জেরেমি বেনথাম ছিলেন ইংরেজ দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, সংস্কারক ও আইনবিদ

জেরেমি বেনথাম বা জেরিমি বেনথাম বা জেরেমী বেন্থাম (ইংরেজি: Jeremy Bentham, ১৭৪৮-১৮৩২) ছিলেন ইংরেজ দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, সমাজ সংস্কারক এবং আইনের ব্যাখ্যাতা। তাঁকে আধুনিক ইউটিলিটারিয়ানিজম বা উপযোগবাদ এবং হিতবাদ দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। হিতবাদ দর্শনের মূলকথা হলো জনগণকে সামগ্রিক সুখ প্রদানই আইন ও নৈতিকতার লক্ষ্য।[১]

জেরেমি বেনথাম ও হিতবাদ

হিতবাদ শব্দটি সুখ অর্থে বেনথাম ব্যবহার করেন। যেটা দুঃখের কারণ সেটা হিতবাদী নয়। তিনি মনে করতেন যে প্রকৃতি মানুষকে দুটি অবস্থার অধীন করেছে, যথা সুখ ও দুঃখ। মানুষের যাবতীয় কামনা ও বাসনার মূলে থাকে সুখের সন্ধান এবং সে সর্বদা দুঃখকে এড়িয়ে চলতে চায়। তিনি তাই সবকিছুকেই সুখ ও দুঃখের মানদণ্ডে পরিমাপ করেন। তাঁর মতে হিতবাদীকে পুণ্যকাম হতে হবে, কারণ পুণ্যকর্মই সুখের উৎস, অন্যদিকে দুঃখের কারণ হিসেবে পাপকর্ম বর্জনীয়। তবে সুখের সন্ধানীকে কেবল নিজ সুখের কথা ভাবলেই চলবে না, সর্বজনের সুখ তার কাম্য হওয়া উচিত।

হিতবাদ একটি ভোগবাদী তত্ত্ব। সুখ বেনথামের কাছে ছিল একটি অনুভূতি বিশেষ। আনন্দ মনের একটা অবস্থা। পরিমাণগতভাবে দুটি সুখের মধ্যে তারতম্য থাকে। অর্থাৎ একটি সুখের পরিমাণ অন্য একটি সুখের পরিমাণ অপেক্ষা বেশি কিংবা কম। অবশ্য দুটি সুখের মধ্যে তুলনাগত বিচারে গুণগত ও পরিমাণগত উভয় প্রকারেরই তারতম্য থাকতে পারে। বেনথাম কেবল পরিমাণগত দিকটিকেই দেখেছেন। মাপার উপযোগী গাণিতিক পদ্ধতিও তিনি উদ্ভাবন করেন । হিতবাদী তত্ত্ব লােকের আচরণ নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি শেখায়। কোন কাজটা ঠিক এবং কোনটা ভাল তা জানা যায়। ভাল কাজে সবচেয়ে বেশি সুখ পাওয়া যায়, কাজের মধ্যে কষ্ট থাকলেও। আর যে কাজটা ঠিক তাতে পাল্লায় সুখের দিকটাই থাকে ভারী। বেনথাম মনে করতেন হিতবাদী তত্ত্ব সর্বজনীন। এর মধ্যে দিয়েই লোকচরিত্র সহজে বোঝা যায়।

রাষ্ট্র সম্পর্কে বেনথামের অভিমত ছিল যে হিতবাদী ধারাকে উন্নত ও বজায় রাখার জন্য কিছু লোকের সমষ্টি হলো রাষ্ট্র। সরকারের কাজ হলো লোকের সুখ ও সমৃদ্ধিসাধন। তাঁর মতে সামাজিক চুক্তি নয়, সুখের তাগিদেই মানুষ সমাজবদ্ধ হয়েছিল। লোকে আইনের প্রতি অনুগত থাকে; কারণ অনুগত থাকার উপকার ও না থাকার বিপদ উপলব্ধি করে বলে। এই আনুগত্যই তাঁর মতে রাজনৈতিক সমাজের ভিত্তি। হিতবাদী উৎসেই জন্মায় রাজনৈতিক সমাজ বা রাষ্ট্র। তাঁর মতে রাষ্ট্রের সমস্ত প্রতিষ্ঠানেরই হিতবাদী ভূমিকা থাকা উচিত।[২]

আরো পড়ুন:  মন্টেস্কুর রাষ্ট্রচিন্তা যুক্তিবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদের সংমিশ্রণে গড়া সমাজতাত্ত্বিক পদ্ধতি

