বিনয় রায় ছিলেন আধুনিক বাংলা গান ও গণসংগীতের গীতিকার ও রাজনৈতিক কর্মী

বিনয় রায় (৮ সেপ্টেম্বর ১৯১৮ – ৩ জুলাই ১৯৭৫) ছিলেন আধুনিক বাংলা গান ও গণসংগীতের অনন্য রূপকার এক প্রাণবন্ত দেশপ্রেমিক ও রাজনৈতিক যোদ্ধা। জন্মলব্ধ সুকণ্ঠের জাদুতে শৈশব থেকেই তিনি সংগীতানুরাগীদের মুগ্ধ করতেন। তবে কেবল সুরের মায়াজালে নয়, বরং শৈশবের সেই কাঁচা বয়সেই তাঁর হৃদয়ে অঙ্কুরিত হয়েছিল দেশমাতৃকার মুক্তি ও প্রগতিশীল রাজনীতির আদর্শ, যা তাঁর গানের বাণীতে আমৃত্যু ধ্বনিত হয়েছে।

১৯১৮ সালের ৮ সেপ্টেম্বর রংপুরের মাটিতে জন্ম নেওয়া বিনয় রায়ের শিকড় ছিল পাবনা জেলায়। উত্তরবঙ্গের আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা এই শিল্পীর জীবন দেশভাগের অমোঘ টানে আমূল বদলে যায়। উত্তাল দেশভাগের পর তিনি কলকাতায় চলে আসেন এবং সেখানেই তাঁর সংগীত ও রাজনৈতিক সংগ্রামের নতুন ক্ষেত্র গড়ে তোলেন।

কৈশোরের প্রারম্ভেই বিনয় রায় সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠন যুগান্তর দলে যোগ দিয়ে দেশমাতৃকার সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। পরবর্তীকালে কলকাতায় পাড়ি জমিয়ে তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেন ট্রেড ইউনিয়নের সক্রিয় কর্মকাণ্ডে এবং অচিরেই কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শে দীক্ষিত হয়ে এর সদস্যপদ গ্রহণ করেন। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায় ১৯৩৬ সালে আমেদাবাদে ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। এরপর ১৯৩৯ সালে তিনি বেলেঘাটার চটকল শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪২-৪৩ সালের ক্রান্তিকালে তিনি ভারতীয় গণনাট্য সংঘের (IPTA) সাংস্কৃতিক ও সংগীত শাখার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন, যা বাংলা গণসংগীতের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর উত্তাল সময়ে বিনয় রায়ের জীবনে গান রচনার এক অভূতপূর্ব জোয়ার আসে। তাঁর মন্দ্র ও উদাত্ত কণ্ঠের গণসংগীত তৎকালীন সভা, সমিতি এবং রাজনৈতিক সমাবেশগুলোকে এক অনন্য উদ্দীপনায় ভরিয়ে দিত। মালাবারের কায়ুর আন্দোলনের অমর পাঁচ শহীদ কমরেডের আত্মত্যাগের স্মরণে তাঁর রচিত বিষাদাতুর গান ফিরাইয়া দে, মোদের কায়ুর বন্ধুদেরে তখন মানুষের মুখে মুখে ফিরত। গণনাট্য সংঘের এই সাংস্কৃতিক লড়াইয়ে তাঁর সহযোদ্ধা ও বন্ধু হিসেবে পাশে পেয়েছিলেন সলিল চৌধুরীজ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র ও দেবব্রত বিশ্বাস-এর মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের, যাঁদের সাথে তাঁর যৌথ প্রয়াস গণসংগীতের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে।

বিনয় রায়ের শৈল্পিক প্রতিভা কেবল মঞ্চেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি কে. এ. আব্বাস পরিচালিত কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘ধরতি কে লাল’ এবং ঋত্বিক ঘটকের ‘লেনিন’ তথ্যচিত্রের জন্য কালজয়ী সব গান রচনা করেন। এর পাশাপাশি অসংখ্য গণসংগীতের মাধ্যমে তিনি শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন। ১৯৫০ সালে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পার্টির নির্দেশে তিনি আত্মগোপন করেন এবং তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে পাড়ি জমান। সেখানে তিনি মস্কো বেতার কেন্দ্রের বাংলা বিভাগে বিশেষ সম্প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করেন।

১৯৫৯ সালে বিনয় রায় স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং ১৯৬০ সালে দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (JNU) রাশিয়ান সেন্টার বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু করেন। দুর্ভাগ্যবশত, ১৯৭৫ সালের ৩ জুলাই মস্কো শহরে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় এই কালজয়ী শিল্পীর জীবনপ্রদীপ নিভে যায়। বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, এমন এক শক্তিশালী কণ্ঠের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কোনো গানের গ্রামোফোন রেকর্ড সংরক্ষিত নেই। তবে তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ফিরাইয়া দে’ গানটি পরবর্তীকালে প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব শম্ভু মিত্র সামান্য রূপান্তর করে তাঁর বিখ্যাত কাব্যনাটক ‘চাঁদ বণিকের পালা’-য় ব্যবহার করেছিলেন।

আরো পড়ুন

অনুরাধা পাড়োয়ালের কণ্ঠে বিনয় রায়ের একটি গান শুনুন ইউটিউব থেকে

তথ্যসূত্র

১. দোলন প্রভা, বিনয় রায় রাজনৈতিক কর্মী এবং আধুনিক বাংলা গানের গীতিকার, রোদ্দুরে.কম, ৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ইউআরএল: https://www.roddure.com/biography/binoy-roy/
২. সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত আধুনিক বাংলা গান, প্যাপিরাস, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৯৪, পৃষ্ঠা, ১৭৬।

Leave a Comment