ইবনে রুশদ ছিলেন আরব সভ্যতার সামন্ত যুগের বিখ্যাত দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক

ইবনে রুশদ বা ইব্‌ন রুশদ বা আবু রুশদ (ইংরেজি: Ibn Rushd বা Averroes; ১১৬২- ১১ ডিসেম্বর ১১৯৮ খ্রি.) ছিলেন আরব সভ্যতার বিখ্যাত একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানী, পদার্থবিজ্ঞানী, জীববিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিদ, ধর্মতত্ত্ববিদ ও দার্শনিক। সামন্ত যুগের পাশ্চাত্য ইউরোপীয় জগতে ‘আভারস’ বা ‘আভারুজ’ বা Averroes নামে তিনি অধিক পরিচিত। আইন, ধর্মতত্ত্ব, অংকশাস্ত্র, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং দর্শন অর্থাৎ জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তাঁর অগাধ প্রগাঢ় পান্ডিত্য ছিল।[১]

ইবনে রুশদ-এর পুরো নাম আবুল ওয়ালীদ মুহাম্মদ ইবন আহমাদ ইবন মুহাম্মদ ইবনে রুশদ। তিনি “আরাস্তু” বা এ্যারিস্টটল-এর ভাষ্যকার। ইবনে রুশদ ছিলেন কুরআন সম্পর্কিত নানা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুসলিম প্রকৃতিবিজ্ঞানী।

রুশদ-এর ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবন 

ইবনে রুশদ মুসলিম সাম্রাজ্যভুক্ত স্পেনের কর্ডোভা শহরে জন্মগ্রহণ করেন ৫২০ হিজরী সনে এবং ১১৬২ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ৫৯৫ হিজরী সনে বা ১১ ডিসেম্বর, ১১৯৮ খ্রিস্টাব্দে। স্পেনের এক নামকরা পরিবারে ইবনে রুশদের জন্ম।

ইবনে রুশদের পিতামহ ছিলেন বিখ্যাত মালিকী ফকীহ আইনবিশারদ। কর্ডোভার দুনিয়াখ্যাত প্রধান মসজিদের ইমাম ছিলেন তিনি। ইবনে রুশদের পিতাও একজন ফকীহ্ এবং কাজী ছিলেন। আল মুরাবীদ ও আল মোহাদ সুলতানদের রাজত্বকালে ইবনে রুশদের দাদা ও বাবা যথাক্রমে ইমাম ও কাজীর পদে আসীন হন। এ ভাবে সরকারি প্রশাসনের সঙ্গে তাদের উভয়ের একটা সক্রিয় যোগাযোগ ছিল। কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইবনে রুশদ কুরআন, হাদীস, ফিকাহ, পদার্থবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, দর্শন, তর্কশাস্ত্র, চিকিৎসা শাস্ত্র ইত্যাদিতে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। 

প্লেটো ও এ্যারিস্টটলের পূর্ণাঙ্গ রচনার ভাষ্য 

ইবনে রুশদের দার্শনিক চিন্তার বৈশিষ্ট্য এই যে, তিনি ইসলামের ধর্মীয়বোধের বিরোধিতা না করেও গ্রিসের দার্শনিক এ্যারিস্টটলের দর্শনের বস্তুবাদী দিক বিকশিত করার চেষ্টা করেন। তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, বস্তু এবং গতির কোনো স্রষ্টা নেই। আত্মার অমরতা ও পরকালকে ইবনে রুশদ অস্বীকার করেন।

আরো পড়ুন:  ইবনে সিনা ছিলেন সামন্ত যুগের দার্শনিক, চিকিৎসাবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী এবং কবি