আইন ও স্বাধীনতা সম্পর্কে জেরেমি বেনথাম

বেনথামের দৃষ্টিতে মানুষ মূলত স্বার্থপর এবং সমাজের অন্যদের স্বার্থ ক্ষুন্ন করে নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করে। উভয় স্বার্থের সামঞ্জস্য বিধানই সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। রাষ্ট্রকে সেই কাজ করতে হয় আইনের সাহায্যে। তাঁর মতে রাষ্ট্রের প্রধান কাজ আইন প্রণয়ন। আইন একাধারে নির্দেশ ও বাধা দেয়। আইন প্রকৃতিগত স্বাধীনতারও প্রতিবন্ধকতা করে। পরস্পরবিরোধী সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান আইনের এক মস্ত ভূমিকা। লোকের সংকীর্ণ স্বার্থ চিন্তাকে আইন এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যাতে লোকে সর্বজনের সুখ বিধানে তৎপর হয়। সেটা শাস্তিদানের মধ্যে দিয়েই সম্ভব । শাস্তি কিন্তু দুঃখের পর্যায়ে পড়ে।

বেনথাম মনে করতেন যে রাষ্ট্রই হলো যাবতীয় অধিকারের উৎস। তবে প্রাকৃত আইন ও প্রাকৃত অধিকার কিংবা দিব্য অধিকার অথবা চুক্তিগত অধিকার ইত্যাদি সবই অর্থহীন। সম্পত্তির কিংবা স্বাধীনতার অধিকার স্বীকৃত হতে পারে যখন সেগুলি লোকের সুখবিধান করে। রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য সুখ, অধিকার নয়। তবে তিনি সবাইকে নিরাপত্তার নিরঙ্কুশ অধিকার প্রদান করেন, কারণ ব্যক্তির সুখ নিরাপত্তা, প্রাচুর্য ও সমতার উপর নির্ভরশীল।

অপরের স্বার্থহানি করে না বলে তিনি নাগরিক স্বাধীনতার বিরোধী ছিলেন না, কিন্তু প্রকৃতিগত স্বাধীনতা সমর্থন করতেন না। তিনি প্রতিনিধিত্বমুলক সরকারের পক্ষপাতী ছিলেন। কারণ তাতে সবাইকার সুখ সুনিশ্চিত হয়। রাজনৈতিক ক্ষমতা মানুষের সুখ বিধানের জন্যই প্রযুক্ত হওয়া উচিত। তাঁর মতে রাজতন্ত্র অপেক্ষা সাধারণতন্ত্র ভালো। তিনি চাইতেন ব্যবসা বাণিজ্যে অবাধ সুযোগ। রাষ্ট্রের বিরোধিতা করার সুযোগ থাকা তিনি চাইতেন, তবে নাগরিকদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আইনসম্মত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অধিকারের তিনি বিরোধী ছিলেন।[২]

নীতিশাস্ত্রের ন্যায়-অন্যায় এবং ভালো-মন্দ প্রশ্নের আলোচনা করে বেনথাম বলেন যে, নীতি বা ন্যায়ের মূলে রয়েছে কার্যের প্রয়োগ বা সার্থকতার প্রশ্ন। একটা কার্য ভালো বা ন্যায্য বলে বিবেচিত হবে তার প্রয়োগ বা সার্থকতার ভিত্তিতে। সার্থকতা কি? কোনো কাজের ফলে সৃষ্ট সুখই হচ্ছে সে কাজের সার্থকতা। ব্যক্তি যখন কোনো কাজ করে তখন সে সুখ লাভ করার জন্যই ইহার সম্পাদন করে। আকাঙ্ক্ষিত সুখ লব্ধ হলেই কাজটি সার্থক এবং ন্যায্য। সুখের পরিবর্তে দুঃখের লাভ ঘটলে ব্যক্তির কাছে সে কাজ অসার্থক। সুখের এ ব্যাখ্যা একেবারেই ব্যক্তিক। সুখের এই ব্যক্তিক ব্যাখ্যাকে হিডোনিজম বা আত্মসুখবাদ বলে তিনি প্রচার করতে চান নি। সে জন্য উপযোগ বা সুখের ব্যাখ্যাকে ব্যাপক করে তিনি সুখ বলতে সামাজিক সুখকেও বুঝাতে চেয়েছেন।

আরো পড়ুন:  ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি হচ্ছে মন্টেস্কুর আইন, শাসন ও বিচার ক্ষমতার পৃথকীকরণ

