে না। এজন্যেই ঘটনা বা বিষয়ের একটি পশ্চাৎপট অনিবার্য হয়ে ওঠে। ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে উইলিয়াম থ্যাকারে, চার্লস ডিকেন্স, জর্জ এলিয়ট পশ্চাৎপটকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করলেন। ডিকেন্স চরিত্র ও ঘটনার প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থান বা পশ্চাৎপটের বর্ণনা দিয়েছেন। জর্জ এলিয়টের কাছে পশ্চাৎপটের উপস্থিতি চরিত্র অঙ্কনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। বিংশ শতাব্দীতে এই ধারণাটির ব্যাপক প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কেউ কেউ পশ্চাৎপটকে স্বতন্ত্রভাবে মূল্য দিতে চেয়েছেন। কিন্তু উপন্যাসের অন্য সব উপাদানের সঙ্গে সমন্বিত হয়েই পশ্চাৎপট বা স্থানের সার্থকতা। ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসের স্থান বা পশ্চাৎপট নাগরিক কোলাহল থেকে দূরবর্তী। উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও চরিত্রগুলোর অন্তঃর্জগতের ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়ার উপস্থাপনে শিলং পাহাড়ের নির্জন পরিবেশের ভূমিকাকে রবীন্দ্রনাথ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন।
সময়
অ্যারিস্টটল তাঁর Poetics গ্রন্থে ট্র্যাজেডির বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যায় যে ত্রি-ঐক্যনীতির কথা বলেছিলেন, তার মধ্যে কালের বা সময়ের ঐক্যের কথাও ছিলো। তবে তাঁর কাছে ক্রিয়াগত ঐক্যই (Unity of action) সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়েছিলো। তার পরে এসেছে স্থান (Unity of place) ও কালগত ঐক্যের (Unity of time) প্রসঙ্গ। উপন্যাস রচনার প্রথম যুগ থেকেই সময়ের তাৎপর্য লেখকের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে। স্যামুয়েল রিচার্ডসন ‘ক্লারিসা’ উপন্যাসে পত্রলিখন পদ্ধতি প্রয়োগ করতে গিয়ে সময়ের ক্রমধারাকে সতর্কতার সঙ্গে অনুসরণ করেছেন। হেনরি ফিল্ডিং-এর ‘টম জোনস’ উপন্যাসেও সময়ের ক্রম অনুসৃত হয়েছে। কিন্তু এঁরা সময়কে উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান মনে করেননি। ঘটনাক্রম রক্ষার ক্ষেত্রে সময়কে অনুসরণ করেছেন মাত্র। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধব্যাপী উপন্যাসে সময়ের তাৎপর্য সচেতনভাবে স্বীকৃত হয়নি। হেনরি জেমসই প্রথম সময়কে উপন্যাসের গঠনগত ঐক্যের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে গ্রহণ করেন। বালজাকের উপন্যাস আলোচনায় তিনি সময় রহস্যের স্বরূপ সন্ধান করেছেন। তিনি দুটি প্রসঙ্গে সময়ের গুরত্ব অনুধাবনের চেষ্টা করেছেন :
১. চরিত্র ও ঘটনাবলির সংক্ষেপীকরণের রহস্য;
২. উপন্যাসের বিষয়বস্তুর স্থিতিকাল ও অতিক্রান্ত সময়ের প্রকাশ।
