মেকিয়াভেলি বা নিক্কোলো দি বের্নার্দো দেই মাকিয়াভেল্লি বা নিকোলাই ম্যাকিয়াভেলী (ইংরেজি: Niccolò di Bernardo dei Machiavelli, ৩ মে, ১৪৬৯-২১ জুন, ১৫২৭) ছিলেন পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকের একজন ইতালীয় রেনেসাঁর কূটনীতিক, দার্শনিক এবং জাতীয়তাবাদী লেখক, যিনি ১৫১৩ খ্রিস্টাব্দে রচিত দ্য প্রিন্স বা রাষ্ট্রনায়ক গ্রন্থের জন্য সর্বাধিক পরিচিত। তাঁকে প্রায়শই আধুনিক রাজনৈতিক দর্শন এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক বলা হয়। ‘দ্য প্রিন্স’ মেকিয়াভেলির মৃত্যুর পাঁচ বৎসর পরে প্রকাশিত হয়। তাঁর চিন্তাকে ভিত্তি করে মেকিয়াভেলিবাদ নামক চিন্তাধারার উৎপত্তি ঘটেছে।[১]
সামন্তবাদী মধ্যযুগের শেষ পর্যায়ে ইউরোপে পুঁজিবাদের বিকাশের ভিত্তিতে ফ্রান্স, স্পেন ও জার্মানিতে জাতীয় রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হলেও ইতালি তখনও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সামন্ততান্ত্রিক রাজ্য ও স্বাধীন নগরে বিভক্ত। ইতালির জাতীয় ও সামাজিক স্বার্থ ইতালিতে ঐক্যবদ্ধ সুশাসিত রাষ্ট্রের গঠন অত্যাবশ্যক করে তুললেও একদিকে রোমের পোপের আপন ক্ষমতা বজায় রাখার ইচ্ছা, অপরদিকে ইতালির রাজ্যসমূহের পারস্পরিক ঈর্ষা ও দ্বন্দ্ব এবং ইউরোপের বৃহৎ রাষ্ট্রসমূহের হস্তক্ষেপে ইতালির ঐক্য বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছিল। ইতালির এরূপ পটভূমিতে মেকিয়াভেলির রাজনৈতিক জীবন এবং তাঁর রাষ্ট্রীয় দর্শন রূপলাভ করে।
মেকিয়াভেলি ১৪৮৮ থেকে ১৫১২ সাল পর্য্যন্ত ইতালির রাজ্যগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্দেশ্য নিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর এ প্রচেষ্টা বাধাহীন ছিল না। সামন্ততান্ত্রিক শক্তি, যাজকতন্ত্র এবং বৃহৎ রাষ্ট্রশক্তি ম্যাকিয়াভেলীর ঐক্যপ্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করে। এই সমস্ত শক্তির স্বার্থে ১৫১২ সালে ফ্লোরেন্স সরকার মেকিয়াভেলিকে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে নির্বাসিত করে। এই ঘটনার পরবর্তীকালে মেকিয়াভেলি সক্রিয় রাজনীতিক জীবন হতে অবসর গ্রহণ করে রাজনীতিক রচনায় আত্মনিয়োগ করেন।
মেকিয়াভেলিবাদ প্রসঙ্গে
মেকিয়াভেলি ছিলেন উদীয়মান পুঁজিবাদী সমাজের প্রতিভূ। ইতালির সামাজিক ও জাতীয় বিকাশের জন্য জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা তিনি আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। আর এই ঐক্য সাধনের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার যে বাস্তবনীতি তিনি ব্যাখ্যা করেন ‘ম্যাকিয়াভেলীর নীতি’ বলে তা প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। ‘ম্যাকিয়াভেলীর নীতি’ বলতে রাষ্ট্রের স্বার্থ সাধনের জন্য বিশেষ কোনো নৈতিকতায় আবদ্ধ না থেকে যা কিছু প্রয়োজন তাই সম্পন্ন করা বুঝায়।