উপযোগবাদ ও জেরেমি বেনথাম

রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে উপযোগবাদের তত্ত্বকে সম্প্রসারিত করে বেনথাম বলেছেন যে, রাষ্ট্রের যে-কোনো আইন বা কার্যের সার্থকতার পরিমাপ হবে অধিকতম সুখের বিধান দ্বারা। সুখকেই কাজের সার্থকতার মাপকাঠি করা, আবার অধিক সংখ্যকের সুখ বিধানের সুপারিশের মধ্যে বেনথাম-তত্ত্বের স্ববিরোধিতা প্রকট হয়েছে। এর কারণ, বেনথাম একদিকে যেমন তৎকালীন ইংল্যাণ্ডের পুঁজিবাদী সমাজের ব্যক্তিকেন্দ্রীকতার পরিপোষক ছিলেন তেমনি অপরদিকে মানবিকতার বোধ থেকে তিনি সে সমাজের বৈষম্য এবং সুখের সামাজিক বণ্টনে ভারসাম্যহীনতাকেও অস্বীকার করতে পারেন নি। এ বিরোধিতার সমঝোতা করার জন্য বেনথাম বলেছেন যে, ব্যক্তিগত সুখ এবং সামাজিক সুখের মধ্যে আসলে বিরোধ নেই। একের সুখেই বহুর সুখ। আবার বহুর সুখেই একের সুখ। আত্মসুখ সাধনের মাধ্যমে মানুষ অপরের সুখও সাধন করতে পারে। কারণ সুখ মানে কেবল দেহের আরাম নয়। বিপন্নকে উদ্ধার করার জন্য জীবনদানের মধ্যেও সুখ নিহিত আছে। আর সে সুখই উত্তম সুখ।

নিজের মানবতা বোধ থেকে বেনথাম ইংল্যাণ্ডের আইনের সংস্কারের চেষ্টা করেন। ফরাসি বিপ্লবের বৎসর ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে বেনথামের ‘ফ্রাগমেণ্ট অন গভার্নমেণ্ট’ বা সরকার সংক্রান্ত মতামত উপস্থিত করেন। বেনথাম বলেন, রাষ্ট্রের যে-কোনো বিধান বা কাজের লক্ষ্য হবে সর্বাধিক সংখ্যক অধিবাসীর সর্বাধিক পরিমাণ সুখের বিধান করা। ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের কোনো কাজ ন্যায় কিংবা অন্যায় তা নির্ধারিত হবে সে কাজের ফলে সে সুখ লব্ধ হবে কিংবা বিনষ্ট হবে, তার তুলনামূলক পরিমাণ দ্বারা। রাষ্ট্রের কোনো শাস্তিমূলক বিধানের সার্থকতার মাপকাঠিও এইরূপ হবে। এ বিধান যাদের উপর প্রযুক্ত হবে তাদের সুখের পরিমাণ এর প্রয়োগে যদি বৃদ্ধি পায় তবেই এ বিধান ন্যায্য। অন্যথায় এ বিধান অন্যায্য।

তৎকালীন ইংল্যাণ্ডের রাষ্ট্রীয় বিধানের অধিকাংশই ছিল অলিখিত। আইনের বিশ্লেষণ করে বেনথাম বলেন, রাষ্ট্রের যে কোনো বিধানেরই একটি খারাপ দিক হচ্ছে এর দ্বারা আহত ব্যক্তির সুখ বিনষ্ট হয়। কিন্তু বিনষ্ট পরিমাণের চেয়ে লব্ধ সুখের পরিমাণ অধিক হওয়া মধ্যেই এ বিধানের ন্যায্যতা নিহিত। প্রত্যেক বিধানের আরো দুটি দিক আছে। একটি তার অধিকারের দিক, অপরটি তার দায়িত্বের দিক। যেমন রাষ্ট্র, তেমনি ব্যক্তি উভয়ের ক্ষেত্রে এ সত্য। এ কারণে প্রত্যেক রাষ্ট্রীয় আইনের অধিকার ও দায়িত্ব উভয় দিক সম্পর্কে নাগরিকমাত্রেরই ওয়াকিবহাল থাকতে হবে। সে জন্য আইনকে বিধিবদ্ধ, প্রকাশিত এবং প্রচারিত হতে হবে।

আরো পড়ুন:  উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ রোমান্টিক কাব্য আন্দোলনের ইংরেজি সাহিত্যের কবি

বেনথামের নীতিশাস্ত্রীয় তত্ত্বে স্ববিরোধিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তা ছাড়া তিনি সুখের পরিমাণকে আঙ্কিক হিসাবে পরিমাপ করা যায় বলেও মনে করতেন। কিন্তু সুখের পরিমাণের এরূপ আঙ্কিক পরিমাপ সম্ভব বলে তাঁর পরবর্তী অনুসারীগণ মনে করতেন না। কিন্তু স্ববিরোধিতা সত্ত্বেও তাঁর নীতিতত্ত্বে একটি মানবতাবোধের পরিচয় আছে। এই বোধ থেকে তাঁর আইনের বিশ্লেষণ এবং আইন বিধিবদ্ধ করার প্রয়াস ইংল্যাণ্ডের সামাজিক অর্থনৈতিক জীবনে বহু সংস্কারের সূচনা করে।[৩]

তথ্যসূত্র:

১. অনুপ সাদি, ২৪ জানুয়ারি, ২০১৯, “জেরেমি বেনথাম ছিলেন ইংরেজ দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ ও আইনবিদ”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/biography/jeremy-bentham/
২. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ২১৩-২১৫।
৩. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; ৫ম মুদ্রণ জানুয়ারি, ২০১২; পৃষ্ঠা ৮৩-৮৪।

Leave a Comment

You cannot copy content of this page