উপন্যাসে সময় নামক উপাদানকে যথাযথভাবে ব্যবহার করে সময়ের ক্রিয়াশীলতাকে অনিবার্যতা দান করা তাঁর মতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি সময়রূপ উপাদানকে উপন্যাসের সাংগঠনিক ঐক্যসৃষ্টির (Organic Unity) কাজে ব্যবহৃত দেখতে চেয়েছেন। বিংশ শতাব্দীতেই প্রকৃতপক্ষে সময়ের প্রাসঙ্গিকতা উপন্যাসে গুরুত্বের সঙ্গে গৃহীত হয়।
প্রুস্ত, ডরোথি রিচার্ডসন ও জেমস জয়েসের মতো ঔপন্যাসিকরা সময় ধারণাকে উপন্যাসতত্ত্বের কেন্দ্রে স্থাপন করলেন। মানবমনের জটিল সত্য, তার স্বপ্নলোক, চেতন-অচেতনের জটিল প্রান্তসমূহ সময়ের মনোবৈজ্ঞানিক প্রয়োগের মাধ্যমে উপস্থাপিত হলো এবং দুই বিশ্বযুদ্ধের পর সময় বিচিত্র দৃষ্টিকোণ থেকে উপন্যাসে ব্যবহৃত হতে থাকে। পাঠক, লেখক, বিষয়বস্তু, বর্ণনাপদ্ধতি, দৃষ্টিকোণ প্রভৃতির ক্ষেত্রে সময়ের প্রয়োগগত বৈশিষ্ট্য সাহিত্যিক উপন্যাস বিচারের অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ প্রসঙ্গ।
উপন্যাসের ভাষা ও পরিচর্যারীতি
জন্মলগ্ন থেকেই যে উপাদানের কারণে উপন্যাস অন্যান্য সাহিত্য রীতি বা সাহিত্য রূপ থেকে স্বতন্ত্র হয়ে উঠলো, সে হলো তার ভাষা। কাহিনী, গল্প, চরিত্র প্রভৃতি উপাদানগুলো ট্র্যাজেডি কিংবা মহাকাব্যের মধ্যে বিদ্যমান ছিলো। কিন্তু জীবনের বাস্তবমুখী, কৃত্রিম, জটিল ও বহুকৌণিক রূপ অঙ্কনের প্রয়োজনে গদ্যভাষা হলো উপন্যাসের প্রকাশমাধ্যম। লেখকের জীবনদৃষ্টি ও জীবনসৃষ্টির সঙ্গে ভাষা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উপন্যাসের বর্ণনা (Narration), পরিচর্যা (Treatment), স্থান বা পশ্চাৎপট উপস্থাপন, চরিত্রের রূপ ও স্বরূপ নির্ণয়ে অনিবার্য ভাষারীতির প্রয়োগ যে কোনো ঔপন্যাসিকের কাম্য। উপন্যাসে বিষয়ের সঙ্গে ভাষার সামঞ্জস্য রক্ষার মাধ্যমেই কোনো উপন্যাস যথার্থ ও সমগ্র হয়ে ওঠে। এই ভাষাই একটি উপন্যাস থেকে আরেকটি উপন্যাসকে, একজন লেখক থেকে আরেকজন লেখককে পৃথক করে দেয়।
আত্মগত জীবনধর্মে পরিপুষ্ট কবিপ্রাণ রবীন্দ্রনাথ এবং বুদ্ধদেব বসুই যে উপন্যাস-কাহিনীর শ্রেষ্ঠ কথক তা বলা যাবে না। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ ওয়ালীউলাহর রুক্ষ কঠোর গদ্যও উপন্যাসের উপযুক্ত ভাষা। এই ভাষা ব্যবহারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গতিশীলতার প্রমাণ বিচিত্র পরিচর্যা রীতির উদ্ভাবন। উপন্যাসের বিষয়, চরিত্র ও স্থান ও সময় স্বভাবকে যথার্থভাবে উপস্থাপন করার প্রয়োজন বোধ থেকেই বিচিত্র পরিচর্যা রীতির উদ্ভাবন হয়েছে। এই সব পরিচর্যাকে বর্ণনাত্মক (Narrative), কাব্যানুগ Poetic), নাটিক (Dramatic), চিত্রময় (Pictorial), প্রতীকী (Symbolic), বিশ্লেষণাত্মক (Analytical) প্রভৃতি অভিধায় চিহ্নিত করা হয়েছে।