আল মোহাদ খলিফা আবু ইয়াকুব ইউসুফ এবং তার সন্তান আবু ইউসুফ ইয়াকুব আল মনসুরের আমলে ইবনে রুশদ রাজ পরিবারের চিকিৎসকরূপে নিয়োজিত থাকেন। আল মোহাদ খলিফাগণ শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান হওয়ায় ইবনে রুশদের চিকিৎসাজ্ঞান, ফিকাহ ও দর্শনে তার পারদর্শিতা খলিফাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সুলতান ইয়াকুব ইউসুফের নির্দেশে ইবন রুশদ প্লেটোর “রিপাবলিক” ও এ্যারিস্টটলের “নিকোমেকিয়ান এথিকস” এর পূর্ণাঙ্গ ভাষ্য রচনা করেন। ইবনে রুশদ ১১৬৯ খ্রীস্টাব্দে সেভিলের এবং ১১৭১ খ্রীস্টাব্দে কর্ডোভার কাজীর পদ লাভ করেন। তিনি স্পেনের আন্দালুসিয়ার কাযী-উল-কুযতের পদে নিযুক্ত হন ১১৮২ খ্রীস্টাব্দে। 

ইবনে রুশদের রচনাবলী 

ইবনে রুশদের রচনাবলীর কালানুক্রমিক হিসাব তৈরী করেছেন এম. আলোনসো। তিনি মোট কত সংখ্যক গ্রন্থ লিখেছেন তা খুব নিশ্চিতভাবে বোঝার উপায় নেই। প্রফেসর ই. রেনা এবং প্রফেসর জর্জ সারটন জানিয়েছেন যে, ইবনে রুশদের গ্রন্থের সংখ্যা ৬৭। প্রফেসর ব্রকেলম্যান ৩৯টি এবং ইবন আবী উসায়বিয়া ৪৭টি গ্রন্থের কথা উল্লেখ করেছেন। রের্না ও সারটনের মতে ইবনে রুশদের গ্রন্থের মধ্যে দর্শন গ্রন্থ ২৮টি, চিকিৎসাবিজ্ঞান ২০টি, আইন ও ফিকাহ গ্রন্থ ৮টি, ধর্মবিষয়ক ৫টি, জ্যোতির্বিজ্ঞান ৪টি, ব্যাকরণ ২টি, পদার্থবিদ্যা ২টি এবং প্রাণীবিদ্যা সম্পর্কেও বই রয়েছে। 

ইবন রুশূদের গ্রন্থসমূহের মধ্যে প্লেটোর “রিপাবলিক” ও এ্যারিস্টটলের “নিকোমেকিয়ান এথিকস”-এর ভাষ্য, “কিতাবুল ফালসুফা”, “ফাসল আল মাকাল” “কিতাবুল মুকাদ্দিমা ফিল ফিকাহ” এবং “কিতাবুল কুল্লিয়াত ফিত-তিব্ব” অন্যতম। চিকিৎসা বিজ্ঞান বিষয়ে ইবনে রুশদ যে ২০টি গ্রন্থ রচনা করেন, তার মধ্যে “কিতাবুল কুল্লিয়াত ফিত-তিব্ব” অন্যতম। যদিও এটা ইবনে সিনার “কানুন” অপেক্ষা নিষ্প্রভ, তথাপি ১১৬২ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে লিখিত ৭ খন্ডের এই গ্রন্থে নিম্নোক্ত বিষয়ের বিশদ সমাবেশ ঘটেছে। (১) শরীরবিদ্যা (এনাটমি), (২) শরীরবৃত্ত (ফিজিওলজি), (৩) সাধারণ রোগবিদ্যা (জেনারেল প্যাথলজি), (৪) নিদান রোগ নির্ণয় (ডায়াগনসিস), (৫) ভেষজ বিজ্ঞান (মেটিরিয়া মেডিকা), (৬) স্বাস্থ্যবিদ্যা (হাইজিন) এবং ভৈষজ (থেরাপেটিকস)।[২]

আরো পড়ুন:  মানবেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা, বিপ্লবী ও তাত্ত্বিক

