সেন্ট টমাস একুইনাস বা থমাস অ্যাকুইনাস বা টমাস আকুইনাস (ইংরেজি: Saint Thomas Aquinas; ১২২৫ – ৭ মার্চ ১২৭৪) ছিলেন একজন ইতালীয় ডোমিনিকান খ্রিস্টীয় সন্ন্যাসী, দার্শনিক, ক্যাথলিক যাজক এবং চার্চের ডাক্তার। একাধিক বিষয়ে প্রভাবশালী দার্শনিক, ধর্মতত্ত্ববিদ এবং ঐতিহ্যবাহী স্কলাসটিকবাদের বিচারপতি থাকা সত্বেও তিনি পরবর্তীকালে ডক্টর অ্যাঞ্জেলিকাস, ডক্টর কম্যুনিস এবং ডক্টর ইউনিভার্সালিস নামেও পরিচিত ছিলেন। অ্যাকুইনাস নামটি ইতালির লাজিওর বর্তমান অ্যাকিনো কাউন্টিতে তাঁর বংশানুক্রমিক উৎস চিহ্নিত করে। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্বের বিশিষ্ট প্রবক্তা এবং টমিজম নামে পরিচিত একটি চিন্তাবিদ্যার জনক।
মধ্যযুগের রাষ্ট্রীয় দর্শনের ইতিহাসে তিনজন খ্রিষ্টধর্মীয় যাজক চিন্তাবিদদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এঁরা হচ্ছেনঃ ১. সেইন্ট বার্নার্ড (১০৯১-১১৫৩)। ইনি ক্লেয়ার ভর বার্নার্ড নামে পরিচিত। ২. সেলিসবারির জন (১১৫৫-১১৮০)। ৩. সেইন্ট টমাস এ্যকুইনাস (১২২৭-১২৭৪)।
ইউরোপীয় ইতিহাসের সামন্ত যুগে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রধান রাজনীতিক সমস্যা ছিল রাষ্ট্র এবং ধর্মের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং ক্ষমতার সমস্যা। রোম সাম্রাজ্যের পতনের পর খ্রিষ্টীয় ধর্মগুরু পোপের অধিনায়কত্বে সমগ্র ইউরোপবাসী এক খ্রিষ্টীয় যাজক সাম্রাজ্য সংগঠিত হয়েছিল। ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের ব্যাখ্যা, প্রার্থনার পৌরহিত্য ইত্যাদি এই সংগঠনের করণীয় হলেও ক্রমান্বয়ে এই সংগঠনের ক্ষমতা পারলৌকিক হতে ইহলৌকিক এবং রাষ্ট্রীয় বিষয়ে বিস্তার লাভ করে। খ্রিষ্টীয় যাজক সংগঠন বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ জমির মালিক হয়ে মধ্যযুগের অন্যতম সামাজিক শক্তিতে পরিণত হয়। রোম নগরীতে এই শক্তিকেন্দ্র স্থাপিত হয়।
যাজকতন্ত্র তার নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা রাজা কিংবা রাষ্ট্রীয় সরকারের উপর বিস্তারিত করার প্রয়াস পায়। এই প্রচেষ্টাতে ধর্মের সঙ্গে রাষ্ট্রের, রাজার সঙ্গে পোপের পারস্পরিক বিরোধের সূত্রপাত ঘটে। কে বড়? রাষ্ট্র না ধর্ম? পোপ না রাজা? এই প্রশ্নে উভয় পক্ষের যুক্তি, প্রতিযুক্তির ভিত্তিতে মধ্যযুগের দর্শন, বিশেষ করে তার রাষ্ট্রীয় দর্শন বিকাশ লাভ করে। সেইন্ট বার্নার্ড জাগতিক এবং ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। পোপ জাগতিক এবং রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে যেরূপ ধর্মীয় সংগঠনকে জড়িত করেছিলেন এবং রাষ্ট্রশাসনে যেরূপ হস্তক্ষেপ করেছেন সেইন্ট বার্নার্ড তার নিন্দা করেন। তাঁর অভিমত ছিলঃ রাষ্ট্রীয় শাসন রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। পুরোহিত ধর্মীয় কাজ সমাধা করবে। রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে পোপ অর্থাৎ পুরোহিতের হস্তক্ষেপ অনুচিত।