কেবলমাত্র বর্ণনা যে উপন্যাসের আকর্ষণকে গৌণ করে ফেলে ইংরেজি সাহিত্যের প্রথম যুগের উপন্যাসসমূহ এবং প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ (১৮৫৮) তার প্রমাণ। বঙ্কিমচন্দ্র ইতিহাসের রোমান্স সৃষ্টির প্রয়োজনে কাব্যানুগ পরিচর্যার সমান্তরালে নাটিক পরিচর্যা ব্যবহার করেছেন। পরিবেশ ও পরিস্থিতির স্বরূপ উন্মোচনের প্রয়োজনে একটি উপন্যাসে সবগুলো পরিচর্যারীতি ব্যবহৃত হতে পারে। তবে উপন্যাসের বিষয়ের স্বভাব একটি প্রধান। পরিচর্যারীতিকে একান্তভাবে গ্রহণ করে রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’ বিষয়ের গভীরতার কারণেই প্রধানত বিশ্লেষণধর্মী (Analytical), ‘গোরা’র মহাকাব্যিক রূপকল্প বর্ণনাত্মক এবং ‘শেষের কবিতা’র ভাবমুখ্য বিষয় কাব্যানুগ পরিচর্যায় উপস্থাপিত হয়েছে।
উপন্যাসে জীবনদর্শন, জীবনার্থ বা জীবনধারণা
উপন্যাসের বিমূর্ত উপাদান (Abstract Elements) হিসেবে জীবনদর্শনের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করলে অন্য সব মূর্ত উপাদানকেও তা ছাড়িয়ে যায়। লেখকের ব্যক্তিসত্তা, ব্যক্তি অনুভূতি এবং জীবন, সময় ও সমাজসম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির অন্তঃসারকে অস্ত্র করে গড়ে ওঠে লেখকের জীবনদর্শন বা জীবনার্থ। ঔপন্যাসিক যখন উপন্যাস রচনায় মনোনিবেশ করেন, তখন তিনি যে কেবল সাধারণভাবে একটি আদর্শ নৈর্ব্যক্তিক মানুষ রচনা করেন তা নয়, তিনি আপন সত্তারই একটি ভাষ্য (Implied Version) রচনা করেন। সত্তার অন্তর্নিহিত এই ভাষ্য অন্য সাহিত্যরূপ গুলোতে থাকলেও উপন্যাসের ক্ষেত্রে তার মূল্য স্বতন্ত্র। ঔপন্যাসিকের অন্তর্নিহিত এই লেখকসত্তাকে দ্বিতীয় সত্তা হিসেবেও অভিহিত করা হয়েছে। একজন লেখকের প্রতিটি উপন্যাসে এই লেখক-সত্তার প্রকাশ স্বতন্ত্রভাবে প্রকাশ পায়। মূর্ত উপাদানগুলোর যৌথ ব্যবহারের অনিবার্যতার মধ্য দিয়ে ঔপন্যাসিক মূলত তাঁর জীবন সম্পর্কিত তত্ত্ব বা দর্শনকেই প্রকাশ করেন। উপন্যাস রচনার প্রথম যুগে বর্ণনার (Narration) প্রতি অতি মনোযোগের ফলে অন্যান্য মূর্ত উপাদানের মতো জীবনদর্শনের প্রশ্নটিও অনুচ্চারিত থেকে যেত। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে পৃথিবীর সব ভাষার উপন্যাসে লেখকের জীবনদর্শনের প্রকাশ তীব্রতর হতে থাকে। কেউ ইতিহাস, কেউ সমকালীন সময় ও সমাজ, আবার কেউ কেউ ব্যক্তির কর্ম ও চিন্তার মধ্য দিয়ে এই দর্শনকে প্রকাশ করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রায় উপন্যাসেই জীবন সম্পর্কিত একটা বক্তব্য আছে। কিন্তু দু-একটি উপন্যাস বাদে অন্য সব উপাদানের সমন্বয়ে তা যথার্থ হয়ে ওঠে নি। রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাসের বিশ্বজনীনতার তত্ত্বটি আমাদের জানা। এ উপন্যাসে ঘটনা, অপরাপর চরিত্র এবং সমাজজীবনের বিস্তৃত পরিসরকে কেন্দ্র করে গোরা চরিত্রের মানসবৈচিত্র্য ও উত্তরণ দেখানো হয়েছে। গোরার উত্তরণ বা মীমাংসায় উন্নীত হওয়ার মাধ্যমেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবন সম্পর্কিত দর্শন প্রকাশ করেছেন। ‘শেষের কবিতা’ রীতির দিক থেকে কাব্যধর্মী হলেও প্রেমের চিরন্তনতার যে তত্ত্ব এ-উপন্যাসের শেষে উচ্চারিত হয়েছে, তা আসলে রবীন্দ্রনাথেরই জীবনদর্শন। এভাবেই আধুনিক উপন্যাসে জীবনদর্শনের অনিবার্যতা স্বীকৃত হয়েছে।