ইবনে রুশদের চিন্তাধারা

আল-গাজ্জালীর ধর্মীয় রহস্যবাদকে ইবনে রুশদ তীব্রভাবে সমালোচনা করেন। প্রাচীন গ্রীক দর্শনের সঙ্গে ইউরোপের সাক্ষাৎ পরিচয়ের অন্যতম মাধ্যম ছিলেন ইবনে রুশদ। এরিস্টটলের দর্শনের যে ব্যাখ্যা তিনি রচনা করেন তার মাধ্যমে ইউরোপের জ্ঞানজগৎ গ্রিক দর্শনের পরিচয় লাভ করে। ইবনে ‍রুশদের দর্শন এবং তার অনুসারীগণ মুসলিম ও খ্রিষ্টীয় ধর্মের গোঁড়াপন্থীগণের তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। তাঁর কোনো কোনো গ্রন্থ পুড়িয়ে ফেলা হয়, তাদের এই বিরোধিতা ইবনে রুশদের দর্শনের শক্তি এবং প্রভাবের পরিচায়ক।

কেবলমাত্র মুসলিম সাম্রাজ্য নয়, ত্রয়োদশ শতকের ফরাসি চিন্তাধারার উপরও ইবনে রুশদের অগ্রসর চিন্তাধারার প্রভাব পরিদৃষ্ট হয়। ইতালিতে চতুর্দশ হতে ষোড়শ শতক পর্যন্ত ইবনে রুশদের চিন্তাধারার সাক্ষাত পাওয়া যায়। ইবনে রুশদের দর্শনের প্রধান অভিমত হচ্ছে বিশ্ব চিরস্থায়ী এবং আত্মাও দেহের ন্যায় মরণশীল। ধর্মের সঙ্গে বিরোধ এড়াবার জন্য ইবনে রুশদ দ্বৈত সত্ত্বার তত্ত্ব রচনা করেন। তিনি বলতেন, সত্য দুই প্রকারঃ দর্শন ও বিজ্ঞানের সত্য এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের সত্য। দর্শন ও বিজ্ঞানের সত্য যেমন ধর্মীয় বিশ্বাসের কাছে গ্রাহ্য নয়, তেমনি জগৎ সম্পর্কে ধর্মের ব্যাখ্যা ও বিজ্ঞানও দর্শনের কাছে গ্রহণীয় হতে পারে না।[৩]

মধ্যযুগে বিজ্ঞান যখন গোঁড়ামির শিকল ভেঙ্গে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে তখন ইবনে রুশদের দার্শনিক রচনা্র মধ্যে এরিস্টটলের দর্শনবিষয়ক তাঁর তিন খন্ডের বক্তব্য সমধিক পরিচিত। এছাড়া চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপর তিনি সাত খন্ডে ‘কিতাব উল কুললিয়াত’ নামে যে বিশ্বকোষ রচনা করেন তাও জ্ঞানের ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে। এই বিশ্বকোষে ইবনে রুশদ শরীরাংশ, দেহতত্ত্ব, রোগতত্ত্ব, সাধারণ চিকিৎসা, খাদ্য ও ঔষধপথ্য ব্যবস্থা এবং আরোগ্য বিজ্ঞানের সুবিস্তারিত বিবরণ পেশ করেন।

তথ্যসূত্র:

১. অনুপ সাদি, ২৬ মে, ২০১৯, “ইবনে রুশদ ছিলেন আরব সভ্যতার বিখ্যাত দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/biography/ibn-rushd/
২. হাসানুজ্জামান চৌধুরী, মো আব্দুর রশীদ, এ এমদাদুল হক ও অন্যান্য; রাষ্ট্রবিজ্ঞান দ্বিতীয় খণ্ড, রাষ্ট্রচিন্তা, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা, ত্রয়োদশ প্রকাশ, ২০২০, পৃষ্ঠা ৯২-৯৩।
৩. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ২০৫-২০৬।

Leave a Comment

You cannot copy content of this page