মেকিয়াভেলি রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্র পরিচালনা উভয়কে ধর্ম এবং নীতির বন্ধন থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। রাষ্ট্র মানুষেরেই সৃষ্টি, কোনো ঐশ্বরিক সত্তা নয়। এবং এর পরিচালনা মানুষের কল্যাণের জন্য। এক্ষেত্রে কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস বা নীতির বন্ধন রাষ্ট্রের জন্য অলঙ্ঘনীয় নয়। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে তার শাসন ব্যবস্থার চরিত্র যে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, এ সত্য ম্যাকিয়াভেলী উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি রাজতন্ত্রকে সর্বাধিক কাম্য শাসনব্যবস্থা বলেছিলেন। এর প্রধান কারণ, ইতালির অনৈক্য ও অরাজকতার অবস্থায় একচ্ছত্র রাজশক্তিকে তিনি প্রয়োজনীয় বোধ করেছিলেন। ইতালিকে শুধু ঐক্যবদ্ধ নয়, তাকে সম্প্রসারিত হতে হবে, বৃহৎ হতে হবে। কারণ ম্যাকিয়াভেলী মনে করতেন, ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেমন, রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ও বিকাশ ও বৃদ্ধিতেই অস্তিত্ব। রাষ্ট্রকে ক্রমান্বয়ে বৃহৎ থেকে বৃহত্তর হতে হবে। অপররাজ্য গ্রাস করে হলেও তার সীমানাকে সম্প্রসারিত করতে হবে। এই বৃদ্ধিই রাষ্ট্রের জীবন। এই বৃদ্ধি যেখানে স্তব্ধ রাষ্ট্র সেখানে জড় এবং মৃতবৎ। রাষ্ট্রের বিরাট এলাকার উপর শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং বজায় রাখার জন্য ম্যাকিয়াভেলী কূটকৌশল এবং শক্তিপ্রয়োগের উপর জোর দেন।
মেকিয়াভেলির মতে রাষ্ট্রে উত্তম শাসক সে যে শাসিত অর্থাৎ জনসাধারণের মধ্যে ভয় ও সমীহের ভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম। শাসক দয়ালু এবং দুর্বল হলে রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা এবং বিদ্রোহের উদ্ভব ঘটে। কাজেই শাসকের পক্ষে প্রশংসিত বা প্রিয় হওয়ার চেয়ে শ্রেয় হচ্ছে ভয়ের পাত্র হওয়া। ম্যাকিয়াভেলীর এরূপ বক্তব্যে তাঁর সমকালীন সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতিফলন ঘটেছে।
মধ্যযুগীয় ধর্মীয় ব্যাখ্যার স্থানে ম্যাকিয়াভেলী রাষ্ট্রীয় সমস্যার বিচারে বাস্তব এবং ঐতিহাসিক পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। তাঁর রাজনীতিক সিদ্ধান্তসমূহ একদিকে যেমন তৎকালীন ইতালির ঐক্যসাধন এবং সামাজিক বিকাশে অগ্রসর শক্তির কাজ করেছে, তেমনি তাঁর নীতিহীনতা পরবর্তীকালে ইউরোপের ধনবাদী রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদী এবং ফ্যাসিবাদী আগ্রাসী মনোভাব সৃষ্টিরও সহায়ক হয়েছে। মেকিয়াভেলির বিশেষ অবদান এই যে, এ পর্য্যন্ত রাষ্ট্রকে যেখানে অতিজাগতিক এবং ঐশ্বরিক সত্তা হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে সেখানে ম্যাকিয়াভেলী রাষ্ট্র যে মানুষের সৃষ্টি এবং মানুষের প্রয়োজনে তার ব্যবহার ও বিকাশ, এ সত্যকে তিনি মধ্যযুগের পটভূমিতে অগ্রগামীর সাহস নিয়ে প্রকাশ করেছেন।