উপন্যাসের শ্রেণীকরণ
মূর্ত উপাদানসমূহের প্রাধান্যের ভিত্তিতে উপন্যাসকে ঘটনা প্রধান, ভাবনা প্রধান, বর্ণনা প্রধান, চরিত্র প্রধান প্রভৃতি অভিধায় চিহ্নিত করা যায়। তবে উপন্যাসে ঘটনা বা ও চরিত্রের ভূমিকাই মুখ্য।
ঘটনাপ্রধান উপন্যাসকে প্রধানত পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায় :
১. সামাজিক উপন্যাস
২. ঐতিহাসিক উপন্যাস
৩. পৌরাণিক উপন্যাস
৪. আঞ্চলিক উপন্যাস
৫. জীবনীমূলক উপন্যাস
১. সামাজিক উপন্যাস
সমাজ-জীবনের ঘটনা নিয়ে রচিত উপন্যাসকে বলে সামাজিক উপন্যাস। মানুষ সামাজিক জীব – আবার ব্যক্তিও বটে। তার সামাজিক ক্রিয়াকর্মকে প্রাধান্য দেয়া হয় সামাজিক উপন্যাসে। পরিবার, দেশ, রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস, ধর্ম, দর্শন প্রভৃতি সমাজ জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। সামাজিক উপন্যাসে এ সকল বিষয় প্রাধান্য পায়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ ও ‘বিষবৃক্ষ’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘যোগাযোগ’, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পল্লীসমাজ’, বুদ্ধদেব বসুর ‘তিথিডোর’,সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লালসালু’ সামাজিক উপন্যাসের দৃষ্টান্ত।
২. ঐতিহাসিক উপন্যাস।
ইতিহাসের ঘটনা ও চরিত্র নিয়ে রচিত উপন্যাসকে বলা হয় ঐতিহাসিক উপন্যাস। ইতিহাস গ্রন্থের সঙ্গে এর পার্থক্য হলো ইতিহাসে কেবল সংঘটিত ঘটনার বিবরণ ও মূল্যায়ন থাকে আর ঐতিহাসিক উপন্যাসে ইতিহাসের ঘটনা ও চরিত্র অবলম্বন করে ঔপন্যাসিক তাঁর জীবনবোধকে প্রকাশ করেন। তবে কল্পনার বিস্তারের ক্ষেত্রে ঔপন্যাসিককে সতর্ক থাকতে হয় – যাতে ইতিহাসের বিকৃতি না ঘটে। জাতীয় ইতিহাসের গৌরব, জয়-পরাজয়, আনন্দ-বেদনা, ঐতিহ্যে উৎস নতুন তাৎপর্য নিয়ে ঐতিহাসিক উপন্যাসে উপস্থাপিত হয়। লিও তলস্তয়ের ‘ওয়ার এন্ড পিস’, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘রাজসিংহ’ ঐতিহাসিক উপন্যাসের দৃষ্টান্ত।
৩. পৌরাণিক উপন্যাস
পুরাণের বিষয়বস্তু অবলম্বন করে রচিত উপন্যাসকে পৌরাণিক উপন্যাস বলে। প্রাচীন কালের মানুষের ধর্ম, বিশ্বাস এবং সংস্কারকেই আমরা পুরাণ-বলে জানি। প্রাচীন মানুষের জীবনে পুরাণের প্রভাব ছিল অপরিসীম। আধুনিক ঔপন্যাসিক পুরাণ কাহিনী অবলম্বনে উপন্যাস রচনা করেন নিজের দেশ, সমাজ ও কালের পরিপ্রেক্ষিতে। সত্যের সেনের ‘অভিশপ্ত নগরী’ পৌরাণিক উপন্যাসের দৃষ্টান্ত।