মধ্যযুগে রাষ্ট্রনীতিক দর্শনের প্রধান ব্যাখ্যাদাতা ছিলেন সেইন্ট টমাস একুইনাস। তিনি ছিলেন ইতালির অধিবাসী। তাঁর রচনার মধ্যে ‘সুমমা থিউলজিকা’(১২৬৫-৭৩) ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে। তিনি এরিস্টটলের ‘রাষ্ট্রনীতি’ বা ‘পলিটিক্স’ এর উপর আলোচনামূলক একখানি গ্রন্থও রচনা করেন। টমাস একুইনাসের প্রধান লক্ষ্য ছিল যুক্তি এবং ধর্মের মধ্যে একটা সমঝোতা স্থাপন। প্রাচীন গ্রিসের চিন্তাধারার সঙ্গে ইতোমধ্যে ইউরোপ আবার পরিচিত হতে শুরু করেছে। ইসলামের সঙ্গে ধর্মীয় যুদ্ধের মাধ্যমে ইউরোপ প্লেটো এরিস্টটলের আরবী অনুবাদের সাক্ষাৎ পরিচয় লাভ করেছে। জীবন ও জগৎ সম্পর্কে নতুন এক ধর্মনিরপেক্ষ দর্শনের সঙ্গে ইউরোপীয় চিন্তাবিদদের পরিচয় ঘটতে শুরু করে। পাছে এই পরিচয় খ্রিষ্ট ধর্মের ভিত্তিকে দুর্বল করে তোলে এই আশঙ্কায় একুইনাস যুক্তির ভিত্তিতে ধর্মকে গ্রহণীয় করে তোলার চেষ্টা করেন। তাঁর রচনায় রাষ্ট্রীয় সমস্যাসমূহের আলোচনাও কিছুটা বৈজ্ঞানিক আলোচনার রূপ গ্রহণ করে।
একুইনাস আইন বা বিধানকে যুক্তির ভিত্তিতে মানুষের মঙ্গলার্থে শাসকের প্রযুক্ত আইনও যে এক প্রকার বিধান—এ তত্ত্ব উপস্থিত করেন। একুইনাসের মতে চরম বিধান অবশ্যই প্রাকৃতিক এবং ঐশ্বরিক বিধান। কিন্তু রাষ্ট্রশাসনে মানুষের বিধানেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। এই প্রসঙ্গে একুইনাসের আইনের প্রকারভেদ উল্লেখযোগ্য। তার মতে আইন চার প্রকার। মানুষের তৈরি আইন অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় আইনের স্থান হচ্ছে সর্বনিম্নে। মানুষিক আইনের উপরে হচ্ছে ঈশ্বরের প্রত্যাদেশমূলক আইন।
প্রত্যাদিষ্ট বিধানের উপরে হচ্ছে বিধাতার ইচ্ছার মূর্ত প্রকাশ, প্রকৃতির বিধান। এই প্রাকৃতিক বিধানের দৃষ্টান্ত হিসেবে একুইনাস উল্লেখ করেন মানুষের আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি, যৌন মিলনের আকাঙ্খা, অপত্য স্নেহ এবং সমাজবদ্ধভাবে বাস করার মানুষের সহজাত প্রবণতা। কিন্তু সর্বোপরি হচ্ছে এক অবিনশ্বর বিধান। বিশ্ব সৃষ্টির মূল হচ্ছে বিধাতার এই অবিনশ্বর বিধান। চরম সত্য হচ্চে এই শাশ্বত বিধান। তাঁর মতে, জাগতিক সমস্যার শেষ মীমাংসাকারী হচ্ছে গির্জা বা ধর্ম। রাষ্ট্র শাসক রাষ্ট্রকে শাসন করতে ধর্মীয় বিধান কার্যকর করার জন্য। রাজা বা শাসক যদি ধর্মীয় বিধান লঙ্ঘন করে তা হলে ধর্ম এবং ধর্মীয় গুরুর অধিকার আছে তাকে সমাজচ্যূত করে জনসাধারণকে রাজার প্রতি আনুগত্য পোষণের দায়িত্ব থেকে মুক্তিদানের। বস্তুত পোপ এবং রাজার দ্বন্ধে পোপের বিজয়ের দার্শনিক ব্যাখ্যা হচ্ছে এ্যাকুইনাসের রাষ্ট্রীয় দর্শনের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
আরো পড়ুন
- ডেভিড হিউম: অভিজ্ঞতাবাদ ও সংশয়বাদী দর্শনের এক অমর আখ্যান
- জ্যাক দেরিদা ছিলেন প্রতিক্রিয়াশীল ফরাসি দার্শনিক
