ফিরাইয়া দে মোদের কায়ুর বন্ধুদেরে: এক রক্তঝরা ইতিহাসের গান

বাংলা প্রতিবাদী গানের ইতিহাসে “ফিরাইয়া দে মোদের কায়ুর বন্ধুদেরে” একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও শোকাতুর গণসংগীত। ১৯৪২ সালে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের (IPTA) অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব ও প্রখ্যাত গণসংগীত শিল্পী বিনয় রায় এই ঐতিহাসিক গানটি রচনা এবং সুর করেছিলেন। কালজয়ী এই সৃষ্টিটি পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে মণিলাল মজুমদারসহ অন্যান্য লোকশিল্পীদের কণ্ঠে আরও ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।

“ফিরাইয়া দে মোদের কায়ুর বন্ধুদেরে” গানের ঐতিহাসিক পটভূমি ও গুরুত্ব

এই কালজয়ী গণসংগীতটির পেছনে রয়েছে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের এক রক্তঝরা এবং গৌরবময় ইতিহাস। গানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

  • কায়ুর কৃষক বিদ্রোহ (১৯৪১): ১৯৪১ সালে কেরালার মালাবার অঞ্চলের কায়ুর (Kayyur) গ্রামে শোষক জমিদার এবং ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বামপন্থী কৃষকদের বিদ্রোহ তীব্র আকার ধারণ করে। এই তীব্র গণআন্দোলনের এক পর্যায়ে পুলিশের সাথে আন্দোলনকারীদের চরম সংঘর্ষ ঘটে এবং একজন পুলিশ কনস্টেবল নিহত হন।
  • চার বীর বিপ্লবীর ফাঁসি: এই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে ব্রিটিশ প্রশাসন দমনপীড়ন শুরু করে এবং চারজন তরুণ কমিউনিস্ট কর্মীকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে ফাঁসির দণ্ড দেয়। এই অমর শহীদরা হলেন— মদনন, কুনহুম্বু, চেরুকান্দান এবং আবু বকর
  • শহীদান দিবস (২৯ মার্চ, ১৯৪৩): ১৯৪৩ সালের ২৯শে মার্চ ভোরে কান্নুর কেন্দ্রীয় কারাগারে এই চার তরুণ বিপ্লবীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁরা ‘কমিউনিস্ট পার্টি জিন্দাবাদ’ এবং ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানে পুরো কারাগার কাঁপিয়ে তুলেছিলেন।

এই ঐতিহাসিক ও শোকাবহ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীতে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের শিল্পীরা এই কালজয়ী প্রতিবাদী গানটি সৃষ্টি করেন।

গানটি রচনার মূল কারণ ও উদ্দেশ্য

“ফিরাইয়া দে মোদের কায়ুর বন্ধুদেরে” গানটি কেবল একটি সাধারণ সুর নয়, বরং এটি ছিল শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের এক বজ্রকণ্ঠ। গানটি রচনার প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি: কায়ুরের সেই চারজন তরুণ কমিউনিস্ট বিপ্লবীর ফাঁসি এবং তাঁদের বেদনাবিধুর আত্মত্যাগের স্মৃতিকে অমর করে রাখতেই বিনয় রায় এই গানটি রচনা করেন।
  • হারানোর হাহাকার ও প্রতিবাদ: এটি একদিকে যেমন আন্দোলনের বীর বন্ধুদের হারানোর এক গভীর হাহাকার, অন্যদিকে শোষক ও অত্যাচারী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ।
  • বিপ্লবীদের মনোবল বৃদ্ধি: গানটি কেবল একটি শোকগাথা বা কান্নার গান নয়। তৎকালীন গণনাট্য সংঘের (IPTA) আন্দোলনের ধারায় এটি বিপ্লবীদের মনোবল ধরে রাখতে এবং সাধারণ মানুষের মনে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনা জাগ্রত করতে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিল।
  • ঐতিহাসিক সংরক্ষণ: বিপ্লবী চেতনার এক অনন্য দলিল হওয়ায় বর্তমান সময়ের বিভিন্ন গণসংগীত সংকলন ও ইতিহাসে এই গানটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সংরক্ষিত রয়েছে।

“ফিরাইয়া দে মোদের কায়ুর বন্ধুদেরে” গানের সুর ও সঙ্গীত শৈলী

এই গণসংগীতটির সুরের মাঝে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত জাদুকরী শক্তি, যা খুব সহজেই সাধারণ মানুষের মনকে নাড়া দেয়। গানটির সুর ও শৈলীর বৈশিষ্ট্য নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ভাটিয়ালি সুরের মেলবন্ধন: গানটি মূলত বাংলার ঐতিহ্যবাহী ভাটিয়ালি সুরের ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে। ভাটিয়ালি সুরের যে চিরন্তন হাহাকার এবং টান, তা এই গানের শোকাতুর আবহকে আরও বেশি জীবন্ত করে তুলেছে।
  • লোকজ সুরের মাধ্যমে গণচেতনা: গণ-আন্দোলনের জটিল রাজনৈতিক চেতনাকে সাধারণ ও মেহনতি মানুষের কাছে সহজে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই এই বিশেষ লোকজ শৈলী ব্যবহার করা হয়েছিল। ফলে গানটি কেবল বুদ্ধিজীবীদের মাঝে সীমাবদ্ধ না থেকে সাধারণ গ্রামীণ মানুষেরও প্রাণের গান হয়ে ওঠে।

মণিলাল মজুমদারের কণ্ঠে গানটি শুনুন ইউটিউব থেকে

গানটির কথাসমূহ

ফিরাইয়া দে, দে, দে মোদের কায়ুর বন্ধুদেরে।
মালাবারের কৃষক সন্তান, (তারা) কৃষক সভার ছিল প্রাণ
অমর হইয়া রহিবে তারা দেশের দশের অন্তরে।।
কৃষক মায়ের রাখতে ইজ্জত মান, (তারা) ফাঁসী কাষ্ঠে দিল প্রাণ
ফিরিয়া পাব না রে মোদের কায়ুর বন্ধুদেরে।।

লজ্জার কথা থুইব রে কোথায় ?
তাদের বাঁচাইতে নারিলাম হায়
তাদের ছাইড়া দিতে বাধ্য করতে
নারলাম দেশের অবুঝ সরকারে রে।।

শোন রে দেশের কৃষক-সন্তান
শোন রে দেশের দেশপ্রেমী সন্তান
শোন রে দেশের বীরের মায়ের প্রাণ
অক্ষমতার দে রে প্রতিদান।
ফিরাইয়া দে তাদের দেশের কাজে হাজারে হাজারে।।

চার কায়ূরের বদলে আজ ভাই
(মোদের) হাজার হাজার কায়ুর চাই
ফিরিয়া পাব রে মোদের কায়ুর শহীদদেরে।।

আরো পড়ুন

বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটি ৩ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। এছাড়াও ২৮ মে ২০২৬ তারিখে লেখাটির সংস্কার সাধন করা হয়েছে। গানের কথা নেয়া হয়েছে সুধীর চক্রবর্তী সংকলিত ও সম্পাদিত আধুনিক বাংলা গান, প্যাপিরাস কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৯৪, পৃষ্ঠা ১৩৮ থেকে।

Leave a Comment