৪. আঞ্চলিক উপন্যাস
যে উপন্যাসে বিশেষ কোনো অঞ্চলের ভৌগোলিক পরিবেশে মানুষের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য এবং জীবন যাপনের স্বাতন্য-রূপ প্রকাশ পায়, তাকেই বলে আঞ্চলিক উপন্যাস। শ্রেষ্ঠ আঞ্চলিক উপন্যাস বিশেষ অঞ্চলের কাহিনী হয়েও মানবিক গুণাবলী প্রকাশে সর্বজনীনতা লাভ করে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’, অদ্বৈত মলবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম সার্থক আঞ্চলিক উপন্যাসের দৃষ্টান্ত।
৫. আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস
গঠনকৌশলের দিক থেকে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস কাহিনী প্রধান নয়, চরিত্রপ্রধান। নিজের জীবনের ঘটনাকে যখন বিশেষ সমাজ ও দেশ কালের পরিপ্রেক্ষিতে ঔপন্যাসিক উপস্থাপন করেন তখন জন্ম নেয় আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। এদিক থেকে বিচার করলে প্রতিটি মহৎ উপন্যাসেই ঔপন্যাসিকের ব্যক্তি-জীবন ও ব্যক্তিচিন্তার প্রতিফলন ঘটে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পঁচালী’কে আমরা জীবনীমূলক সামাজিক উপন্যাস হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি।
এছাড়াও গঠনকৌশল ও জীবনবিন্যাসের ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের আলোকে উপন্যাস আরো বিচিত্র শ্রেণির হতে পারে। যেমন ক. কাব্যধর্মী উপন্যাস, খ. ভ্রমণ উপন্যাস, গ. পত্রোপন্যাস, ঘ. মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস, ঙ. চেতনাপ্রবাহরীতির উপন্যাস, চ. রহস্য উপন্যাস, ছ. প্রতীকী উপন্যাস, জ. মহাকাব্যিক উপন্যাস ইত্যাদি।
জীবনবিন্যাসের বৈশিষ্ট্যর দিক থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’ কাব্যধর্মী উপন্যাসের পর্যায়ে পড়ে। এ উপন্যাসকে ভাবনা প্রধান উপন্যাসও (Novel of thought) বলা যেতে পারে।
উপন্যাসের ইতিহাস
ইউরোপে বিশেষ করে ইংরেজি সাহিত্যের উপন্যাস-যুগের সূচনা ড্যানিয়েল ডিফো’র ‘রবিনসন ক্রুশো’র (১৭১৯) কাল থেকে। অধিকাংশ সমালোচকের মতে ইংরেজি সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস স্যামুয়েল রিচার্ডসনের ‘পামেলা’ (১৭৪০)। ‘রবিনসন ক্রুশো’ মূলত ভ্রমণকাহিনী আর ‘পামেলা’ ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে পরিবার ও সমাজের পরিচয় উপস্থাপিত হয়েছে। ইংরেজি সাহিত্যের প্রথম যুগের কয়েকজন ঔপন্যাসিক হলেন হেনরি ফিল্ডিং (১৭০৭-১৭৫৪), স্যামুয়েল রিচার্ডসন (১৬৮৯-১৭৬১) এবং ওয়াল্টার স্কট (১৭৮১-১৮৩২)। অষ্টাদশ শতাব্দীতে সমগ্র ইউরোপে ও আমেরিকায় উপন্যাসের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। জর্জ এলিয়ট (১৮১৯-১৮৮০), চার্লস ডিকেন্স (১৮২২-১৮৭০), হেনরি জেমস (১৮৪৩-১৯১৬) উপন্যাসের প্রথম যুগের কয়েকজন শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক। রুশ সাহিত্যের লিও তলস্তয়ের নামও এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে।