- বারট্রান্ড রাসেল ছিলেন একজন ব্রিটিশ মহাজ্ঞানী, চিন্তাবিদ, দার্শনিক ও মনীষী
- ইমানুয়েল কান্ট ছিলেন অষ্টাদশ শতকের জার্মান ভাববাদী দার্শনিক ও বিজ্ঞানী
- রেনে দেকার্ত ছিলেন সপ্তদশ শতকের ফরাসি দার্শনিক, গণিতশাস্ত্রবিদ ও বিজ্ঞানী
- জেরেমি বেনথাম ছিলেন ইংরেজ দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, সংস্কারক ও আইনবিদ
- প্লেটো ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের প্লেটোবাদী স্কুল ও একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা দার্শনিক
- এরিস্টটল প্রাচীন গ্রিসের ধ্রুপদী সময়কালের একজন দার্শনিক এবং বহু জ্ঞানী
- সেন্ট অগাস্টিন ছিলেন উত্তর আফ্রিকার প্রকৃতিবাদী ধর্মতত্ত্ববিদ ও খ্রিস্টীয় দার্শনিক
- সেন্ট টমাস একুইনাস ছিলেন ইতালীয় খ্রিস্টীয় সন্ন্যাসী, দার্শনিক ও যাজক
- আল্লামা মহম্মদ ইকবাল ছিলেন একজন মুসলিম লেখক, দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ
- আল কিন্দি নবম শতাব্দীর মুসলিম দার্শনিক, গণিতবিদ, চিকিৎসক এবং সংগীতজ্ঞ
- ইবনে সিনা ছিলেন সামন্ত যুগের দার্শনিক, চিকিৎসাবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী এবং কবি
- আল ফারাবির রাষ্ট্রচিন্তা বা রাষ্ট্রদর্শনে আল ফারাবির অবদান সম্পর্কে আলোচনা
- ইমাম আল গাজ্জালী ছিলেন সামন্তবাদী সাধক, ধর্ম বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞ ও দার্শনিক
- ইবনে খালদুন সামন্তযুগের আরব সভ্যতার ঐতিহাসিক, সমাজতাত্ত্বিক ও দার্শনিক
- ইবনে রুশদ ছিলেন আরব সভ্যতার সামন্ত যুগের বিখ্যাত দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক
- আল ফারাবি সামন্তযুগের প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তায় এক গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক
- হার্বার্ট স্পেন্সার ছিলেন ইংরেজ দার্শনিক, জীববিজ্ঞানী, নৃতাত্ত্বিক ও সমাজবিজ্ঞানী
- টমাস হিল গ্রীন ছিলেন উনিশ শতকের ইংল্যাণ্ডের শিক্ষাবিদ এবং দার্শনিক
- কৌটিল্য বা চাণক্য প্রাচীন ভারতীয় কূট রাজনৈতিক গুরু ও অর্থশাস্ত্রের রচয়িতা
- কনফুসিয়াস ছিলেন শরত বসন্তকালের একজন চীনা দার্শনিক এবং রাজনীতিবিদ
- অরবিন্দ ঘোষ ছিলেন অগ্নিযুগের মহানায়ক ও সিদ্ধযোগী একজন কবি ও গুরু
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বাংলা ভাষার লেখক, কবি দার্শনিক ও চিন্তাবিদ
- আবুল ফজল ছিলেন আকবরের এক নবরত্ন, সুপণ্ডিত, ইতিহাসবেত্তা ও রাজনীতিক
- মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ছিলেন ভারতের মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণির নেতা
- জর্জ উইলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেল: জার্মান ভাববাদী দর্শনের চরম উৎকর্ষ ও পরম ভাববাদ
তথ্যসূত্র
১. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ২৭২-২৭৩।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