মেকিয়াভেলির জীবনকালে ইতালি রোম, ফ্লোরেন্স, মিলান, ভেনিস এবং নেপলস এরূপ পাঁচটি নগর রাষ্ট্রে বিভক্ত ছিল। এই রাষ্ট্রগুলির মধ্যে নিজ রাষ্ট্র ফ্লোরেন্স অর্থনীতি, রাজনীতি, শিল্প, সাহিত্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে ছিল সবচেয়ে অগ্রগামী, ইউরোপীয় নবজাগরণের অন্যতম কেন্দ্র।
আরো পড়ুন
- নোয়াম চমস্কি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মার্কিন দার্শনিক
- মার্শাল ম্যাকলুহান ছিলেন কানাডীয় প্রতিক্রিয়াশীল দার্শনিক
- জ্যাক দেরিদা ছিলেন প্রতিক্রিয়াশীল ফরাসি দার্শনিক
- বারট্রান্ড রাসেল ছিলেন একজন ব্রিটিশ মহাজ্ঞানী, চিন্তাবিদ, দার্শনিক ও মনীষী
- ইমানুয়েল কান্ট ছিলেন অষ্টাদশ শতকের জার্মান ভাববাদী দার্শনিক ও বিজ্ঞানী
- রেনে দেকার্ত ছিলেন সপ্তদশ শতকের ফরাসি দার্শনিক, গণিতশাস্ত্রবিদ ও বিজ্ঞানী
- জন স্টুয়ার্ট মিল উনিশ শতকের ইংল্যান্ডের দার্শনিক, যুক্তিবিদ এবং অর্থনীতিবিদ
- প্লেটো ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের প্লেটোবাদী স্কুল ও একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা দার্শনিক
- এরিস্টটল প্রাচীন গ্রিসের ধ্রুপদী সময়কালের একজন দার্শনিক এবং বহু জ্ঞানী
- সেন্ট অগাস্টিন ছিলেন উত্তর আফ্রিকার প্রকৃতিবাদী ধর্মতত্ত্ববিদ ও খ্রিস্টীয় দার্শনিক
- সেন্ট টমাস একুইনাস ছিলেন ইতালীয় খ্রিস্টীয় সন্ন্যাসী, দার্শনিক ও যাজক
- চার্লস লুই দ্য মন্টেস্কু স্বৈরতন্ত্র ও রাজতন্ত্রবিরোধী একজন পুঁজিবাদী দার্শনিক
- মেকিয়াভেলি ইতালীয় রেনেসাঁর কূটনীতিক, দার্শনিক এবং জাতীয়তাবাদী লেখক
- জাঁ জ্যাক রুশো ফরাসি বিপ্লবের তাত্ত্বিক এক পুঁজিবাদী দার্শনিক, লেখক ও সুরকার
- জন লক ছিলেন সপ্তদশ শতকের ইংরেজ বস্তুবাদী দার্শনিক ও রাজনৈতিক লেখক
- লেনিন ছিলেন বিশ শতকের ইউরোপের মহত্তম মানব এবং মার্কসবাদের উত্তরসূরি
- কনফুসিয়াস ছিলেন শরত বসন্তকালের একজন চীনা দার্শনিক এবং রাজনীতিবিদ
- আবুল ফজল ছিলেন আকবরের এক নবরত্ন, সুপণ্ডিত, ইতিহাসবেত্তা ও রাজনীতিক
- মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ছিলেন ভারতের মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণির নেতা
- টমাস হবস আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক
- লিও তলস্তয় ছিলেন সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং প্রভাবশালী লেখক
- ফ্রিডরিখ হেগেল ছিলেন জার্মান ভাববাদী দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব
তথ্যসূত্র:
১. অনুপ সাদি, ২৮ জুন ২০১৯, “মেকিয়াভেলি ছিলেন পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকের ইতালির জাতীয়তাবাদী চিন্তাবিদ”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/biography/machiavelli/
২. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ২৭২-২৭৩।
রচনাকাল: ২৮ জুন ২০১৯, নেত্রকোনা বাংলাদেশ।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।