ইংরেজ সাহিত্যের প্রথম যুগের কয়েকটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হলো হেনরি ফিল্ডিং-এর ‘টম জোনস, জেন অস্টেনের ‘প্রাইড এ প্রেজুডিস’, চার্লস ডিকেন্স-এর ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ এবং এমলি ব্রন্টির ‘উইদারিং হাইটস’। ফরাসি সাহিত্যে গুস্তাভ ফ্লবেয়ারের ‘মাদাম বোভারি’, রুশ সাহিত্যে ফিওদর দস্তয়োভস্কির ‘দি ব্রাদার্স কারমাজোভ’, লিও তলস্তয়ের ‘ওয়ার এন্ড পিস’ এবং ‘আনা কারেনিনা, আমেরিকান সাহিত্যে হেনরি জেমস-এর ‘দি পোর্টেট অব এ লেডি’ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের দৃষ্টান্ত। বিশ শতাব্দীতে উপন্যাসের বিষয় ও গঠন-কৌশল নিয়ে বিচিত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা লক্ষ্য করা যায়। সমারসেট মম, ডি. এইচ. লরেন্স, ভার্জিনিয়া উলফ, জেমস জয়েস, জ্যাঁ পল সার্তে, স্যামুয়েল বেকেট প্রমুখ ঔপন্যাসিক নতুন নতুন ধারায় উপন্যাস সৃষ্টি করেছেন। মানুষের জীবন-যাপন, ধ্যান-ধারণা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উপন্যাসের বিষয়বস্তুর যেমন পরিবর্তন ঘটেছে, তেমনি উপস্থাপন ভঙ্গিতেও নতুন নতুন রীতি প্রবর্তিত হয়েছে।
বাংলা উপন্যাস
আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাবে উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাংলা উপন্যাস রচনার সূত্রপাত। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ (১৮৬৫) প্রথম সার্থক উপন্যাস। এরপর বঙ্কিমচন্দ্র ‘কপালকুণ্ডলা’ (১৮৬৬), ‘বিষবৃক্ষ’ (১৮৭৩), ‘চন্দ্রশেখর’ (১৮৭৫), কৃষ্ণকান্তের উইল’ (১৮৭৮), ‘রাজসিংহ’ (১৮৮২) প্রভৃতি উপন্যাস রচনা করে বাংলা সাহিত্যকে বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধি দান করেন। বঙ্কিমচন্দ্রের সমকালে উপন্যাস রচনা করে খ্যাতি লাভ করেন মীর মশাররফ হোসেন। তাঁর ‘বিষাদ-সিন্ধু’ (১৮৮৫-‘৯১) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস।
রবীন্দ্রনাথের সাধনায় বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার মতো উপন্যাসও সমৃদ্ধ হয়েছে। ঘটনা গঠন-কৌশল, জীবনদর্শন ও ভাষার ঐশ্বর্যে রবীন্দ্রনাথের প্রতিটি উপন্যাসই বিশিষ্ট। ‘চোখের বালি’ (১৯০৩) ‘গোরা’, (১৯১০) ‘চতুরঙ্গ’ (১৯১৬), ‘ঘরে বাইরে’ (১৯১৬), ‘যোগাযোগ’ (১৯২৯), ‘শেষের কবিতা’ (১৯২৯), ‘চার অধ্যায়’ (১৯৩০) রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর মধ্যে অন্যতম।
রবীন্দ্র-পরবর্তীকালে বাংলা উপন্যাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক শরচ্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর উপন্যাসগুলোর মধ্যে ‘চন্দ্রনাথ’ (১৯১৬), ‘পল্লীসমাজ’ (১৯১৬), ‘শ্রীকান্ত’ (১৯১৭-৩৩), ‘চরিত্রহীন’ (১৯১৭), ‘দেবদাস’ (১৯১৭), ‘গৃহদাহ’ (১৯২০), ‘দেনাপাওনা’ (১৯২৩), ‘পথের দাবী’ (১৯২৬) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের পর বাংলা উপন্যাসের বৈচিত্র্য বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিষয়বস্তু, গঠনকৌশল, জীবনকে দেখা এবং দেখানোর ভঙ্গি প্রভৃতি দিক থেকে এ সময়ের প্রত্যক ঔপন্যাসিকই বিশিষ্ট। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত (১৮৮২-১৯৬৪), জগদীশ গুপ্ত (১৮৬৬-১৯৫৬), বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০), তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১), অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত (১৯০৩-১৯৭৬), প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৪-১৯৮৮), মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৮৮), শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় (১৮৯৯-১৯৭৯), প্রবোধকুমার সান্যাল (১৯০৫-১৯৮৩), সতীনাথ ভাদুড়ী (১৯০৬-১৯৬৫), সুবোধ ঘোষ (১৯০৯-৮০) কমলকুমার মজুমদার (১৯১৫-১৯৭৯) সনৎ কুমার ঘোষ (১৯২০-১৯৮৫) এবং সমরেশ বসু (১৯২৪-১৯৮৮)।
বাংলাদেশের উপন্যাস
অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশের উপন্যাস কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলা উপন্যাসের সহচর হয়েও স্বতন্ত্র ধারায় বিকাশ লাভ করেছে। এর কারণ বাংলাদেশের নদীমাতৃক, কৃষিনির্ভর জীবন এবং শিল্প-রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে দেশ বিভাগের সময় বাংলাদেশ পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। তবে এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠির স্বতন্ত্র জীবনধারার মতো উপন্যাসের ক্ষেত্রেও বিশিষ্টতা লক্ষ্য করা যায়। এই ধারার প্রথম উপন্যাস মোহাম্মদ নজিবর রহমানের (১৮৬০-১৯২৩) ‘আনোয়ারা’ (১৯১৪)। কাজী আব্দুল ওদুদের ‘নদীবক্ষে’ (১৯১৯), বেগম রোকেয়ার ‘অবরোধবাসিনী’ (১৯২৮), কাজী ইমদাদুল হকের ‘আব্দুল্লাহ’ (১৯৩৩), হুমায়ুন কবিরের ‘নদী ও নারী’ (১৯৪৫) বাংলাদেশের উপন্যাসের পটভুমি সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বাংলাদেশে রচিত উপন্যাস বিষয়বস্তু ও গঠন-কৌশলের নতুন নতুন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে বিকাশ লাভ করেছে। প্রধানত গ্রামীণ কৃষিজীবন, নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবন, আঞ্চলিক উপাদান সমৃদ্ধ জীবন বাংলাদেশের উপন্যাসের প্রধান বিষয়। এছাড়া দেশের মানুষের রাজনৈতিক আন্দোলনসমূহ বাংলাদেশের উপন্যাসের কাহিনী রূপে গৃহীত হচ্ছে। বিশেষত ভাষা আন্দোলন ও আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ কিছু উপন্যাসে বিষয় রূপে গৃহীত হওয়ায় জাতীয় গৌরবের স্মারক হিসেবে সেসব উপন্যাস আমাদের সাহিত্যের অহংকার।
বাংলাদেশের ঔপন্যাসিকদের মধ্যে যাঁরা কৃতিত্ব অর্জন করেছেন তাঁদের মধ্যে উলেখযোগ্য হলেন: আবুল মনসুর আহমেদ (১৮৯৭-১৯৯৭), আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩), সত্যেন সেন (১৯০৭-১৯৮১), কাজী আফসার উদ্দিন (১৯২১ –), আবু জাফর শামসুদ্দিন (১৯১১-১৯৮৮),শওকত ওসমান (১৯২১ —১৯৯৮ ), আবু রুশদ (১৯১৯ — ), সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৯২২-১৯৭১), আবদুর রাজ্জাক (১৯২৬-১৯৮১), সরদার জয়েন উদ্দীন (১৯২৩-১৯৮৬), রশীদ করিম (১৯২৫ —), শামসুদ্দীন আবুল কালাম (১৯২৬ – ), আবু ইসহাক ১৯২৬ – ), অদ্বৈত মলবর্মণ (১৯১৪-১৯৫১), মিরজা আবদুল হাই (১৯১৯-১৯৮৪), শহীদুলা কায়সার (১৯২৭-১৯৭১),আলাউদ্দীন আল আজাদ (১৯৩২ – ), জহির রায়হান (১৯৩৩-১৯৭২), সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫ –), শওকত আলী (১৯৩৬ – ), হুমায়ুন কাদির (১৯৩৫-১৯৭৭), আবু বকর সিদ্দিক (১৯৩৬ – ), রিজিয়া রহমান (১৯৪৩ — ), মাহমুদুল হক (১৯৪০ ), রাহাত খান (১৯৪০ ), রশীদ হায়দার (১৯৪১ –), আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৪৩-১৯৯৭), সেলিনা হোসেন (১৯৪৭ – ), কায়েস আহমেদ (১৯৪৮-১৯৯২), সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়, হরিপদ দত্ত,মঈনুল আহসান সাবের (১৯৫৮ )।
বস্তুসংক্ষেপ:
যে বর্ণনাত্মক গদ্য রচনায় মানুষের বাস্তব জীবনকথা লেখকের জীবন সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে অভিব্যক্ত হয়, তাকেই উপন্যাস বলে। ঘটনামূলক ও বর্ণনাধর্মী হওয়ায় গদ্যভাষাই উপন্যাসের প্রকশবাহন। মানুষের জীবন জটিল, সুক্ষ্ম এবং বিচিত্র। জীবন বৈশিষ্ট্যের বহুমুখী রূপের প্রতিফলন ঘটার জন্য প্রতিটি উপন্যাসের আয়তন ভিন্নধর্মী।
জন্ম লগ্ন থেকেই যে উপাদানের কারণে উপন্যাস অন্যান্য সহিত্যরূপ থেকে স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে, তা হলো তার ভাষা। কাহিনী, চরিত্র প্রভৃতি উপাদানগুলো ট্রাজেডি কিংবা মহাকাব্যের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। কিন্তু জীবনের বাস্তবমুখী, কৃত্রিম, জটিল ও বহুকৌণিক রূপ অঙ্কনের প্রয়োজনে গদ্যভাষা হলো উপন্যাসের প্রকাশ মাধ্যম। লেখকের জীবনদৃষ্টি ও জীবন সৃষ্টির ভাষা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উপন্যাসের বর্ণনা, পরিচর্যা, স্থান বা পশ্চাৎপট উপস্থাপন, চরিত্রের রূপ ও স্বরূপ নির্ণয়ে অনিবার্য ভাষারীতির প্রয়োগ যে কোনো ঔপন্যাসিকের কাম্য। উপন্যাসে বিষয়ের সঙ্গে ভাষার সামঞ্জস্য রক্ষার মাধ্যমেই কোনো উপন্যাস যথার্থ ও সমগ্র হয়ে ওঠে।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা এগারটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।